শহীদ কাদরী : কবিতায় শ্রেণী উচ্ছেদে উচ্চকিত কণ্ঠস্বর

সৈয়দ জেরিন

24

১৯৪৭ পরবর্তী ঢাকা কেন্দ্রিক বাংলা কবিতার নতুন ইতিহাস সৃষ্টিতে যে কয়কজন কবি অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন, তাদের মধ্যে শহীদ কাদরী অন্যতম। আধুনিক বাংলাকাব্যের জনক, কবিকূল শিরোমনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। আধুনিক বাংলা গীতিকবিতার জনক বিহারীলাল চক্রবর্তীর ধরিয়ে দেয়া সুরে গীতিকবিতা লিখে বাংলাকাব্যকে বিশ্বের দরবারে নিয়ে যান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এরপর কাজী নজরুল ইসলাম সৃষ্টি করলেন বাংলা কবিতার নতুন বাঁক। রবীন্দ্র-নজরুলের গড়া বাংলা কবিতার ঐতিহ্যের উপর দাঁড়িয়ে আবির্ভূত হলেন তিরিশোত্তর পঞ্চ-আধুনিক কবি বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে। বাংলা কবিতার এ রাজকীয় যাত্রায় কলকাতা ছিল বাংলা কাব্যের রাজধানী। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পর ঢাকা কেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যের নতুন রাজধানী সৃষ্টিতে যে কয়জন কবি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন তাদের মধ্যে আছেন সিকান্দর আবু জাফর, আবুল হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান, সানাউল হক, শামসুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, সৈয়দ সামসুল হক, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রমুখ। তিরিশোত্ত আধুনিক কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ যেমন পরবর্তী কবিদের কবি হয়ে আছেন তেমনি বাংলাদেশের প্রধান কবি হিসেবে শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রমুখ তাদেরকে বাংলাদেশের অপরিহার্য প্রধান কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। উপরোক্তরাই বর্তমান বাংলাদেশের কাব্যধারায় বিশিষ্টতা অর্জন করে টিকে আছেন।
শহীদ কাদরীর কবিতা মাইকেল, নজরুল, সুধীন দত্তের মতো অস্বাভাবিক পন্থায় কবি হননি। তিনি স্বাভাবিকভাবে বিশিষ্ট হয়ে আছেন। শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরীর তিন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা চারজনই বাংলাদেশের প্রধান কবির আসনের যৌক্তিক দাবিদার। এরা চারজন আজীবন কবিতার সাথে বসবাস করেছেন ও করছেন। শামসুর রাহমান ও শহীদ কাদরী প্রায়ত আর সৈয়দ হক ও আল মাহমুদ এখনো কাব্য জগতে সরব আছেন।
বুদ্ধদেব বসু তিরিশোত্তর আধুনিক বাংলা কাব্যের সংগঠক। রবীন্দ্র-নজরুল বলয়মুক্ত রঙিন ও রঙরিক্ত, দ্রোহী ও আনত, সুখকর ও সুখহর, সমকাল মগ্ন ও মহাকাললুব্ধ, ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তক, বিশ্বমুখি ও স্বদেশলগ্ন এবং জ্ঞানী ও মেধাবী বাংলাকাব্যের ভূবন তৈরিতে বুদ্ধদেব বসু বিশাল মহিরোহ। বুদ্ধবে বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকার স্বীকৃতি নিয়ে আধুনিক কবিতার পঞ্চপান্ডবের বিচিত্র পথ ধরে কবি হয়ে উঠেছেন শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী। চারজনের মধ্যে সহজাত কাব্য হিংসাও ছিল। চারজনই মেধাবী এবং বাংলা কবিতার একনিষ্ঠ সেবক।
শহীদ কাদরী লিখেছেন মাত্র চারটি কাব্যগ্রন্থ। শ’দেড়েক কবিতা, যা তার ‘উত্তরাধিকার’ ১৯৬৭, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা ১৯৭৪, কোথাও কোন ক্রন্দন নেই ১৯৭৮, ও আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও ২০০৯-এ চারটি কাব্য গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। তিনি লিখেছেন কম। কিন্তু দেখে লিখেছেন, ছেঁকে লিখেছেন; কবিতা নামধারী পদ্যের জঞ্জাল তৈরি করেন নি। বাংলা সাহিত্যে বেশি লিখে বড় কবি হয়েছেন একজন তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিতার মধ্যে যদি জীবনবোধ, মনবতা এবং শিল্প থাকে তবে কম লিখেও যে কেউ কাল মহাকলের যাত্রী হতে পারেন। বিশ্বসসাহিত্যে বোদলেয়ার কম লিখেছেন, ১৮০টার মতো কবিতা নিয়ে একটিমাত্র কাব্যগ্রন্থ রচনা করে তিনি স্থান পাকা করতে পেরেছেন বিশ্বসাহিত্যে। শহীদ কাদরীও কম সংখ্যক কবিতা নিয়ে বাংলা কব্যে পাকা আসন দখল করতে পেরেছেন, হয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান কবিদের একজন।
শহীদ কাদরীর জন্ম ১৪ আগস্ট ১৯৪২, মৃত্যু ২৮ আগস্ট ২০১৬। তিনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর হিন্দু মুসলিম দাঙার সময় তার পরিবার স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন। বড় হয়েছেন ঢাকা মহানগরীতে। ১৯৭১ সালে শহীদ কাদরী বিয়ে করে নাজমুন নেসা পিয়ারীকে। ঠিক তার কয়েক বছর পর ১৯৭৮ সালে কি এক অভিমানে তিনি দেশ ত্যাগ করে লন্ডনে চলে যান। সেখানে ৫ বছর থাকার পর চলে যান জার্মানিতে। তিন মাস জার্মানিতে থেকে আমেরিকায় পাড়ি জমান। আমেরিকায় তিনি তাঁর এক ভক্তনারী ‘নীরা’কে বিয়ে করেন। নীরা কাদরী নামে সে নারী কবির শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত সাথে ছিলেন। বিগত ২২ আগস্ট ২০১৬তে আমেরিকার নর্থ শোর হাসপাতালে অসুস্থ অবস্থায় কাদরীকে ভর্তি করা হয়। সেখানে ২৭ আগস্ট তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। অবশেষে মৃত্যুই তার অভিমান ভাঙতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৭৮ সালে দেশ ত্যাগের পর মাজখানে তিনি দেশে এসে কিছু দিন দৈনিক সংবাদে কাজ করেছেন। পরে আবার চলে যান আমেরিকায়। তাঁর দীর্ঘ প্রবাসের কারণ হিসেবে তিনটি বিষয় ওঠে আসে: ক. প্রথম স্ত্রী সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ, খ. এক কবি বন্ধুকে টাকা দিয়ে একটা প্রেস কিনে পরে বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতায় প্রেসের মালিক হতে না পেরে প্রেস ধ্বংস এবং গ. ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড। তা য্ াহোক, শহীদ কাদরী ভালোবাসতেন কৈশোর যৌবন কাটানো এ বাংলাদেশকে। দীর্ঘদিন প্রবাসে জীবন কাটানোর পর তিনি বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় ফিরে আসেন এ দেশে। জীবিত নয়, শবদেহ হয়ে। তিনি প্রবাসে থাকলেও অন্তরে কামনা করতেন এ দেশের শীতল মাটিতে কবরস্ত হতে ‘স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নে একদিন’ কবিতায়:
‘আমার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে আমার শুধ্যানুয়ীরা পৌঁছে গেছেন
শহরের প্রখ্যাত কবরখানায়,
পুরানো পল্টন থেকে পায়ে হেঁটে রওয়ানা দিয়েছেন
তিন জন তরুণ কবি
মোহাম্মদপুর থেকে এসেছেন চশমা-চোখে
বিরলকেশ দু’জন সাহিত্য সমালোচক,
প্রায় প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা পাঠিয়েছেন
অসামান্য চিত্রকল্প শিকারি।
বেশ কয়েকজন ক্যামরাম্যান।’
(আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও)……এখানে ঢাকা শহরে তাঁর কবরস্থ হবার বাসনা স্পষ্ট।
কবির কবিতা সামগ্রী, শান্তির আবাসে যখন নষ্ট হয় ভালোবাসার বন্ধন, ভেঙে যায় সংসার; বন্ধু যখন হয় বিশ্বাসঘাতক; আর যে দেশের মানুস দেশের স্থপতিকে নির্মমভাবে হত্যা করে, সে দেশের প্রতি তার অভিমান হতেই পারে। ৫০-এর দশকের কবি শহীদ কাদরী দেশের সাধারণ মানুষ, রাজনীতি, নির্সগ এবং শিল্পের উন্নতি ও কল্যাণ কামনা করেছেন-১৪ বছর বয়স থেকে আমৃত্যু। তার কবিতাশিল্পই এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশ ছেড়ে প্রবাসী জীবন কখনো তাঁর কাম্য ছিল না। মৃত্যুর পূর্ব সময়ে তিনি দেশে ফেরার আকাঙ্খা পোষণ করেছেন। কবির ভাষা:
‘তোমার আমার প্রিয় কবি কোথায় যেন বলেছিলেন
সব পাখিরা ঘরে ফিরে
সব নদী।
আমরা কেন দন্ডায়মান
গাছতলাতে নিরবধি।
কীর্তিনাশার কালো স্রোতে
নৌকাভাসে সারি সারি
এবার আমি বলতে পারি-
যাচ্ছি বাড়ি।
যাচ্ছি বাড়ি।’
(সব নদী ঘরে ফেরে)।
কবি দেশ ও বাড়ি ফেরার পিপাসা ‘আমরা চুম্বন গুলো পৌঁছে দাও’ কাব্যগ্রন্থের ছত্রে ছত্রে প্রকাশ মান।
শহীদ কাদরী স্বভাব কবি। কবিতা প্রসবের অলৌকিক বেদনাবোধে সদা কল্পমান পুরুষ। কবি মাত্রেরই অলৌকিক বেদনাবোধ থাকবে। কবি সম্পর্কে অন্য এক কবি বলেন, ‘তিনি এক ঝড়ো কবি/বুকে ঝড় বয়/যার বুকে ঝড় নেই/সে কি কবি হয়?‘ সৃষ্টি ও শিল্পের বেদনা সব সময় কবিদের তাড়িত করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন :
‘অলৌকিক আনন্দের ভার
বিধাতা যাহারে দেন
তার বক্ষে বেদনা অপার
তার নিত্য জাগরণ
ঊর্ধ শিখা জ্বালিচিত্তে
অহোরাত্র দগ্ধ করে প্রাণ।’
এইতো সকল কবির বেদনাবোধের স্বরূপ।
বিউটি বোর্ডিংয়ের তুমুল আড্ডা, পাঠ অভিজ্ঞতা, প্রকৃতি ও জীবনকে অবলোকন তথা নাগরিক জীবনের অনিকেত আবহ শহীদ কাদরীর কবিতাশিল্প ও উপলব্ধির জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি আজবীন মানবের শ্রেণি বৈষম্যের বিনাশ কামনা করেছেন। দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, জীবন ও শিল্পের বৈষম্য ঘোচাতে চেয়েছেন তিনি কবিতায়। শ্রেণি ও কদর্যের উচ্ছেদে তার শিল্পবোধ সব সময় উচ্চকিত ছিল। তিনি শ্রেণি উচ্ছেদে বিপ্লব কামনা করেছেন কিন্তু তা রক্তাক্ত বিপ্লব নয়।
‘বিপ্লব’ কবিতায় :
‘মনজুর এলাহী আবার বললেন:
বন্দুকের নলই শক্তির উৎস।
রক্তপাত ছাড়া শ্রেণীসাম্য প্রতিষ্ঠা
অসম্ভব, অনায়াসে কেউ শ্রেণীস্বার্থ ছেড়ে দেয় না’
(কবি বললেন) আমি জানালা থেকে দেখলাম
মনজুর এলাহীর গোটা বাগান
জোনাকিরা দখল করে নিয়েছে
বিনা যুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে।’
শহীদ কদরী সাম্যের আদর্শে আলো জ্বেলে শ্রেণির উচ্ছেদের পক্ষপাতি ছিলেন। অসাম্প্রদায়িক এবং সাম্যের একটি আদর্শ তিনি সবসময় লালন করেছেন কবি সত্তায়। তাঁর প্রকাশ ভঙ্গির সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও নিজস্ব। শামসুর রাহমান নাগরিক কবি। শহীদ কাদরীও জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নগরেই কাটিয়েছেন জীবন। শামসুর রাহমানের নগর ঢাকা, ঢাকা আর ঢাকা। কিন্তু শহীদ কাদরীর নগর কলকাতা, ঢাকা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, আমেরিকার নগর পর্যন্ত বিস্তৃত। দু’জনের কাব্য নিষ্ঠার মধ্যে বিস্তর ফারাক। এ ফারাক উপস্থাপনের স্ব স্ব ঢংয়ের কারণে। তিন প্রধান কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ ও শহীদ কাদরীর স্বাতন্ত্র্যের একটি নমুনা :
শামসুর রাহমান :
নক্ষত্র পুঞ্জের মতো জ্বল জ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার স্বত্তায়,
মমতা নামের প্লুত এদেশের শ্যামলীমা তোমাকে নীবিড় ঘিরে রয় সবর্দায়’
কালো রাত পোহানোর পরের প্রহরে শিউলি শৈশবে
‘পাখি সব করে রব বলে’ মদমোহন তর্কালঙ্কার
কী ধীরোদাত্ত স্বরে প্রত্যহ দিতেন ডাক।
তুমি আর আমি অবিচ্ছিন্ন পরস্পর মমতায় লীন।’
(বর্ণমালা আমার দুখিনী বর্ণমালা)
আল মাহমুদ :
ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে বৃষ্টি কোথায়? বরকতের রক্ত
হাজার যুগের সূর্য তাপে জ্বলছে এমন লাল যে
সে লোহিতে লাল হয়েছে কৃষ্ণচ‚ড়ার ডাল যে।
(একুশের কবিতা)
শহীদ কদরী :
এই কবিতাটি সরাসরি একুশের কবিতা নয়।
কিন্তু বৈশাখের খররৌদ্রে সোনালি খড়বাহী গরুর গাড়ির মতো
মন্থরভাবে এগিয়ে চলছে এই কবিতা, এখন আমি জানি
একুশই হচ্ছে এই পঙক্তিগুলো জরায়ু-
একে আমি একুশের কবিতাই বলতে চাই।’
(একে বলতে পারো একুশের কবিতা)
তিনজন কবির একুশ নিয়ে রচিত তিনটি কবিতা পড়লে বোঝা যাবে যার যার মতো করে একুশে ফেব্রæয়ারির ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগকে তাঁরা তুলে এনেছেন নিজের মতো করে।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে কবি আল মাহমুদ চট্টগ্রামের বইঘরে কাজ করেছেন। চট্টগ্রামের ‘বইঘর’ প্রকাশনা থেকে কবি শহীদ কাদরীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উত্তরাধিকার’ (১৯৬৭) প্রকাশিত হয়। একই সময়ে ‘বইঘর’ চট্টগ্রাম থেকে আল মাহমুদের ‘কালের কলস’ দ্বিতীয় সংস্করণ ফাল্গুন ১৩৮২ এবং কবি শামসুর রাহমানের ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’ প্রকাশিত হয়। তিনটি বইয়েরই প্রচ্ছদ করে ছিলেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। কবি নূরুল হুদা বলেন“এই তিনটি কবিতার বই প্রকাশিত হওয়ার পরই বাংলা সাহিত্যের তিনজন প্রধান কবিকে চিহ্নিত করা হয়। সমকালীন বাংলা কবিতায় এই তিনজনকে নিয়ে একটি ত্রিভ‚জ গঠিত হয়েছিল।” আমরা জানি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী এ তিনজন সমকালীন বাংলা কাব্যে একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করতে পেরেছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে শহীদ কাদরী বন্ধু আল মাহমুদ সম্পর্কে বলেন“আমি আল মাহমুদকে বড় কবি বলেই মনে করি। হ্যাঁ, সমসাময়িকদের মধ্যে।” (অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার সুমনা শারমীন দৈনিক প্রথম আলো, শুক্রবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৬।) শহীদ কাদরীর ‘উত্তরাধিকার’ যখন প্রকাশিত হয় তখন কবির বয়স ২৫ বছর। তার এ গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের সরাসরি সহযোগিতার কথা কবি ওই সাক্ষাৎকারে সুমনা শারমীনের কাছে স্বীকার করেছেন।
শহীদ কাদরী নাগরিক বৈদগ্ধের সাথে মানসপটে অবিশ্বাস, সন্দেহ, নিরাশ্রয়, নিঃসঙ্গতা ও নিরবলম্বন ইত্যাদি চিন্তার দ্ব›দ্ব সেলাই করে দিয়েছেন কবিতার অবয়বে। এদিক থেকে তিরিশি কবিদের মধ্যে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সাথে কাদরীর ঐক্য লক্ষ করা যায়। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চোরাবালির উপস্থিতি তাকে অবিশ্বাসী করে তুলেছে। অন্যপক্ষে সুধীনদত্তের অবিশ্বাসের ভিত্তিভ‚মি ছিল সত্য ও বিশ্বাসের সন্ধান। এক্ষেত্রে দু’জনের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য ও চিহ্নিত হয়ে যায়। শহীদ কাদরী ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বাঞ্চিতের সন্ধান খুব একটা পাননি। কাক্সিক্ষত পরিবেশ না পাওয়াতেই তাঁর শিল্পকর্ম তথা কবিতা স্বতন্ত্র মূল্যায়নের দাবিদার হয়ে ওঠেছে।
এ জন্যে কবি বলেন :
‘তিন তিনটে মহাদেশ থেকে
অনন্ত ছ’বার উড়োজাহাজের টিকেট কিনেও
তোমাদের উঠোন পেরিয়ে
নিজস্ব আটচালার দিকে যাত্রা সাঙ্গ হয়নি এখনো।’
শেষ পর্যন্ত জীবনের অনিকেত পরিস্থিতি জয় করেছেন মৃত্যুনামক অন্তিম মহাযাত্রা দিয়েই। এখানে তার কবিতাশিল্পের বিজয় সূচিত হয়েছে। কবি জানতেন জীবন তাঁর সুখ শান্তিতে ভরা না হলেও তাঁর কবিতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আপন মহিমায় দাড়িয়ে থেকে তাঁর জীবনের অমরত্ব ঘোষণা করবে। কবি ‘স্বপ্নে-দুঃস্বপ্নের একদিন’ কবিতায় বলেন তাঁর লাশ নিয়ে হয়তো কেউ বলবে ‘একজন গৌণ কবি যিনি মৌন দীর্ঘকাল/তাঁকে নিয়ে সময়ের এই অপচয় কেন! দাফন শেষ করো/কবরে নামাও’ এমন মন্তব্যের পর কফিনটা মুদ্দাফরাশদের হাত থেকে ফসকে কবরের গর্তে পড়ে যায়। তখন সবাই হুড়মুড় করে ঝুঁকে পড়ে সদ্য খোঁড়া কবরটার ওপর সেখানে দেখা যায় “কফিনটা শূন্য, কবির শবদেহ সেখানে নেই। বিদ্যুতের মতো রটে গেল কবির মৃত্যু হয়নি এখনো” এটা কবির কল্পনা মাত্র। বাস্তবে শহীদ কাদরীর মরদেহ আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে পৌঁছলে শহীদ মিনারের ভীড় বলে দেয় প্রকৃত কবিরা অমরই হয়। দেশের পত্র-পত্রিকা, লেখক, কবি, সাংবাদিক এবং সমালোচকেরা স্বীকার করলো তিনি এ দেশের একজন প্রধান কবি। জীবদ্দশায় তাঁর মূল্যায়ন খুব একটা হয়নি। মৃত্যু যেন তাকে নিয়ে গবেষণারদ্বার উন্মুক্ত করে দিল। তিনি স্বেচ্ছায় নির্বাসনে ছিলেন বলে দেশে তাকে নিয়ে তেমন মাতামাতি হয়নি। বর্তমানে তার দেহ বাংলাদেশে স্থায়ী আবাস গেড়েছে। আর তার কবিতা বাংলাভাষার কবিতা গবেষকদের সামগ্রী হয়ে উঠেছে। নাগরিক জীবনের বর্ষা ও বৃষ্টির বিষয় নিয়ে কাদরীর রচিত ‘বৃষ্টি, বৃষ্টি’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। এখানে একজন নিঃসঙ্গ, বিপর্যস্ত কবি শহুরে বৃষ্টির জলে দেহাত্মবাদের আরাধনায় মগ্নভাসানে যেন ভেসে চলেছেন :
‘এইক্ষণে আঁধার শহরে প্রভু, বর্ষায়, বিদ্যুতে
নগ্নপায়ে ছেঁড়া পাৎলুনে একাকী
হাওয়ায় পালের মতো শার্টের ভেতরে
ঝকঝকে, সদ্য, নতুন নৌকোর মতো, একমাত্র আমি,
আমার নিঃসঙ্গ তথা বিপর্যস্ত রক্তে মাংসে
নূহের উদ্দাম রাগী গরগরে আত্মা জ্বলে
কিন্তু সাড়ানেই জনপ্রাণীর অথচ
জ্বলোচ্ছ্বাসে নিঃশ্বাসের স্বর, বাতাসে চিৎকার
কোন আগ্রহে সম্পন্ন হয়ে, কোন শহরের দিকে
জলের আহ্লাদে আমি একা ভেসে যাবো?’
(বৃষ্টি, বৃষ্টি-উত্তরাধিকার)
কাদরীর কাব্যভাষায়, সুধীনদত্তের মতো নির্মেদ, টানটান চিলার সংহতি আছে। ড. ফজলুল হক সৈকত বলেন, “কাদরী শিল্পের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন; পুঁজিবৃত্তির কাছে নয়। শহরের যান্ত্রিকতা আর সমূহ নেতিবাচকতার অন্তরালে তিনি খুঁজেছেন জীবনানন্দীয় কোমলতা, সুধীনীয় দৃঢ়সংবদ্ধতা, রিলকের শিল্পিত গোলাপ আর রাতের আকাশের জ্বলজ্বলে তারার উজ্জ্বলতা।”
শহীদ কাদরীর স্বেচ্ছায় নির্বাসন বাংলা কবিতাকে দিয়েছে বৈশ্বিক মননের প্রতীতি। তাঁর কবিতা অহেতুক অলঙ্কারের ভারে কখনো দুর্বল হয়ে পড়েনি। কবিতা চর্চার ক্ষেত্রে নিজের বিশ্বাস ও শিল্পের দায়বদ্ধতাকে কখনো তিনি উপেক্ষা করেননি। এদেশে কবিতা নিয়ে দলাদলি, ঠেলাঠেলি ও নোংরা ঘরানাপ্রীতি পছন্দ করতেন না। এ সম্পর্কে শহীদ কাদরী সাক্ষাৎকারে বলেন“এটা অস্বাস্থ্যকর। সাহিত্য ফুটবল টিম কিংবা রাজনীতির মাঠ নয়। আমি দলাদলিতে বিশ্বাস করি না। আমার মতে, এতে একজন শিল্পীর সৃষ্টির উদ্যম নষ্ট হয়, তা অপূরণীয়।” সম্প্রতি আমাদের দেশের সাহিত্য যে পরিমাণে প্রচার সর্বস্ব হয়ে পড়ছে তাতে আমরা কবি যশপ্রার্থী পাচ্ছি বটে, প্রকৃত কবির উত্থান ঘটছে না। যে সকল অকবিকে প্রচার দিয়ে, পুরস্কার দিয়ে কবি বানানো হচ্ছে তারা মহাকালের যাত্রাপথে থির হবে না। শহীদ কাদরীদের মতো শিল্পের দায়বদ্ধতা নিয়ে যারা কাব্যজগতে এগিয়ে গেছেন এবং বাংলা কবিতায় নিজস্ব মুদ্রাকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন তারাই অমরত্ব লাভ করবেন। কবিতার শিল্প বিচারে বাংলা সাহিত্যে শহীদ কাদরীর অমরত্ব প্রাপ্তি ঘটবেই। কেননা তিনি তাঁর বিশ্বাস, মতবাদ এবং অনুরাগ-বিরাগকে কবিতায় পরিণত করতে পেরেছেন। তার মতকে কখনো তিনি স্লোগান কিংবা পরিমিত শব্দের ব্যানারে প্রবন্ধে রূপান্তরিত করেননি।
তথ্যসূত্র :
১। আধুনিক কাব্য পরিচয় দীপ্তি ত্রিপাঠী
২। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত মুহাম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান
৩। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস মাহবুবুল আলম
৪। নিংসঙ্গ শেরপা হুমায়ুন আজাদ
৫। দশদিগন্তের দ্রষ্টা-আবদুল মান্নান সৈয়দ
৬। শহীদ কাদরীর অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার প্রথম আলো শিল্প-সাহিত্য, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৬