শত সংগ্রামের অগ্রদূত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

39

১৫ জানুয়ারি ১৯৩৮ সাল। বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী গেলেন গোপালগঞ্জে মিশন স্কুল পরিদর্শন করতে। ফেরার পথে পথরোধ করে দাঁড়ালেন এক ছাত্রের নেতৃত্বে কয়েকজন। প্রধানমন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি চাও? উত্তরে খোকা নামের লম্বা চমশা চোখের ছেলেটি বলল, আমাদের ছাত্রাবাসের চালের মেরামত করতে হবে। ছেলেটির সাহসে মুগ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজ তহবিল হতে অর্থ প্রদান করে ছাত্রাবাসের চালের মেরামতের ব্যবস্থা করে দিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মন্তব্য করলেন, সঠিক পথে পরিচালিত হলে ছেলেটি একদিন বড় রাজনীতিক হবে। সোহরাওয়াদীর কথাই সত্য হয়ে ফলেছিল। সে স্পষ্টবাধী সাহসী ছেলেটির নাম শতাব্দীর মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
তাঁর জীবনের প্রতিটি বাঁক ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যেভাবে জাতির মুক্তির জন্য জীবন গড়া প্রয়োজন ছিল সেভাবে তিনি গড়ে উঠেছিলেন। এটা সম্ভব হয়েছিল তাঁর দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি সৎসাহস ও সিদ্ধান্তের কারণে। রাজনীতির অবস্থার কোন তত্তে¡ও আত্মবন্দি না হয়ে তিনি সরাসরি পৌঁছে গিয়েছিলেন মানুষের হৃদয়ে। এতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন, জনতা থেকে নেতা, নেতা হতে জাতীয় নেতা, জাতীয় নেতা হতে জাতির জনক।
বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে গবেষক আবু লাল সাঈদ লেখেছেন, ‘সুভাব বোসের সশস্ত্র সংগ্রামের অভিজ্ঞতা, দেশবন্ধুর অহিংস অসম্প্রদায়িক নিরপেক্ষ আন্দোলন, সোহরাওয়াার্দীর দলের সাংগঠনিক দক্ষতা, এ কে ফজলুল হকের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মেধা-এ সবকিছুই তাঁর মধ্যে সমর্থিত হয়েছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিতভাবে।
বঙ্গবন্ধু কোন এক ব্যক্তিসত্তার সাধারণ নাম নয়। তিনি এক আলোকিত উজ্জ্বল আদর্শের জ্বলন্ত মূর্তপ্রতীক। তাঁর জীবনের লালিত আদর্শ প্রতিষ্ঠায় তিনি কখনো পিছপা হননি। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শাসক শোষকের রক্তচক্ষুকে ভয় করেননি। শত অত্যাচার নির্যাতন জেল জুলুমকে উপেক্ষা করে এগিয়ে গেছেন বাংলার অধিকার আদায়ে। তিনি কখনো কারাগারের ভয়ে ভীত ছিলেন না। তিনি বলতেন, ‘একজন রাজনীতিক কারগারে না গিয়ে রাজনীতিক হতে পারে না। ভাল চিন্তা চেতনার পাঠশালা হলো কারাগার।
কারাগারের ভয়ে ভীত ছিলেন না বলেই তাঁকে পুলিশ যখনই গ্রেফতার করতে চেয়েছেন তখনই হাতের কাছে পেয়েছেন। জীবনে তিনি ১৮ বার গ্রেফতার হয়ে ১৪টি জীবনের সোনালী বসন্ত কারাগারে অতিবাহিত করেছেন। ফাঁসির মঞ্চ হতে ফিরে এসেছেন দু’দুইবার।
তিনি কোন শিখড়বিহীন ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। মাটি ও মানুষ তাঁকে আকর্ষণ করতো। তিনি বেরিয়ে এসেছেন সাধারণ মানুষের ভেতর হতে। তাই তিনি গ্রাম বাংলার সাধারণ দুঃস্থ মানুষের ন্যায্য দাবি আদায়ে আপস করেননি।
তিনি সুলতানি ও মোঘল শাসনের হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দ্ব›দ্ব সংঘাতের ইতিহাস আত্মস্থ করেছেন। ছোটবেলা হতে সমাজ জীবনের জমিদার, মহাজনদের অত্যাচার পীড়ন প্রত্যক্ষ করে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। এই বিদ্রোহের আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছেন পাকিস্তানি শাসকদের মসনদ।
