লেখক এম সেলিম খান চাটগামী একটি আধ্যাত্মিক চেতনাসম্বলিত সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্নচারী

23

আ ব ম খোরশিদ আলম খান

লেখক-গবেষক মুহাম্মদ সেলিম খান চাটগামী দীর্ঘদিন ধরে কর্কট (ক্যান্সার) রোগে আক্রান্ত ছিলেন। দীর্ঘদিন ভারতেও চিকিৎসা নিয়েছিলেন। সাংবাদিক-অধ্যাপক আবু তালেব বেলালের মুখে সর্বপ্রথম শুনলাম সেলিম খান চাটগামী যে আর বেঁচে নেই এই দুঃসংবাদটি। চাটগামী ছিলেন একজন সহজ সরল সাদাসিধে মানুষ। তাঁর অমায়িক মাধুর্যপূর্ণ ব্যবহারে যে কেউ মুহূর্তে মোহাবিষ্ট হতেন। তিনি ছিলেন অজাতশত্রু। একজন রাজনীতিবিদ, সুন্নি দরদী সংগঠক, সনিষ্ঠ লেখক, নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবক এবং নিষ্ঠাবান ব্যবসায়ীÑএইসব কয়টি অভিধায় ভূষিত করা যায় তাঁকে। যাঁর বাড়ি পটিয়ার মনসা হুলাইন গ্রামে। তাঁর ব্যবসা খাতুনগঞ্জে। ব্যবসার ফাঁকে লেখালেখি, গ্রন্থ রচনা, রাজনীতি এবং সমাজসেবা সব ক্ষেত্রেই যাঁর সরব পদচারণা ছিল। প্রতি বছর ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) মাসে প্রকাশ করতেন মদিনার পথে নামে এক বিশেষ প্রকাশনা। এতে বিভিন্ন লেখকের সাথে আমার লেখাও স্থান পেত। কুতুবুল আউলিয়া আল্লামা শাহসূফি সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি (র.) কে নিয়ে গবেষণা সংকলন ‘বাগে ছিরিকোট’ প্রকাশ সেলিম খান চাটগামীর আধ্যাত্মিক চেতনার প্রতি নিষ্ঠা এবং কঠিন পরিশ্রমের ফল। বাগে তৈয়বা নামে গাউসে জামান আল্লামা শাহসূফি সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ.) এর জীবন-দর্শন বিষয়ক সংকলনটি বেশ সমাদৃত হয় তরিকতপন্থি সুধী মহলে। তিনি তৈয়বিয়া সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে এ সংস্থা থেকে এ প্রকাশনাগুলো প্রকাশ করেছেন।
জশনে জুলুছে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.), ওলীকুল শিরোমণি গাউসুল আজম সৈয়দ আবদুল কাদের জিলানী (রহ), গরিবে নেওয়াজ আল্লামা সৈয়দ মঈনুদ্দিন চিশতী (রহ), কুতুবুল আউলিয়া আল্লামা আবদুর রহমান চৌহরভি (রহ), গাউসুল আজম আল্লামা শাহসূফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (ক), গাউসে জামান আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ ছিরিকোট (রহ), গাউসে জামান আল্লামা হাফেজ কারী সৈয়দ মুহম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ), দরবারে ছেরিকোট এর খলিফা ইঞ্জিনিয়ার আলহাজ্ব মুহাম্মদ আবদুল খালেক (রহ), আলহাজ্ব নূর মোহাম্মদ আলকাদেরী (রহ)সহ আরো অন্যান্য সিলসিলা ও তরিকতের মাশায়েখদের জীবন-কর্ম নিয়ে সেলিম খান চাটগামী নিয়মিত পত্র পত্রিকা ও মাসিক তরজুমানে লিখে আসছিলেন। কোনমাসে কাকে নিয়ে লিখতে হবে এ ব্যাপারে তিনি রুটিন মেনে চলতেন। মাশায়েখে কেরামের জীবন মৃত্যুর সন-তারিখ ছিল তাঁর নখ দর্পণে। লেখাগুলো প্রকাশে তিনি যে আন্তরিকতা, শ্রম ও কষ্ট স্বীকার করতেন তা বিশেষভাবে এখানে উল্লেখ করতে হয়। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখাগুলো প্রকাশের জন্য তদবির কোশেশ করতেন। অথচ লেখাগুলো প্রকাশের পেছনে কোনো ব্যক্তি স্বার্থ ছিল না। দ্বীন-মাজহাব ও মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত গবেষক-মনীষী-আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের ওপর লেখা প্রকাশের পেছনে ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত না থাকলেও দ্বীন ও মাজহাবের খাতিরে তিনি নানামুখী লেখা চালিয়ে যেতেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এসব অলাভজনক লেখালেখিতে ব্যস্ত থাকাতেই তিনি নিজের কর্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। দৈনিক আজাদীতে লেখা প্রকাশে অনেক সময় আমার কাছে ফোন দিতেন এবং পরামর্শ চাইতেন। সুন্নি আক্বিদার ওপর প্রতিষ্ঠিত কালজয়ী ব্যক্তিত্বদের ওপর তাঁর যে দরদ, নিষ্ঠা ও গভীর আন্তরিকতা দেখা যায় তা ছিল সত্যি মুগ্ধ করার মতো। এমন স্বার্থত্যাগী মানুষের কোনো তুলনা হয় না। পিতা মরহুম আমিরুজ্জামান খান, মাতা ম”ত ফাতেমা খাতুন, স্ত্রী মুছাম্মাৎ শাহীন আখতার, এক ছেলে মুহাম্মদ সাইফুল করিম খান সৌরভ, এক মেয়ে সফিনা আখতার খানম তোহফা নিয়ে চাটগামী সাহেবের সুখের সংসার।
লেখক-গবেষক মুহাম্মদ সেলিম খান চাটগামীর প্রকাশনা-গ্রন্থগুলো প্রকাশে অনেকেই নানাভাবে আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। শাহ আমানত হজ্ব কাফেলার চেয়ারম্যান মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াছিনও তাঁকে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। আমিরুল হুজ্জাজ আল্লামা শাহসূফি ছালেহ জহুর ওয়াজেদী (রহ) স্মারক গ্রন্থেও চাটগামী সাহেব লিখেছিলেন। সুন্নি অঙ্গনে তাঁর সক্রিয়তা বরাবরই বলিষ্ঠ ও নিবেদিতপ্রাণ। সুন্নি ব্যবসায়ী ও দানবীরদের সঙ্গে চাটগামী সাহেবের সখ্য সম্পর্ক ছিল। মাধুর্যপূর্ণ ব্যবহারে মানুষকে আপন করে নেয়ার গুণ-বৈশিষ্ট্য তাঁর মাঝে ছিল। চট্টগ্রাম নগরের শাহ আমানত (রহ) হেফজখানা ও এতিমখানা কমপ্লেক্সের মহাপরিচালক মাওলানা মুহাম্মদ নূরুল আবছার আলকাদেরীসহ অনেক খ্যাতিমান আলেম ও ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।
ইন্তেকালের প্রায় তিন সপ্তাহ আগে চাটগামী সাহেব আমাকে বললেন, তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত, সবার দোয়া কামনায় এই নিউজটি যেন আজাদীতে আমি প্রকাশ করি। অবশ্য এর আগে আজাদীর সাংবাদিক কাশেম শাহ এমন একটি নিউজ ছেপেছিলেন। তাই, আমি আর নিউজ প্রকাশে আগ্রহ দেখাই নি। তবে তাঁকে বলেছি, আপনার প্রতি আমাদের দোয়া ও শুভ কামনা থাকবে। সাংবাদিক-অধ্যাপক আবু তালেব বেলাল কল্পলোকের বাসায় চাটগামীকে দেখতে গিয়েছিলেন। তা ছবিসহ পূর্বদেশ পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছিলো। চাটগামী সাহেবের সঙ্গে আমার যে দ্বীনি ভ্রাতৃত্বের ও ঈমানি বন্ধন তা তো অটুট থাকবে চিরকাল। ইন্তেকালের তিন সপ্তাহ আগে চাটগামী সাহেব সহানুভূতির সুরে মোবাইল ফোনে আমাকে জানালেন, অনেক আলেম ওলামা, সংগঠক ও বিশিষ্ট ব্যক্তি আমাকে দেখে গেছেন। আপনি আমাকে দেখতে এলে আমি খুশি হতাম। দুর্ভাগ্য, শেষবারের মতো তাঁকে আর দেখা হলো না। তাঁকে দেখার আশা অপূর্ণই থেকে গেল। তবে, তাঁকে নিয়ে কিছু লিখে কিছুটা দায়বোধের এই চেষ্টা।
বহুমাত্রিক গুণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মুহাম্মদ সেলিম খান চাঁটগামী একজন ধর্মভীরু, প্রগতিশীল আধ্যাত্মিক ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তি ছিলেন। আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের আজীবন সদস্য, গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ ইসলামী যুবসেনা এমনকি ছাত্র জীবনে এলাকায় ছাত্রসেনার দায়িত্বও পালন করেছেন। সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়ার মাশায়েখে কেরাম এবং হুজুর গাউসে জমান আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (র.) এবং গাউসে জামান শাহসূফি আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ (মজিআ)কে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা মহব্বত করতেন। তিনি ছিলেন গাউসে জমান আল্লামা শাহসূফি সৈয়দ তৈয়ব শাহ (রহ.) এর একনিষ্ঠ নিবেদিতপ্রাণ মুরিদ। তাঁর মাঝে কোনো লৌকিকতা ও বাহুল্য ছিল না।
যখনই কোনো দ্বীনি, জীবন দর্শন, আক্বিদা ভিত্তিক প্রকাশনা বের করতেন তা আপন মুরশিদ কেবলাকে তিনি দেখাতেন এবং তা উপহার হিসেবে হাতে তুলে দিতেন। হুজুর কেবলা গাউসে জামান আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ (মজিআ) সেলিম খান চাটগামী কর্তৃক প্রকাশিত বই-গ্রন্থগুলো সহাস্যে গ্রহণ করতেন। তা যেন আজ বিশেষ স্মৃতি হয়ে আছে। ছবিই যেন কথা বলে।
সেলিম খান চাটগামীর অশেষ কীর্তি তাঁর সর্বশেষ লেখনী প্রয়াস। সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়ার বিশিষ্ট মুরিদ-শিষ্যদের নিয়ে তিনি সংকলন গ্রন্থ বের করেন ‘স্মরণীয় ও বরণীয়’ এবং ‘পথের দিশা দেখালেন যারা’। এতে সারা দেশে থাকা আলোচিত-অনালোচিত সিলসিলার ভক্ত মুরিদদের জীবনবৃত্তান্ত উঠে এসেছে। শীর্ষস্থানীয় আলেম উলামা পীর মাশায়েখ ও কীর্তিমান আলেমে দ্বীনদের নিয়ে বছর দুয়েক আগে প্রকাশ করেন ‘সিরাতুল মুস্তাকিম দেখালেন যারা।’ আমার আব্বা অধ্যক্ষ আল্লামা ক্বারী নূরুল আলম খানের (রহ.) ওপর আমার লেখাও এতে স্থান পেয়েছে। গ্রন্থগুলো প্রকাশের পেছনে তিনি অশেষ কষ্ট স্বীকার করেছেন।
আনজুমান রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক আল্লামা এম এ মান্নান, ওএসি সেক্রেটারি আল্লামা কাযী মুঈন উদ্দিন আশরাফী, আনজুমান ট্রাস্টের মুখপত্র মাসিক তরজুমানের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাংবাদিক স ম ইবরাহিম, তরজুমানের নির্বাহী কর্মকর্তা স ম মনছুরুর রহমান এবং সহ সম্পাদক আবু নাছের মুহাম্মদ তৈয়ব আলীর সঙ্গে সেলিম চাটগামীর সখ্যতা ছিল নিবিঢ়। লেখালেখির ব্যাপারে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ নিতেন। সুন্নি অঙ্গনের সকল পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁর কথা ও আচরণে কেউ কখনো কষ্ট পায়নি। তাঁর সারল্যের একটি ঘটনা মনে পড়ে। কয়েক বছর আগে খাতুনগঞ্জ থেকে একজন দোকান কর্মচারী নিয়ে তিনি রিকশাযোগে চেরাগী পাহাড়ে এসেছিলেন। ভাড়া দেওয়ার জন্য শ-পাঁচশ টাকার নোট ভাংতি ছিল না। কর্মচারীকে টাকা ভাঙাতে পাঠালেন। কর্মচারীটি ওই টাকা নিয়ে সেই যে উধাও হয়ে গেল আর ফিরে এলো না। ওই সময় চেরাগী পাহাড়ে আমাকে দেখে গভীর আফসোসের সঙ্গে ঘটনাটি ব্যক্ত করে মন হাল্কা করলেন। বিস্তর লেখালেখি, গ্রন্থ প্রণয়ন ও গবেষণা অনুসন্ধিৎসা ও অসামান্য অবদান পরিস্ফুটিত হয়েছে চাটগামীর লেখায়। তাঁর গবেষণালব্ধ শ্রমমথিত লেখনী ও গ্রন্থগুলো তাঁকে অনেক দিন ধরে স্মরণীয় করে রাখবে বলা যায়। তিনি থাকবেন সকলের মণিকোঠায়। রোগ-ব্যাধির ওপর মানুষের হাত নেই। প্রায় বছর খানেক ধরে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে নিয়তির কাছে হেরে গেলেন সেলিম খান চাটগামী। এ বছর রোজার মাসে (৪ রমজান) সাহরির সময় তিনি দুনিয়া থেকে চির বিদায় নেন। সুন্নিয়ত প্রচার, লেখালেখি ও সমাজসেবার জন্য তিনি আরো কিছুকাল বেঁচে থাকলে ইতিহাস ভিন্নভাবে রচিত হতো।
কেন এই সময়ে পরম করুণাময়ের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি চলেন গেলেন-তা আল্লাহই মালুম। জীবন-মৃত্যুর ওপর কারো হাত নেই। আবার অকাল মৃত্যু বলেও কিছু নেই। আল্লাহ পাক যার ভাগ্যে যার তকদিরে যতোদিন হায়াত-মওত-রিজিক রেখেছেন তাই নিশ্চিতভাবে ঘটবে সকলের বেলায়। মুহাম্মদ সেলিম খান চাটগামী চলে গেলেন নীরবে, কিন্তু সুন্নি অঙ্গনসহ সবার কাছে তিনি থাকবেন চিরঞ্জীব হয়ে। আল্লাহ পাক তাঁর কৃতকর্মের যথাযথ প্রতিদান নসিব করুন। আমিন।
লেখক : সাংবাদিক