শওকত ওসমানের জননী উপন্যাসে সমাজবাস্তবতা

17

শওকত ওসমানের (২ জানুয়ারি ১৯১৭- ১৮ মে ১৯৯৮) বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে ক্ষণজন্মা, সমাজসচেতন ও নন্দিত পুরুষ। তিনি পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার সবলসিংহপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহন করলেও শওকত ওসমান বাংলাদেশ ও তার নিজস্ব চিন্তা চেতনার অনন্য সাধারণ শিল্পী। প্রধানত কথাসাহিত্যিক হলেও মননশীল সাহিত্য রচনায়ও তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। বিভাগপূর্বকালের তাঁর সাহিত্য সৃজনকর্ম বিভাগোত্তরকালেই পরিপূর্ণতা লাভ করে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তরকালেও বাংলাদেশের মৃত্তিকা ও গণমানুষের কন্ঠস্বর হিসেবে তিনি ছিলেন উচ্চকন্ঠ। বহুমাত্রিক লেখক হিসেবে তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নির্ভিক কন্ঠস্বর, ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সরব ব্যক্তিত্ব। তিনি মুসলিম সমাজের জীবন সংগ্রাম, উত্থান-পতন ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জীবন কাহিনীকে রুপায়িত করেছেন তাঁর শিল্পকর্মে শৈল্পিক সত্ত¡ায়। তাঁর পিতৃপ্রদত্ত নাম শেখ আজিজুর রহমান। ১৯৩৮ এর পর তিনি লেখক হিসেবে শওকত ওসমান নাম ধারণ করেন। এই নামেই তিনি সর্বজনবিদিত। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হচ্ছে জননী (১৯৬১),বণী আদম (১৯৬৪), ক্রীতদাসের হাসি (১৯৬২), সমাগম (১৯৬৭), রাজা উপাখ্যান (১৯৭১), জাহান্নাম হইতে বিদায় (১৯৭২), নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩), দুই সৈনিক (১৯৭৩), জলাঙ্গী (১৯৭৪), পতঙ্গ পিঞ্জর (১৯৮৩), আর্তনাদ (১৯৮৫), রাজসাক্ষী (১৯৮৫) ও পিতৃপুরুষের পাপ (১৯৮৬)।
শওকত ওসমানের প্রথম উপন্যাস জননী। এই উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন নিম্ন মধ্যবিত্ত গ্রামীণ জীবনের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক অনটনের চিত্রকে। দারিদ্র পীড়িত কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমসাময়িক গ্রামীণ জীবন, দাঙ্গা ও ধর্মীয় অনুশাসন ঔপন্যাসিক অত্যন্ত সাবলিল ভাষায় নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছেন। দরিয়া বিবি উপন্যাসের কাহিনীর মূলবিন্দু। এই উপন্যাসের মূল কাহিনী আলী আজহার খাঁকে নিয়ে নয়, তার স্ত্রী দরিয়া বিবিকে নিয়ে। দরিয়া বিবির দ্বিতীয় স্বামী আলী আজহার খাঁ। প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর ভাইদের অবহেলা এবং শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর মৃত্যুর পর তাকে ও তার পুত্র মোনাদিরকে স্বামীর পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করায় সে