রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন

শাহিদা আকতার জাহান

3

যুগ যুগ ধরে মানব সমাজে পুরুষের তুলনায় নারীরা অনেক হীন অবস্থায় রয়েছে। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নারীর স্বাধীনতা, নারী ক্ষমতায়ন, নারীর সামাজিক মুক্তি ও অধিকারের প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। ঊনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে ‘রাজনীতিতে নারী, ক্ষমতায়নে নারী’ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উঠে আসে। ৭০ দশকে এই ইস্যুটি বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে আবির্ভুত হয়। এর মূল কারণ ছিল ৬০এর দশকে নারী মুক্তির আন্দোলনের প্রভাব। এর পূর্বে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতিতে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নারীকে গুরুত্ব দেওয়া হতো না। সবাই মনে করতো নারীরা একাজগুলোতে দক্ষ নয়, আগ্রহী নয়। নারীরা থাকবে ঘরের কাজে ব্যস্ত। ক্রমান্বয়ে সমাজ ব্যবস্থায় যারা অধিষ্ঠিত তারাই বুঝতে পারলো উন্নত দেশ গুলোতে নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, নারীর অধিকার ও নারী জাগরণের সূচনা হয়ছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরা তাদের নায্য অধিকার দাবি করেছে এবং জাতিসংঘ নারীর এই দাবিকে গুরুত্ব সহকারে যৌক্তিকতার সাথে স্বীকার করে নিয়েছেন। এই নারী জাগরণ ও নারী চিন্তাজগতের অন্যতম হলেন মেরি ওলস্টোন ক্র্যাফট। তার সময়ে নারীদের কিছুতে কোনো অবস্থান ছিলো না। তাই তিনি নারী অধিকার আদায়ের লক্ষে আমূল পরিবর্তনের কথা চিন্তা করছেন। মেরি ওলস্টোন এক গরীব চাষির পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার স্বৈরাচারী পিতা তার মাকে নির্যাতন করতে দেখে তিনি প্রতিবাদ জানান। পরিবার থেকেই প্রথম প্রতিবাদ শুরু করেন। মেরি ছিলেন রুশোর অনুরাগী, তাই তিনি রুশোর সাথে নারী অধিকার নিয়ে আলোচনা করেন, তাতে রুশোর সাথে মেরির চরম বিরোধিতা লেগে যায়। কারণ হিসেবে যা পেয়েছি তা হল রুশোর মতে ‘পুরুষেরা যুক্তি শিখবে’ নারীরা নয়। নারী পুরুষের শিক্ষণীয় বিষয় হবে ভিন্ন। নারীরা হবে, মমতাময়ী, আবেগময়ী, কোমলমতী, নমনীয় সংযমী ও সৌন্দর্যময়ী। সত্যিকার অর্থে নারীরা এ গুনাবলীগুলো অর্জন করবে। মেরি এর সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেন।
রুশোর এই বৈষম্যমূলক শিক্ষা কখনো নারী পুরুষের সহায়ক হতে পারে না। বরং পরিবারের, সমাজের, জাতির বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। নারীর শিক্ষা, নারীর সচেতনতা শুধু নারীর জন্য নয় বরং সামগ্রিকভাবে সমাজের, পরিবারের ও দেশের কল্যাণের জন্য একান্ত প্রয়োজন। নারী সমাজ ও দেশের একটি বিরাট অংশ, ওরা যদি শিক্ষাদীক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকে, যুক্তিহীন ভাবে বেড়ে উঠে তাহলে গোটা দেশকে ধ্বংশের দিকে নিয়ে যাবে। পুরুষের মতো নারীরও মেধা ও কর্মদক্ষতা রয়েছে, যা সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। আর ‘ক্ষমতায়ন হচ্ছে মানুষের যে অধিকার অর্জিত হওয়া যায়, যার দ্বারা নিজের জীবনের পাশাপাশি সামাজিক-পারিপার্শ্বিক ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। আবার শুধু ক্ষমতা থাকলে হবে না, ক্ষমতার কঠোর প্রয়োগও থাকতে হবে। নারীকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ও দেওয়ার ক্ষমতা বাস্তবায়ন, সম্পদ অর্জনের ক্ষমতা, আত্মোপলদ্ধি গ্রহণ, নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হতে হবে, নারীকে স্বাধীন সওা হিসেবে দেখতে হবে। ক্ষমতাহীনতার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বেশি ভাগ নারী অর্থনৈতিক ভাবে পুরুষের উপর নির্ভরশীলতা ও দরিদ্র্যতা নারী ক্ষমতাহীনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বাংলাদেশে বেশিরভাগ নারী দারিদ্র্যের শিকার নেতিবাচক সামাজিকীকরণ আর নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের প্রথম যাত্রা শুরু হয় পরিবারের আপন জন দ্বারা।
নারীর রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নারীদেরকে প্রদও মেধা দিয়েই মহান আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। তাই নারীকে যথাযোগ্য শিক্ষার মাধ্যমে যোগ্য করে তুলতে হবে, সঠিকভাবে যুক্তি শেখাতে হবে। যে যুক্তি দিয়ে নারীকে পুরুষের অন্তরাল থেকে বের করে আনতে হবে। নারীর সচেতনতা ও নারীর গুণাবলীগুলি অর্জন করতে হবে। যুক্তি সহকারে অধিকার আদায় করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রামের মেয়ে ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, এবংদেশের স্বাধীনতার জন্য অবলীলায় মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলেন প্রীতিলতা প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন, প্রয়োজনে নারীরা দেশের জন্য যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন। ’৭১-র মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীরা পুরুষের মতই যুদ্ধসংশ্লিষ্ট সকল সেক্টরে কর্মরত ছিলেন। সশস্ত্র যুদ্ধ থেকে শুরু করে কুটনৈতিক দায়িত্ব পালন সহ সব ধরণের ভূমিকা ইতিহাসে ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে আছে,থাকবে।জাতি শ্রদ্ধা ভরে তাদেরকে চিরদিন স্মরণ করবে। যুগের পরিবর্তনে জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বর্তমানে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় দৃশ্যমান। বর্তমানে মন্ত্রী সভায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদেও আছেন নারীরা। দেশে প্রথমবারের মতো স্পীকার নারী। উপনেতা এবংবিরোধী দলীয় নেতা নারী, জাতীয় সংসদের হুইপ পদে ১ জন নারী এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ১ জন নারী। মন্ত্রী সভায় নারী জাতীয় সংসদে ৭০ জন নারী যা জাতীয় সংসদের ২০ ভাগ সংসদে ২০ জন নির্বাচিত নারী নিবার্চিত হয়েছেন। সততার সাথে, যোগ্যতা, দক্ষতা জবাবদিহিতার সাথে নারী নেতৃত্বের বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন নারী প্রতিনিনিধিরা। জেলাপরিষদে ১ জন সদস্য ৩টি উপজেলার অধিক ইউনিয়ন নিয়ে জন প্রতিনিধিদের ভোটে নিবার্চিত হয়েছে। উপজেলা পরিষদে এক জন করে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নিবার্চিত হয়েছে। ১৯৯৭ সাল থেকে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ৩ জন করে নির্বাচিত নারী সদস্য রয়েছে। প্রথমবারের সচিব নারী অতিরিক্ত সচিব পদে, রাষ্ট্রদূত পদে, জেলা প্রশাসক পদে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশবাহিনী সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে নারী, হাইকোট বিভাগে বিচারপতি পদে নারী, ইউএনও নারী, বাংলাদেশ ব্যাংক এর ডেপুটি গভর্ণর পদে নারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো- ভিসি পদে নারী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রো-ভিসি নারী, ডিসি নারী বিভিন্ন থানায় ওসি পদে, দেশের আরো বিভিন্ন গুরুত্ব পূর্ণ পদে নারীরা দক্ষতা ও সাহসীকতার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। হাজার বছরের কুসংস্কার ও গৃহবন্দী দশা থেকে নারীদের বেরিয়ে আসতে হলে বা সমানতালে এগিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন নারীর ক্ষমতায়ন। বাস্তবতা হচেছ রাজনৈতিক জীবনে অংশীদার হওয়ার ব্যাপারে নারীর জন্যে আইনগত প্রতিবন্ধকতা গুলো অনেক কমে গেলেও সামাজিক সাংস্কৃতিক নিয়মাচার এখনও রাজনীতিকে মনে করে পুরুষের কাজ; এম পি, মন্ত্রী হবেন পুরুষরা। আর প্রচলিত রাজনৈতিক ধারায় এখনো নারীরা রাজনৈতিক পদের ক্ষেত্রে পুরুষ বাচক শব্দ শুনেই অভ্যস্থ। তবে স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশে নারী প্রধান মন্ত্রী, স্পীকার ও সংসদ সদস্যারা দক্ষাতার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। নারীরা এ সব পদে এসে ধীরে ধীরে শব্দগুলোর অর্থই পাল্টে দিচ্ছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা বললেই একজন মামতাময়ী নারীর ছবি আমাদের চোখে ভেসে উঠে আর তা হলো বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা বিশ্বের নন্দিত নেত্রী, মানবতার মা, নারী ক্ষমতায়নের বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতিচ্ছবি। তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন আপাত দৃশ্যমান থাকলেও প্রকৃত অর্থে প্রচলিত রাজনীতিতে এই দৃশ্যমানতা বড় কোনো গভীর বা ব্যাপক পরিবর্তন তৈরি করতে পারেনি। এজন্য পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের মধ্যে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। নারীকে নারীর পরিবর্তে মানুষ হিসেবে চিন্তা করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। তবে সারা পৃথিবী জুড়েই দেখা য়ায় সাধারণভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ, অভিজ্ঞতা অর্জন বা নেতৃত্বের বিকাশে সে সব নারীই সফল হতে পারেন যারা প্রচন্ড আত