আইসিসির তদন্ত

রোহিঙ্গা নিধনের জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে

6

অবশেষে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী রোহিঙ্গাদের উপর দেশটির সামরিক বাহিনীর বর্বর হামলা ও গণহত্যার অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। এ নিয়ে মিয়ানমার সরকারের কোন কূটকৌশলে আর চিঁড়া ভিজবে বলে মনে হয় না। সম্প্রতি দেশটির সরকার আইসিসির বিচার নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তাতে দমবার নয়। মিয়ানমার হেগভিত্তিক আইসিসির সদস্য না হলেও দেশটিতে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্তের এখতিয়ার এ আদালতের রয়েছে বলে দুই সপ্তাহ আগে রুল জারি করেছেন বিচারকরা। এর পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলা হয়েছে- বাংলাদেশ আইসিসির সদস্য হওয়ায় এ ধরনের উদ্যোগে আইনি কোনো বাধা নেই। বস্তুত এমন সিদ্ধান্তের পরই এ তদন্ত শুরু হল। আমরা আইসিসির এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। আইসিসির এ তদন্তের পথ ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পথ খুলতে পারে বলে আমরা মনে করি। জানা গেছে, আইসিসির প্রাথমিক এ তদন্তের পর একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত হবে। মূলত এরপরই অপরাধীদের অভিযুক্ত করা হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এমন অপরাধ করেছে, যার গভীরতা পরিমাপ করা সত্যিই কঠিন। কাজেই পাশবিক ও নৃশংস এ গণহত্যার জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা জরুরি। অন্যদিকে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদনেও রাখাইনে গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে অভিযুক্ত করে দেশটির শীর্ষ জেনারেলদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনটি গত মঙ্গলবার জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের চলমান অধিবেশনে প্রকাশ করা হয়। ৪৪৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটিতে রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর ওপর দেশটির প্রভাবশালী সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। রাখাইন থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়ন, হত্যা ও ধর্ষণসহ সব অপকর্মের নাটেরগুরু যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট উঠে এসেছে। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে দশকের পর দশক ধরে শাসনক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে সেনাবাহিনী। ২০১৫ সালে একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আংশিক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানকার পার্লামেন্টের এক-চতুর্থাংশ আসন এখনও সেনা দখলে। তাছাড়া মন্ত্রিসভার তিন সদস্যও সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা নামক মুসলিম জাতিসত্তার ধ্বংস ও বিতাড়নের অভিপ্রায় থেকেই নির্বিচারে হত্যা ও ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটেছে। মিয়ানমারের সেনা চৌকিতে তথাকথিত বিচ্ছিন্নতাবাদীর হামলার অভিযোগ এনে আইন প্রয়োগের নামে ভয়ংকর এসব অপরাধ সংঘটনের জন্য মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংসহ জ্যেষ্ঠ পাঁচ জেনারেলকে বিচারের মুখোমুখি করার যে সুপারিশ করেছে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন, তা যথার্থই মনে করি আমরা। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর যা ঘটেছে, তা যে গণহত্যা- জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ঘরের ভেতর আটকে রেখে আগুন দেয়া হয়েছে। খুব কাছ থেকে গ্রেনেড হামলা ও গুলি করে তাদের হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর সু চির সাথে দেখা করে রোহিঙ্গা নিধনের জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার কথা জানিয়ে এসেছেন। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য রওনা হয়েছেন। আশা করা হচ্ছে জাতিসংঘে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে তাঁর ভূমিকা আরো জোরালো হবে। যেহেতু মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ক্ষুদ্র গোষ্ঠী রোহিঙ্গা সংকট বেশ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নে উপায় না পেয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে দশ লাখের অধিক রোহিঙ্গা। বাংলাদেশ সরকার সার্বিক সহযোগিতা শরণার্থীদের জন্য দিয়ে আসলেও বলতে দ্বিধা নেই যে, তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছে। যা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব সরেজমিনে দেখে গেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ জাতিসংঘের অনুসন্ধানেও রোহিঙ্গা নিপীড়নের প্রমাণ মিলেছে। তাদের ওপর যে নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা ও ধর্ষণসহ অন্যান্য পৈশাচিক ঘটনা ঘটানো হয়েছে, যা রুয়ান্ডার গণহত্যার সঙ্গে তুলনীয় বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মনে করছেন। কাজেই এ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের কুশীলবদের বিচারের সম্মুখীন করার বিকল্প নেই।