লেভ টলস্তয়

রাশিয়ান সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন

236

প্রচন্ড দানবীয় জীবনীশক্তি ও কর্মোদ্যমের অধিকারী টলস্টয় ছিলেন ব্যাপক একগুয়ে স্বভাবের এবং নিজের কর্মের জন্য কাউকেই পরোয়া করতেন না। দীর্ঘজীবনের স্বাদ নেয়া টলস্টয় সারাজীবন নিজের মতামতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন সবকিছুর উপর। তাঁর একাগ্রতা ও পরিশ্রম করার শক্তি যে কাউকেই অভিভ‚ত করবে। অসম্ভব মেধাবী এ সাহিত্যিক নিজ প্রচেষ্টায় অনেক ভাষা শিখেছিলেন যার মধ্যে লাতিন, ইংরেজি, আরবি, তুর্কো-তাতার, ইতালীয়, গ্রিক এবং হিব্রূ ভাষা অন্যতম।
মাঝপথে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ চুকিয়ে দেয়া টলস্টয় ছিলেন মূলত স্বশিক্ষিত। টলস্টয়ের বহুলতার সাথে জড়িত আছে বহুমুখিতা ও বৈচিত্র্যতা। তাঁকে কেবলই কথা সাহিত্যিক হিসেবে গণ্য করলে তাঁর সৃজনশীল প্রতিভার মূল্যায়ন হবে খন্ডিত কিংবা আংশিক। সাহিত্য নির্মাণের বাইরে তিনি বিশুদ্ধ চিন্তাশ্রয়ী ও সমাজসম্পৃক্ত অসংখ্য রচনার দিকে উদ্দীপ্তিত হয়েছিলেন আত্মিক তাগিদে।
১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের ৯ সেপ্টেম্বর (পুরাতন ক্যালেন্ডার মতে, ২৮ আগস্ট) টলস্টয়ের জন্ম রুশ সাম্রাজ্যের তুলা প্রদেশের ইয়াস্নায়া পলিয়ানা নামক স্থানে। তাঁর পুরো নাম লেভ নিকোলেয়েভিচ তলস্তয় (Lev Nikolayevich Tolstoy), যিনি লিও টলস্তয় (Lio Tolstoy) নামে সুপরিচিত।
লিও টলস্তয় তাঁর বাড়িতেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্যদেশীয় ভাষার এক শিক্ষাক্রমে তিনি যোগ দেন। কিন্তু ছাত্র হিসেবে কৃতী হয়ে উঠতে তিনি ব্যর্থ হন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিত্যাগ করে কৃষক হবার জন্য তাঁর বাবার জমিদারিতে ফিরে আসেন।লিও টলস্টয়ের পিতা নিকোলাই ইলিচ টলস্টয় ছিলেন জমিদার এবং মা মারিয়া নিকোলায়েভনা টলস্টয়াও ছিলেন সম্ভ্রান্ত মহিলা। তিনি ছিলেন পরিবারের চতুর্থ সন্তান। শিশু বয়সে তার বাবা মা মারা যান এবং আত্মীয় স্বজনরাই তাকে বড় করেন। ১৮৩০ সালে টলস্টয়ের পিতা এবং ১৮৩৭-এ মা মারা যান। পারিবারিক পরিবেশে শৈশব ও কৈশোর অতিক্রম করার পর ১৮৪৪-এ টলস্টয় কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবী ও তুর্কী ভাষা বিভাগে ভর্তি হন। পরের বছর বিভাগ পরিবর্তন করে স্থানান্তরিত হন আইন অনুষদে। তিন বছর পরে অসমাপ্ত শিক্ষায় ইতি টেনে ফিরে আসেন নিজ জন্মভ‚মিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন ছেড়ে কৃষক হবার পাশাপাশি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন লেখালেখিতে। পরবর্তী কয়েক বছর ‘লক্ষ্যহীন উশৃঙ্খল’ জীবনযাপন করেন মস্কো, সেন্ট পিটার্সবুর্গ এবং অন্যান্য শহরে। এ সময় স্নাতক পরীক্ষা দেবারও নিষ্ফল চেষ্টা করেন। ১৮৫১ সালে ভাই নিকোলাইয়ের কাছে বেড়াতে যান ককেশাস অঞ্চলে এবং তাদের ব্যতিক্রমী জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হন। ককেশীয় জীবন ও যুদ্ধ নিয়ে অনেক লেখার পটভূমি এখান থেকেই তাঁর মনে রেখাপাত করে।
তাঁদের ছিল একটি এস্টেট। তাঁর ভূস্বামী পরিবারের অধীনে ছিল শত শত ভ‚মিদাস বা সার্ফ। ভূমিদাসেরা ছিল ক্রীতদাসের মতো দায়বদ্ধ কৃষক যাদের জমি ছেড়ে চলে যেতে দেয়া হতো না। এসব এস্টেটের মালিকদের পদবি ছিল কাউন্ট, মহিলা হলে কাউন্টেস।
জীবনের এক পর্যায়ে এসে একেবারেই সাদাসিধে জীবন যাপনে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু শুরুতেও পারিবারিক সম্পত্তি ভাগের সময় তাঁর ভেতর জাগতিক লোভ তেমন প্রকটভাবে গোচরীভ‚ত হয় না যদিও স্বভাবচরিত্রে তিনি বেশ বেপরোয়া ছিলেন। পিতার জমি যখন তার ভাইদের মধ্যে ভাগ করা হয় তখন তিনি সব থেকে অনুর্বর অংশটি নিয়েছিলেন।
রাশিয়ার অভিজাত শ্রেণির দায়িত্বজ্ঞানহীন, ইন্দ্রিয়পরায়ন জীবনচর্চ্চায় তাঁর বিবমিষা জাগে। তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন আর তা থেকে মুক্তি পেতে টলস্টয় ১৮৫২ সালে ক্যাডেট হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। চেচেনদের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধে চতুর্থ শ্রেণির গোলন্দাজ হিসেবে নন-কমিশনড অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন । ১৮৫৪ সালে জুনিয়র সেনাপতি পদে নিযুক্তি পান এবং ১৮৫৬ সালে লেফটেন্যান্ট হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
যোদ্ধা হিসেবে কর্মরত অবস্থায় তিনি একটি আত্মজীবনী মূলক গল্প লেখেন যার নাম ‘Childhood’। ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে তিনি গল্পটি সেই সময়ের সবথেকে জনপ্রিয় পত্রিকা ‘The Contemporary’-তে জমা দেন। এই পত্রিকায় গল্পটি গৃহীত হয় এবং এটি হয়ে ওঠে টলস্টয়ের প্রথম প্রকাশিত গল্প।
টলস্টয় তাসের জুয়া খেলায় আসক্ত ছিলেন। ‘অ্যা কনফেশন’-এ তিনি স্বীকার করেছেন: ‘যুদ্ধে মানুষ হত্যা করেছি, তাদের হত্যা করার জন্য দ্ব›দ্বযুদ্ধে লড়েছি, তাসের জুয়া খেলে হেরেছি, কৃষকের শ্রম শোষণ করে ভোগ করেছি, তাদের নানা শাস্তি দিয়েছি, যেনতেনভাবে চলেছি, মানুষকে ঠকিয়েছি। মিথ্যা বলা, ডাকাতি, সব ধরনের ব্যভিচার, নেশা পান, সন্ত্রাস, খুন এমন কোনো অপরাধ নেই যা আমি করিনি। এরপরও মানুষ আমার আচরণের প্রশংসা করেছে, আমার সমসাময়িকেরা বারবার আমাকে তুলনামূলকভাবে একজন নীতিবান মানুষ বলেই বিবেচনা করেছে। এভাবেই কেটেছে আমার ১০ বছর।’
