রাস্তা হস্তান্তর হলেও ফ্লাইওভার নিয়ে প্রশ্ন

ওয়াসিম আহমেদ

22

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে (চসিক) ৪ দশমিক ৭০ কিলোমিটার রাস্তা হস্তান্তর করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। ‘মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট ও জিইসি জংশনে ফ্লাইওভার নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় ফ্লাইওভারের নিচে রাস্তার কার্পেটিং, ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণ কাজও সম্পন্ন করেছে সিডিএ। গতকাল এসব সড়ক হস্তান্তর করা হলেও ফ্লাইওভার ও নিচের সৌন্দর্য্য বর্ধনের অংশ হস্তান্তর করেনি সিডিএ। নগরীর সকল রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের এবং ফ্লাইওভারও এক ধরণের রাস্তা। তাই এ ফ্লাইওভার কেন সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করা হবে না, এমন প্রশ্ন উঠেছে। তবে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের কারণে ফ্লাইওভারে সবধরণের দেখভালের দায়িত্ব সিডিএ’র বলে দাবি করছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। অন্যদিকে নগরীর সকল রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের বলে জানিয়েছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।
অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনি, ফ্লাইওভারের লাইট বন্ধ থাকা, অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে থাকাসহ নানা অব্যবস্থাপনায় নগরীতে ফ্লাইওভারগুলো দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এভাবে চলতে থাকলে জনকল্যাণে নির্মিত ফ্লাইওভারগুলো জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নগরীর বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের ডিভাইডারে বসানো লোহার রেলিং খুলে নিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। ইতোমধ্যে প্রায় শ’ খানেক রেলিং হাওয়া হয়ে গেছে। এ ছাড়া ফ্লাইওভারের ওপরের সড়কবাতির বেশিরভাগ সুইচ ভেঙে ফেলা হয়েছে। ফলে এটি এখন মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের নিরাপদ আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর ফ্লাইওভারটিতে অনেকটা নির্বিঘেœ চলে ছিনতাই ও মাদক সেবন। প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর ফ্লাইওভারটি নির্মাণকালে একটি গার্ডার ধসে ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটে।এক দশমিক চার কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভারটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। এছাড়াও প্রায় সময় আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার ও দেওয়ান হাট ফ্লাইওভারে রাতের বেলায় লাইট জ্বলে না। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে হরহামেশা।
জানা গেছে, বহদ্দার হাট ফ্লাইওভার হতে লালখান বাজার পর্যন্ত এবং দুই নম্বর গেট হতে বেবী সুপার মার্কেট পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ করেছে সিডিএ। এই প্রকল্পের আওতায় সিডিএ এভিনিউ রোড ও বায়েজিদ বোস্তামি রোডের উভয় পাশের প্রায় ৪ দশমিক ৭০ কিমি রাস্তার কার্পেটিং, ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণ কাজও সম্পন্ন হয়েছে। তাই সড়কগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চসিককে হস্তান্তর করেছে সিডিএ। হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় সিটি মেয়রের কাছে সিডিএ চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত একটি পত্র প্রেরণ করা হয়। গতকাল বিকালে চিঠিটি মেয়র গ্রহণ করেছেন। তবে সে চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম ওয়াসা সিটি কর্পোরেশনের অনুমতি নিয়ে রাস্তা কর্তন করে ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন স্থাপনের কাজ করছে। ফলে সিডিএ কর্তৃক ইতোমধ্যে কার্পেটিং ও রোড মার্কিং দ্বারা সম্পন্নকৃত নতুন রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় চউক অর্ডিন্যান্স ৪০-সি ধারা মোতাবেক বহদ্দার হাট থেকে লালখান বাজার ও দুই নম্বর গেট থেকে বেবী সুপার মার্কেট পর্যন্ত রাস্তা, ড্রেন ও ফুটপাত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্যে বুঝে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে সিডিএ। তবে সিডিএ’র পাঠানো চিঠিতে চসিকের কাছে উল্লেখিত সড়কের ফ্লাইওভার ও ফ্লাইওভারের নিচের সৌন্দর্য বর্ধন কাজ হস্তান্তর না করায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতোপ‚র্বে এই ফ্লাইওভারের রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মেটাতে সিডিএ আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের নিচে সুপারশপ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে চসিক ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) বিরোধিতা করে আসছিল। সর্বশেষ মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিস ফর ওয়াচ ফাউন্ডেশনের করা রিটে ৬ মাসের জন্য স্থগিতাদেশ দিয়েছে হাইকোর্টের আপিল বিভাগ।
এছাড়াও ২০০৯ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটের সিটি কর্পোরেশন সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন ও অধ্যাদেশসমূহ একীভূত, অভিন্ন এবং সমন্বিতকরণকল্পে প্রণীত আইনের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়, কর্পোরেশন নগরীর অধিবাসী এবং নগরীতে আগন্তুকদের আরাম ও সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় রাস্তা এবং অন্যান্য ব্যবস্থাও রক্ষণাবেক্ষণ করবে।
এ বিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম চট্টগ্রামের জন্য ফ্লাইওভার নতুন ‘কনসেপ্ট’ এবং আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তক্রমে নির্মিত সকল ফ্লাইওভারের সকল ধরণের রক্ষণাবেক্ষণ সিডিএ করবে বলে মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেছেন, ‘বুধবার সিডিএ’র প্রকল্প পরিচালক এসেছিলেন রাস্তাগুলো হস্তান্তর করতে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন ফ্লাইওভারগুলো হস্তান্তর করছে না ? তখন তিনি জানিয়েছেন, ফ্লাইওভার যেহেতু নতুন ‘কনসেপ্ট’, তাই আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এছাড়াও তাদের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয় বৃষ্টি পড়লে ফ্লাইওভারে পানি জমে যায়, তাই আমরা (সিটি কর্পোরেশন) যাতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় ভূমিকা রাখি।’
মেয়র আরও বলেন, ‘নগরীতে চলাচলের জন্য সকল রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণ করবে সিটি কর্পোরেশন। আর ফ্লাইওভারেও একটি রাস্তা। তাই সেটারও দাবিদার সিটি কর্পোরেশন।’ ফ্লাইওভার হস্তান্তরের জন্য সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে কেনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মেয়র বলেন, আমরা এ বিষয়ে একটু ধীর গতিতে এগুচ্ছি। তবে অবশ্যই ফ্লাইওভারের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশন পাবে এবং আমরা সে বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।