ঐ বাড়ী ত্যাগ করে। কিন্তু দেবর-ভাশুরদের অত্যাচারে মোনাদিরকে সেখানে রেখে আসতে বাধ্য হয়। দরিয়ার নতুন সংসারে তার এক পুত্র আমজাদ এবং দুই মেয়ে নঈমা ও শরীফন জন্ম নেয়। দরিয়ার দু:খের সংসারে তার আগের সংসারের ছেলে মোনাদির চাচাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আজহারের পরিবারে ওঠে। আজহার মোনাদিরকে আপন ছেলের মতো গ্রহন করে। একদিন দরিয়াবিববি অসুখের সময় তার পানি চাওয়ার ডাকে কেউ সাড়া দেয়নি বলে আজহার মাঠ থেকে ফিরে এসে জানতে পারায় আমজাদ ও মোনাদিরকে বেদম মারপিট করে। মার খেয়ে মোনাদির বাড়ী থেকে চলে যায়। আজহারের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সে এ বাড়ীতে ফিরে আসে না। এ নিয়ে স্বামীর সাথে দরিয়াবিবির মনোমালিন্য হয়, এরপর জীবনে কোনদিন স্বামীর সংগে স্বাভাবিক আচরণ করেনি। আজহার খাঁ জীবিকার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জায়গায় পাড়ি দেয়। ইতোমধ্যে আজহার পরিবারে ঢোকে ইয়াকুব। ইয়াকুব তার ফুফাতো ভাই। সংসারে ইয়াকুবের আনাগোনা আজহার সহজভাবে গ্রহন করে না। গৃহকর্তার অনুপস্থিতিতে ইয়াকুবের আগমন দ্রুত হয়। সে খালি হাতে আসে না, আসার সময় জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে দরিয়াবিবির বাড়ীতে হাজির হয়। প্রথমে দরিয়াবিবি ব্যাপারটাকে সহজভাবে গ্রহন করেনি, কিন্তু তার আর্থিক অস্বচ্ছলতা ও নিজ অভাবের দরুন ইয়াকুবের অত্যাচার অনিচ্ছাসত্বেও মেনে নেয়।
সংসারের সব ঝালেমা পোহাতে গিয়ে দরিয়া যখন হিমশিম খাচ্ছিল ঠিক তখই পর্যায়ক্রমে সে আজহারের বন্ধু চন্দ্র কোটাল, বাগদী মেয়ে শৈরমী ও দেবর ইয়াকুবের শরণাপন্ন হয়। চন্দ্র কোটালের সংসারও অভাবে পূর্ণ। তার বিধবা দুই বোন সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে তার পরিবারে, শৈরমী পঙ্গু ছেলেকে নিয়ে বিব্রত ও বেদনাহত। ইয়াকুবের দুই স্ত্রী। স্ত্রীরা দেহ সর্বস্ব,সারাক্ষণ চুলোচুলিতে মেতে থাকে। তাদের কেউ তাকে শান্তি দিতে পারেনি। তাই দরিয়ার কাছে আসে একটু শান্তি ও স্বস্তির প্রত্যাশী হয়ে। দরিয়াকে সে বলে, ‘আপনার হাসির দাম লাখ টাকা।’ ইয়াকুবের সাহস ক্রমে বেড়ে যায়। সে বৈশাখের উত্তপ্ত দিনে, নির্জন দ্বিপ্রহরে, নিদ্রায় অবসন্ন দরিয়ার লোভনীয় শরীরকে উপভোগ করে। লেখক দৃশ্যটি বর্ণনা করেছেন এভাবে- ‘দরিয়াবিবি হঠাৎ অনুভব করে, কার যেন গভীর আলিঙ্গনে সে একদম নিস্পিষ্ট। চোখ খুলিয়া দেখিল, ইয়াকুব। দরিয়াবিবি প্রথমে খোলা বাটির দিকে চাহিল। বাঁশের দরজা খোলা ছিল, এখন বন্ধ। দরিয়া বিবির মনে হয় হঠাৎ যেন ঠান্ডা হইয়া আসিতেছে তার সমস্ত শরীর।——। সমস্ত পৃথিবী তাহার নিকট নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকারে আবৃত।’
পরবর্তীকালে দেখা যায় দরিয়াবিবি ইয়াকুবের আনা তরকারী আস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু ঘটনা এখানে শেষ নয়। >> চতুর্থ পৃষ্ঠায় দেখুন
>> তৃতীয় পৃষ্ঠার পর

আবার ইয়াকুবের কাছে তাকে হাত পাততে হয। কারণ পনের টাকার অভাবে তার আদরের পুত্র মোনাদিরের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে। আজহার খাঁ সংসারে সচ্ছলতা আনার জন্য জীবনে অনেক কষ্টের সম্মুখীন হয়। কিন্তু তার অভাব কিছুতেই ঘোচে না। অবশেষে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আজহার মারা যায়। এরপর মোনাদির ফিরে আসে। দরিয়াবিরি অভাবের সংসারে ইয়াকুবের টাকায় মোনাদিরের লেখাপড়ার খরচ চলতো। কিন্তু একদিন মোনাদির রাতের অন্ধকারে বাড়ির ওঠানে তার মা ইয়াকুবের অবৈধ মেলামেশার দৃশ্য দেখে মনের দু:খে ও অপমানে বাড়ী থেকে বেরিয়ে যায়। মায়ের জীবিত অবস্থায় সে কোনদিন মহেশডাঙায় ফিরে আসেনি। এরপর ইয়াকুবও আসা বন্ধ করে দেয়। ইয়াকুবের অবৈধ মিলনের ফলে দরিয়াবিবির পেটে সন্তান আসে। একরাতে ইয়াকুবের অবৈধ সন্তাান দরিয়া নিজে প্রসূতি ও ধাত্রী হয়ে প্রসব করে। তারপর গলায় দড়ি ঝুলিয়ে আত্মহত্যা করে। সন্তানহীন হাসুবৌ দরিয়া বিবির অবৈধ সন্তানকে কোলে তুলে নেয়।দরিয়া বিবির মুত্যুর পর তার সন্তানদের আশ্রয় হয় আমিরন চাচীর সংসারে। এই হলো মোটামুটি জননী উপন্যাসের কাহিনী।
নিদারুন অভাবেও দরিয়া সংগ্রাম বিমুখ হয়নি। একের পর এক সমস্যা মোকাবেলা করেছ্ েকখনো ভেঙ্গে পড়েনি। নিজে না খেয়ে সন্তানদের খাইয়েছে,পরিয়েছে। পিতার শেষ স্মৃতি পিতলের ঘড়াটা পর্যন্ত বিক্রি করে অন্ন জোগাড় করেছে। আসেকজানের ভিক্ষে করা খাবার খেতে এবং জাকাতের কাপড় তাকে শেষ পর্যন্ত পড়তে হয়েছে। ইয়াকুবের অত্যাচার অসহ্য হওয়া সত্বেও দু:সময়ে তার দান গ্রহন করতে হয়েছে। তার চরিত্রে অসম্ভব ধৈর্য্য ও সহ্যগুণ লক্ষ্যনীয়। দিন দুপুরে দবিয়ার সম্মতি না নিয়ে তার সমস্ত শরীর ইয়াকুব উপভোগ করার পরও সে কাউকে কিছু বলেনি। নীরব থেকেছে। জীবনের সর্বমুহূর্তে সে স্বাভাবিক ও সাবলিল থেকেছে। ইয়াকুবের অবৈধ সস্তান প্রসবকালেও সে স্বাভাবিক ছিলো। তাই নিজে প্রসূতি হয়ে একাই ধাত্রীর কাজ সেরেছে। দরিয়া চরিত্রে দুইটি ধারা বিদ্যমান। এক. সে জননী দুই. আত্মহননকারিনী। এ ধরনের চরিত্র বাংলা সাহিত্যে বিরল। এই চরিত্র সম্পর্কে শওকত আলী মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলা সাহিত্যে দরিয়া বিবি একটি বিশিষ্ট চরিত্র হিসেবে শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।’
