লিভার সিরোসিস

12

সংজ্ঞা : লিভার বা যকৃতের কোষের ক্ষয়সাধন, আকারের পরিবর্তন, ছোট ও শক্ত হয়ে যাওয়া, লিভারের গঠনের ক্ষতিসাধন, কিছু লিভার কোষের পুনঃ বিভাজন, লিভারকোষে অতিরিক্ত চর্বি জমা এবং অতিরিক্ত ফাইব্রাস টিসুর উৎপাদনের ফলে লিভারের কার্যক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পায় এবং পোর্টাল ভেনের উপরে চাপ বৃদ্ধি পায়। এই অবস্থাকে লিভার সিরোসিস বলে। লিভার সিরোসিস একটি বড় ব্যাপার। এটি যখন যার হয়, তখন তার বিশেষত: খাবার হজমে ব্যাঘাত ঘটে।
রোগের কারণ :
১) গ্রীষ্ম প্রধান দেশে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মদ্যপান করতে থাকলে।
২) হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসের সংক্রমণে।
৩) দীর্ঘদিন ধরে লিভারে চর্বি জমতে থাকলে।
৪) দীর্ঘদিন ধরে খাবারে অনিয়ম করতে থাকলে লিভারে পিত্তরস জমে হেপাটিক কনজেশন হলে ।
৫) অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়া হলে।
৬) ইমিউনোলজিক্যাল ফ্যাক্টর, মেটাবলিক ডিজ-অর্ডার,ও অন্যান্য কারণে লিভার সিরোসিস হতে পারে।
৭) ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, ডেঙ্গুজ্বর, টাইফয়েড প্রভৃতি রোগ হতে যকৃত প্রদাহ হয়, পরে লিভার সিরোসিস হতে পারে।
প্রকারভেদ :
১) মাইক্রো-নডিউলার (গরপৎড়-হড়ফঁষধৎ) দীর্ঘদিন মদ্যপানের দোষে এই ধরনের লিভার সিরোসিস হয়ে থাকে।
২) ম্যাক্রো-নডিউলার (গধপৎড়-হড়ফঁষধৎ) হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসের সংক্রমণে এই প্রকার রোগের আক্রমণ হয়ে থাকে।
রোগের কারণ, লক্ষণ ও ফলাফল :
১) ক্ষুধামান্দ্য, পেটে গ্যাস, বমি বমি ভাব ও বমি হয়। ২) ক্রমশ: পেটে ভারী বোধ ও পেট ফোলে। ৩) ক্রমশ: দুই পা ফোলে এবং টিপে ধরলে গর্ত হয়ে যায়। ৪) ক্রমশ: শরীর দুর্বল, ওজন হ্রাস, রক্তাল্পতা, অবসাদ, অল্প অল্প জ্বর ইত্যাদি হয়। ৫) কিছু কিছু ক্ষেত্রে হেমাটোমেসিস ও মেলিনা হয় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ইসোফেজিয়াল ভেরিকোসিস হয়ে রক্তক্ষরণ হতে পারে। ৬) অর্শ হয়ে রক্তপাত হয়। ৭) পাতলা পায়খানা বা কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। ৮) মহিলাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় মাসিক ঋতুবন্ধ থাকে ও পুরুষদের ক্ষেত্রে ধ্বজভঙ্গ দেখা দেয়। ৯) কিছু কিছু ক্ষেত্রে জন্ডিস দেখা দেয়। ১০) হাতে পামার ইরিথ্রিমা বা গলার কাছে স্পাইডার এনজিওমা হতে পারে। ১১) কিছু কিছু ক্ষেত্রে চামড়ার তলায় রক্তক্ষরণ হয়। ১২) পেটে জল জমার কারণে নাভি বাইরের দিকে ফুলে উঠে। পেটের রক্তবাহী শিরাগুলি ফুলে ওঠার জন্য ভালোভাবে দেখতে পাওয়া যায়। আঙ্গুল দ্বারা প্রথম অবস্থায় লিভারকে অনুভব করা যায় কিন্তু পরের অবস্থায় লিভার ছোট হয়ে যাওয়ার জন্য অনুভুত হয় না। প্লীহা বড় হয় ও আঙ্গুল দ্বারা অনুভব করা যায়।
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা :
১) ফ্লুইড থ্রিল ও শিফটিং ডালনেস পরীক্ষা
২) লিভার ফাংশন টেস্ট
৩) প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা
৪) লিভার বায়োপ্সী
৫) সি.টি. স্ক্যান ও আল্ট্রাসনোগ্রাফী
৬) প্র¯্রাব পরীক্ষা ইত্যাদি
সতর্কতা ও ব্যবস্থাপনা
১) মদ খাওয়া বন্ধ করতে হবে।
২) খাবারে কাঁচা লবণ ও নোনতা খাবার খাওয়া বন্ধ করতে হবে।
৩) শর্করা জাতীয় খাবার বেশি খেতে হবে। আমিষ বা চর্বি জাতীয় খাবার পরিমিত খেতে হবে। ফল ও শাক সবজি বেশি খেতে হবে।
৪) শরীর থেকে রক্তক্ষরণ হলে বা পেটে জল জমলে সম্পুর্ণ বিশ্রাম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
৫) জন্ডিস থাকলে চর্বিজাতীয় এবং ভাজা পোড়া খাবার সম্পূর্ণ রূপে বাদ দিতে হবে। স্যুপ জাতীয় খাবার বেশি উপযোগী হয়।
৬) মসলা-জাতীয় খাবার না খেয়ে পারলে বেশি ভাল, এতে রোগীর তাড়াতাড়ি সুস্থ হবার সুযোগ তৈরী হয়।
৭) সবচেয়ে বড় কথা রোগীকে চিন্তামুক্ত থাকার ব্যবস্থা এবং শব্দমুক্ত স্থানে রাখার চেষ্টা করতে হবে।
৮) রোগীকে মোবাইল এবং যেকোন রেডিয়েশন থেকে যথাসম্ভব দূরে স্বাস্থ্যসম্মত স্থানে রাখতে হবে।
প্রয়োজনীয় পথ্যাদি :
১) কচি ডাবের পানি
২) এলোভেরা জেল-এর শরবত
৩) আখের রস
৪) জাম্বুরা ও লেবুর শরবত
৫) ডালিম প্রভৃতি রসালো ফল
৬) চিকেন স্যুপ
৭) কাঁচা হলুদের রস
৮) পেঁপে পাতার রস
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা :
এই ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে যে সকল ঔষধাবলী সাধারণভাবে প্রযোজ্য বা প্রয়োগ করা হয় সেগুলি হল:- ( বিষয়টি সংক্ষিপ্ত করার স্বার্থে ঔষধের বর্ণনা বাদ দিলাম।) তবে রোগলক্ষণের যাচাই বাছাই অনুসারে ঔষধের প্রয়োগকাল নির্ভর করে রোগশক্তি ও ঔষধশক্তির এবং রোগীর সার্বদৈহিক ও মানসিক ক্ষমতার উপর।
চেলিডোনিয়াম, লাইকোপডিয়াম, ফসফরাস, মিউর-এ, আর্স-এ, কার্বো-ভেজ, এসিটিক-এ, এপিস মেল, পডোফাইলাম, এপোসা-ক্যানা, কষ্টিকাম, নাক্স-ভম, নেট-মি, নেট-সা, কোলেষ্টেরিন, মার্ক-সল, জিঙ্কাম মেট, আর্জেন্ট নাইট, পডোফাইলাম, ক্রোটেলাস, চায়না, ম্যাগ-মি, সালফ ইত্যাদি।
লেখক : ডা. দানিয়েল বাড়ৈ