রোহিঙ্গা সংকট নিরসন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে

5

গত বৃহস্পতিবার মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই বিগান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাত করতে গণভবনে গেলে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত ও পুনর্বাসনে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের প্রতি আহŸান জানিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আমরা অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন চাই এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব স¤প্রদায়ের উচিত এ পুনর্বাসনে সহায়তা করা। মিয়ানমারের উচিত তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়া। এসময় প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের পরিসংখ্যান এবং বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় তাদের নেতিবাচক অবস্থানের কথা তুলে ধরে বলেন, এ মুহূর্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশে অবস্থান করছেন, যা আমাদের দেশের জন্য অতিরিক্ত বোঝা। সমস্যাটি মিয়ানমার তৈরি করেছে এবং আমরা তাদের সাথে আলোচনা করছি, তাদের উচিত নিজেদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়া। শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু একটি সামাজিক সমস্যা এবং মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের একটি বড় অংশ কক্সবাজারের শিবিরে বসবাস করছে। কিছু মহল তাদের অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত হওয়ার জন্য বিভ্রান্ত করতে পারে। সুতরাং, তাদের স্বদেশে তাৎক্ষণিক প্রত্যাবাসন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জবাবে স্টিফেন ই বিগান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রও দীর্ঘায়িত ও স্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চায়। আমরা এ ইস্যুতে বাংলাদেশে আমাদের সমর্থন অব্যাহত রাখব।
বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, সারা বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস নিয়ে উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তখন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার জীবন একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশ শুরু থেকে এ সংকট সমাধানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ক‚টনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আসছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে আলোর ঝলক দেখা গেলেও নিমিষেই তা মিটে যায়। এ অবস্থা কোনভাবেই আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রত্যাশিত নয়। আমরা যতটুকু মনেকরি, মূলত আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক মেরুকরণ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি এ সংকট থেকে উত্তরণে বড় বাধা হয়ে দেখা দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পাশে রয়েছে দাবি করলেও বাস্তবে তা কতটুকু কার্যকর করতে পারবে তা দেখার বিষয়। কারণ পাশ্ববর্তী দেশ ভারত ও চীন এ বিষয়ে আন্তরিকভাবে এগিয়ে না আসলে সংকট সহজে সমাধানের পথ পাবে-তা বলা মুশকিল। ফলে সরকারের উচিৎ যেভাবেই হোক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ চীন-ভারত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা বিষয়ে এক টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত নেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। একাজটি মিয়ানমারের, তবে তারা করবে বলে মনে হয়না, ফলে আমাদেরকেই এগিয়ে যেতে হবে। উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালে যে ‘রোহিঙ্গা ঢল’ এ অঞ্চলের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল, গত ২৫ আগস্ট তাদের তিন বছর গত হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান সংকট তিন বছর পার করে চার বছর চলছে। কিন্তু বিশ্বগত তিন বছরে কোনো আশার বাণী শোনাতে পারেনি। এটা ঠিক, রোহিঙ্গাদের ওপর ২০১৭ সালে যে গণহত্যা ও নির্যাতন চালানো হয়েছিল, সে ব্যাপারে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’ বা ‘আইসিজে’ একটি রায় দিয়েছিল চলতি বছরের ফেব্রæয়ারি মাসে। কিন্তু ওই রায় সংকট সমাধানে কোনো বড় ভূমিকা পালন করতে পারেনি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে একটি চুক্তিও হয়েছিল মিয়ানমারের সঙ্গে। কিন্তু এ ব্যাপারেও কোনো অগ্রগতি নেই। বরং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা এখনো অব্যাহত রয়েছে। গেল জুন মাসেও রাখাইনে রোহিঙ্গা নির্যাতনের খবর দিয়েছে আল-জাজিরা। এক প্রতিবেদনে তারা আমাদের জানিয়েছে, রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ২০০ রোহিঙ্গা বসতি পুড়িয়ে দিয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়েছে রাখাইন ত্যাগ করতে। আর বাংলাদেশ সরকার উদার ও মানবিকতার পরিচয় দিয়ে তাদের আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু তাই বলে এই নয় যে, রোহিঙ্গাদের বছরের পর বছর বাংরাদেশ আশ্রিত হিসাবে রাখতে পারবে। বাংলাদেশ একটি ছোট্ট জনবহুল ও উদিয়মান উন্নয়নশীল দেশ। ঘনবসতির এ দেশে রোহিঙ্গা বড় সংখ্যার রোহিঙ্গা অবশ্য্য বাড়তি বোঝা। এ বোঝা টানার সক্ষমতা বাংলাদেশের কতটুকু আছে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের না বুঝার কথা নয়। সুতরাং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে এ সংকটের সমাধানে। তবে সরকারকে এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। ক‚টনৈতিক তৎপরতা অধিকতর জোরদার করতে হবে। অন্যথায় সংকট, সংকটের মধ্যেই থেকে যাবে।