বঙ্গবন্ধু দেশের বাইরের কোন তত্ত¡ প্রতিষ্ঠা করতে কখনো সংগ্রাম করেননি। তাঁর কাছে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি মুসলিম লীগ সোহরাওয়ার্দী গ্রæপের কর্মী থাকলেও আবুল হাশিমের উদার আদর্শে অনুরক্ত কেন? তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কাজের মানুষ, কাজেই আমার বিশ্বাস। আগে জনগণের মনকে জানতে হবে। জনগণের কাছ থেকে শেখা রাজনীতিনই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক তথ্য তত্ত অর্জন করেছি পরে। তাই বাইরে কোন তত্ত¡ আমাকে প্রভাবিত করতে পারেনি। জনগণের দাবি থেকে তাদের মুক্তি ও কল্যাণের সংগ্রামে আমি আত্মনিয়োগ করেছি। আমি আবুর হাশিমের কর্মসূচি যেটা সঠিক মনে করেছি সেটার সাথে একাত্ম হয়েছি। সোহরাওয়াদী আমার শিক্ষা গুরু কারণ তিনি বাঙালির নাড়ির স্পন্দন বুঝেন। কিন্তু কাজের সিদ্ধান্তে নিতে তিনি ভুল করে ফেলেন। (তথ্য সূত্র : ভারতের দৈনিক যুগান্তর, ৬ মার্চ ১৯৭০)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলতেন, ‘বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত শোষক আর শোষিত, আমি শোষিতের পক্ষে।’ তিনি সাম্রাজ্যবাদীদের মত শুধুমাত্র ভোটাধিকারকে গণতন্ত্র মনে করতেন না, সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির মধ্যদিয়ে দেশকে স্বনির্ভর করাই তাঁর শোষিতের গণতন্ত্র। এই শোষিত মানুষই বাংলাদেশের প্রধান অংশ। তাদের মুক্তিতে দেশের মুক্তি মনে করতেন।
দেশ ও দেশের সাধারণ মানুষের ভালোবাসা এবং মঙ্গল সাধনা ছাড়া তাঁর কোন ধ্যান জ্ঞান ছিল না। তিনি ছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বীর, বাঙালির বটবৃক্ষ। একটি জাতি-রাষ্ট্রের আশা আকাক্সক্ষা তাঁর মধ্যদিয়ে অভিব্যক্ত হয়েছিল। তাঁর মাধ্যমেই একটি দেশের চিন্তা চেতনা ধ্যান ধারণার অবয়ব প্রতিবিম্বিত হয়।
পাকিস্তানি অর্থনৈতিক শোষণ অত্যাচার বঞ্চনা তাঁকে ব্যথিত করেছিল। তাই তিনি বাঙালির মুক্তির লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেছিলেন। পাকিস্তানি সামরিক শাসকের সাথে ৬ দফার ব্যাপারে তিনি বিন্দুমাত্র আপস করেননি। অনেক পরশ্রীকাতর রাজনীতিক অপপ্রচার চালিয়ে ছিলেন, শেখ সাহেব ৬ দফা ত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি অঙ্গীকার প্রদান করেছি, অঙ্গীকার রক্ষা করবো। বাঙালি জাতির স্বার্থ রক্ষা না হওয়ায় আইয়ুবের আপস প্রস্তাব তিনি প্রথ্যাখ্যান করেছিলেন। আইয়ুব শাহী বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পণ করতে সম্মত হয়েছিলেন যদি তিনি ৬ দফা দাবি ত্যাগ করেন। তিনি বাঙালি জাতির স্বার্থ রক্ষায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর লোভ ত্যাগ করেছিলেন। ইডেনের কাউন্সিল সভায় তিনি ঘোষণা করেছিলেন, অধিকার প্রতিষ্ঠায় ৬ দফার জন্য যত রক্ত প্রয়োজন বাঙালি দেবে কিন্তু ৬ দফার ১ দফাও ত্যাগ করবে না।
স্বাধীনতার মূল উৎস ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন নয়, ৬ দফাই স্বাধীনতার মূল স্তম্ভ। ভাষা আন্দোলনের দাবি পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালে প্রণীত শাসতন্ত্রে উর্দু, বাংলা ও ইংরেজী তিন ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার মাধ্যমে ভাষা বিরোধী সমাধান করেন কিন্তু ৬ দফার একটি দফাও বাস্তবায়ন করেনি। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, চরম নির্যাতন, আগরতলা মামলা, গোলটেবিল বৈঠক করে ৬ দফার সমাধান করতে সক্ষম হয়নি। মূলত আওয়ামী লীগ ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমেই বড় এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
বঙ্গবন্ধু ছয় দফা আদায়ে আইয়ুবের গোলটেবিল আলোচনায় যেতে সম্মত হলে মাওলানা ভাসানী চরম বিরোধিতা শুরু করেন। আপস নয় সংগ্রাম, যারা গোলটেবিলে যাবে তারা বাঙালির রক্তে সাথে বেঈমানী করবে। তিনি মনে করেছিলেন শেখ মুজিব গোলটেবিলে গেলে বাঙালি তাকে সন্দেহের চোখে দেখবে এবং যুবসমাজের হৃদয় হতে দূরে চলে যাবে। বঙ্গবন্ধু বিমান বন্দরে বললেন, আমি ছয় দফা নিয়ে এই জন্য গোলটেবিলে যাচ্ছি, পশ্চিম পাকিস্তানিরা ৬ দফা না বুঝলে তাদের ভালভাবে বোঝাবা। গোলটেবিলের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে ৬ দফার যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানাবো। না গেলে আমাদের সম্পর্কে ভুল বুঝতে পারে। বলতে পারে আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী রাষ্ট্রদ্রোহী আলোচনায় বসছি না। বৈঠকে ৬ দফায় বঙ্গবন্ধু অবিচল ছিলেন। তিনি ছয় দফার একটি বর্ণও পরিবর্তনে সম্মত না হওয়ায় বৈঠক ভেঙে যায়। তিনি বৈঠক থেকে ফিরে এসে বলেছিলেন, ‘আমি কথা দিয়েছিলাম, কথা রেখেছি।
৬ দফা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতিকে এক প্লাটফরমে আনা সম্ভব হয়েছিল বলেই ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে একল্পনীয় বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছিল। এই নির্বাচনের পথ ধরেই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ এবং আমাদের স্বাধীনতা অর্জন।
বঙ্গবন্ধু এক মহাকায় আমরা বামন। বামনের দ্বারা মহাকাশের বিশালতার পরিমাণ এক দুঃসাধ্যের কাজ। রোম বলতে যেমন জুলিয়াস সিজারের কথা মনে পড়ে তেমনি বাঙালি ও বাংলাদেশ বলতে বুঝায় শতাব্দীর মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
হাজার বছরে অনেক বাঙালি স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেছে। মাঝে মাঝে আলোর আভা দেখা দিলেও স্বাধীনতার সূর্য
উদিত হয়নি। এই সংগ্রামী যাত্রায় নবাব সিরাজদৌল্লাহ, ঈসা খাঁ, তিতুমরীর, সূর্যসেন, হাবিলদার বজল আলী, হাজী শরিয়তুল্লাহ আত্মত্যাগ করলেও সফলকাম হননি। দু’শত বছর ইংরেজের শোষণ হতে মুক্তির লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক অবৈজ্ঞানিক রাষ্ট্রটি সৃষ্টি হয়। ১৯৪৬ সালে গণভোটে বাঙালিদের অধিক ভোটে পাকিস্তানের জন্মের শুভসূচনা হয়। কিন্তু সেটা ছিল আরেক শোষণের যাতাকল। বাঙালিরা বুঝতে পারল পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রের কথা। আবার সংগ্রাম, আবার রক্ত পিচঢালা রাজপথে। এই সংগ্রামে সমগ্র জাতিকে যিনি সাহস যোগালেন তিনিই এশিয়ার সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারি নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতি নয় মাস সশস্ত্র যুদ্ধ করলো। এই যুদ্ধে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদের শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনলো।
বঙ্গবন্ধুকে আবিষ্কার করা এখনো সম্ভব হয়নি। বঙ্কিম চন্দ্র বলেছেন, ‘আমরা ইতিহাস মিশ্রিত জাতি’। জাতি না কিভাবে হয়ে গেলাম ইতিহাস বিকৃত জাতি! স্বাধীন বাংলাদেশের বুকে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে দেশীয় মীর জাফরদের ষড়যন্ত্রের বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে শারীরিকভাবে শহীদ করার পর কয়েক দশক সরকারি প্রচার মাধ্যমে তাঁর নাম শুধু নিষিদ্ধ নয়, তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করা হলো। আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছিলেন, কিছু মানুষকে সকল সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখা যায়, সকল মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখা যায় কিন্তু সকল মানুষকে সকল সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখা যায় না। বঙ্গবন্ধু শহীদ হওয়ার পর সাবেক মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজী বলেছিলেন, ‘দেশ শেখ সাহেবকে চিনলো না একদিন শেখ সাহেব কবর থেকে বের হয়ে আসবে আবার। তখন হয়তো তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন সম্ভব হবে।’
ইতিহাসের পাতা ছেঁড়া যায় মোছা যায় না। যারা এই মহান নেতার নাম মুছে ফেলতে চেয়েছিল তারা জানতো না বঙ্গবন্ধু শাহাদাতের পর একদিন আরো বেশি জীবন্ত আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হবেন।

লেখক: রাজনীতিক ও কলাম লেখক