শাহজাহান শাহ (র.)

রূহানী জাগরণের প্রতিভূ

মুহাম্মদ ওহীদুল আলম

60

আল্লাহ তায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রিয়তম প্রতিনিধি, রহমাতুল্লিল আ’লামীন, মানবতার অগ্রদূত, হযরত রাসূলে করিম (সা.) জীবন সায়াহ্নে এসে বিদায় হজের দিনে আরাফাতের ময়দানে সমবেত লক্ষাধিক মুসলিম জনমণ্ডলীর উদ্দেশ্যে এক কালজয়ী ভাষণ দিয়েছিলেন। পবিত্র সে ভাষণে শুধু মুসলিম নয় সমগ্র মানবজাতির মুক্তির দিশা নির্দেশিত হয়েছিল। অনতিদীর্ঘ সে ভাষণের উপসংহার টেনেছিলেন তিনি এভাবে তোমরা যারা এখানে উপস্থিত আছো তারা, যারা অনুপস্থিত আছে তাদের কাছে আমার এসব বাণী পৌঁছে দেবে। অনেক সময় দেখা যায়, অনুপস্থিতরাই উপস্থিতদের চাইতে উপদেশ দ্বারা বেশি উপকৃত হয়।
প্রাথমিক যুগের সে সৌভাগ্যবান মুসলমানরা হুজুর করিম (সা.) এর আদেশ নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। আরাফাতের সে সমাবেশ থেকে তখনই হাজার হাজার মুসলিম দেশ বিদেশে আল্লাহর রাসূলের বাণী নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা নিজেদের সাধ্যমত পৃথিবীর আনাচে কানাচে ইসলামের বাণী ও শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ইসলাম প্রচারের এ ধারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চালু রয়েছে। কখনো সে ধারা স্থিমিত হয়েছে কখনো বেগবান। অনেকেই বিশ্বাস ও প্রচার করেন যে, ইসলাম তরবারির জোরে প্রচারিত হয়েছে। অথচ প্রকৃত সত্য এই যে, ইসলাম প্রচারের সূচনালগ্ন থেকে বৈরি শক্তির তলোয়ারই সবসময় ইসলাম ও মুসলমানদের ঘাড়ের ওপর সার্বক্ষণিকভাবে ঝুলেছিল।কিন্তু ইতিহাসের সচেতন ও নিরপেক্ষ পাঠক মাত্রই জানেন, তলোয়ারের মাধ্যমে ইসলামের প্রচারের এ অপবাদ নির্জলা মিথ্যা।
প্রাথমিক যুগের সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়িনরা ইসলামের প্রচার-প্রসারে দেশ-বিদেশেষ ছড়িয়ে পড়েছিলেন। আল্লাহর মহান অলিরাও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। তাঁদের অনেকেই স্বীয় মাতৃভ‚মি ত্যাগ করে অজানা অচেনা জনপদের উদ্দেশে ভ্রমণ করেছেন শুধু মানুষের মাঝে আল্লাহর বাণীকে পৌঁছে দেয়ার জন্য। এজন্য তাঁরা স্বেচ্ছায় বাস্তুহারা হয়েছেন, বিপদসঙ্কুল পথে পদচারণা করেছেন। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুর্ভোগ দুর্ভাবনার কোনো পরোয়া করেননি। তাঁরা শিখিয়েছিলেন, মানুষে মানুষে আশরাফ আতরাফ নেই, কেউ স্লেচ্ছ, কেউ অস্পৃশ্য নয়। সব মানুষ এক আল্লাহর বান্দাহ, সব মানুষ একই আদি মা বাবার (হযরত আদম ও হাওয়া আলায়হিস সালাম) সন্তান।
ইতিহাস পাঠ ও জনশ্রতিতে জানা যায় আরব ভূখণ্ড থেকে এ রকম অসংখ্য অলি বুজুর্গ আমাদের প্রিয় মাতভূমি বাংলাদেশে আগমণ করেছিলেন। তেমনি একজন প্রথিতযশা অলি আল্লাহ হচ্ছেন হযরত শাহজাহান শাহ (রহ.)। তাঁকে চট্টগ্রামের বারো আউলিয়াদের একজন মনে করা হয়। জনশ্রতি রয়েছে, তাঁর জন্ম হয়েছিল ইয়েমেনে খ্রিস্টীয় ১৫শ শতাব্দীতে। স্থল ও জলপথের অনেক কষ্টকর পথপরিক্রমার পর লাহোর দিল্লি গৌড় হয়ে তিনি চট্টগ্রাম আসেন। নদীপথে তিনি প্রথমে পৌঁছেন সাতকানিয়ায়। কথিত আছে তখন তাঁর হাতে একটা লাঠি ছিল। তিনি সে লাঠি মাটিতে স্থাপন করে প্রথমে উচ্চারণ করেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। তাঁর উচ্চারিত কলেমার সূত্র ধরে সে জায়গাটির নাম হয়ে পড়ে ‘ইল্লা’। তা ছিল এক অজপাড়া গ্রাম। লোকমুখে ছড়াতে ছড়াতে সে গ্রামের নাম ‘ইল্লা’ নামে স্থায়ী হয়ে যায়। মনে হয় তখনকার দিনে অপরিচিত ভাষার কলেমার যে শব্দটা স্থানীয় লোকদের কানে বেশি ধরা পড়েছিল সেটিই পরবর্তীতে চারদিকে চাউর হয়ে পড়েছিল। ইল্লা গ্রামটা এখনো তাঁর স্মৃতি হয়ে বিদ্যমান আছে। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে তিনি বর্তমান হাটহাজারী উপজেলার ধলই গ্রামে উপস্থিত হন। এখানেই তিনি স্থায়ী আস্তানা গড়ে তোলেন। হযরত শাহজাহান শাহ (র.) স্থানীয় লোকজনের কাছে ফকির নামেই পরিচিত এবং সেখানে তাকিয়া নির্মাণ করেন। জায়গাটা নাম হয় ফকিরের তাকিয়া। কিন্তু লোকমুখে বারংবার উচ্চারিত হতে হতে ফকিরের তাকিয়া ‘ফইরের টাইক্কা’য় পরিণত হয়। চট্টগ্রামে এরকম নামের বিকৃতি দুর্লভ নয়। যে এলাকায় এ তাকিয়া নির্মিত হয়েছিল তা সাধারণত ‘কোড়ের পাড়’ নামে অভিহিত ছিল। এ কোড়ের পাড়েই একটা বটগাছের নিচে গায়ে একটা কাঁথা জড়িয়ে হযরত শাহজাহান শাহ (র.) শুয়ে থাকতেন। স্থানটা ছিল নির্জন ও জঙ্গলাকীর্ণ। লোকজন চলার পথে এ স্থানটাকে এড়িয়ে যেতো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ছিল জঙ্গলের কিছু বাঘ তাঁকে ঘিরে বসে থাকত। এ বাঘগুলো ছিল যেন তাঁর মেহমান, সাথী ও পাহারাদার। তারা মানুষের কোনো ক্ষতি করতো না। এ ঘটনা ছিল মানুষের কাছে খুবই বিস্ময়কর। বনের হিংস্র পশু মানুষের আনুগত্য করে এ দৃশ্য ছিল মানুষের অভিনব অভিজ্ঞতার অংশ। তারা সময়ের প্রবাহে বুঝতে শিখেছে এটা আল্লাহর অলিদের কেরামত। এটা প্রকৃতির সাধারণ ও প্রচলিত নিয়মের ব্যতিক্রম। এটা আল্লাহর কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। মানুষ ফিতরত তথা প্রকৃতিকেই চিনতে অভ্যস্ত। কিন্তু ফিতরতকে পরিচালনা করে যে শক্তি সে শক্তির নাম কুদরত। শুধু ফিতরত চর্চা করে মানুষ আসল সত্যের খোঁজ পায় না। ফিতরত বস্তুকে উপস্থাপন করে। কুদরত প্রকাশ করে বস্তুর হাকীকত। শুধুমাত্র ফিতরতের চর্চা করলে মানুষ ক্লান্ত হতে বাধ্য। আল্লাহর অলিরা কুদরতের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘোরেন। ফলে প্রকৃতি তাঁদের দাসত্ব করে।
মানুষ স্বীয় প্রকৃতিকে জয় করে যখন কুদরতের অভিমুখী হয় তখন তার কাছে জীবন ও জগতের সকল রহস্যের দুয়ার খুলে যায়। তখনই সে বলতে পারে: নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও মরণ সবকিছু মহান রব্বুল আ’লামীনের উদ্দেশ্যে নিবেদিত।
বনের হিংস্র পশুকে বশীভ‚ত করে হযরত শাহজাহান শাহ (রহ.) মানুষকে নিজেদের পশুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণের সবক দিয়েছেন। মানুষ যদি নিজেকে সৃষ্টির সেরা প্রমাণ করতে চায় তাহলে অবশ্যই প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণাধীন না হয়ে বরং প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার শিক্ষা রপ্ত করতে হবে। আজকাল পৃথিবীতে মানবসমাজে যে উৎপাত উচছৃংখলা বর্বরতা ও অমানবিকতার সয়লাব বয়ে চলছে তার পেছনে মানুষের প্রবৃত্তির প্ররোচণা সতত ক্রিয়াশীল। মানুষ মান্য করছে প্রবৃত্তির নির্দেশকে, সে উপেক্ষা করছে বিবেকের তাগিদকে। সে শক্তিবলে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। ফলে দুর্বলের আর্তনাদ বাড়ছে। প্রবৃত্তি-প্ররোচিত মানুষের এ প্রবল শক্তি মানবজাতির কল্যাণধারাকে নিশ্চিত না করে মানবজাতির অস্তিত্বকে সংকটে নিক্ষেপ করেছে। মানুষের শক্তিমত্তা ক্রমশই নির্যাতনমূলক শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। নির্যাতনমূলক শক্তির মোকাবিলা করা মানবজাতির প্রধান সমস্যা হয়ে ওঠেছে।
আল্লাহর অলিদের মাধ্যমে সূচিত জনকল্যাণের ধারা যে কখনো বিলুপ্ত হয় না তার সাক্ষাৎ উদাহরণ হযরত শাহজাহান শাহ (র.)। ৫০০ বছরেরও বেশি পূর্বে তিনি মানুষের মাঝে বিচরণ করেছিলেন। আজ ধলই গ্রামে তাঁরই বিশ্রামস্থল ঘিরে গড়ে উঠেছে মানব সেবার এক জমজমাট আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। স্থানীয় জনসাধারণের ধর্মীয়, সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারে তাঁর মাজারকে ঘিরে এক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে এক যুগ আগ থেকে। দারিদ্র বিমোচন ও চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত আছে মাজার পরিচালনা কমিটি। মসজিদ মাদ্রাসা হিফজখানা পরিচালনার মাধ্যমে জিকির ও ইবাদতের এক জাগ্রত কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে ধলই শাহী দরবার শরীফ। আমরা স্মরণ করতে পারি মুক্তিযুদ্ধের (১৯৭১) সময় হযরত শাহজাহান শাহ (র.) এর মাজার শরিফ পরিণত হয়েছিল দেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিকামী জনতার সার্বক্ষণিক প্রার্থনাস্থল। এলাকার স্থানীয় আলেম ওলামা, ছাত্র যুবক বয়স্ক লোকেরা এখানকার নিরাপদ পরিবেশে বসে সেই দুঃসময়ে আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করতেন জুলুমের অবসান ও মুক্তির আকাক্সক্ষায়।
এখনো প্রতিদিন দূর-দূরান্ত হতে অনেক সমস্যাগ্রস্ত মানুষ তাঁর রূহানী ফয়েজ লাভের আশায় এ দরবারে ছুটে আসেন। তাঁরা এখানে এসে ফাতিহা পাঠ, পবিত্র কুরআন তিলওয়াত, দরুদ শরিফ পেশ ও মিলাদ শরিফ আয়োজনের মাধ্যমে মহান আল্লাহর দরবারে বিনীত চিত্তে ফরিয়াদ জানান। পার্শ্বস্থ শাহী মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সাথে প্রায় সবসময় মুসল্লিদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা গমগম করতে থাকে। এখানে পৌঁছলেই মানুষ এক অনির্বচনীয় আধ্যাত্মিক স্বাদ ও মানসিক প্রশান্তি লাভ করে থাকে। প্রতি বছর ২০ মাঘ তাঁর বাৎসরিক ওরস উদ্যাপিত হয়ে থাকে।

লেখক : প্রাবন্ধিক