রাহাত খান রচিত ভালোমন্দ মানুষ উপন্যাসের মানুষেরা

ড. ইয়াহ্ইয়া মান্নান

17

রাহাত খান (জন্ম. ১৯ ডিসেম্বর, ১৯৪০) খ্যাতিমান কথাশিল্পী। বাংলা ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনায় তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি অর্থনীতি ও দর্শন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করলেও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে (১৯৬১, ঢা.বি)। জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজ, ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজ, ঢাকা জগন্নাথ কলেজে এবং চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে প্রায় আট বছর শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে সম্পৃক্ত হন সাংবাদিকতা পেশায়। সাংবাদিকতা পেশায় চাকরির সুবাদে প্রায় অর্ধেক পৃথিবী পরিভ্রমণ করেছেন। তাঁর রচিত কথাসাহিত্যে বিশ্বভ্রমণের এসব অভিজ্ঞতা বিভিন্নভাবে চিত্রিত হয়েছে। তাঁর রচিত উপন্যাসগুলি হলো : ব-দ্বীপের ভবিষ্যৎ (১৯৮২), অমল ধবল চাকরি (১৯৮২), এক প্রিয়দর্শিনী (১৯৮২), হে অনন্তের পাখি (১৯৮৩), ছায়া দম্পতি (১৯৮৪), হে শূন্যতা (১৯৮৪), সংঘর্ষ (১৯৮৪), শহর (১৯৮৪), আকাক্সক্ষা (১৯৯৬), আমার সময় (২০০৫), ভালোমন্দ মানুষ (২০১০) ইত্যাদি। সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৩), সুহৃদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৫), সুফী মোতাহার হোসেন পুরস্কার (১৯৭৯), আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮০), হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮২), ত্রয়ী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮) ও একুশে পদক (১৯৯৬) অর্জন করেন।
ভালোমন্দ মানুষ উপন্যাসে রাহাত খান মানব-মানবীর প্রেম-প্রণয়, মানসিক দ্ব›দ্ব ও ভারতীয় উপমহাদেশের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস ও চোরাচালান চক্রের কর্মকান্ড বর্ণনার পাশাপশি ভালো ও মন্দ মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করেছেন। আলোচ্য উপন্যাসে তিন গুচ্ছ মানুষের জীবনপ্রণালী চিত্রিত হয়েছে। প্রথম গুচ্ছে কানিজ রেজা ও আবিদুর রেজা, দ্বিতীয় গুচ্ছে শাফাত আরা কুঞ্চি-মাহমুদ দম্পতি ও তাদের বন্ধু সাজ্জাদ, তৃতীয় গুচ্ছে ভারতীয় সন্ত্রাসী জয়নাল ওরফে জয়ন্ত, নলিনী ও আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও মিয়ানমার (বার্মা) এর আন্ডার ওয়ার্ল্ড তথা সন্ত্রাসী জগৎকেও লেখক এখানে চিত্রিত করেছেন।
উপন্যাসের প্রথম আখ্যানে বর্ডুত হয়েছে কানিজ রেজা ও আবিদুর রেজার জীবন-যাত্রা। কানিজ রেজার স্বামী আবিদুর রেজা। চিকিৎসকের পরামর্শে হাওয়া বদলে তারা ঢাকা থেকে কক্সবাজারে এসেছেন। মধ্য আগস্টের এই সময়ে কক্সবাজারে পর্যটকের ভীড় অনেক কম। হোটেল-মোটেলে থাকা-খাওয়ার খরচও কম। শীত সিজনের মত সি-বিচে ভীড় না হলেও লোকজন একেবারে কম নয়। তবে বিদেশীদের চেয়ে দেশী জনগণই বেশি। কানিজ রেজা গত পাঁচ দিন কক্সবাজারে এসে জয়নাল নামে এক যুবকের আকর্ষণে উদ্বেলিত। যদিও স্বামী আবিদুর রেজার সঙ্গেই থাকেন তিনি, তথাপি তার মন উচাটন। লেখক তার দেহের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-
কানিজ রেজার দেহের গড়ন পাতলা। তার বয়স ৪৪ বছর। তাকে ঢের কম বয়স বলে মনে হয়। সব সময় গোছগাছ হয়ে থাকেন। আজ পরেছেন তিনি সবুজ সিল্কের তিন প্রস্থ সালোয়ার-কামিজ। ব্রার কল্যাণে তার স্তন জোড়া উন্নত ও সুডোল দেখায়। চোখে পরে আছেন আচ্ছা কালো রঙের গগল্স। (পৃ.৮)
আবিদুর রেজা কানিজের চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। অর্থাৎ তার বয়স এখন (৪৪+৫)=৪৯ বছর। এই বয়সে ডায়াবেটিস, পুরনো ম্যালেরিয়া ও এসিডিটিতে আক্রান্ত তিনি। আর কানিজ ভোগেন মাইগ্রেনে। বিকাল বেলায় স্ত্রীকে সমুদ্র সৈকতে বসিয়ে রেখে হাঁটতে শুরু করেন আবিদ। আবিদের শরীরের বর্ণনায় লেখক বলেন- ‘তিনি গোলগাল দেখতে। গায়ের রঙ ফর্সা ছিল এককালে। মুখে মেছতা পড়ে রঙ নষ্ট হয়ে গেছে। জোরে হাঁটতে পারছিলেন না ইদানীং বাম পায়ে শক্তি একটু কম পাচ্ছেন বলে।’ (পৃ.৯) স্বামী আবিদের গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন কানিজ। বিকেলের লম্বা ছায়া পড়ে গেছে চারদিকে। তবে ঝাউবন, শহরের গাছপালা ও উঁচু বিল্ডিংয়ের উপর ধবধব করছে সোনালি রোদ। আজ হাওয়া খুব একটা নেই। সৈকতে বহু নর-নারী, শিশু ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কানিজ রেজার মনে হয় জয়নুল এখন আসতে পারতো। জয়নুল তাকে কী বলতে চায় এ সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকলেও তার ন¤্রতা ও ভদ্রতা তাকে মুগ্ধ করে। কানিজের রূপ যৌবন সে উপভোগ করে, এটি কানিজের ভাল লাগে। কানিজ মনে মনে ভাবে লোকটি এলে একা থাকতে হতো না। ঠিক সে সময়েই ছোট একটা শিশুর সাথে পরিচয় ঘটে তার। শিশুটির নাম ব্যাটম্যান বা বাদুড় সাহেব। ব্যাটম্যানের মা-বাবাও পাশেই ছিলেন। শিশুটির মা শাফাত আরা কুঞ্চি আর বাবা মাহমুদ নজীর। মাহমুদ নজীর কক্সবাজার সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিষয়ের শিক্ষক, আর শাফাত আরা কুঞ্চিও গার্লস কলেজের ম্যাডাম; কক্সবাজার শহরের জেবি (সরকারি) কলোনিতে তাদের বাসা। তাদের বাসায় যাওয়ার নিমন্ত্রণ জানিয়ে তারা চলে যাওয়ার কয়েক মিনিটের ভেতর হাজির হয় আবিদুর রেজা ও জয়নুল। কানিজ আবিদকে মাহমুদ ও কুঞ্চি জুটির কথা জানায়। তারা বিশ্ব প্রকাশনীর মালিক আবিদের নাম শুনেই চিনে ফেলে এবং আবিদের প্রশংসা করে- এতেই আকৃষ্ট হয়ে যায় কানিজ। স্বামীর প্রশংসা শুনতে মেয়েদের খুবই ভাল লাগে।
কানিজ ও আবিদের পাশে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের কিলিং স্কোয়াডের সদস্য জয়নুল ওরফে জয়ন্ত। সে দেরিতে আসায় তাকে একটু ভর্ৎসনাও শুনতে হয় কানিজের কাছে। সদ্য পাতানো বোনের ভর্ৎসনা তার ভাল লাগে। সে ক্ষমা চেয়ে নেয়-‘সরি আপা। আমাকে মাফ কইরা দিয়েন।(পৃ.১৩)
বিকালের লম্বা ছায়া এতক্ষণে দিগন্ত ও শহরের সব রোদ গ্রাস করে ফেলেছে। সাগর জলে ডুব দিয়ে সূর্য এখন অস্ত যেতে প্রস্তুত। চারদিকে ঘণায়মান সন্ধ্যার কালোছায়া। সাগর সৈকতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অধিকাংশ লোকজন এখন ডিমের পোচের মত দেখতে সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছে। যদিও ব্যবসায়ী আবিদের কাছে সেটা একঘেয়েমি ছাড়া কিছুই নয়। আবিদ বউকে নিয়ে সেই স্থান ত্যাগ করতে চাইলেও ‘সূর্যাস্ত’ না দেখে সে যাবে না বলে জানিয়ে দেয়। প্রয়োজনে আবিদকে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ানোর কথা বলে এবং সে ও জয়নুল একসঙ্গে যাবে বলেও জানায়। জয়নুলকে আপাত ভদ্র ছেলে মনে হলেও চার-পাঁচদিনের পরিচয়ে তেমন কিছু জানা সম্ভব নয়। অপরিচিত জনের কাছে নিজের বউকে ছেড়ে না দিয়ে অগত্যা তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন। অতঃপর সূর্যাস্তের শেষ দৃশ্য অবলোকন করে জয়নুলেরর হাত ধরে বালুময় সৈকতভূমি অতিক্রম করেন কানিজ রেজা। আবিদের দৃষ্টিতে এ দৃশ্য জঘণ্য লাগলেও কিছু বলতে পারেন না আধুনিকতার খোলসে। অতঃপর তারা একটি হোটেলে গিয়ে ডিনার করেন ও বিদায় নেন।
মাত্র চার-পাঁচ দিনের পরিচয়ে জয়নাল বা জয়নুল নামের যে তরুণের প্রেমে কানিজ রেজা হাবুডুবু খাচ্ছিলেন, সে প্রকৃতপক্ষে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী। আর সে মুসলিমও নয়। তার প্রকৃত নাম জয়ন্ত। জয়ন্ত থেকে জয়নাল বা জোসেফ। জয়ন্ত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ শহরের সত্যেন্দ্রনাথ দে ওরফে সতু কেরানির ছেলে। মাত্র চার বছর বয়সে সে তার মাকে হারায়। তারপর নিরূপমা মাসী তাকে কোলেপিঠে করে মানুষ করে। সেই মাসী জয়ন্তর মা। পরে তার বাবা এই মহিলাকে বিয়ে করে। জয়ন্তর সঙ্গে এখন তার বাবা সত্যেন্দ্রনাথ বা নিরূপমা মাসীর কোন সম্পর্ক নেই। সব সম্পর্ক চুকে গেছে। জয়ন্তর আন্ডারগ্রাউন্ড কানেকশনের কথা জানার পর বাবা কাগজে-কলমে তাকে ত্যাজ্যপুত্র করেছে। অথচ জয়ন্তর মা মারা যাওয়ার পর তার বাবা সত্যেন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন বাবা-মা দুই-ই। শৈশব- কৈশোরে তার বাবা কখনো তার গায়ে হাত তোলেননি। কত আদর-যতেœ তাকে বড় করে তুলেছিলেন, অথচ আজ ত্যাজ্য করেছেন বাঁচার তাগিদে। বাবার জন্য জয়ন্তর অনেক কষ্ট হয়। তবে করার কিছু নেই তার। ইচ্ছে করলেও আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই তার।
কক্সবাজারের এই পর্যটন নগরীতে তার অবস্থান মূলত আত্মগোপনের, লুকিয়ে জীবন বাঁচানোর। সে এখানে বসে বসে জুয়া খেলে আর অতীত স্মৃতিচারণে সময় অতিক্রম করে। মুর্শিদাবাদে সে খুব ভালভাবেই জীবন যাপন করছিল। বশিরহাটে সিপিএমের কনক বসুর খুনটাই বিপদ হয়ে যায় তার জন্য। হাইকমান্ডের নির্দেশেই সে বসুকে খুন করে। খুন শেষে সে সটকেও পড়ে ঠিকমত। বশিরহাট থেকে ১৭/১৮ মাইল দূর গোপালপুরে বৃন্দাবন আর সীতাংশুর ডেরায় দিনগুলো ভালই কাটছিল তার। কিন্তু হাইকমান্ড তাকে বললো বর্ডার পার হয়ে বাংলাদেশে চলে আসতে। বাংলাদেশে নানা ঘাঁটিতে তাদের মিত্ররা রয়েছে। জয়ন্তকে বলা হয় বাংলাদেশেও যদি অসুবিধা দেখা দেয়, তবে যেতে হবে টেকনাফ বর্ডার পার হয়ে মিয়ানমারে। বাংলাদেশে তাকে প্রথম রাখা হয় বগুড়ায়, পরে চাঁদপুর। সবশেষে কক্সবাজারে।
জয়নালের ধারণা ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ- সবজায়গায়ই আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়ার্ল্ড একটু বিপদ ও নড়চড়ের মধ্যে আছে এই সময়ে। এই তিন দেশে সর্বহারা এবং জঙ্গিরা ভেসে উঠেছে। পুলিশ এবং সেনাবাহিনী তৎপর এই তিন দেশের পয়েন্টে পয়েন্টে। সর্বহারা এবং জঙ্গির অনুসন্ধান করতে গিয়ে সন্ত্রাসী আন্ডারওয়ার্ল্ডের খোঁজ পেয়ে যাচ্ছে পুলিশ। স্মাগলিং এবং পাচার বাডুজ্য একটা বিরাট ধাক্কা খেয়েছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডও পড়েছে একটু বিপদে। জয়নালকে কক্সবাজারে থাকতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে আপাতত কোন বিপদ বা ঝামেলা নেই। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ক্ষমতাবানদের একটা সমঝোতা হয়ে গেছে। তবু সাবধানের মার নেই। জয়নালকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে যে কোন দিন বর্ডার ক্রস করে মিয়ানমারে যেতে হতে পারে।
জয়ন্তর খুনের হাতেখড়ি নলিনীর প্রেমিক যোগেশকে দিয়ে। নলিনী তার প্রেমিক ছিল। জয়ন্তর চেয়ে বয়সে অনেকটা বড় ছিল মহিলাটি। সে গোপনে হেরোইন পাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। জয়ন্ত তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে অশ্বিনী স্কুলের মাঠে খেলতে যেত। নলিনী চুল বেঁধে, সেজেগুজে বসে থাকত বাড়ির সামনে। প্রায়ই জয়ন্তকে ডেকে আদর করে নাস্তা খাওয়াতো, টাকা দিত। এভাবেই জয়ন্তকে হাত করে সে। এরপর জয়ন্তকে দিয়ে হেরোইন ও গাঁজার চালান বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতো এবং তাকে যথেষ্ট পরিমাণে টাকা দিত। জয়ন্ত তখন কলেজে দ্বাদশ শ্রেডুর শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্যটা ভালো। গাট্টাগোট্টা শরীর। খেলাধুলায় প্রাইজ পায়।
এই জয়ন্তই দেখে পুলিশ নলিনীর বাড়ি যায়, নাস্তা খায় আর সেলামির টাকা নিয়ে হাসিমুখে বেরিয়ে যায়। নলিনী তাকে বুঝাতে সক্ষম হয়-টাকা ছাড়া দুনিয়া অচল। টাকাই এই ভবজগতে আসল ভগবান। যার টাকা আছে তার ইহকাল-পরকাল দুই-ই আছে। নলিনী সেদিন এরকম শিখিয়েছিল জয়ন্তকে। মুগ্ধ হয়ে শুনেছিল জয়ন্ত। তার তখন অভাবের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। সংসারে টানাটানি কাকে বলে তা সে হাড়ে হাড়ে বুঝতে শিখেছে। টাকা প্রসঙ্গে নলিনীর বক্তব্যটায় মুগ্ধ হয়ে যায় সে। নলিনী তাকে টাকার নেশা ধরিয়েছিল। আর ধরিয়েছিল মেয়ে মানুষের শরীরের নেশা। সেই মেয়ে মানুষটা আর কেউ নয়, নলিনী নিজেই। লেখকের ভাষায়
এক দুপুরে নলিনী বলে : জয়ন্ত আয় একটু গল্প করি।
বিছানায় গিয়ে শোয় তারা দু’জন। নলিনীর বয়স ৩৬/৩৭। একটা বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর আর সে চেষ্টা করেনি। শরীরটা পাতলা ছিপছিপে। খুব সেজেগুজে থাকত। বিছানায় শোওয়ার পর গল্প বলা কিছুক্ষণের মধ্যেই শিকেয় ওঠে। নলিনী, ওকে সাপিনীর মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে চুমুর পর চুমু খেতে থাকে। গায়ের জামা কি একটা বাহানায় আগেই খুলে ফেলেছিল সে। (পৃ.৩২)
এরপর নিয়মিতই রতিক্রিয়ায় মিলিত হতো তারা। তবে নলিনীর প্রেমিকের সংখ্যা ছিল একাধিক। জয়ন্ত সেটা সহ্য করতে না পেরে নলিনীর প্রেমিক যোগেশকে হত্যা করে। এরপর সে পালিয়ে যায় কলকাতায়। সেখানে দুলাল সিংয়ের ডেরায় ঠাঁই মেলে তার। দুলাল সিংয়ের একটা আন্তঃরাজ্য কিলিং স্কোয়াড আছে। বাংলাদেশ, বার্মা, নেপাল প্রভৃতি দেশেও দুলাল সিংয়ের লোকজন এবং মিত্র রয়েছে। আন্তঃদেশীয় কিলিং সিন্ডিকেটের সদস্য এরা। ওরা জয়ন্তকে ট্রেনিং দেয়। জয়ন্ত ভাড়াটে খুনি হিসেবে ঢুকে পড়ে দুলাল সিংয়ের দলে। এর মধ্যে পুলিশের হাতে সে কয়েকবার ধরা পড়েছে, জেলও খেটেেেছ দুই বছর। তবে এখন যাই ঘটুক, মাথার ওপর সিন্ডিকেটের ছাতা আছে তার। যেখানেই যাক, সিন্ডিকেট তাকে সাহায্য করবে।
ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালে বেশ কয়েকজন লোকের কাছে তার টাকা রাখা আছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডে একটা অলিখিত আইন আছে, জমা রাখা টাকা বা স্বর্ণ কেউ আত্মসাৎ করে না। ক্বচিৎ যারা এই টাকা নষ্ট করে, আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাদের খুব ঘৃণার চোখে দেখা হয়। তবে অনেক টাকা বা অনেক সম্পদ হলে ভিন্ন কথা। সেখানে ধর্মাধর্ম কিছু নেই। সেখানে হলো যার যেমন ক্ষমতা আছে, তার তেমন প্রয়োগ। বিভিন্নজনের কাছে তার গচ্ছিত টাকার পরিমাণ বেশি নয়। তবে ইদানিং সে তিন তাসের খেলায় বেশি হেরে যাচ্ছে। আর হেরে গেলেই তার টাকার প্রয়োজন হয়। কক্সবাজারে তাকে জগলুল চৌধুরী টাকা সরবরাহ করে, যা পৌঁছে দেয় নান্টু মৌলানা। মধ্যম মানের একটা আবাসিক হোটেলে নিজের রুমে বসে ভাবতে ভাবতে তার সময় অতিক্রান্ত হচ্ছিল, এমন সময় তার দরোজার কড়া নড়ে। সে ভাবে যে হয়তো নান্টু এসেছে তাকে টাকা দিতে। দরোজার চিকন ফাঁক দিয়ে দেখে আগন্তুক নান্টু নয়, তার ¯œায়ুতন্ত্র সজাগ হয়ে যায়। লোকটি চলে গেলে সে অনুসন্ধানে জানতে পারে লোকটি এই হোটেলের উপরতলার বোর্ডার। এরপর নান্টু এসে তাকে টাকা দিয়ে যায়। তার কিছুক্ষণ পরেই আসে কানিজ রেজা। কানিজ রেজার পোশাক আর পারফিউমের ঘ্রাণ তাকে মাতাল করে তোলে, সে তাকে রুমের ভেতর জড়িয়ে ধরে। দেহভোগের আর্তি জানায়। কানিজও মুহূর্তের ভেতর রাজি হয়ে যায়। তবে বলে: ‘এখন না ল²ীটি। তোমার ভাইসাব ডাইনিং হলে বসে অপেক্ষা করছেন।’ কিছুক্ষণের মধ্যে জয়নালকে নিয়ে ভেতরে উত্তেজনা ও স্বপ্নে বিভোর একটু অন্যমনস্ক ও সুখী কানিজ রেজা ডাইনিং হলে এসে ঢোকেন। আবিদুর রেজা ততক্ষণে খাওয়া শুরু করে দিয়েছেন। তিনি ডায়াবেটিসের রোগী। সামনে খাবার রেখে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করা তার পক্ষে অসম্ভব। মজা করে ঘিয়ে ভাজা পরাটা দিয়ে তিনি খাচ্ছিলেন গরুর মাংস, রসমালাই ও ভেজা সন্দেশ। এসব তার খাওয়া নিষেধ থাকলেও মাঝে মাঝে নিয়ম ভঙ্গ করে তিনি খেয়ে ফেলেন। কানিজ রেজা স্বামীর প্রতি কপট রাগ দেখিয়ে সদ্য ঘনিষ্ঠ হওয়া ছোটভাইকে নিয়ে নাস্তা শুরু করেন। জয়নালকে আদর করে পাঁচটা পরোটা আর পাঁচ প্লেট গরুর মাংস তুলে দেন। জয়নালও পাতানো বোনের আদর-ভালবাসা আর আপ্যায়ন উপভোগ করে। আবিদুর রেজা খাওয়া শেষেই তার ব্যবসায়িক ব্যস্ততায় উঠে পড়েন। কানিজ তার স্বামীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে। স্বামীর গুণকীর্তন করার একটা উদ্দেশ্যও ছিল কানিজের। কিছুক্ষণের মধ্যে সে হয়তো লোকটার পিছু পিছু তার রুমে গিয়ে ঢুকবে। শাড়ি জামা খুলবে। কিন্তু সে যা-ই হোক, লোকটা যেন না ভাবে কানিজ স্বামীর সংসারে অসুখী। যেন না ভাবে, কানিজ তার স্বামীকে ভালবাসে না।
প্রকৃতপক্ষে কানিজ তার স্বামী আবিদুর রেজাকে ভালবাসে। স্বামী, ছেলে এবং সংসার এই তিন ছাড়া তার জীবনে আর কী আছে ? এই তিনই তার জীবনের সবকিছু। কিন্ত তারপরও ফেরদৌসের সংসর্গে তাকে যেতে হয়েছিল। গিয়ে জীবনের ধন, পুত্রকে তিনি পেয়েছিলেন। আবিদুরের সব আছে, শুধু নেই সন্তান দানের ক্ষমতা। কিন্তু আবিদ জানেন এখন তার সেই ক্ষমতা আছে। পুত্রকে পেয়ে তিনি অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু ছেলেটি কার ঔরসে জন্ম- এটাতো কানিজ, ফেরদৌস আর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আরও একটি সন্তান চান কানিজ। ছেলে বা মেয়ে। তার স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে ফেরদৌসকে নিয়ে তার রঙ্গলীলা। জয়নুলের মধ্যে ফেরদৌসের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায় কানিজ। আর একটি সন্তান চায় সে। তার বুকের ভেতর এবং জঠরে আবার যেন স্বর্গের এক শিশুর মা মা ডাক শুনতে পায়। জয়নালের প্রতি ভাললাগার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ে তার চোখে-মুখে। দেহমনে তৈরি হয় সে। তার অনাগত শিশুর জন্ম দেবে যে লোকটা, তার প্রতি আগ্রহের আতিশয্য বিকশিত হয়। ঠিক সে সময়েই ডাইনিংয়ের অপর প্রান্তে বসা লোকটাকে দেখে জয়নালের মুখাবয়ব পরিবর্তিত হয়ে যায়। এতক্ষণ মুখে ছিল রোমান্স, আর এখন ভয়। সে দ্রুত বেরিয়ে পড়ে হোটেল থেকে। সদ্য জড়িয়ে ধরা নারীও জীবনের কাছে পরাজিত হয়।
আলোচ্য উপন্যাসের আরেক গুচ্ছ চরিত্র সাজ্জাদ ইমাম, শাফাত আরা কুঞ্চি ও মাহমুদ নজীর। একজন শিল্পপতি অন্য দু জন শিক্ষক। এদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো এরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সাজ্জাদ ইমাম এমন একজন মানুষ, যার মনে দ্বৈতসত্তা বিদ্যমান। তার বাবা কাড়ি কাড়ি সম্পদের মালিক- শিল্পপতি। বাবার যে অঢেল ধন-সম্পদ আছে, তা দিয়েই সে এবং তার কয়েক পুরুষ বিনা পরিশ্রমে খেয়ে-দেয়ে আনন্দ-ফুর্তিতে সময় অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু সে অলস বা কর্মবিমুখ নয়, কাজের মধ্যেই তার সার্থকতা খটুজে পায়। তার মনে যে দ্বৈতসত্তা সক্রিয়, সেখানে একটি সত্তা তাকে বসে বসে আরাম-আয়েশ ভোগ করার জন্য অনুপ্রাডুত করে ; আরেকটি সত্তা দেশের দরিদ্র জনসাধারণের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে শিল্প-কারখানায় অর্থ বিনিয়োগের আহবান জানায়। তার সামনে উদ্ভাসিত হয় ‘টাটা’, ‘বিড়লা’, ‘ওয়ালটন’, ‘ওয়ালমার্ট’ ইত্যাদি বিখ্যাত মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানি। তার ভাষায়-‘ব্যবসা করুম, লক্ষ্য থাকবে গরিবী হটানো। দেশে ৪ হাজার কোটি টাকার অর্থ সঞ্চালন কইরা আমি বাংলাদেশে ৪০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান করুম।’(পৃ.১৬)
সাজ্জাদ ইমাম কক্সবাজারে এসেছে ব্যবসায়িক কর্মসূচি নিয়ে। ছাত্রজীবনে সে শাফাত আরা কুঞ্চির খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল, তাদের মনের গ্রন্থিও ছিল খুব কাছাকাছি। কিন্তু মাহমুদের সঙ্গে পরিচয়ে তাদের সে গ্রন্থিতে ছেদ পড়ে। মাহমুদ ও কুঞ্চি শুভ পরিণয়ে আবদ্ধ হয়। সাজ্জাদ আপাত দৃষ্টিতে তাদের সম্মুখ থেকে হারিয়ে যায়। পাড়ি জমায় বোম্বাই, আগ্রা ও দিল্লিতে। দীর্ঘ দেড় মাস পর দেশে ফিরে এলেও কুঞ্চির সাথে আগের মত আর ঘনিষ্ঠ হতে পারে না। অথচ ছাত্রজীবনে তারা অনেক ঘনিষ্ঠ ছিল- ওরা দু জন সপ্তাহ শেষে শহরের বাইরে ঘুরতে যেত, খেতে যেত বিভিন্ন ফাস্টফুডের দোকানে, রেস্তোরাঁয়। দেখা হলে দু জনার দু জনকে জড়িয়ে ধরা, গালে চুমু খাওয়া, ক্যাম্পাসে হাত ধরাধরি করে হাঁটা-এগুলি ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। আগের সেই সম্পর্ক না থাকলেও এ আচরণে তারা এখনও অভ্যস্ত, আর মাহমুদেরও এ নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। তার চিন্তা সংসার নিয়ে। মাহমুদ সরকারি কলেজের অর্থনীতির প্রভাষক, কুঞ্চি গার্লস কলেজের ম্যাডাম। দু জনের মিলিত আয় থেকে প্রতিমাসে একটা অংশ তাদের সন্তান ‘নান্নে’র জন্য তারা সঞ্চয় করে। নান্নের লেখাপড়া, বিদেশ গমন প্রভৃতি কাজে এ সঞ্চয় সহায়ক হবে। ফলে তাদের সংসারে মাঝে মাঝে একটু টানাটানি হয়। দু জনেই এ টানাটনি হাসিমুখে বরণ করে।
কুঞ্চি ও মাহমুদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাজ্জাদ। সাজ্জাদই তাদের প্রথম পরিচয়ের অনুঘটক। জীবিকা উপার্জনে কুঞ্চি ও মাহমুদ এখন কক্সবাজারে, আর সাজ্জাদ ঢাকায়। আশচর্যজনক বিষয় হলো কুঞ্চি-মাহমুদের ঘর আলো করে একটি সন্তান এলেও সাজ্জাদ এখন পর্যন্ত বিয়েই করেনি। সে ছাত্রজীবনে কবিতা রচনা ও গানচর্চা করতো, যার সঙ্গে পরিচয় ছিল কুঞ্চির। সাজ্জাদ কক্সবাজারে আসায় তিন জন নবীন কবি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসে এবং কুঞ্চি ও মাহমুদের কাছ থেকে তারা যে কবির কবিত্বশক্তির পরিচয় জেনেছে- সে কথাও উল্লেখ করে। নবীন কবিরা নাছোড় বান্দা। তারা কবিকে নিজেদের কবিতা শোনাবে এবং কবির কবিতাও শুনবে, সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি নিয়ে কবির দৃষ্টিভঙ্গী ব্যাখ্যা করতে বলবে। অপরপক্ষে সাজ্জাদ মনে করে তার সকাল-দুপুরটা মাটি করার ষড়যন্ত্র করেই কুঞ্চি-মাহমুদ এই তিন স্থানীয় কবিকে তার কাছে পাঠিয়েছে। সে তাদেরকে দশ মিনিটের ভেতর বিদায় দেয়ার পরিকল্পনা করে। সে নবীন কবিদেরকে কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখার পরামর্শ দেয়। সে বলে- ঢাকাইয়া, মৈমনসিংহ, নোয়াখাইল্যা ও বরিশাইল্যা ভাষায় যদি কবিতা লেখা যায়, তাহলে কক্সবাজারের ভাষায়ও কবিতা লেখা যাবে। নিরেট আঞ্চলিক শব্দ নিয়ে লিখিত হবে কবিতা। তার ভাষায়-
বাংলা কবিতার একটা বিপ্লব ঘটাতে হবে। আঞ্চলিক ভাষায় ভাব প্রকাশ করা সহজ হয়। শব্দগুলো প্রাণের সঙ্গে মিশে থাকে। বাংলাদেশে সবক’টা আঞ্চলিক ভাষায় যদি এভাবে কবিতা লেখা হতে থাকে, তাহলে একদিন না একদিন বাংলা কবিতার রূপান্তর ঘটতে বাধ্য। আমরা বিভিন্ন অঞ্চলের কবিতা থেকে পেয়ে যাব অনেক নতুন শব্দ। বহু বৈচিত্র্যপূর্ণ বাকভঙ্গি। তবে বৈচিত্র্যেও দিক থেকেও ঐশ্বর্য যোগাবে বাংলা ভাষাকে।(পৃ.১৮)
এভাবে বক্তৃতা দিয়ে মিনিট দশেকের ভেতর তিন কবিকে বিদায় করে সাজ্জাদ ইমাম। এ কৌশল অবলম্বন করা ছাড়া উপায় ছিল না তার। সে আজ মহাব্যস্ত। সারাদিন তার রুটিন ওয়ার্ক নির্ধারিত। যেমন সাড়ে দশটায় মার্কেটিং টিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ , পুরো দেড় থেকে দুই ঘণ্টা চলবে মতবিনিময়। এরপর লাঞ্চ, তারপর আড়াইটার সময়ে টুরিস্ট লজের সাইট দেখতে যাওয়া। সাইট দেখতে তাকে নিয়ে যাবে স্থানীয় এক লোক, সঙ্গে থাকবে কুঞ্চি ও মাহমুদ। অথবা শুধু মাহমুদ। কুঞ্চি যাবে কি না, এখনও নিশ্চিত করে বলেনি। তবে কুঞ্চি গেলে বড়ই খুশি হয় সাজ্জাদ। এই একটা মেয়ে , যাকে দুই সাজ্জাদ ইমামই অনুমোদন দেয়। তবে কুঞ্চি সাজ্জাদ ইমামের হয়ে থাকতে চাইল না কেন যেন। দু জনের বন্ধুত্বের কোন ঘাটতি ছিল না। একসঙ্গে আহার-বিহার সবই ছিল। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এক নাগাড়ে তারা বসে থেকেছে রমনা গ্রিনে। ভাললাগা-ভালবাসা কাউকে প্রথমে ভাসিয়ে নিয়ে বোকা বানিয়ে দেয়। কুঞ্চির পাল্লায় পড়ে সাজ্জাদ কিছুদিন ওই রকম হয়ে গিয়েছিল। নিরেট মস্তিষ্ক, গবেট ইত্যাদি। কিন্তু বেশিদিনি না। পরে এই মায়াজাল ছিন্ন করতে সক্ষম হয় সাজ্জাদ। কুঞ্চির কোন কিছু ছিন্ন করার প্রয়োজন হয়নি। কারণ সে ভালবাসতো মাহমুদকে। সাজ্জাদ ছিল তার একজন ভাল বন্ধু। কুঞ্চি এক সন্তানের জননী হলেও সাজ্জাদ তাকে আগের মতই পছন্দ করে।
আড়াইটার দিকে তাদের সবার রামগড়ের দিকে প্রস্তাবিত টুরিস্ট লজের সাইট দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা পাকা হয়ে আছে। কুঞ্চি যেতে না চাইলেও তাকে সম্মত করায় সাজ্জাদ ইমাম। তাদের দুজনের ফোনালাপেও তাদের প্রেমের নস্টালজিয়া উত্থিত হয়
: তুমি আমার কথা কোনদিন চিন্তা করছ নাকি!
: অবশ্যই।
: তারপর…
কুঞ্চি একটু হেসে বলে : মাহমুদকে বাইছা নিলাম…
: ভাল কর নাই। আমার হৃদয় ভাইঙ্গা দিছ তুমি… (পৃ.২০-২১)
অতঃপর তারা রামগড়ের টুরিস্ট স্পট দেখে ফেরৎ আসে এবং জঙ্গলের কাছ ঘেঁষে একটা ছায়াময় নিরিবিলি জায়গায় শতরঞ্চি বিছিয়ে বসে যায়। গাড়ি থেকে খাবারের প্যাকেট নামানো হয়। এই সুযোগে সাজ্জাদ কুহ্চির ছেলে নান্নেকে নিয়ে বন ঘুরে দেখায়। নান্নে বনে-জঙ্গলে ঘেরা পাখ-পাখালির কল-কাকলিতে মুখর এই জায়গা দেখে খুবই আনন্দিত হয়। নান্নের আসতে দেরি দেখে মাহমুদ তার অনুসন্ধানে বনের ভেতর প্রবেশ করে। ঠিক সে মুহূর্তে সাজ্জাদ নান্নেকে নিয়ে ফেরৎ আসে। মাহমুদের অনুপস্থিতিতে দুজন দুজনের মনের জানালা খুলে কথা বলে। কুঞ্চি সাজ্জাদকে সংসারী হওয়ার জন্য বিয়ে করতে বলে আর সাজ্জাদ যে এখনও তার জন্য অপেক্ষমান সেকথা জানায়। কিন্তু কুঞ্চি যে মাহমুদের স্ত্রী, নান্নের জননী- একথা সে ভুলে যায়। দু জনের মনের আঙিনায় অদৃশ্য ঝড় শুরু হয়। মাহমুদ তাদের কাছে উপস্থিত না থাকলেও সে ঝড় উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। এই তিন জন মানব-মানবীর হৃদয়-ঘটিত দ্ব›দ্ব এখানে প্রকটিত হয়েছে। কুঞ্চি ও সাজ্জাদের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে বসা, মুখে হাত দেয়া মাহমুদকে পীড়িত করে। সে ভাবে- ‘কুঞ্চির সঙ্গে সাজ্জাদের সম্পর্কটা কতদূর গড়িয়েছিল ?… একজন বিবাহিতা মহিলার জন্য এটা বাড়াবাড়ি ছাড়া আর কি!’ (পৃ.২৮)
টুরিস্ট স্পট দেখে আসার পরের দিন মাহমুদ কলেজে ক্লাস নিলেও মানসিক প্রশান্তিতে ছিল না। সাধারণত ক্লাস শেষে সে লাইব্রেরিতে যায়। সেখানে সে অধ্যয়ন-অনুশীলনে নিমগ্ন হয়। আজও অভ্যাসবশত অমর্ত্য সেনের দুর্ভিক্ষের ওপর রচিত অর্থনীতির বইটির কয়েক পৃষ্ঠা পড়েও ফেলে। কিন্তু পড়াতে তার মন বসে না। সে পাড়ি জমায় নস্টালজিয়ায়। যেখানে কুঞ্চি-সাজ্জাদ ও মাহমুদের আনাগোনা। অপরদিকে কুঞ্চিও সাজ্জাদের সঙ্গে বাইরে ঘুরে লাঞ্চ সেরে আসার বিষয়টি মাহমুদকে জানায়। মাহমুদ হারিয়ে যায় মনঃসমীক্ষণের অন্তর্বাস্তবতায়। তার মনেও ঈর্ষা জেগে ওঠে। তথাপি সে ধৈর্যসহকারে মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সাজ্জাদ কুঞ্চি ও নান্নেকে নিয়ে যায় সমুদ্র সৈকত ঘেঁষে সবে তৈরি হওয়া কক্সবাজারের একমাত্র তারকা হোটেলে। হোটেলের স্বত্বাধিকারী প্রৌঢ়বয়সী যুবক তার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। জানালার ধারে তারা বসে। একটু দূরেই সমুদ্র। খাবার তৈরি হতে যতটুকু সময় লাগবে, ততটুকু সময় কুঞ্চি ও সাজ্জাদ একান্ত মনের কথা বিনিময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আর নান্নেও কিডস্ প্লে-গ্রাউন্ডে খেলায় মেতে ওঠে। তাদের কথোপকথনেও তাদের ভালবাসার কথা উচ্চারিত হয়। সাজ্জাদ জানায়- তার দুটি ক্যাপিটেল আছে, এক: বাবার টাকা, বাড়ি, সম্পত্তি। দুই : কুঞ্চি বিবির ভালবাসা। কুঞ্চিও জানায়- ‘ তয় একটা ক্যাপিটেল ভাঙানো যাইব। ব্যবহার করা যাইব যেমন খুশি। আর একটা ক্যাপিটেল ভাঙানো যাইব না। মনের ব্যাংকে এফডিআরে হোল লাইফের জন্য জমা রাখতে পারো বড়জোর।’(পৃ.৪৬) কুঞ্চিকে সাজ্জাদ জানায়, সে বিয়ে করতে চায়। একটা ছেলে চায়। বউকে প্রাণভরে ভালবাসতেও চায়। এসবই তো মানুষ তার জীবৎকালে পেতে চায়। বিয়ে করে সংসারী হতে চাইছে সাজ্জাদ, এটা তো কুঞ্চির কাছে খুশির খবর। তবে সাজ্জাদের আন-রিয়েলিস্টিক মনের কারণে সে আবার শঙ্কিতও হয়। তারপরও ‘মেয়েটি কে’ তা সে জানতে চায়। সাজ্জাদের বাবা ইশতিয়াক আর কুঞ্চির বাবা ইমদাদ খান ধানমন্ডির ১২ নম্বর রোডের প্রতিবেশী, ছাত্রজীবনে মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজের সহপাঠী; দু জনে ও দু পরিবারের ঘনিষ্ঠতা অনেক। তারা ভেবেছিলেন কুঞ্চি ও সাজ্জাদ বিয়ে করে আনন্দে দিন যাপন করবে। কিন্তু কুঞ্চি তাতে বাঁধ সাধে। ফলে সাজ্জাদ সংসারী না হয়ে ব্যবসায়ী হয়ে যায়। এখন সে বিয়ের পিড়িতে বসতে চায়। মেয়েটা তার তিন বছরের ছোট, গুলশানের জাবিন। যে ছাত্রজীবনে ইডেন কলেজে ইনডোর গেমসে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কুঞ্চি তার সম্পর্কে বলে-‘খুব মানাবে জাবিনকে তোমার সাথে। লম্বায় শুধু একটুখানি খাটো আছে। পাঁচ ফিট এক- দেড়ের বেশি হবে না বোধ হয়। আর একটু লম্বা হলে ওকে আমি ফুল নাম্বার দিতাম। বাট আদারওয়াইজ, শি ইজ এ্যান এক্সিলেন্ট চয়েস… ’(পৃ.৪৯)। কথা বলতে বলতে টেবিলে খাবার সার্ভ করা শুরু হয়। চিলড্রেন কর্নার থেকে নান্নেকে আনতে যায় সাজ্জাদ। কুঞ্চি জানালার ধারে বসে নিজের মনের জানালা খুলে দ্যায়। সে একটু উল্টা-পাল্টা ভাবতে শুরু করে। মাঝে মাঝে তার মনে এরূপ ধারণা উদিত হয়। যেমন- মাহমুদকে ত্যাগ করে যদি সে নান্নেকে নিয়ে সাজ্জাদের ওখানে ওঠে, তাহলে কেমন হয় ? সাজ্জাদ তাকে এত ভালবাসে! এ ভালবাসা তো কুঞ্চি চেয়েছিল। সংসার জীবনে সাজ্জাদকে সে খুব অনুভব করে। সে ভাবে একই নারীর যদি এক সাথে দু জন পুরুষকে বিয়ে করার অথবা বিয়ে না করেও একসাথে থাকার উপায় থাকতো! কুঞ্চি জানে এসব উল্টা-পাল্টা চিন্তার কোন অর্থ নেই। মানুষের জীবন তো একলার নয়। তার সঙ্গে অন্য মানুষ থাকে, সমাজ থাকে, সমাজের নিয়ম-কানুন থাকে। তার ওপর আছে ধর্ম, বিবেক, বৈষয়িক ও আধ্যাত্মিক বিবেচনা; এসব কিছুর দায় ও দাবি মিটিয়েই মানুষকে সমাজে চলতে হয়। মনের বদ্ধ দুয়ারের এসব নেতিবাচক চিন্তা আপনাতেই আবার বন্ধ করে দ্যায় কুঞ্চি। এরপর খেয়েদেয়ে তারা বের হয়। গাড়ি শহর ও শহরতলীতে কিছুক্ষণ ঘুরতে থাকে। নান্নে নানা গাছপালা-পাখি দেখে সময় অতিবাহিত করে, কুঞ্চি সাজ্জাদের নিকটবর্তী হয়, ডান বাহুতে হেলান দেয়া তার মাথা। কুঞ্চির চোখ দুটি বোজা, আর তপ্ত অশ্রæ গড়িয়ে পড়ে চোখ থেকে। সাজ্জাদ কুঞ্চির র্স্পশ পেয়ে আশ্চার্যান্বিত হয়, উপলব্ধি করে কুঞ্চির মনোবেদনা।
অপরদিকে আকস্মিকভাবে জয়নালের হারিয়ে যাওয়া মেনে নিতে পারে না কানিজ রেজা। যাকে নিয়ে সে জীবনের আরেকটা বড় স্বপ্ন দেখেছিল, সে-ই কি না এভাবে জীবন থেকে উধাও হয়ে গেল। নিজের আনুগত্যশীল স্বামীকে তাই সে জয়নালের অনুসন্ধানে ব্যাপৃত করে। আবিদুর রেজা বাধ্য হয়েই বউয়ের পাতানো ভাইয়ের খোঁজে সময় ব্যয় করে। ইতঃপূর্বে ফেরদৌস নামক আরেক ছোট ভাইয়ের প্রতিও তার দরদের কোন শেষ ছিল না। ফেরদৌসকে নিয়ে বাপের বাড়ি কুচ্ছিাতে বেড়িয়ে আসতো সপ্তাহ-কাল। তাকে নিয়ে কিছু বললেও কানিজ ক্ষেপে যেত। কাজেই বউয়ের মান-অভিমান থেকে আত্মরক্ষায় জয়নালের খোাঁজে তিনি বিভিন্ন জায়গায় যান। সেদিন বিকালে সাগর-সৈকতে সাক্ষাৎ হয় মাহমুদ নজীরের। মাহমুদ নজীর তাকে একটি সংবাদ-পত্র ধরিয়ে দিয়ে বলেন, দ্যাখেন কী নিউজ আছে! নিউজে দেখা যায় আবিদুর রেজার পাতানো ছোট ভাই জয়নালের বুলেটবিদ্ধ মৃতদেহ।
খবরের কাগজে লেখা হয়েছে জয়নাল ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী। সে ভারতে মানুষ খুন করে বাংলাদেশে পালিয়েছিল, কিন্তু বাঁচতে পারেনি। কক্সবাজার শহর থেকে বান্দরবনের গভীর অরণ্যে সেদিন সে পাড়ি জমিয়েছিল। কিন্তু তার আততায়ী ওই হোটেলেই দুদিন আগে এসে হাজির হয়। তারপর সে যখন হোটেল থেকে পালিয়ে যায়, তার পিছে পিছে তার আততায়ী দলও রওনা হয়, এবং পরদিন ভোরেই তাকে বুলেটবিদ্ধ করে হত্যা করে।
আলোচ্য উপন্যাসে লেখক মানবীয় ভালোমন্দ গুণাবলি এবং এসব গুণ লালনকারী কিছু মানুষের চরিত্র চিত্রণে সফলতা অর্জন করেছেন। নৈতিক বিবেচনায় সব মানুষই ভাল, আবার সব মানুষই মন্দ এমন বলা যায় না। ভাল গুণাবলির আলোকে গড়ে ওঠে ভাল মানুষের জীবন-প্রণালী, আর খারাব গুণাবলির আলোকে গড়ে ওঠে মন্দ মানুষের জীবন-প্রবাহ। এই জীবন গঠনে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, সমাজ ও অর্থনৈতিক অবস্থা তাকে প্রভাবিত করে। জয়ন্ত মন্দ হওয়ার পশ্চাতে তার সমাজব্যবস্থা অনুঘটক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।