লক্ষী রানী ভট্টাচার্য্য : একজন শিক্ষকের প্রতিকৃতি

শাহজাহান আজাদ

22

শিক্ষকতা মহান পেশা। শিক্ষকদেরকে বলা হয় জাতিগড়ার কারিগর। তবে শিক্ষকদের মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র। এ পেশায় যোগ দিয়ে কেউ কেউ এর মর্যাদা ধরে রাখতে পারেননা। কলুষিত হয়ে যান, কিংবা বিপথগামী হন। ফলে নন্দিত হওয়ার চেয়ে নিন্দিত হন বেশি। অনেকে আবার আর্থসামাজিক কারণে কম আয়ের এই মহান পেশায় নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারেন না। ছেড়ে চলে যান বাড়তি আয়ের কোন পেশায় বা ব্যবসায়। কিন্তু যারা জাত শিক্ষক তাঁরা শত সমস্যা, সংকট, আর্থিক টানাপোড়েন সহ্য করেও আজীবন শিক্ষাসেবায় নিয়োজিত থাকেন। দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষে অবসর জীবনে গিয়ে তাঁদের হয়তো আরো বেশি প্রতিক‚লতার সম্মুখীন হতে হয়। উল্লেখ্য, কিছুদিন আগেও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অবসর নেয়ার সময় শিক্ষকরা ফিরতেন খালি হাতে। প্রসঙ্গত: আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, আমার বাবা মরহুম ভাষাসৈনিক ও শিক্ষাবিদ আবুল কালাম আজাদ নব্বইর দশকে অবসর গ্রহণ করেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সদ্য সরকারি হওয়া গাছবাড়ীয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। তাঁর আপন সহোদর ভাষাসৈনিক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ সোলায়মান ও চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী স্যার আশুতোষ কলেজ থেকে অবসর নিয়েছেন কিন্তু কোনো আর্থিক সুবিধা পাননি। ফলে, কাছে থেকেই তাঁদের দুরাবস্থা দেখেছি। আনন্দের কথা, বর্তমানে যারা অবসর নিয়েছেন তাঁরা বিলম্বে হলেও মোটামুটি ভালো আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন।
যাক্ মূল কথায় ফিরে যাচ্ছি। গত ৩০ জুন, রবিবার আমাদের বিদ্যালয়ের একজন অত্যন্ত গুণী শিক্ষককে আমরা শিক্ষক পরিষদের পক্ষ থেকে বিদায় সংবর্ধনা জানালাম। তিনি হলেন মিসেস লক্ষী রানী ভট্টাচার্য্য। আমাদের ল²ী ম্যাডাম। ঐদিন ছিল গাছবাড়ীয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে তাঁর শেষ কর্মদিবস। ১৯৮৬ সনের ২ সেপ্টেম্বর এ বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে দীর্ঘ প্রায় ৩৩ বছর একাধারে তিনি এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে আসছিলেন। ১৯৫৯ সালের ১ জুলাই পটিয়া উপজেলার ছনহরা ইউনিয়নের মঠপাড়া গ্রামের বিদ্যালংকার বাড়িতে তাঁর জন্ম। পিতার নাম প্রয়াত সতীশ চন্দ্র ভট্টাচার্য্য ও প্রয়াত মাতার নাম ইন্দুমতী দেবী। মঠপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভাটিখাইন নলিনীকান্ত মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। এ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৫ সনে এস.এস.সি পাশ করেন। অত:পর পটিয়া সরকারি কলেজ থেকে ১৯৭৮ সনে এইচ.এস.সি পাশ করেন। ১৯৮৬ সনে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। একই বছরের ২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। উল্লেখ্য, ১৯৮২ সানে তিনি কাব্যতীর্থ এবং ২০০৬ সনে ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বি,এড) সমাপ্ত করেন।
গাছবাড়ীয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে মহিলা শিক্ষক ছিলেন তখন মাত্র কয়েকজন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ দিন শিক্ষকতা করেছেন মাত্র দুইজন প্রয়াত গীতা রাণী বিশ্বাস এবং মিসেস লক্ষী রানী ভট্টাচার্য্য। তাঁরা শিক্ষার্থীদের কাছে যথাক্রমে বড় দিদি ও ছোট দিদি নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যেও সে রকম সম্পর্ক ছিল। দুই বোনের মত ছিলেন তাঁরা। গীতা ম্যাডাম বাংলা পড়াতেন। ১৯৭৫ সালে এ বিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে, দীর্ঘ ৩৮ বছর শিক্ষকতা করেছেন তিনি। আরও তিন বছরের কম বেশি থাকতে পারতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল মারা যান তিনি। ১৯৮২ সালে এস.এস.সি পাশ করি আমি এ বিদ্যালয় থেকেই। ১৯৯৭ সালে এ বিদ্যালয়ে যখন ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই তখন তিনি সবচেয়ে বেশি খুশী হয়েছিলেন। আমার বাবা মরহুম ভাষাসৈনিক আবুল কালাম আজাদের সাথে তিনি দীর্ঘদিন এ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। এর পরে আমিও তাঁর সহকর্মী হলাম। ছাত্র জীবনে তাঁকে পেয়েছি পাঁচ বছর। কিন্তু সহকর্মী হিসেবে তাঁর পাশের সিটে বসেছি পনের বছরের বেশি। ল²ী দিদিকে আমি শিক্ষক হিসেবে পাইনি। কিন্তু কনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে তাঁর সঙ্গে কাটিয়েছি বাইশটি বছর। তাঁর অকৃত্রিম স্নেহ ভালবাসায় ধন্য হয়েছি। পেয়েছি তাঁর সহযোগিতা মূল্যবান পরামর্শ এবং আন্তরিক সান্নিধ্য। প্রয়াত লক্ষী রানী ভট্টাচার্য্য ম্যাডাম একজন ব্যতিক্রমী শিক্ষক। লক্ষী ম্যাডামের কখনও অতিরিক্ত অর্থলোভ দেখেনি। সম্ভবত: এই বিদ্যালয়ে তিনি একমাত্র শিক্ষক কমবেতন পেয়েও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনে একটি মাত্র স্কেল (টাইম স্কেল) ভোগ করতে পেরেছেন। সহজ সরল ছিলেন বলে স্কেল পরিবর্তনের নিয়ম গুলো হয়ত ভালো করে জানেননি। তবে একজন আর্দশ শিক্ষকের সব ভালো গুণাবলী তাঁর মাঝে দেখেছি। শ্রেণিকক্ষে তিনি যেমন শিক্ষার্থীদের কাছে আস্থাভাজন ছিলেন তেমনি শিক্ষক কমন রুমে তিনি ছিলেন সবার প্রিয়। হিন্দু ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি পড়িয়েছেন বাংলা, সমাজ বিজ্ঞান, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান, শারীরিক শিক্ষা, ইতিহাস এবং নতুন শিক্ষাক্রমের চারুকারু, কর্মও জীবনমূখি শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মত বিষয় গুলো। মাঝে মাঝে ছোটদের শ্রেণীতে ইংরেজি ও গণিত পড়িয়েছেন। নারী শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের গৃহীত কর্মসূচীর সফল বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন বরাবরই আন্তরিক। মেয়েদের বয়:সন্ধিকালীন নানা সমস্যা ও স্বাস্থ্য পরিচর্যা, তাদের পুষ্টি বিষয়ক ধারণা প্রদান, ইভটিজিং প্রতিরোধ এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। নারীনির্যাতন, যৌতুক ও মাদক বিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রমে তিনি ছিলেন আমাদের অগ্রবর্তী। শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে মেয়েদের তিনি ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য অভিভাবক। তাদের ব্যক্তিগত সমস্যা, অসুস্থতা, অভাব-অভিযোগ সব কিছু শেয়ার করতো ল²ী ম্যাডামের সাথে। তিনি আগ্রহ সহকারে ধৈয্য দরে সবার কথা শুনতেন। হাসিমুখে গঠন মূলক পরামর্শ দিতেন। শিক্ষার পাশাপাশি সহ শিক্ষা ক্রমিক কার্যাবলীতে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল লক্ষ্যনীয়। কবিতা আবত্তি, নৃত্য বির্তক, বক্তব্য অভিনয়, সংগীত, চিত্রাঙ্কন প্রভৃতি বিষয়ে উৎসাহিত করতেন। বিশেষ করে তাঁর আবৃত্তি ও বক্ততায় আমাদের মুগ্ধ করতেন। প্রায়ই বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর সহযোগিতা পেয়েছি। বিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক হিসেবে এ লেখকের নাম প্রস্তাব করেছেন এবং নির্বাচিত করতে সফল হন। তিনি শিক্ষক প্রতিনিধির দায়িত্ব ও পালন করেছেন বেশ ক’বছর। শিক্ষকদের দাবী দাওয়া নিয়ে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। এবং বিদ্যালয়ের সংকট সময়ে প্রধান শিক্ষক, সহকারি প্রধান শিক্ষক এবং আমাদের পাশে থাকতেন। শিক্ষার্থীদের আপন সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। তাঁর স্নেহ মমতার কথা ভুলতে পারেনা তারা। বিশাল হৃদয়ের অধিকারী তিনি। প্রতিদিন কাউকে না কাউকে কিছু খাওয়াতেন। শিক্ষকদের বিভিন্ন সময়ে নাস্তা করাতেন এবং দু’এক বার দুপুরের খাবারের ও ব্যবস্থা করেছেন। শিক্ষক কর্মচারীদের করিয় অনেককে বিপদে ধার দিয়েছেন। অসুস্থদের সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। ছাত্র-ছাত্রী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে আয়োজিত বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উদার হস্তে দান করেছেন। নিজ এলাকার (বাপের বাড়ী ও শ্বশুর বাড়ী) অনেক গরীব, দু:খী, অনাথ এবং আত্মীয়স্বজনকে কোন দিন বিমুখ করেন নি। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার, ১৯৮৯ সনের ২৭ জানুয়ারী চন্দনাইশ উপজেলার জোয়ারা ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী প্রয়াত অমর কৃষ্ণ চক্রবর্ত্তী ও প্রয়াত দীপালী চক্রবর্ত্তীর পুত্র বিশিষ্ট ব্যাংকার বাবু পরিমল ভট্টাচার্য্যের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। পরিমল বাবু কিছুদিন হয় বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে অবসর নিয়েছেন। তাঁদের দুই সন্তান। বড়ছেলে দেবাশীষ চক্রবর্ত্তী এম,বি,বি,এস (চমেক) পেশায় চিকিৎসক। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করেন এবং ছাত্র সংসদের ভি,পি ছিলেন। ছোট ছেলে সঞ্জয় চক্রবর্ত্তী বুয়েট থেকে বি.এস.সি ইঞ্জিনিয়ার হয়ে সরকারি চাকরী করছেন। উল্লেখ্য, দু’জনেই অত্যন্ত মেধাবী। প্রাইমারি ও জুনিয়র বৃত্তি পেয়েছিল ট্যালেন্টপুলে। এছাড়া এস.এস.সি ও এইচ.এস.সিতে ও গোল্ডেন জি.পি.এ প্রাপ্ত। তাঁরা বিভিন্ন বেসরকারি বৃত্তি-পুরস্কার পেয়েছে। বড় ছেলে দেবাশীষ কে বিয়ে করিয়েছেন। তার স্ত্রী শাওন ব্যানার্জী এম.বি.বি.এস. (চমেক) ও একজন চিকিৎসক। উল্লেখ্য, লক্ষী রানী ভট্টাচার্য্যরে ভাইবোনেরা ও সবাই শিক্ষিত। তাঁদের মা বাবার চার ছেলে ও তিন মেয়ে। লক্ষী ম্যাডাম সবার কনিষ্ঠ। তাঁর বড় ভাই প্রথম জন বাবু বাদল ভট্টাচার্য্য বি.এ। যুদ্ধের সময় ভারত গিয়ে ফিরেননি। সেখানে অবসর জীবন যাপন করছেন। দ্বিতীয় জন বাবু গণেশ চন্দ্র ভট্টাচায্য এম.এ (ডবল), বি.এড, এম.এড, শোভনদন্ডী স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর নিয়েছেন। তৃতীয় ভাই বাবু নরেশ চন্দ্র ভট্টাচায্য বি.এ, বি.এড। তিনি ও উল্লেখিত বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে অবসর নিয়েছেন। চতুর্থ ভাই (কনিষ্ঠ) ডা. দুলাল প্রসাদ ভট্টাচার্য্য। তিনি দীর্ঘদিন পটিয়া ও চন্দনাইশ হাসপাতালের প্রধান (উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা) ছিলেন। পরে ফৌজদারহাট বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে অবসর নেন। তাঁর বড় দুই বোন বাসন্তী ভট্টাচার্য্য ও জয়ন্তী ভট্টাচার্য্য যথাক্রমে চট্টগ্রাম ও পটিয়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। দু’জনই মারা গেছেন।
বাপের বাড়ী ও শ্বশুর বাড়ী দু’দিকেই লক্ষী ম্যাডামের সম্ভ্রান্ত এবং সংস্কৃতিমোদী বংশ। উভয় দিকে সবার ভালোবাসা পেয়েছেন তিনি। কর্মক্ষেত্রে যেমন তিনি সফল আবার ব্যক্তিজীবনে ও ঠিক একই। একজন সু-গৃহিণী এবং রত্নগর্ভা মা। তিনি সমাজ সচেতনতা, মানবিকতা এবং অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য প্রতিকৃতি। তাঁর বিদায় তথা অবসর গ্রহণ সত্যি বেদনাদায়ক। একজন সৎ, অমায়িক, মিশুক নির্ভরযোগ্য সহকর্মী ছিলেন তিনি আমাদের কাছে। শিক্ষার্থীরা ও তাদের প্রিয় শিক্ষক লক্ষী রানী ভট্টাচার্য্য ম্যাডামকে ভীষণ মিস করছে। বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী- শিক্ষক কর্মচারী সবার পক্ষ থেকে তাঁকে সশ্রদ্ধ অভিনন্দন জানাই। তাঁর অবসর জীবন সুন্দর হোক, সুখী হোক ও শান্তিময় হোক। তাঁর সু-স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।