পালতোলা সাম্পান

লিটন কুমার চৌধুরীর ছড়া রচনায় কুশলতার পরিচয়

বাসুদেব খাস্তগীর

5

ছড়াসাহিত্যের একটি প্রাচীন শাখা। মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত সর্বজনীন আবেদনময় একটি বিষয় হলো ছড়া। ছড়ার আবেদন সবসময় ছিলো, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। ছড়ার প্রধান বিষয় সুর, তাল, লয় ও ছন্দ, তার অর্থের গভীরতা তেমন মুখ্য হয়তো নয়। শিশুতোষ ছড়ার বিষয়বস্তু হতে পারে তার চমৎকারিত্ব ও এক ধরণের রহস্যময়তা। ছোট্ট বন্ধুরা, বই আলোচনায় আজ আমরা একটু চোখ রাখি শিশুসাহিত্যিক লিটন কুমার চৌধুরীর শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ ‘পালতোলা সাম্পান ’এর দিকে। লিটন কুমার চৌধুরীর ‘পালতোলা সাম্পান’ একটি চমৎকার শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ। অনেকদিন ধরে শিশুকিশোরদের নিয়ে লেখালেখি করছেন লিটন কুমার চৌধুরী। তাঁর কুশলতার ছাপে ঋদ্ধ ছড়াগ্রন্থ ‘পালতোলা সাম্পান’ এ বেশ কিছু মনকাড়া ছড়া স্থান পেয়েছে। ‘সাম্পান’ আমাদের চট্টগ্রামেরই ঐতিহ্যবাহী একটি বাহনের নাম। কর্ণফুলীর বুক ছিঁড়ে পাল তুলে যখন ‘সাম্পান’ ছুটে যেতে দেখে কার না ভালো লাগে? চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘সাম্পান’ নিয়ে বইয়ের নামকরণেও এক ধরণের বৈচিত্র আছে। বইটিতে মোট ঊনিশটি ছড়া স্থান পেয়েছে। বইয়ের বেশ কয়েকটি ছড়ার মধ্যে মায়ের শাড়ি, সুর তুলি, ডানপিটে ছেলে, সম্প্রীতির বন্ধনে, ফড়িং বাবু, মনির বাড়ি রহিমপুর, প্রজাপতি, রঙ ছড়ানো, বৈশাখ, শীতের সকাল, এবার ঈদে, রাঙা সকাল নামের ছড়াগুলো বেশ চমৎকার ও এগুলোকে নিটোল শিশুতোষ ঢঙের ছড়া বলা যেতে পারে। যেমন ‘মায়ের শাড়ি’ ছড়ায় ছড়াকার বলছেন ‘সবুজ ঘেরা বাড়ি আমার সবুজ ঘেরা বাড়ি, সেই বাড়িতে আমারই মা পরে সবুজ শাড়ি’ কিংবা ‘সুর তুলি’ ছড়ার ‘বলে খোকা ভাইয়াটা তোর পলাশ গাছের শাখে, মা মা বলে আমায় যেনো আকুল করে ডাকে।’এগুলো হতে পারে শিশুতোষ ঘরানা ছড়ার চমৎকার উচ্চারণ। লিটন কুমার চৌধুরী একজন একনিষ্ঠ নিষ্ঠাবান লেখক। তিনি তাঁর লেখালেখিতে আরো নিবিষ্ট মনোযোগ দিলে সকল সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। শিশুতোষ ছড়ার যে ব্যঞ্জনা, সে ব্যঞ্জনা যেনো ফোটে তাঁর উচ্চারণে ‘আমাদের ননী বাবু ডানপিটে ছেলে, গাছ থেকে আম পাড়ে খেলে এলে বেলে’, (ডানপিটে), ‘খুশির আমেজ পুজোর ছুটি মন খুলে তাই হাসি, মনের ভেতর উথলে ওঠে সুখ যে রাশি রাশি’ (স¤প্রীতির বন্ধনে), ‘নরম নরম শরীর খানা নামটা ফড়িং বাবু, কথার প্যাঁচে অন্যকে সে করতে পারে কাবু’ (ফড়িং বাবু), এরকম কিছু ছড়ার কথা শিশুদের মনযোগ আকর্ষণের কেন্দ্র হতেই পারে। আগেই বলেছি ছড়া হতে হবে অর্থময়তার গন্ডি পেরিয়ে চটুল হালকা বাণী সমৃদ্ধ, আকর্ষণের জন্য থাকতে পারে নতুনত্ব বা চমক। তাঁর অনেক ছড়ার মধ্যে সে গতিময়তা লক্ষ্য করা যায়। যেমন ‘মনির বাড়ি রহিমপুর’ ছড়ায় তিনি বলছেন ‘মনির বাড়ি রহিমপুরে নদীর কাছে ঘর, বর্ষা এলে ভয়ে তাদের বুক কাঁপে থরথর’ কিংবা ‘এবার ঈদে’ নামক ছড়ায় বলছেন ‘বাড়ি বাড়ি ঘুরবো সবাই ফিন্নি পায়েস খাবো, কেমন হবে এবার ঈদে ভাইয়া তুমি ভাবো।’ তাঁর এসব কথামালায় ছড়ার নির্মল বিশেষত্ব ফুটে উঠেছে বলা যায়। এছাড়া পালতোলা সাম্পান, চান্নিপশর, চৈতি হাওয়া, গ্রাম শিরোনামের ছড়াগুলোতে গ্রাম বাংলার বর্ণনা, চরিত্র, চিত্রণ তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা বিদ্যমান। আঙ্গিক ও পরীক্ষা নিরীক্ষার বিচারে বইয়ের সব ছড়াকে শিশুতোষ ছড়ার ঘরানায় ফেলা যায় কী না তার প্রশ্ন তোলাই যায়। তবে লিটন কুমার চৌধুরীর আন্তরিক প্রয়াস প্রশংসাযোগ্য। অনেক ছড়ার অনেক লাইন আমাদের শিশুদের মনযোগ আকর্ষণে সক্ষম বলাই যায়। আরেকটু মনোযোগী হলে দু’একটি বানান বিভ্রাট এড়ানো যেতো। বইটির মোট ঊনিশটি ছড়ার মধ্যে সতেরটি ছড়া স্বরবৃত্ত ছন্দে, দুটি ছড়া মাত্রাবৃত্ত ছন্দে। মাত্রাবৃত্ত ছন্দের ছড়ার দু’একটি জায়গায় ত্রুটি উপেক্ষা করা যায়। একজন শিক্ষক ও একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসাবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে লেখালেখির মত সৃজনশীল জগতে সময় দেয়া সত্যি কঠিন। তারপরও লেখালেখির নেশা, লেখককে তার লেখনী থেকে দূরে রাখতে পারে না। লিটন কুমার চৌধুরী তার প্রমাণ। ভবিষ্যতে আমরা তাঁর কাছ থেকে আরো ভালো ভালো লেখা প্রত্যাশা করি। ‘পালতোলা সাম্পান’ প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা অক্ষরবৃত্ত প্রকাশন। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী মোমিন উদ্দীন খালেদ ও ভেতরের অলংকরণ করেছেন শিল্পী পীযুষ চন্দ্র সরকার। ক্রাউন সাইজের তিন ফর্মা (২৪ পৃষ্ঠা) বইটির মূল্য রাখা হয়েছে একশত ত্রিশ টাকা। বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।