শহীদ ছাত্রনেতা তবারক হত্যা ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

32

মোঃ খোরশেদ আলম

১৯৮১ সাল আমি তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কদম মোবারক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করি। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে নজির আহমদ রোডস্থ এম.ই.এস স্কুলে ভর্তি হই। স্কুলটি নাছির ভাইয়ের বাড়ীর বিপরীতে অবস্থিত। হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পর থেকে নাছির ভাইয়ের কথা শুনে আসছি। ’৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীরা নতুনভাবে রাজনীতি করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। বাংলাদেশের সমস্ত বিশ^বিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলো নেত্রীর আগমনী বার্তায় মিছিলে মিছিলে মুখরিত হয়ে উঠে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়ার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলাদশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে লেখা-পড়ার চেয়ে অস্ত্রের ঝনঝনানী ছিল বেশি। প্রশাসনের ছত্র-ছাঁয়ায় থেকে চর দখলের মত ক্যাম্পাস দখল করা ছিল ইসলামী ছাত্র শিবির ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাদের প্রতিদিনের কাজের রুটিন। ১৯৭৯ সালে ঢাকা বোর্ডের উচ্চ মাধ্যমিক পরিক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় শীর্ষে থাকা মেধাবী ছাত্র গোলাম ফারুক অভি, নিরু, বাবলুদের সেইদিন হিজবুল বাহারে করে সিঙ্গাপুরে প্রমোদ ভ্রমণে পাঠিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। সেই থেকে মেধাবী ছাত্ররা বিকৃত ও অপসংস্কৃতির ছাত্র রাজনীতির দিকে ধাবিত হয়। যা পরবর্তীতে আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়য়ের ৭ গঁৎফবৎ এর ঘটনা আমরা সকলে কম-বেশী জানি। ঐ মামলার প্রধান আসামী শফিউল আলম প্রধানের ফাঁসির রায় হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে রাষ্ট্রপতি ক্ষমতাবলে তাকে ক্ষমা করে দেয়। মূলত, তখন থেকেই দেশের সকল বিশ^বিদ্যালয়, কলেজ গুলোতে হত্যার রাজনীতি শুরু হয়। ’৮১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সকাল বেলা চট্টগ্রাম কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের মিছিল হওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করে মহানগর ছাত্রলীগ। ঐ সময় নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন সফর আলী, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ মোহাম্মদ, আ.জ.ম নাছির উদ্দিন ঐ কমিটির শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক। মিছিলটি কলেজের প্রধান ফটক দিয়ে ছাত্রাবাসিক হলের সামনে আসতেই শিবিরের ক্যাডার আনোয়ার ও হেলাল হুমায়ুনের নেতৃত্বে মিছিলের উপর হামলা হয়। প্রথমে তারা আ.জ.ম নাছিরকে বেদড়ক লাঠিপেটা করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, এরপর হামলা করে সিটি কলেজ ছাত্র সংসদের এজিএস মেধাবী ছাত্রনেতা তবারকের উপর। মৃত্যু নিশ্চিত করে তবারকের লাশটি ঐ সময় ক্যাম্পাসে রেখে তারা পালিয়ে যায়। নাছির ভাই কলেজের পূর্ব গেট হয়ে সিরাজদ্দৌলা রোডে তাঁর এক নিকট আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নেন। নজির আহমদ চৌধুরী রোডে মুহাদ্দেস ভিলায় সেই সময় নেতা-কর্মীদের ভিড় হতে লাগল। এক সময় খবর এল নাছির ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা তখন এম.ই.এস স্কুলের গেটে নাছির ভাইকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছি। নাছির ভাইয়ের মা ছেলের জন্য উন্মাদ প্রায় ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’ নাছির ভাই প্রাণে বেঁচে যায়। ’ ৮০-৯০ দশক ছাত্রলীগের রাজনীতি করা অত্যন্ত কঠিন দূরহ ব্যাপার ছিল। কারণ সে সময় ছাত্রলীগের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের উপর মিথ্যা মামলা ও হুলিয়া ছিল। এখন আ.জ.ম নাছির সম্পর্কে অনেকে অনেক কথা বলেন। কিন্তু ’৮১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তবারকের স্থলে যদি নাছির ভাই মারা যেতেন তাহলে সে দায়িত্ব কে নিত? চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কলেজ, হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, আগ্রাবাদ সরকারি বাণিজ্য কলেজ, টি.টি.সি. পলিটেকনিক্যাল কলেজ সহ সমস্ত কলেজ ক্যাম্পাসগুলো ছাত্রশিবির এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের দখলে ছিল। ধীরে ধীরে নাছির ভাইয়ের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের বিভিন্ন কলেজ-ক্যাম্পাসগুলো ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে আসে। ’৭৫ এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর তবারক ছিল প্রথম শহীদ ছাত্রনেতা। বর্তমানে ছাত্ররাজনীতির সাথে অতীতের ছাত্র-রাজনীতির মাঝে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। নীতি, আদর্শের প্রশ্নে সেই সময় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ছিল আপোসহীন। জীবনের মায়া ত্যাগ করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ করে শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির ঝান্ডা উড়িয়ে কলেজ ক্যাম্পাসগুলোতে সংগঠনের ভীত মজবুত করা ছিল নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য উদ্দেশ্যে। ঐ সময় এত গ্রুপিং ছিল না। ভোগের চেয়ে ত্যাগের মহিমা ছিল বেশী। ’৮২ সালে এসএসসি পাস করার পর আমি, রাশেদ, আলমগীর, আমার চাচাত ভাই সৈয়দুল হক, হারুন (পাথরঘাটা), মোহাম্মদ ফারুক (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী), চকবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. মোর্শারফের ছেলে রিদুয়ান, দেব পাহাড়ের জসিম, জাকির, ইডেন তসলিম আরো অনেকে ঐ সময় মহসিন কলেজ ক্যাম্পাসে আড্ডা দিতাম। ঐ সময় ক্যাম্পাসে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথে আমাদের মারামারি হলে আমি ও রিদুয়ান গ্রেফতার হই। ’৭৪ এর বিশেষ ক্ষমতা আইনে আমাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। ছাত্রলীগের উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন ও জুলুম-অত্যাচার। শহীদ তবারক আমাদের মাঝে আর কোন দিন ফিরে আসবে না। তাঁর রক্তের সিঁড়ি বেয়ে আজ চট্টগ্রামের সমস্ত বিশ^বিদ্যালয়-কলেজগুলো ছাত্রলীগের দুর্গে পরিণত হয়েছে। তার নীতি আদর্শ আমাদের চলার পথে পাথেয় হয়ে থাকবে। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে দেশ-দেশের মানুষ ও সংগঠনকে ভালোবাসি তাহলে সকল অপরাজনীতি, অপকর্ম ও সন্ত্রাস থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে-বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সোনার বাংলা ও তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে- ছাত্রলীগের মূল নীতি শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির ধারাকে অব্যাহত রাখতে পারি তাহলে শহীদ তবারকের আত্মা শান্তি পাবে।

লেখক: শ্রম সম্পাদক চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগ