রোহিঙ্গাদের মাঝে নেই ঈদ উৎসবের আমেজ

উখিয়া প্রতিনিধি

34

সামনে বর্ষা, বিজলী-বাদলের দিন, যেকোন মুহুর্তে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দিয়ে লন্ডভন্ড করে দিতে পারে ঘরবাড়ি। এমন পরিস্থিতিতে ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী ও পরিজন নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব। ছেলে, মেয়েদের আহার কোথা থেকে জোগাড় করব। শত প্রতিকূল অবস্থাতেও কোন রকম সেহরি খেয়ে রোজা রাখছি। তবে এ মুহুর্তে ঈদুল ফিতরের উৎসব নিয়ে কোন চিন্তা ভাবনা নেই।
গতকাল সোমবার উখিয়ার কুতুপালং, লম্বাশিয়া, মধুরছড়া ক্যাম্প ঘুরে বেশ কয়েজন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু সাথে আলাপকালে তারা এভাবে আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
গত বছর ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনা, বিজিপি ও উগ্রপন্থি রাখাইন জনগোষ্টীর নির্বিচারে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগে মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেতে দলে দলে রোহিঙ্গারা ছুটে আসেন বাংলাদেশে।
আশ্রিত হলেও গত বছর এখানে ঈদুল আজহার আনন্দ অনুভব করতে পেরেছে দাবি করে রোহিঙ্গা নেতা আবু তাহের জানান, রোহিঙ্গারা এদেশে এসে যেভাবে কোরবানি দিয়েছে মিয়ানমারের সেভাবে কোরবানির উৎসব করতে পারেনি।
আর ক’দিন পর রমজানের ঈদ। এবারের এ উৎসব রোহিঙ্গারা কীভাবে উদ্যাপন করবেন জানতে চাইলে কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্পের হতদরিদ্র হামিদ হোসেন ও তার স্ত্রী শহর বানু বলেন, এক বেলা খেলে আরেক বেলার চিন্তা করতে হয়। এমন অবস্থায় ঈদের কথা ভাবতেই পারছি না।
পাশে আরেকটি পরিবারের ছেলে, মেয়েরা কান্না করছিল। ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা রান্না করছেন। বাবা চিন্তায় মগ্ন। পরিবার প্রধান শহর মুল্লক বলেন, হাতে একটি টাকাও নেই। নিয়মের বাইরে কাজ করার সুযোগ নেই। ছেলে, মেয়েরা বায়না ধরছে ঈদের জামা-কাপড় কিনে দেওয়ার জন্য।
এভাবে আরো অসংখ্য পরিবারে অভাব-অনটনসহ বিভিন্ন দুর্বিসহ যন্ত্রণার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠতে দেখা গেছে।
লম্বাশিয়া গ্রামে একটি বাড়িতে কান্না শুনতে পেয়ে গিয়ে দেখা যায়, অবস্থা দেখতে উঠে আসে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা।
বিধবা মরিয়ম খাতুন (২২) জানান, তিনি ছিলেন সন্তান সম্ভবা। ওই সময় মিয়ানমার সেনারা তার স্বামীকে চোখের সামনে গুলি করে হত্যা করেছে। মা-বাবা বেঁচে নেই। পিতৃহীন সন্তানের বয়স মাত্র দেড় মাস। এ শিশুকে লালন পালন করা কোন উৎস তার কাছে নেই। কীভাবে এ ছেলেকে বাঁচাবো এসব কথা বলে মরিয়ম কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এভাবে প্রতিটি ক্যাম্পে কারো না কারো বাড়িতে স্বজনহারাদের আহাজারী ও তাদের পারিবারিক জীবনের অমানিশার অন্ধকার। নেই ঈদ উৎসবের কোন আমেজ।
রোহিঙ্গা নেতা লালু মাঝি জানান, পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সরকার ও বিভিন্ন এনজিও সংস্থা পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী, ইফতার ও সেহরির খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করছে। ঈদ উৎযাপনে পোশাকসহ শিশুদের নানা প্রকার খেলনা, কাপড় সরবরাহ করছে। এরপরও রোহিঙ্গাদের মাঝে নেই আনন্দ।
ওই রোহিঙ্গা নেতা আশ্রিত রোহিঙ্গাদের উদ্বৃতি দিয়ে বলেন, পরদেশে ঈদ আনন্দ যতই মধুর হোক না কেন, নিজ মাতৃভূমির স্বাদ কেউ পাবে না। তাই রোহিঙ্গাদের মাঝে ঈদুল ফিতরের আনন্দ নেই বললে চলে।