রাজনীতিতে যুক্তফ্রন্ট

কাজি রশিদ উদ্দিন

11

রাজনীতি নিয়ে কিছু লেখা খুব একটা সুখকর ব্যাপার নয়। বাংলাদেশে হেলদি (Healthy) রাজনীতির বড়ই অভাব। ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম। বড় দু’টি রাজনৈতিক দল একে অপরের প্রতিপক্ষ না ভেবে শত্রু মনে করে। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনও দলেরই কট্টর সমর্থক নই। তারপরেও আওয়ামী লীগের সমালোচনা করলে আমাকে মনে করা হয় বিএনপির সমর্থক আবার বিএনপির সমালোচনা করলে ধরে নেয়া হয় আমি আওয়ামী লীগের লোক। এ এক মহাবিপদের কথা। সরু রাস্তার দুই পাশেই কাটা গাছ। আমাকে এই রাস্তা পার হতে হলে খুব সাবধানে হাঁটতে হবে। শরীর একদিকে বেঁকে গেলে গায়ে কাঁটা বিধবে আবার অন্য দিকে গেলে একই অবস্থা। কাজেই খুব সাবধানে না হাঁটলে যে কোনও মুহ‚র্তে গায়ে কাঁটা লাগার সম্ভাবনা আছে। টেলিভিশনের রাজকাহন নামক জনপ্রিয় অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন নবনিতা চৌধুরী। তিনি ভ‚মিকায় সবসময় বলেন, ‘রাজনীতিই সব কিছুর নিয়ন্তা। আবার পাটকদের কাছ থেকেও অনেক টেলিফোন পাই রাজনীতি নিয়ে লেখার জন্য।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছে। যার লক্ষ্য হচ্ছে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা। দেশে কোনো শক্তিশালী নীতিনির্ভর সরকার প্রতিষ্ঠিত করা নয়। এরকম যুক্তফ্রন্ট সরকার কোনো একটি দেশকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উপযোগী হয় না। আমাদের নিজেদের দেশের ইতিহাস থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯৫৪ সালে আমাদের দেশে অর্থাৎ তদানীন্তন পূর্ববাংলা প্রদেশে গঠিত হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট, যার লক্ষ্য ছিল সে সময়ের পাকিস্তানের পূর্ববঙ্গ প্রদেশে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়ে গড়তে সক্ষম হয় না কোন স্থিতিশীল শক্তিশালী সরকার। পূর্ববাংলার রাজনীতিতে সৃষ্টি হয় প্রচন্ড বিশৃঙ্খলা।
পূর্ববঙ্গের আইন পরিষদে স্পিকার খুন হন পরিষদের মধ্যেই। তার নাম ছিল শাহেদ আলী। প্রধানত পূর্ববঙ্গের এই বিশৃঙ্খলার অজুহাতকে নির্ভর করেই সেনাপতি আইয়ুব খান আসেন পাকিস্তানের ক্ষমতায়। অবশ্য এর সাথে আরও অনেক কিছু জড়িত ছিল।
গণতন্ত্রের পরিবর্তে প্রচলিত হয় সেনানিয়ন্ত্রিত পরবর্তিকালে বুনিয়াদি গণতন্ত্র (Basic Democracy) যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল প্রধানত তিনজন নেতার নেতৃত্বে। এরা হলেন আবুল কাশেম ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল খান ভাসানী। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জেতার পরপরই এদের মধ্যে শুরু হয় ব্যক্তিত্বের সংঘাত। দেখলা যায় নীতিগত বিরোধ। এবারে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলো প্রধানত ড. কামাল হোসেন ও খ্যাতনামা চিকিৎসক ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে। ড. কামাল হোসেন একসময় ছিলেন আওয়ামী লীগের, অন্যদিকে ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন বিএনপিতে। কামাল হোসেনকে আওয়ামী লীগ ছাড়তে হয় বিভিন্ন কারণে। অন্যদিকে বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে বিএনপি ছাড়তে হয় অত্যন্ত অসম্মানজনক ভাবে। অত্যন্ত অশিষ্টভাবেই যাকে টেনে নামানো হয়। কিন্তু এখন সেই বিএনপি থেকেই তাকে আবার ডাকা হচ্ছে নেতৃত্বে। তবে ইতিমধ্যে চিকিৎসক বদরুদ্দোজা চৌধুরী যুক্তফ্রন্ট ত্যাগ করেছেন বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জেলে আছেন। তিনি জেল খাটছেন রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে নয়। তিনি জেল খাটছেন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে। তিনি এই অভিযোগ থেকে ছাড়া পাবেন কিনা আমরা বলতে পারি না। সেটা দেখবে ্উচ্চ আদালত। কিন্তু এগিয়ে আসছে নির্বাচন। আর তাই বিএনপিকে বাধ্য হতে হবে নির্বাচনে অংশ নিতে। না হলে দলটি হারাবে তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব।
লক্ষ করার বিষয় বিএনপির নেতারা বিশেষ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুক্তফ্রন্ট গঠনের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। দল হিসাবে বিএনপি সর্বসাধারণের মধ্যে এখনো যথেষ্ট জনপ্রিয়। কিন্তু মির্জা সাহেব যথেষ্ট মোবাইল নন। তিনি যাচ্ছেন না দেশের মানুষের কাছে। তিনি যাচ্ছেন ছুটছেন জাতিসংঘে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। জাতিসংঘ বাংলাদেশের নির্বাচনের ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারে না। কেননা, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। তার ঘরোয়া রাজনীতি জাতিসংঘের কোনো ভ‚মিকা থাকার কথা নয়।
বাংলাদেশ একটা মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। চিনের সাথে বৈরিতার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইতে পারে বাংলাদেশের সাথে হাত মিলিয়ে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে যুক্তফ্রন্ট গড়তে গিয়ে বিএনপি জামায়াতকে পাশ-কাটিয়ে যেতে বলা হচ্ছে। অথচ জামায়াতের সমর্থনে ১৯৯১ সালে বিএনপিকে তাদের ১৮টি আসন দিয়ে ক্ষমতায় যেতে সাহায্য করেছিল। বাংলাদেশে জামায়াত একটা বড় দল ছিল না। জামায়াত কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে বাংলাদেশ হওয়ার পর। প্রধানত তার ভারতের আধিপত্যবাদবিরোধী নীতির কারণে। ঠিক ইসলামী মূল্যবোধের কারণে নয়। কেননা সে কখনও বলেনি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হতে হবে ইসলাম। বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেছেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। যখন তিনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট। এসব কথা আমরা আমাদের আগের একটা লেখায় বলেছি। আওয়ামীলীগ গত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো পক্ষ গ্রহণ করেনি। বিএনপির এই মার্কিনপ্রশাসনের কাছে ছোটাছুটি দেখে মনে হয়, তাদের নীতিনির্ধারণে নীতিনির্ধারকদের যোগ্যতার অভাব। তাদের এই অযোগ্যতা এমন এক পর্যায়ে গেছে যে, বিএনপির নেতারা হাতে দেশের নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়ে করতে চাচ্ছেন ড. কামাল হোসেনের লেজুড়বৃত্তি। যখন তাদের উচিত হচ্ছে, দেশের জনসাধারণের কাছে যাওয়া ও বিএনপির নিজের নীতি অবস্থানকে ব্যাখ্যা করা। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে-আসলে কি যথাসময়ে জাতীয় নির্বাচন হবে ? না জাতীয় নির্বাচন স্থগিত হতে যাচ্ছে। আমরা এসব বিশ্বাস করতে চাই না। আমাদের সেনাবাহিনী চলতে চান জনগণের সাথে সহযোগিতা করে। এরশাদ ক্ষমতায় এসেছিলেন আর ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল গণ-আন্দোলনের চাপেই। দেখা যাক, বিএনপি যুক্তফ্রন্টকে কতদূর কাজে লাগাতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট