রোহিঙ্গা শিশুর শিক্ষা

লিটন দাশ গুপ্ত

5

রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম অনেক আগে। অর্ধেক লেখা সহ কাগজটি হারিয়ে ফেলেছিলাম বলে আর লেখা হয়নি। কয়দিন আগে হারানো লেখাটি পেলাম। এই অবস্থায় পূর্বে লেখার সাথে সমন্বয় করে ঐ লেখাটি শেষ করলাম। উল্লেখ্য আমার লেখার বিষয়ে একটি অভ্যাস আছে, যখন মূলভাব মনে আসে, তখন যেখানে যে অবস্থায় থাকিনা কেন, হাতের কাছে যা কিছু পাওয়া যায় তাতেই মূল কথাগুলো লিখে ফেলি। এরপর কাগজ হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলে ঐ লেখার জন্যে অনুশোচনা করতে থাকি। যদিও ঘরে উপহার হিসাবে পাওয়া অনেক ডায়েরী জমে আছে। আর লেখার এই ধরণের অভ্যারে জন্যে, হাতে সব সময় ডায়েরী নিয়ে চলাফেরাও সম্ভব নয়।
যাইহোক, রোহিঙ্গার বিষয়ে যে কথা বলতে চেয়েছিলাম, গত বছরের আগস্টের শেষ সপ্তাহে মায়ানমার (বার্মা) সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্মম নির্যাতনের মুখে প্রাণ ভয়ে এবং অনেকটা বিতাড়িত হয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে থাকে। বাংলাদেশকেও বাধ্য হয়ে আশ্রয় দিতে হয়। কারণ সশস্র মায়ানমার সেনারা যেভাবে আক্রমণ ও নির্যাতন করেছে, তখন রোহিঙ্গাদের সামনে দুটো পথ ছিল। হয়ত অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ, নয়ত নির্মম নির্যাতনের সাথে মৃত্যুবরণ। শেষ পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ পথটা বেছে নেয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও সিমান্তরক্ষী বাহিনী যদি ঐ দেশের সেনাবাহিনীর অনুরূপ অনুপ্রবেশ প্রতিহত করার চেষ্টা করত, তাহলে নাফ নদীর পানি লাল রক্তের জোয়ার বয়ে যেত। এমন কি মায়ানমার-বাংলাদেশ যুদ্ধের সম্ভাবনাও দেখা দিত।
বর্তমানে ১২ লাখের উপর রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় প্রায় দুই লক্ষ নারী সন্তান সম্ভবা ছিল। এরপরেও ৬+ স্কুল গমনোপযোগি সন্তান ইউনিসেফের হিসাব মতে প্রায় তিন লক্ষ। এখন তিন লক্ষ শিশুকে কিভাবে শিক্ষা দেয়া যায়, সেই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। যেখানে বাংলাদেশ এতগুলো শরণার্থীকে অন্ন বস্ত্র বাসস্থান (অস্থায়ী) দিয়ে মানবতার পরিচয় দিতে পেরেছে, সেখানে শিক্ষা দেয়া নিশ্চয় কোন সমস্যা নয়। এদিকে বাংলাদেশ সরকার ও ইউনিসেফ, এর মধ্যে উদ্যোগও নিয়েছে; তবে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাধ্যম। অর্থাৎ কোন ভাষার মাধ্যমে তাদের শিক্ষা দেয়া হবে, বার্মিজ ভাষার মাধ্যমে নাকি বাংলা ভাষার মাধ্যমে। ইউনিসেফ বাংলা ও বার্মিজ দুই ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দিতে চাই। কিন্তু বাংলাদেশ স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাভাষা শিক্ষাদানে আপত্তি জানাচ্ছে।
উল্লেখ্য এরই মধ্যে বেশ কিছু এনজিও বাংলা মাধ্যমে শিক্ষাদান প্রক্রিয়া চালালে সরকার ঐ সকল এনজিও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। বর্তমানে ইউনিসেফ কক্সবাজারে অস্থায়ী রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলোতে শিশুদের জন্যে ১৮০ টির অধিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করে প্রায় ১৫ হাজার শিশুকে বিচ্ছিন্নভাবে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। আগামী বছর প্রথম থেকে আরো ১৩ শত স্কুল প্রতিষ্ঠা করে ২ লাখ শিশুকে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা দিতে কার্যক্রম গ্রহণ করেছে ইউনিসেফ। তবে তাদের বাংলা ও বার্মিজ দুই ভাষায় শিক্ষায় দানে আগ্রহ থেকেই গেছে। এই অবস্থায় আমাদের অবস্থাও শাকের করাত। অর্থাৎ আমরা পড়ে গেছি উভয় সংকটে। কারণ যদি বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা দেয়া হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী অন্যভাবে নিতে পারে। তাদের ভাবনায় আসতে পারে- বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিকত্ব দেয়ার চিন্তা রয়েছে। তাই ভবিষ্যৎ কথা চিন্তা বা বিবেচনা করে বাংলাভাষায় শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। এতে করে রোহিঙ্গাদের সেদেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা শৈথিল্যতা দেখা দিতে পারে। একই ভাবে মায়ানমারও, বাঙ্গালী শিক্ষা সংস্কৃতি গ্রহণ করা রোহিঙ্গা শিশুদের ফিরিয়ে নিতে গরীমসি করবে। এখনো যদিও অনেকটা তারা (মায়ানমার সরকার) রোহিঙ্গাদের সেই দেশের নাগরিক হিসাবে স্বীকার করেনা।
অন্যদিকে বার্মিজভাষায় শিক্ষা দিলে তারা যদি অবশেষে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশে থাকতে হয়, তাহলে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি এদেশে বিস্তার লাভ করবে। শুধু তাই নয়, সামগ্রিকভাবে পুরো দেশে সকলক্ষেত্রে এর ঋণাত্বক প্রভাব পড়বে। আবার ইউনিসেফের পরামর্শ গ্রহণ করতে হলে বাংলা এবং বার্মিজ এই দুই ভাষায় পাঠ্যপুস্তুক প্রস্তুতকরণ, উপকরণ ব্যবস্থাকরণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ ব্যাপক মহাযজ্ঞ আদৌ সম্ভব কিনা সেটাও ভাবতে হচ্ছে। এই হলো রোহিঙ্গা শিশুর শিক্ষার ভবিষ্যৎ। এখানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আর্তসামাজিক চিত্র সার্বিকভাবে দৃশ্যমান হলেও, তাদের শিশুদের শিক্ষা বিষয় যদিও বিশেষভাবে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না, তবে এই বিষয়ে জটিলতাও কিন্তু কম নয়।