আলী আজহার খাঁ উপন্যাসের নায়ক। তার পরিবারের কাহিনীই উপন্যাসের বর্ণিতব্য বিষয়। লেখক আজহারের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-‘আজহার খাঁর পিতা আলী আজগর খাঁ সামান্য লেখাপড়া জানিতেন।তবে পার্সীতে তার দখলের যথেষ্ট সুনাম ছিল এই অঞ্চলে। আজহার খাঁ পিতার এই মহিমাগুণ কিছুই পায় নাই। তার পিতামহ আলী আমজাদ খাঁ নাকি আরো পারদর্শী পন্ডিত ছিলেন। সওয়াশ’ বছর আগে তার প্রপিতামহ আলী মজহার খাঁ এই গ্রামে অকস্মাৎ নাজেল হয়েছিলেন, এই বংশের তিনিই আদি পিতা। শান-শওকত দবদবা তার আমলেই ছিল। তারপর খাঁ পরিবারের অধঃপতনের যুগ। ইমারতের আকাশ হইতে আলী মজহার খাঁর বংশধরেরা আজ খড়ো ঘরের মাটিতে নামিয়াছে। শিক্ষা সংস্কৃতি সব নিরুদ্দষ্ট মাটির কাছাকাছি আসিয়া আলী আজহার খাঁও অতীতের দিকে চাহিয়া থাকে। বিগত ইতিহাসের স্বপ্ন তার কাছে ধূসর মরীচিকার মত মাঝে মাঝে জীবন সংগ্রামের নিরাশা-ক্লিষ্ট ক্ষুব্ধ মুহূর্তে ভাসিয়া আসে বৈকি।
আলী আজহার খাঁর রক্তে পূর্ব পুরুষের যাযাবর নেশা আছে যেন। আবাদের পর আর কোন কাজ থাকে না। ফসলের অনিশ্চয়তা নীড়ে কোন মোহ জাগায় না। আজহার তাই রাজমিস্ত্রির কাজও শিখিয়াছিল। তখন সে দূর ভিন গাঁয়ের দিকে কন্নিক আর সূতা হাতে চলিয়া যায়। এমনি আজহার খাঁ নিরীহ। প্রতিবেশীদের কাছে সে সাধু ও সজ্জন নামে খ্যাত।’
‘পথের পাঁচালি’র সংগে ’জননী’র বহু সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। চরিত্র চিত্রনে সমান্তরাল ভাব ফুটে উঠেছে। বিভূতিবাবুর সর্বজয়ার সংগে দরিয়াবিবির সাদৃশ্য একই রকম। ক্ষুধা, দারিদ্র, অপমান লাঞ্জনা দু’চরিত্রকে সমানভাবে তাড়িত করে। হরিহরের সংগে আলী আজহার খাঁর মিল এখানেই যে তাদের দু’জনকে বাড়ি-ঘর ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে দিগি¦দিক ছুটাছুটি করতে হয়। ইন্দির ঠাকুরণের মতো বৃদ্ধা মহিলার চরিত্রও জননীতে দেখতে পাই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চোখের বালি’ উপন্যাসের সংগে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘গৃহদাহ’ এর যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। পূর্ববর্তী রচনার প্রভাব পরবর্তী রচনায় বিভিন্নভাবে থাকতে পারে। এটা দোষের কিছু নয়। তবে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, জননী একজন দক্ষ সৃজনশীল লেখকের হাতে সৃষ্ট এক নতুন শিল্পরুপ।
জননী উপন্যাসের সমাজ বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। উপন্যাসের আদ্যোপান্ত কাহিনী দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত। কাহিনী বর্ণনায় লেখক বাস্তবতার ও মৌলিকতার পরিচয় দিয়েছেন। কাহিনীতে সামান্য কিছু অবাস্তবতা ও অসংগতি থাকলেও কাহিনী নির্মাণে, চরিত্র চিত্রনে, শিল্প চেতনা ও সমাজ বাস্তবতায় লেখক মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। জননী শওকত ওসমানের প্রত্যক্ষ জীবন ঘনিষ্ঠ সর্বাধিক সার্থক ও মৌলিক উপন্যাস।