শহীদ মিনার

রুমানা নাওয়ার

25

ষোলো ডিসেম্বর খুব ভোরে শহীদ মিনারে বাবার সাথে ফুল দিতে গেলো টগর।এত এত লোকের ভীড়ে ফুল হাতে বাবার হাত ধরে পায়ে পায়ে হেঁটে শহীদ মিনারে পৌঁছুতে পেরে খুশীতে দু’হাতে তালি বাজালো টগর। তার প্রথম দেখা এরকম সকাল। খালি পায়ে ফুল হাতে হাজার হাজার মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। সবারই লক্ষ্য মাথা তুলে দাঁড়ানো শহীদ বেদীমূল। কি অপার দৃঢ়তায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে প্রতিকী দেশের সূর্য সন্তহানেরা। দেশ মাতৃকার প্রতি শ্রদ্ধাবনত এঁরা। মাথা নুইয়ে দেশের প্রতি সন্মান জানাচ্ছে দিনরাত্রি অহর্নিশ।
গোলাপের গুচ্ছটা শহীদ মিনারে রেখে উপুর হয়ে উপরের দিকে তাকালো টগর। কি ভাবলো কি জানে। ছোট্ট টগর।
বয়স আর কতো হবে তার? ছয় শেষ হলো মাত্র। বাবার হাতটা ছাড়িয়ে সামনে হাঁটলো কয়েক কদম। কিনার ধরে ধরে এগুলো শহীদ মিনারের মাথা তোলা স্তম্ভের কাছে। বাবা একটুও চমকালো না বাঁধাও দিলোনা ছেলেকে। বরং পরম আগ্রহে তাকিয়ে রইলো ছেলের দিকে। কি করে তার বুকের ধন সাত রাজার মানিক দেখলো চেয়ে চেয়ে। আয়শা হলে তা কখনো পারতোনা টগর। ছেলেকে হাতছাড়া করতোই না। মুঠোয় পুরে রাখতো ছেলের হাত। মায়ের সাবধানী হাত ছেড়ে টগর কি পারতো শহীদ মিনারকে বুকে জড়াতে?
এসব ভাবতে ভাবতে বাবা ছেলের থেকে চোখ সরালো না একটুও।
টগর ডানহাতটা তুলে সালাম জানিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কয়েক সেকেন্ড কি ভাবলো কে জানে। বাবাও পায়ে পায়ে ছেলের কাছে এসে দাঁড়ালো। টেরই পেলো না সে। টগর বিড়বিড় করে বলতে লাগলো… তোমাদের আমি অনেক ভালোবাসি। যেমন ভালোবাসি আমি আমার মা’কে বাবাকে। ছোট্ট টুই সোনাকে। আমি তোমাদের মতো হতে চাই। আমি যুদ্ধ করবো তোমাদের মতো। দেশের জন্য প্রাণ দিতে পারবো আমিও। ছোট্ট হাত দু’টোতে জড়িয়ে ধরলো শহীদ মিনারকে। তারপর কাঁদতে লাগলো। বাবা অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলো তার বীর পুরুষ ছেলের দিকে।
ছেলেকে ডাকার ইচ্ছে হলোনা তার। আরো অনেককাল এভাবে দাঁড়িয়ে টগরের কথা শুনার সাধ হলো। কখন কোন ফাঁকে দেশপ্রেমের বীজ বপন হয়ে গেলো টগরের বুকে জানতেই পারলো না একটুও। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ও কত শিশু কিশোর যুবক বৃদ্ধ কতভাবে যে দেশের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে তাও তো দেশমাতৃকার প্রেমে। সময় মানুষকে বলে দেয় কি করতে হবে, কি করা উচিত। আমার টগর সোনা ও সে রকম সময়ের সারথি। দেশমাতৃকার সূর্যসন্তান। আজকের যে বোধ, ভাবনা, অনুভূতি তা আগামীতেও অটুট থাকুক কায়মনোবাক্যে এটাই প্রার্থনা করলো মনে মনে।