রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশের জন্য বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে

7

কাজি রশিদ উদ্দিন

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান শেষ পর্যন্ত হবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের কারণ আছে। বাংলাদেশের মত ঘন বসতিপূর্ণ এলাকায় মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত হয়ে বিতাড়িত প্রায় ১২ লক্ষ রোহিঙ্গা শেষ পর্যন্ত কি আমাদের গলার কাটা হয়ে দাঁড়াবে ?
ইতিমধ্যে খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে মনে হয় এরা এখানে ক্রমশ উগ্রবাদি হয়ে উঠছে। কক্সবাজার এ তাদের ক্যাম্পে নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে ৮ জন নিহত হয়েছে বলে পত্রিকায় খবর বেড়িয়েছে। গোলাগুলির এই অস্ত্র তারা কিভাবে কোথায় পায় সেটি একটি বিরাট প্রশ্ন !
মোদ্দা কথা হলো করোনা ভাইরাস ও ক্রমবদ্ধমান নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের ইস্যুগুলির কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুটি ক্রমশ ধামাচাপা হয়ে গিয়েছে বলে মনে হয়। তবে রোহিঙ্গা সমস্যা খুব সম্ভবত বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে কিনা তা এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বয়ং আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবদুল মোমেনকে বলতে শোনা গেল যে মিয়ানমার সরকার কথা দিয়ে কথা রাখে না। কথা হলো বাংলাদেশের ক‚টনীতি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সমর্থ হয় নাই যদিও জাতিসংঘ সহ ফ্রটে যারা আছেন তাদের প্রচেষ্টার অন্ত নাই।
উল্লেখযোগ্য যে ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের মুসলিম রোহিঙ্গাদের সে দেশের সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর যৌথ কমান্ড হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে এবং বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করে তাড়িয়ে দেয়। মিয়ানমারের লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে মানবিক কারণে আশ্রয় লাভ করে তখন। এ জন্য বাংলাদেশ সরকার ভিন্ন দেশ থেকে প্রশংসা পায়। আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন কর্তৃক আয়োজিত ২৫ আগস্ট বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা ‘জেনোসাইড দিবস’ পালন করে থাকে। এদিকে, মিয়ানমার সরকার ক‚টনৈতিক চালে সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১৮ সালের জুনে বেইজিংয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রী, মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মিলিত হয়েছিলেন। তখন সিদ্ধান্ত হয় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করবে এবং এই সমস্যার লিখিতভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সভাপতিকে লিখিতভাবে জানান ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে। ২৮ সেপ্টেম্বর চীন সরকার ভেটো প্রদান করে। যাতে কোনো কমিটি গঠন করা না হয়। সে কমিটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরে তারা হিউম্যান রাইটস ধ্বংস করছে এবং জেনোসাইড করেছে কিনা, তা পরীক্ষা করবে, সে কমিটি গঠন করতে দেয়া হয়নি। বেইজিংয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। উভয় সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করবে বন্ধুত্বের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, যুক্ত ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করবে রোডম্যাপ তৈরি করতে এবং রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর সময় ঠিক করা হবে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকার এক চুক্তি করে।
অভিযোগ এই চুক্তি মিয়ানমার সরকারের স্বার্থ অনুযায়ী হয়েছে। ওই চুক্তি ১৯৯৩ সালের চুক্তি অনুযায়ী করা হয়। অথচ ১৯৮০ সালের চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। মিয়ানমারের তদানিন্তন সরকার প্রধান জেনারেল লে উইন ১৯৮২ সালে নতুন নাগরিক আইন চালু করেন। ওই আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। অন্য দিকে, জাতিসংঘ হাই কমিশন ফর রিফুজি অভিযোগ করে। ওই চুক্তিতে জাতিসংঘ হিউম্যান রাইটস সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ রিফুজি সংক্রান্ত সংস্থা জাতিসংঘের। লক্ষনীয় ব্যাপার হলো মিয়ানমার সরকার অন্য দিকে জাতিসংঘের হাই কমিশন ফর রিফুজি সংস্থার সাথে চুক্তি করেছিল ২০১৮ সালের ৬ জুন, ওই চুক্তিতে উল্লেখ ছিল যে, এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। যাতে করে রোহিঙ্গারা মর্যাদার সাথে রাখাইন স্টেটে ফিরে যাবে এবং তাদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা, চলাফেরার স্বাধীনতা এবং নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া মিয়ানমার সরকার আরো একটি চুক্তি করেছে জাতিসংঘের উন্নয়ন এজেন্সির সাথে বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ হাইকমিশন ফর রিফুজি মিয়ানমার সরকারের সাথে যে চুক্তি করেছিল, সেগুলো চুক্তিতে লিপিবদ্ধ করেনি।
চট্টগ্রাম থেকে কালাদান সংবাদ সংস্থা জানিয়েছিল, ২০১২ সালে রাখাইন মায়ু পাহাড় রেঞ্জ মিলিটারি ইনফ্রাস্টাকচার তৈরি করা হয়। এ ছাড়া মাছ ধরার বোট সব বাজেয়াপ্ত করা হয়। নাফ নদীতে তাদের নেভিবোট পাহারা দিত ২৪ ঘণ্ট। সুতরাং জঙ্গি বাহিনী মিয়ানমারের পুলিশ পোস্ট আক্রমণ মিথ্যা কথা। একটা অজুহাত দাঁড় করিয়েছিল মিয়ানমার সরকার।
এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ করার কারণ দাঁড় করিয়েছিল। সুতরাং ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট তাদের পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণের বিষয়টি মিথ্যা অজুহাত ছিল।
অথচ রোহিঙ্গারা যুগ যুগ ধরে রাখাইন স্টেটে বাস করছে। মিয়ানমার সরকার আরাকানের নাম পরিবর্তন করে রাখাইন স্টেট রাখে ১৯৮৯ সালে। রাখাইন স্টেটের এক দিকে চিন স্টেট, উত্তর দিকে বাগো রিজিওন। ইরাবাদি রিজিওন পূর্ব দিকে। বে অব বেঙ্গল পশ্চিম দিকে এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ডিভিশন উত্তর দিকে অবস্থিত। এই হলো রাখাইন স্টেটের সীমানা (সুত্র গেøাবেল টাইমস) ও (আল জাজিরা) রোহিঙ্গারা আরব, মোগল, পারস্য ও বাঙালি মুসলিম জাতি।
ফারসি ভাষা রাখাইন স্টেটের কোর্টের ভাষা ছিল ১৮ শতাব্দী পর্যন্ত। রাখাইন স্টেটে বৌদ্ধরাও রোহিঙ্গা মুসলিম যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছে। অথচ মিয়ানমারের সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল থেইন সেইন ইউনাইটেড নেশন হাইকমিশনার ফর রিফুজি। অ্যান্তেনিও গুতেরেসকে ১২ জুলাই ২০১২ সালে বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোন দেশে পাঠাতে অথবা ইউনাইটেড নেশান হাই কমিশন ফর রিফুজি তাদের দেখাশুনা করবে। অথচ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, রোহিঙ্গাদের তার দেশে ফেরত নেবেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর দুই দিনের শুভেচ্ছা সফরে মিয়ানমার গিয়েছিলেন। সাথে ছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাক্তার দীপু মনি।
এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার ১৯৫১ সালের স্ট্যটাস অব রিফুজি সংক্রান্ত ইউনাইটেড নেশন কনভেনশন অথবা ১৯৬৭ সালে স্ট্যাটাস অব রিফুজি সংক্রান্ত প্রটোকলে সই করেনি। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা রিফুজি গ্রহণ করেছে কিন্তু বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক কোভেনান্ট ও কনভেনসনে সই করেছে।
এতদসত্তে¡ও বাংলাদেশের ওপর গুরুতর অর্থনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমÐলে প্রভাব পড়বে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তা ছাড়া আইন ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে বিপর্যয় আনতে পারে। ২০১২ সালে গুতেরেস জাতিসংঘের হাই কমিশনার ফর রিফুজি ছিলেন। বর্তমানে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল। সুতরাং অতীব গুরুত্বপূর্ণ এ ব্যাপারে তাঁর অনেক দায়িত্ব। জাতিসংঘের উচিত এই মানবিক সমস্যার আশু সমাধানের উদ্যোগ নেয়া।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট