রাজপুত্র ও অজগর সাপ

অমিত কুমার কুন্ডু

6

দুই বোন কঙ্কাবতি আর চন্দ্রমুখি। তাদের দুজনের চেহারা কথাবার্তা আচার আচরণ সবই আলাদা। কঙ্কাবতি বড় বৌ এর সন্তান। কঙ্কাবতি যখন খুব ছোট তখন ওর মা মারা যায়। কঙ্কাবতির বাবা অনেক ভেবেচিন্তে কঙ্কাবতিকে দেখাশোনা করার জন্য আবার বিয়ে করে। কিন্তু না, মা মরা কঙ্কাবতির জীবনে সুখ আসে না। সৎ মা কঙ্কাবতিকে নিজের দাসির মতো মানুষ করতে থাকে। সারাদিন ছোটমার ফাইফরমাশ খাটা, ছোট মার মুখ ঝামটি পাওয়া আর বাড়ির সমুদয় কাজ করে তার দিন পার হতে থাকে। কিছুদিন পর ছোটমার কোল আলো করে আসে চন্দ্রমুখি। চন্দ্রমুখি আর কঙ্কাবতি এক সাথে বড় হতে থাকে । কঙ্কাবতি পরে ছেঁড়া জামা, চন্দ্রমুখি পরে নতুন জামা। কঙ্কাবতি ঘুমায় মাটিতে মাদুর পেতে, চন্দ্রমুখি ঘুমায় খাটের উপর তুলোর বিছানায়। দিনে দিনে যদিও দুটি বোন বড় হতে থাকে। পোষাক পরিচ্ছদে তারা যে দুজন দুই বোন দেখে বোঝার কোন উপায় নেই।
তবুও কঙ্কাবতির রূপে চারিধার ঝলমল করে। এত কালি মাখে, এত রোদে পোড়ে, এত আগুনের তাপে কাটায়, তবুও কঙ্কাবতির রূপে সাতগ্রাম মুগ্ধ। বড় বড় সওদাগর, বনিকের ছেলেরা কঙ্কাবতির বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু তাদের ছোট মা সবার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। ছোট মা কঙ্কাবতির রূপে হিংসায় জ¦লে পুড়ে যায়। সে চাই না কঙ্কাবতির ভালো বিয়ে হোক। এদিকে কঙ্কাবতির বিয়ে না হলে চন্দ্রমুখিরও বিয়ে দিতে পারছে না। কঙ্কবতিকে কিভাবে মেরে ফেলা যায় এই ভেবে ভেবে শেষমেষ ছোট মা কঙ্কাবতির জন্য বন থেকে এক অজগর সাপ ধরে আনলো আর বললো জ্যোতিষ বলেছে তুই যদি এই অজগরের সাথে বিয়ে না করিসতো তোর স্বামী বাসর রাতেই মারা যাবে। আগে তোর অজগরের সাথে বিয়ে করতে হবে। অজগরের সাথে বিয়ে করলে বাসর রাতে অজাগর মারা যাবে। পরে তোকে কোন ছেলের সাথে বিয়ে দেব।
কঙ্কাবতি সরল বিশ^াসে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায়। ছোট মা কঙ্কাবতিকে এত নির্যাতন করে তবুও ছোট মার প্রতি কঙ্কাবতির শ্রদ্ধা ভক্তির কোন কমতি নেই। যথারিতি এক লগ্নে কঙ্কাবতির আর অজগর সাপের বিয়ে হয়ে গেল। ছোট মার ইচ্ছা অজগরের সাথে বাসর ঘরে থাকলে অজগর কঙ্কাবতিকে খেয়ে ফেলবে। আর সে চন্দ্রমুখিকে নিয়ে সুখি সংসার করবে। যথরিতি বিয়ে শেষ হলে ছোট মা কঙ্কাবতির বাবার শত নিষেধ অমান্য করে কঙ্কাবতি আর অজগরকে বাসর ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে শিকল টেনে দিলেন। এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে বাবা কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে উঠোনে পড়ে রইল।
এদিকে কঙ্কাবতি আর অজগর বাসর ঘরে যাবার পর কঙ্কাবতি ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে খাটের এক পাশে পরে রইল। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখে কোথায় অজগর সাপ। তার খাটে বসে রয়েছে পরম সুন্দর এক রাজপুত্র। কঙ্কাবতি ভেবে পাচ্ছে না সে স্বপ্ন দেখছে না বাস্তব। যখন কঙ্কাবতির ঘোর কাটলো তখন কঙ্কাবতি বুঝতে পারলো সে স্বপ্নে নয়, বাস্তবেই রাজপুত্রের পাশে বসে রয়েছে। কঙ্কাবতি এ ঘটনার কারণ জানতে চাইলে রাজপুত্র বললো, আমি কয়েক বছর আগে শিকারে গিয়ে খেলার ছলে এক অজগরকে মেরে ফেলি। কিন্তু অজগরের ছদ্মবেশে ছিল এক তপস্যাসিদ্ধ ঋষি। তিনি আমার অপরাধের জন্য আহত অবস্থায় আমাকে শাপ দেয় আমি যেন রাজপুত্র থেকে অজগর হয়ে যাই। এরপর তার কাছে অনেক কাকুতি মিনতি করে ক্ষমা চেয়ে যখন নিজের রূপ ভিক্ষা চাইলাম, তখন তিনি বললেন, যদি কোন সুন্দরী মেয়ের সাথে তোমার এই অজগর রূপে বিয়ে হয়, তবে বাসর রাতে তুমি তোমার পূর্বের রাজপুত্রের রূপ ও ঐশ^র্য ফিরে পাবে।
কঙ্কাবতি রাজপুত্রের কথা শুনে অবাক। তারপর রাজপুত্র কঙ্কাবতিকে তাকে বিয়ে করার জন্য ধন্যবাদ দিয়ে বাসর রাতে কিছু গহনা উপহার দিতে চায়। রাজপুত্র তার আগের রূপ ফিরে পেলে সাথে থাকা স্বর্নালংকার, সোনার তলোয়ারসহ রাজবেশও ফিরে পেয়েছে। সে যখন তার বৌ রাজরানি কঙ্কাবতিকে সেসব উপহার দিতে চায় কঙ্কাবতি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়।
এরপর রাজপুত্র একে একে কঙ্কাবতির কান ছিদ্র করে যখন কানে গহনা পরায় তখন কঙ্কাবতি কেঁদে উঠে ও বাবাগো বাঁচাও গো। যখন নাক ছিদ্র করে নাকে নথ পরায় তখনও বলে উঠে ও মাগো বাঁচাও গো। এদিকে ছোটরানি বাহির থেকে চিৎকারের আওয়াজ শুনে আনন্দে লাফাতে থাকে আর ভাবতে থাকে এই বুঝি কঙ্কাবতির হাত খেয়ে ফেললো অজগরটি। এই বুঝি কঙ্কাবতির পা খেয়ে ফেললো অজগরটি । এভাবে সারারাত রাজপুত্র কঙ্কাবতিকে গহনা পরায় আর সারারাত কঙ্কাবতি কাঁদতে থাকে আর বাহিরে কঙ্কাবতির ছোট মা কঙ্কাবতির সম্ভাব্য মৃত্যুর কথা চিন্তা করে আনন্দ লাফাতে থাকে। ভোরে যখন গহনা পরানো শেষ হয়ে যায় তখন দুজনেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পরে। এদিকে কঙ্কাবতির ছোট মা কঙ্কাবতি অজগরের পেটে চলে গিয়েছে ভেবে সেও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পরে।
সকালে বেশ বেলা হলে ছোট মার ঘুম ভাঙে। সে আনন্দে আনন্দে কঙ্কাবতির কঙ্কাল দেখতে বাসর ঘরের দরজা খোলে, কিন্তু কোথায় কঙ্কাল, কোথায় অজগর সাপ। কঙ্কালের পরিবর্তে অলঙ্কার শোভিত রাজরানি কঙ্কাবতি শুয়ে রয়েছে, আর তার পাশে শুয়ে রয়েছে সুবর্ণভূমি রাজ্যের অজগর হয়ে যাওয়া রাজপুত্র অরুণকুমার।
ছোট মা কঙ্কাবতির বাসর ঘরে প্রবেশ করাতে ওদের দুজনের ঘুম ভেঙে যায় । ওরা বাহিরে এসে রাজপ্রসাদে খবর পাঠায়। রাজা ও রানি মহাধুমধাম করে তাদের নতুন পুত্রবধু কঙ্কাবতি আর রাজপুত্র অরুণকুমারকে রাজপ্রাসাদে বরণ করে নিয়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে জ্ঞান ফিরে পাওয়া কঙ্কাবতির বাবা পরম আনন্দে, পরম তৃপ্তিতে ঈশ^রকে ধন্যবাদ দিতে থাকে।
এদিকে কঙ্কাবতির এমন বিপরীতে হিত হওয়ায় ছোট মা হিংসায় উদভ্রান্তের মত হয়ে গেল। সে তার মেয়েকে কঙ্কাবতির মতই আরেক রাজপুত্রের সাথে বিয়ে দিতে আবার বন থেকে অজাগর ধরে আনলো। এবার আর যেন তেন ভাবে নয়, মহাধুমধাম করে চন্দ্রমুখি আর অজাগরকে বিয়ে দিয়ে বাসর ঘরে পাঠিয়ে বাইরে গয়না পরার কান্না শুনতে বসে রইল চন্দ্রমুখির মা। কিন্তু এবার আর অজাগর রাজপুত্র হলো না। অজাগর ঘরের মধ্যে মানুষ পেয়ে প্রথমে চন্দ্রমুখির হাত কামড়ে খেয়ে ফেললো আর চন্দ্রমুখি চিৎকার করে কেঁদে উঠল, ও মা গো, ও বাবা গো, আমায় খেয়ে ফেললো গো, আসো গো, দরজা খোল গো, আমায় বাঁচাও গো। চন্দ্রমুখির বাবা দরজা খুলতে গেলে ছোট বৌ তাকে এক ধাক্কা দিয়ে উঠোনে ফেলে দিল আর বললো, বুঝতে পারছি চন্দ্রমুখিকে রাজপুত্র গহনা পরাচ্ছে সেটা তোমার সহ্য হচ্ছে না। দূর হয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে।
এদিকে অজাগর চন্দ্রমুখি হাত, পা, এক একটা অঙ্গ খেয়ে নিচ্ছে আর চন্দ্রমুখির মা আনন্দে লাফাচ্ছে। মেয়ের গহনায় মোড়া রূপ দেখে মুগ্ধ হবার জন্য তার প্রাণ আকুলি বিকুলি করছে। এমন ভাবে ভোর পর্যন্ত চলার পর যখন চন্দ্রমুখিকে পুরোপুরি খেয়ে ফেলেছে অজাগরটা, তখন চন্দ্রমুখির মা গহনা পরানো শেষ হয়ে মেয়ে জামাই সুখে নিদ্রা গেছে ভেবে নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাতে গেল।
আজও একটু বেলা করে তার ঘুম ভাঙলো। ঘুম ভাঙতেই তারাতারি করে এসে দরজা খুলতেই দেখে কোথায় গহনা পরা রানির বেশে থাকা চন্দ্রমুখি, সেখানে পরে রয়েছে কয়েকটি হাড় আর চন্দ্রমুখিকে খেয়ে পেট মোটা করে ঘুমিয়ে রয়েছে বন থেকে ধরে আনা অজগরটি। কঙ্কাবতির ছোট মার ঘরে ঢোকা টের পেয়ে অজাগরটি হেলে দুলে ঘর থেকে বের হয়ে বনের দিকে চলে গেল আর চন্দ্রমুখির হাড় জড়িয়ে ধরে চন্দ্রমুখির মা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বুক চাপড়ে বলতে থাকলো, লোভে পরে এ আমি কি করলাম চন্দ্রমুখি, মা আমার, এ আমি কি করলাম।