শরৎ পূর্ণিমায় শ্রীকৃষ্ণের রাসনৃত্য দর্শন

এস প্রকাশ পাল

7

শরৎকালের পূর্ণিমার রাত সব চাইতে সুন্দর। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই শরৎ পূর্ণিমায় গোপীদের সঙ্গে রাসলীলা বিলাস করেছিলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল আট বছর। সেই সময় অনেক গোপীই বিবাহিতা ছিলেন। অপ্রাকৃত জগতে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে গোপীদের সে সম্পর্ক, তা সর্বোচ্চ মহিমামÐিত। শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর ভক্তের সম্পর্ক নানা রকমের হতে পারে, যথাÑদাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মাধুর্য। প্রকৃতপক্ষে শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন সকলের পতি, তিনিই হচ্ছেন পরম ভোক্তা। জড় জগতে পরকীয়া রসে যে সমস্ত বিকৃতি দেখা যায়, অপ্রাকৃত জগতে গোলোক-বৃন্দাবনে সেই রকম হয় না। শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে যে, স্বপ্নে এবং কল্পনাতেও এই পরকীয়া রস অনুকরণ করার চেষ্টা করা উচিত নয়। যারা তা করে, তারা সব চাইতে তীব্র বিষ পান করছে।
চন্দ্র উদয়ের পর শ্রীকৃষ্ণ যখন তাঁর বাঁশি বাজাতে লাগলেন, বৃন্দাবনের সমস্ত গোপীরা তখন মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। চারদিক স্নিগ্ধ এবং উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল। সেই বংশীধ্বনি শোনামাত্রই তাঁরা তাঁদের সমস্ত কাজ ফেলে দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখানে ছুটে গেলেন। কেউ যখন পূর্ণ কৃষ্ণভাবনায় শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আকৃষ্ট হন, তখন তিনি আর কোন রকম জাগতিক কর্তব্যের পরোয়া করেন না। কৃষ্ণভাবনার অমৃত এতই মধুর যে, তা সব রকমের জড় বন্ধন থেকে স্বস্তি দান করে। কয়েকজন গোপী শ্রীকৃষ্ণের কাছে যেতে না পেরে চোখ বন্ধ করে তাঁর অপ্রাকৃত রূপের ধ্যান করতে লাগলেন। তাঁদের মনের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের রূপ ইতিমধ্যে বিরাজমান ছিল। এই সমস্ত গোপিকারাই হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ যোগী।
শ্রীকৃষ্ণের সহচরী গোপিকারা, যাঁরা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য সমবেত হয়েছিলেন, তাঁরা বিভিন্ন গোষ্ঠীভুক্ত। অধিকাংশ গোপী শ্রীকৃষ্ণের নিত্য সহচারী। অপ্রাকৃত জগতে শ্রীকৃষ্ণের সহচরেরা, বিশেষ করে গোপিকারা তাঁর হ্লাদিনীশক্তির প্রকাশ। তাঁরা শ্রীমতী রাধারাণীর প্রকাশ। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ যখন এই জড় জগতে তাঁর লীলাবিলাস করেন, তখন কেবল তাঁর নিত্য সহচরেরাই নয়, যাঁরা জড় স্তর থেকে সেই স্তরে উন্নীত হচ্ছেন, তাঁরা তাঁর সেই লীলায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পান। যে সমস্ত গোপিকারা এই জড় জগৎ থেকে শ্রীকৃষ্ণের লীলায় অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন সাধারণ মানবী। তাঁরা যদিও কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ থেকে থাকেন, নিরন্তর শ্রীকৃষ্ণের ধ্যান করার ফলে তাঁরা সেই কর্মফল থেকে পূর্ণরূপে মুক্ত হয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণকে দেখতে না পাওয়ার গভীর বেদনাময় আকুলতায় তাঁরা সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণের বিরহে তাঁর প্রতি তাঁদের অপ্রাকৃত প্রেমের আনন্দানুভূতি সব রকমের জড়জাগতিক পূণ্যকর্মের অতীত অপ্রাকৃত স্তরে উন্নীত করেছিল। বদ্ধ জীবেরা পাপ অথবা পূণ্যের প্রভাবে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ, কিন্তু গোপিকারা শ্রীকৃষ্ণের ধ্যান শুরু করার ফলে সেই পাপ-পূণ্যের স্তর অতিক্রম করে সম্পূর্ণভাবে নির্মল হয়ে শ্রীকৃষ্ণের নিত্য সহচরী ব্রজগোপিকার পদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন।
সমস্ত গোপীরা যখন শ্রীকৃষ্ণের সামনে সমবেত হলেন, তখন তিনি তাঁদের সাদরে আহŸান করলেন এবং সেই সঙ্গে বাক্চাতুর্যের দ্বারা তাঁদের নিরাশ করতে লাগলেন। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরম বক্তা; তিনি ভগবদ্গীতার বক্তা। তিনি সর্বোচ্চ দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি সমস্ত বিষয়ে কথা বলতে পারেন এবং যে সমস্ত গোপীরা তাঁর প্রতি এত অনুরক্ত ছিলেন, তাঁদের সঙ্গেও তিনি কথা বললেন।
গোপীরা এসেছিলেন শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গ উপভোগ করবার জন্য। তারা অযাচিত উপদেশ শুনে বনের সৌন্দর্য দেখতে লাগলেন। সেই সময় সমস্ত বন চন্দ্রের জ্যোৎস্নায় আলোকিত হয়ে উঠেছিল এবং প্রস্ফুটিত ফুলের উপর দিকে মৃদুমন্দ সমীরণ তখন সবুজ গাছের পাতাগুলি কম্পিত হচ্ছিল। বনের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের উপদেশ দিতে লাগলেন, ‘আমার মনে হয় তোমরা এই রাত্রে বৃন্দাবনের সৌন্দর্য দর্শন করতে এসেছ। তবে এখন নিশ্চয়ই তোমাদের তৃপ্তি হয়েছে। সুতরাং এখন তোমরা আর দেরি না করে ঘরে ফিরে যাও। আমি জানি যে, তোমরা সকলেই অত্যন্ত সতী-সাধ্বী স্ত্রী। তাই, এখন যখন তোমরা বৃন্দাবনের সৌন্দর্য দর্শন করেছ, এবার আর দেরি না করে ঘরে ফিরে যাও। অনুরাগের বশবর্তী হয়ে আমার বংশীধ্বনি শুনে তোমরা এখানে এসেছ। আমার প্রতি তোমাদের এই প্রীতি এবং অনুরাগের ফলে আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছি। আমিই হচ্ছি পরমেশ্বর ভগবান। প্রতিটি জীবই হচ্ছে আমার বিভিন্ন অংশ এবং স্বাভাবিকভাবেই তারা আমার প্রতি অনুরক্ত। তোমাদের পক্ষে ঘরে ফিরে যাওয়াই শ্রেয় হবে এবং ঘরে ফিরে গিয়ে তোমরা কেবল আমার চিন্তা কর, আমার কথা বলো এবং তার ফলে নিরন্তর আমাকে স্মরণ করার মাধ্যমে এবং আমার নাম কীর্তন করার ফলে তোমরা অবশ্যই অপ্রাকৃত স্তরে উন্নীত হবে।’
গোপীরা শ্রীকৃষ্ণকে কিছুই বলতে পারলেন না, কেবল নিঃশব্দে অশ্রæপাত করতে করতে সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন। শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের প্রিয়তম, প্রাণনাথ। তাঁদের সমস্ত হৃদয় জুড়ে কেবল শ্রীকৃষ্ণই। তাঁর চরণে তাঁরা সর্বতোভাবে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন।
অবশেষে স্খলিত কণ্ঠে তাঁরা বলতে লাগলেন, আমরা জানি যে-তুমি পরমেশ্বর ভগবান এবং তুমি তোমার যা ইচ্ছা তাই করতে পার। আমরা সব কিছু ফেলে দিয়ে তোমার কাছে ছুটে এসেছি, কেবল তোমার শ্রীপাদপদ্মে আশ্রয় গ্রহণ করার জন্য। আমরা আকুলভাবে তোমার কাছে প্রার্থনা করবো, তুমি আমাদের দূরে ঠেলে দিও না। আমরা তোমার ভক্ত। নারায়ণ যেভাবে তাঁর ভক্তদের গ্রহণ করেন, আমাদেরও ঠিক সেইভাবে গ্রহণ করা তোমার কর্তব্য। নারায়ণের অনেক ভক্ত আছেন, যাঁরা মুক্তিলাভের জন্য তাঁর আরাধনা করেন, তিনিও তাঁদের মুক্তি দান করেন। তেমনই, তোমার শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় ছাড়া আর কোন আশ্রয় যখন আমাদের নেই, তখন কিভাবে তুমি আমাদের পরিত্যাগ করতে পার?
গোপীদের এই আকুল আবেদন শুনে পরমেশ্বর ভগবান হাসতে লাগলেন এবং গোপীদের প্রতি অত্যন্ত কৃপাপরবশ হয়ে পরমেশ্বর ভগবান তাদের দিকে তাকালেন। তখন তাদের মুখমÐল শতগুণ সৌন্দর্যমÐিত হল। তাঁকে দেখে মনে হলো যেন লক্ষ লক্ষ তারকা পরিবৃত পূর্ণচন্দ্র। এইভাবে পরমেশ্বর ভগবান শত শত গোপিকা পরিবৃত হয়ে এবং নানা রঙের ফুলমালায় ভূষিত হয়ে সেই বৃন্দাবনের বনে ভ্রমণ করতে লাগলেন। কখনও তিনি এককভাবে গান গাইছিলেন, আবার কখনও কখনও তিনি গোপিকাদের সঙ্গে গান গাইছিলেন। এইভাবে পরমেশ্বর ভগবান এবং গোপিকারা স্নিগ্ধ বালুকা আচ্ছাদিত যমুনার তটে এসে উপস্থিত হলেন যেখানে কুমুদ, কলহার এবং পদ্মফুল ফুটে ছিল। সেই দিব্য পরিবেশে শ্রীকৃষ্ণ এবং গোপিকারা নৃত্য সহকারে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
শ্রীকৃষ্ণের এই রাসনৃত্যকে কখনই জড় জগতের কোনরকমের নৃত্যের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। এই রাসনৃত্য সম্পূর্ণ চিন্ময়। সেই কথাটা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ, নিজেকে বহুরূপে বিস্তার করে প্রতিটি গোপিকার সঙ্গে নৃত্য করেছিলেন। কৃষ্ণ দু’জন গোপিকার মাঝখানে বিরাজ করে, তাঁদের কণ্ঠ ধারণ করে তাঁদের সঙ্গে নাচতে লাগলেন। শ্রীকৃষ্ণ যে তাঁর অচিন্ত্য শক্তির প্রভাবে বহুমূর্তিতে প্রকাশিত হয়েছেন তা গোপীরা বুঝতে পারলেন না। কেননা তাঁদের প্রত্যেকেরই মনে হলো, কৃষ্ণ যেন একলা তাঁদের সঙ্গে নাচছেন। গোপীদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের এই অপূর্ব নৃত্য দর্শন করবার জন্য সেই রাসমÐলীর উপরিভাগে আকাশে বিমানে চড়ে স্বর্গের দেবতারা এসে উপস্থিত হলেন। গন্ধর্ব এবং কিন্নরেরা গান করতে লাগলেন এবং সস্ত্রীক দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন। সেই নৃত্য দর্শন করে চন্দ্র বিস্ময়ে হতবাক হলেন।
রাসনৃত্যজনিত শ্রান্তি দূর করবার জন্য শ্রীকৃষ্ণ যমুনার জলে প্রবেশ করলেন। গোপিকাদের গলার পদ্মফুলের মালা দলিত হয়েছিল এবং তাঁদের বক্ষের কুমকুমের রঙে ফুল রঞ্জিত হয়েছিল। ভ্রমরেরা সেই ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করার জন্য গুঞ্জন করতে করতে চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছিল। রাসনৃত্যজনিত শ্রান্তি দূর করার জন্য জলকেলি করতে করতে শ্রীকৃষ্ণ এবং গোপিকারা উভয়েই আনন্দে আত্মহারা হলেন। কলহাস্যে চতুর্দিক মুখরিত করে তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের শ্রীঅঙ্গে যমুনার জল সিঞ্চন করতে লাগলেন এবং মহা আনন্দে শ্রীকৃষ্ণ তা উপভোগ করলেন। শ্রীকৃষ্ণ যখন এইভাবে গোপিকাদের মধুর বচন এবং জল সিঞ্চন উপভোগ করছিলেন, স্বর্গের দেবতারা করতে লাগলেন পুষ্পবৃষ্টি। কিন্তু হঠাৎ গোপীদের গর্ব খর্ব করার জন্য শ্রীকৃষ্ণ সেখান থেকে হয়ে গেলেন অন্তর্হিত।
লেখক : প্রকাশক, মাসিক জ্যোতির্ময়