জীবনের একটি ক্ষেত্রে টলস্টয় নিজেকে উৎকর্ষের পর্যায়ে নিয়ে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। জীবনে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সাথে সাথে এই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তাঁর মন পরিবর্তন করার ইচ্ছাশক্তি ও সক্ষমতা ছিল। ১৮৫০-এর দশকে যখন তিনি ছিলেন একজন সেনা কর্মকর্তা, তখনই তিনি এ দক্ষতার চর্চা শুরু করেন। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় টলস্টয় সেবাসটোপল দখলের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লড়াই করেছেন। সেখানে তিনি যে ভয়ানক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তাই তাঁকে একজন নিয়মিত সৈন্য থেকে একজন প্যাসিফিস্ট বা শান্তিবাদী করে তোলে।
১৮৫৭ সালে তাঁর জীবনেএক সিদ্ধান্তসূচক ঘটনা ঘটে। প্যারিসে জনসমক্ষে গিলোটিনে মানুষ হত্যার দৃশ্য তিনি কখনো ভুলতে পারেননি। সে দিন তিনি দেখেছেন, কী ভয়াবহভাবে সজোরে আঘাত দিয়ে মানুষের হাতে মানুষের মুন্ডূপাতের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় তাঁর বিশ্বাস জন্মে রাষ্ট্র ও এর আইন শুধু নির্মমই নয়, বরং সেই সাথে তা ধনী ও ক্ষমতাসীনদের স্বার্থরক্ষার কাজেই ব্যবহার হয়।
রাশিয়ার জারবাদী শাসনের সমালোচনায় তিনি এতটাই উচ্চনাদি হয়ে উঠেছিলেন যে, শুধু তাঁর সাহিত্যিক খ্যাতির কারণেই তিনি জেলজুলুম থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। মানুষ যে মৌল বিশ্বাস ও গোঁড়া ধর্মমত নিয়ে বেড়ে উঠছিল এর বিরুদ্ধে টলস্টয়ই প্রথম আমাদের সাহস জোগান।
১৮৬১ সালে সার্ফদের মুক্তি এবং রাশিয়াজুড়ে কৃষক স¤প্রদায়ের প্রতি সশ্রদ্ধ ব্যাপক আন্দোলনের পর টলস্টয় শুধু কৃষকদের প্রচলিত পোশাকই পরতেন না সেই সাথে তাঁর এস্টেটে কৃষিশ্রমিকদের সাথে থেকে তাদের মতোই কাজ করতেন। নিজে লাঙল চালাতেন, নিজ হাতে কৃষকদের ঘর মেরামত করে দিতেন। বলা হয়, টলস্টয় ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর ‘গ্রেট এমপ্যাথিক অ্যাডভেঞ্চারার’দের মধ্যে অন্যতম একজন। তিনি অস্বাভাবিক মাত্রায় তাঁর জীবনে অন্যান্য লোকের সেসব মত বা অনুভ‚তির সাথে একাত্মতা প্রকাশের দৃঢ় ইচ্ছা প্রদর্শন করেছেন যা ছিল তাঁর নিজের মত বা অনুভ‚তি থেকে ব্যাপকভাবে আলাদা।
ওপরের শ্রেণির এক সাহিত্যিক হিসেবে টলস্টয় উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছিলেন অন্যদের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নিতে। দুর্ভিক্ষের সময় তিনি কৃষকদের ত্রাণকাজে যে আত্মত্যাগ দেখিয়ে গেছেন, তা আর কোথাও দেখা যায়নি।এটাই তাঁকে অন্যদের থেকে ভিন্নতর করেছিল।
টলস্টয়ের ধর্মবোধ ছিল প্রখর তী²। তাঁর নানা রচনায় দেখা যায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অন্তর্দ্বন্দ্বে পীড়িত, যৌক্তিক একজন মানুষকে টলস্তয় শেষ পর্যন্ত বাইবেলের বাণীতে মুক্তি দিয়েছেন। তারপরও বিপ্লব ও প্রতিরোধবিরোধী ধর্মপ্রচারক টলস্তয়কে ছাপিয়ে ওঠেন শিল্পী টলস্তয়। লেনিন তাঁকে বলেছেন, ‘রুশ বিপ্লবের দর্পণ’। টলস্টয় তাঁর গল্প উপন্যাসের বহু জায়গায় বাইবেলের বাণী উদ্ধৃত করেছেন। তবে খ্রিস্টধর্মের অমানবিক যাজক প্রথাকে টলস্টয় নিজ ধর্মের সবচেয়ে বড় গোঁয়ার্তুমি বলে মনে করতেন। তার বিপরীতে তিনি স্থাপন করেছিলেন মানবতার শাশ্বত বাণী। বাস্তব জীবনে টলস্টয় পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছিলেন। তৎকালীন পাদ্রী এবং ইসলামিক স্কলারদের সাথে টলস্টয় মত বিনিময় করতেন। অনেকে চিঠির মাধ্যমে টলস্টয় এর কাছে ধর্মীয়ে বিষয়ে জানতে চাইতেন। টলস্টয় পাদ্রী-পুরুতদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তাদের সমালোচনা করেছেন এবং তার শাস্তি স্বরূপ যাজক সম্প্রদায় ঘোষণা করেছেন যে, টলস্টয়কে খ্রিস্ট ধর্ম থেকে বহিষ্কার করা হল। তিনি আর খ্রিস্টান বলে গণ্য হবেন না। এর উত্তরে তিনি বলেছিলেন যে যারা ঈশ্বর ও যীশুকে নিয়ে ব্যবসা করে তাদের চেয়ে তিনি সহস্র গুণ বেশী ধার্মিক খ্রিস্টান।
টলস্টয় যখন পূর্ণাঙ্গভাবে কলম হাতে নেন তখন তিনি শুরু করেন তাঁর নবযুগ সূচনাকারী সাড়া জাগানো বই ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ লেখা। বেশির ভাগ মানুষ তাকে জানেন ঊনবিবংশ শতাব্দীর একজন বড় মাপের ঔপন্যাসিক হিসেবে। আমরা কম লোকই জানি তিনি ছিলেন সে সময়ের বড় ধরনের প্রগতিবাদী, বৈপ্লবিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। ১৮২৮ থেকে ১৯১০ পর্যন্ত সুদীর্ঘ জীবনকালে তাঁর জীবনের অভিজাত প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা বিশ্বাস তিনি ক্রমে ক্রমে বাতিল করে দেন এবং বিশ্ব সম্পর্কে ধারণ করতে শুরু করেন অবাক করা সব অপ্রচলিত ধারার ধারণা। বিষয়টি তার বন্ধুবান্ধবকে ভাবিয়ে তোলে। কারো কারো তা মনোকষ্টেরও কারণও হয়ে ওঠে। তাঁর এই পরিবর্তন লক্ষ করলে তাঁর জীবন থেকে বেশ কিছু আশ্চর্যজনক ও জ্ঞানগর্ভ জীবনশিক্ষার সন্ধান পাওয়া যায়। এসব শিক্ষা জানিয়ে দেয়, কী করে আমরা আজকের দিনের নানা দ্বন্দ্বে দ্বান্দ্বিক জগতেও একটি শৈল্পিক সুন্দর ধ্রæপদ জীবন পরিচালনা করতে পারি। কী করে তিনি নিজেকে জীবনের নানা সংকট থেকে বের করে নিয়ে এলেন এ ধরনের অবাঞ্চিত অবক্ষয়ী জীবনাচার থেকে। আর কী করেইবা তাঁর এই জীবনযাত্রা সহায়ক ভ‚মিকা পালন করতে পারে আমাদের জীবনদর্শন নির্ধারণের ভাবনায়।
তিনি ছিলেন ধীরগতি লেখক। সমস্যা কিংবা অব্যবস্থা যখনই তাঁর মনকে আলোড়িত করেছে তখনই তার উপর কাহিনীর খসড়া নির্মাণ করেছেন। কিন্তু সেই কাহিনী অথবা গল্প পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে বহু বিন্যাস ও পুননির্মাণের মাধ্যমে- কয়েক মাস, বছর কিংবা জীবনের শেষ লগ্নে এসে। এ জন্য টলস্টয়ের লেখার ক্রমধারা প্রকাশনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বরং তার জীবনের সঙ্গে সমান্তরাল। তাঁর সাহিত্য তাঁর জীবনের মতোই অদ্ভুত। উপন্যাসাশ্রয়ী। গল্প প্রায়শই দীর্ঘ, অনুপুংখ বিশ্লেষণ, কমা ও সেমিকোলনের পৌনঃপুনিক ব্যবহার এবং (মনোবিশ্লেষণের প্রয়োজনে) প্রেক্ষাপট বিবরণে সমুজ্জ্বল। প্রকাশের তাড়াহুড়া না থাকায় শতবর্ষের কাহিনী বিস্তার এবং মহাদেশীয় মানসিকতা উপস্থাপিত হয়েছে কখনো জাতিসত্তায় (যুদ্ধ ও শান্তি), কখনো পরিবারকে ঘিরে (আন্না কারেনিনা) এবং শেষ অব্দি সকলকে তুচ্ছ করে ব্যক্তিতে (পুনরুজ্জীবন)। যুদ্ধের নায়ক আঁদ্রে, পরিবারের ভ্রনস্কিতে ঠাঁই না পেয়ে পরিণতি পেয়েছে নেখলুদভে। এই দীর্ঘ পরিবর্তনের ফাঁকে ‘কাল’ অতিক্রম করেছে দীর্ঘ পথযাত্রা (যুদ্ধ ও শান্তি প্রকাশের ৮ বছর পর বেরোয় আন্না কারেনিনা এবং এর ২১ বছর পর প্রকাশিত হয় পুনরুজ্জীবন)। সেই অবসরে রচিত হয়েছে তাঁর গল্প, নাটক, প্রবন্ধ ও সন্দর্ভ। বলা বাহুল্য, এর মধ্যে উপন্যাস ও গল্পই মর্যাদা পেয়েছে সর্বাধিক। তাঁর প্রধান সৃষ্টিকর্ম (তিনটি উপন্যাস) দিয়ে তিনি যে জীবনদর্শনে পৌঁছাতে চেয়েছেন (“হোয়াট ইজ আর্টে” যার সরল বর্ণনা রয়েছে) তার মধ্যবর্তী কূন্যতা পূরণ করেছে তাঁর গল্পসম্ভার। দেশ থেকে পরিবার, পরিবার থেকে ব্যক্তিত্বে পৌঁছানোর ঘটনা আপাতদৃষ্টিতে সহজ স্বাভাবিক মনে হলেও এটা ছিল উনবিংশ শতাব্দীর রুশ (এমনকি বাকি পৃথিবীর জন্যেও) জীবনের জন্য এক অবিশ্বাস্য উত্তরণ। আবার, তিনি নিজেও তাঁর সৃষ্টির খাপছাড়া চরিত্রটি স্পষ্ট জানতেন এবং এ কারণে তাঁর অনেক রচনাকে তিনি নিজেই খারিজ করেছেন ‘অনুত্তীর্ণ’ বলে। তাঁর ভাষায় -“উপরন্ত আমি অবশ্যই উল্লেখ করবো যে, আমি আমার নিজের শৈল্পিক সৃষ্টিগুলোকে অসৎশিল্পের পর্যায়ভুক্ত করি। কেবলমাত্র ‘ঈশ্বর সত্যকে দেখেও অপেক্ষা করেন’-গল্পটি এর ব্যতিক্রম। এ গল্পটি প্রথম শ্রেণিতে স্থান দাবি করে এবং ‘ককেশাসের বাদী’ শীর্ষক গল্পটি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে’ ।
টলস্টয় “যুদ্ধ ও শান্তি” রচনা শুরু করেন ১৮৬৩ সালে এবং শেষ করেন ১৮৬৯ সালে। ১৮৭০ সালে মূল হোমার পাঠ করার জন্য গ্রীক শেখেন। ১৮৭১-এ শিশুদের জন্য রচনা করেন “অআকখ”। ১৮৭৩-এ “আন্না কারেনিনা” রচনায় হাত দেন এবং ১৮৭৭ সালে শেষ করেন। ১৮৮০-তে চার্চের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ১৮৮২ সালে গরীব ও অন্ত্যজ শ্রেণি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আদম শুমারীতে অংশগ্রহণ করেন। পরের বছর রচনা করেন লোককাহিনী ভিত্তিক গল্পমালা। সাধারণ পাঠ্য বিষয়ক প্রকাশনালয়ও প্রতিষ্ঠা করেন এই একই বছর। ১৮৯১ সালে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে পূর্বে প্রকাশিত সমস্ত রচনার স্বত্ত¡ ত্যাগ করেন। মোপাঁসার রচনাবলীর জন্য ভ‚মিকা লেখেন। “অন্ধকারের ক্ষমতা” ও “হাজী মুরাদ” উপন্যাস লিখিত হয় ১৮৯৩ এবং ১৮৯৬-তে। পরের বছর বেরোয় সর্বাধিক বিতর্কিত গ্রন্থ “হোয়াট ইজ আর্ট?”। “পুনরুজ্জীবন” ও “সমালোচনা সংগ্রহ” প্রকাশিত হয় ১৮৯৮ সালে।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৮৬২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর টলস্টয় বিয়ে করেন জার্মান বংশোদ্ভূত রুশ সোফিয়া আন্দ্রেইভনাকে। তাঁরা ছিলেন ১৩ সন্তানের জনক-জননী? দাম্পত্য জীবনের প্রথম দিকটা তাঁদের সুখের হলেও পরে অশান্তি দেখা দেয়?এ অশান্তির ছাপ আমরা তাঁর মৃত্যুতেও দেখতে পাই।
টলস্টয় মারা যাবার ১০ দিন আগে অভিমানে কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং “আস্তাপভ” নামক এক অখ্যাত স্টেশনে একজন অজ্ঞাত পথিক হিসেবে ১৯১০ সালের ২০ শে নবেম্বর সকাল ৬টা ৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আর সে সময় তাঁর পকেটে ছিল ২৯ রুবল। আর এভাবেই ঋষি টলস্টয় কাউকে না জানিয়ে ‘আস্তাপভ’ স্টেশনের পাশে তুষার চাপা পড়ে মহামুক্তির দ্বারে পৌঁছে যান।
টলস্টয় ছিলেন জমিদার, তাঁর ছিল বিশাল জমিদারী। এসব সত্তে¡ও তিনি ছিলেন জমিদার প্রথার ঘোর বিরোধী। শুধু তাই নয়, তাঁর জমিদারীর বিশাল অংশ উনি দান করে দিতে চেয়েছিলেন যা নিয়ে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে তাঁর ছিল ঘোর বিবাদ। ভূমি সংস্কার নিয়ে টলস্টয়ের গভীর ভাবনা ছিল। উনিশ শ’ সাত সালে ভ‚মি সমস্যার সমাধান চেয়ে রুশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখেছিলেন। তাঁর মতো অভিজাত শ্রেণির বাসিন্দা নেখলিউদভও স্বেচ্ছায় ত্যাগ করেছিল ভ‚মির মায়া। নিজের বিপুল ব্যক্তিগত সম্পদের এক অংশ নামমাত্র খাজনায় দিয়ে দেন কৃষকদের। বাকি সম্পত্তি বিক্রি করে দেন।
বিপ্লবের দিকে এগুচ্ছে তখন রাশিয়া। আর সে কারণে তথনকার বুদ্ধিজীবীদের প্রতি টলস্টয়ের প্রসন্নতা থাকার কোনো কারণ দেখা যায় না কোথাও। সেই অধ্যাপক, আমলা, চাকুরে উকিল, ডাক্তার, প্রকৌশলী প্রমুখ কারোরই দেশের সিংহভাগ জনগণের অর্থাৎ চাষিদের সাথে সম্পর্ক নেই। চাষিদের যে ভ‚মির মালিকানা থাকা দরকার সেটি বুদ্ধিজীবীদের কেউ বোঝেই না। টলস্টয়ের মতে, চাষিদের প্রত্যেকের একখন্ড জমি থাকা চাই যা তাদের নিজেদেরই জমি, নিজেদেরই স্বত্বাধিকার। কিন্তু বিপ্লববাদী বুদ্ধিজীবীরা এইটুকু সুবিধাও তাদের দিতে চায় না। রাষ্ট্রের সব জমি রাষ্ট্রেরই মালিকানাধীন। এই বিপ্লবী চিন্তাও টলস্টয়ের মনঃপুত ছিল না।
টলস্টয়কে নিয়ে ম্যাক্সিম গোর্কি বলেছিলেন,
“টলস্টয় নিজেই একটি পৃথিবী।”
দস্তয়ভস্কি মনে করতেন,
“জীবিত সকল সাহিত্যিকদের মধ্যে টলস্টয় সর্বশ্রেষ্ঠ।”
টলস্টয়ের সততা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ ছিলো বিস্ময়কর। তাঁর মনের গড়ন ছিলো ভাবুকের, দার্শনিকের। খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক টলস্টয় বেঁচেছিলেন ৮২ বছর দুই মাসের মতো সময় । কিন্তু সাহিত্যস্রষ্টা টলস্টয় মানব সমাজে আজও বেঁচে আছেন এবং চিরকাল থাকবেন তার অমর সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে।