ধর্ষণ মামলা বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা

রায় বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ চাই

26

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনার পাশাপাশি নারী ধর্ষণের ঘটনা ও উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। এক্ষেত্রে অপরাধীদের গ্রেফতার ও বিচারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন থাকলেও দেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও পুলিশের নানা হয়রানি এবং মামলা নিতে অপারগতার কারণে ধর্ষিতা নারী ও তাদের পরিবার খুব একটা ন্যায় বিচার পায় না। উল্টো সমাজ ও প্রশাসন নারীকে হেয় প্রতিপন্ন করে ধর্ষক পুরুষকে বাঁচানোর জন্য নানা চলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে থাকে। এর ফলে একদিকে নারী সমাজকে অমর্যাদা ও অসম্মানিত করা হচ্ছে অপরদিকে অপরাধীরা মারাত্মক অপরাধ করেও পার পাওয়ার ফলে অনাচার ও ব্যভিচার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় মরণব্যাধি ক্যান্সারের ন্যায় ছড়িয়ে পড়া ধর্ষণের মত এ ব্যাধি দূর করতে গত রবিবার দেশের উচ্চ আদালত এক যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। হাইকোর্টের এ রায়ে বলা হয়েছে, সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যেকোনো থানায় মামলা করা যাবে। একইসাথে মামলা দায়েরের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভুক্তভোগীর ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট বাধ্যতামূলকভাবে পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানোসহ ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট।
ধর্ষণের মামলা দায়ের ও তদন্ত বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন না হওয়া পর্যন্ত এ নির্দেশনাগুলো মেনে চলতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্টসহ পাঁচটি সংগঠনের দায়ের করা হাইকোর্টে এক রিটের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি কাজী ইজারুল হক আকন্দের হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ উপরোক্ত আদেশ দেন। হাইকোর্টের নির্দেশনাগুলোয় উল্লেখিত আরও কিছু বিষয় গুরুত্বের দাবি রাখে। যেমন নির্দেশনায় বলা হয়েছে- ‘ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন বা এ সংক্রান্ত ঘটনায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ লিখিতভাবে রেকর্ড করবেন। এক্ষেত্রে ওই থানার আওতার মধ্যে ঘটনা সংঘটিত হোক বা না হোক, সেটা মুখ্য নয়। অবিলম্বে এমন একটি সার্ভার তৈরি করতে হবে যেন এ ধরনের অভিযোগ সরাসরি অনলাইনের মাধ্যমে করা যায়। রায়ে যেকোনো রিপোর্ট সংগ্রহ বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থার যেকোনো ব্যর্থতাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ বলে গণ্য করতে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে দ্রুত তদন্ত রিপোর্ট প্রস্তুত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি অভিযোগ গ্রহণে বিলম্ব করেন, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুনির্দিষ্ট বিধান থাকার কথাও বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, প্রতিটি থানায় কনস্টেবলের নিচে নয় এমন একজন নারী পুলিশ রাখতে হবে।
অভিযোগ পাওয়ার পর ডিউটি অফিসার একজন নারী কর্মকর্তার (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মাধ্যমে ও ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য, শুভাকাক্সক্ষী, সমাজকর্মী বা আইনজীবীর উপস্থিতিতে অভিযোগ রেকর্ড করবেন। সবক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর সব তথ্য সংরক্ষণে গোপনীয়তা রক্ষা করার নির্দেশনাসহ প্রতি থানায় ভুক্তভোগীদের জন্য সহযোগিতাপূর্ণ নারী সমাজকর্মীদের একটি তালিকা তৈরি রাখার কথাও বলা হয়েছে।
আমরা মনে করি, দেরিতে হলেও হাইকোর্টের এ রায় সমাজে ধর্ষণের মত মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত করার লাঘাম টেনে ধরবে। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও রায়কে আমরা যুগান্তকারী বলছি একারণে যে, ঘটনা সংঘটনের স্থান থানার আওতাভুক্ত কিনা সে প্রশ্ন তুলে মামলা নিতে গড়িমসি করে। শুধু তাই নয়, উল্টো ভুক্তভোগী নারীর ওপরই দোষ চাপাতে দেখা যায়। কোনো থানা মামলা নিলেও নানা কারণে অপরাধীর অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
এ ধরনের অপরাধের বিচারে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সামাজিক সমস্যা। ঘটনা গোপন রাখার জন্য অধিকাংশ নারী ঘটনার পর থানা-পুলিশের শরণাপন্ন হতে চান না। এসব দিক বিবেচনায় নিয়েই হাইকোর্ট অত্যন্ত যুগোপযোগী একটি রায় দিয়েছেন বলে মনে করি আমরা। রায়ের আরেক অংশে হাইকোর্টের রায়ের সুপারিশ, পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার আলোকে নীতিমালা তৈরি করতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের মহাপরিদর্শককে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। আমরা আশা করি সংশ্লিষ্টরা এ ব্যাপারে দ্রুত উদ্যোগ নেবেন।