রাজনীতিতে তরুণদের সক্রিয়তাকে উৎসাহিত করতে হবে

কাজি রশিদ উদ্দিন

10

বাংলাদেশের তরুণদের রাজনীতিতে অংশ না নিক, কোনো যৌক্তিক আন্দোলন না করুক এমন ধারণা কারও কারও মনে আছে বলে মনে হয়। এই প্রশ্নগুলো তোলার কারণ হচ্ছে, কোটা সংস্কার আন্দোলন বা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় সংবাদ মাধ্যমের কিছু খবর, রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য ও আচরণ শুধু তা-ই নয়। এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলো বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় রোষ থেকে তাদের সন্তানদের রক্ষা করতে যে কথাগুলো বলেছে, তা শুনেও আমাদের মনে হয়েছে এর একটা জবাব দরকার। অবশ্য এই কথাগুলো বলার সাথে সাথে যেকোনও আন্দোলনের নামে যাতে গুরুতর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় সে দিকটাও সবাইর বিশেষ করে সরকারের খেয়াল রাখার দায়িত্ব। শান্তিপূর্ণ যেকোনও আন্দোলন তো যেকোনও গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং দেশের সংবিধান তাই বলে।
আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীরা গোড়া থেকেই বলেছেন যে, তাদের কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তাদের ওপরে যখন কর্তৃপক্ষীয় খড়গ নেমে আসে এবং কিছু নেতা আটক হন, তখন তাদের পরিবারগুলো বারবার এই কথা বলতে বাধ্য হয় যে তাদের সন্তানেরা রাজনীতি করেন না। সেদিন টেলিভিশনে একজন টকারকে বলতে শুনলাম, “এখন রাজনীতির ভিতর নাকি পলিটিক্স ( চড়ষরঃরপং ) ঢুকে গেছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনেরে নেতা রাশেদ খানের মা ও স্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে জোর দিয়ে বলেছেন যে, ‘রাশেদ কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না’। রাজনীতিকে বলা হয় নীতির রাজা এটা কি তাহলে এতই খারাপ জিনিস। একজন অসহায় মা তার সন্তানের মুক্তির জন্য আবেদন জানাতে দুই হাত জোড় করে বলেন, “আমার মনি এমনকি আমরা কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত না’ ( বাংলা ট্রিবিউন, ১১ জুলাই ২০১৮) প্রায় একই সময়ে যখন কোটা আন্দোলনের আরেকজন নেতা তারেক রহমানকে পাওয়া যাচ্ছিল না তখন তার বাবা-মা আবদুল লতিফ ও শাহানা বেগম তাদের সন্তানের সন্ধান চেয়ে ১৬ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করলে সেখানে তারেক রাজনীতি করতেন কিনা তা জানতে চাইলে আবদুল লতিফ সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা কেউই রাজনীতি করি না। তবে আমাদের ছেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাংগঠনিক ছিল শুনেছি”। (প্রথম আলো, ১৬ জুলাই ২০১৮)।
এই মা-বাবারা যে সত্য কথাই বলেছেন, সে বিষয়ে সংশয়ের কোনও অবকাশ নেই। যখন যথাযথ কর্তৃপক্ষের সব শক্তি তদন্তের কাজে নিয়োজিত এই আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত করতে, সেই সময় শিক্ষার্থীদের পরিবার ভুল বা মিথ্যা তথ্য দেওয়ার ঝুঁকি নেবে। এমন যুক্তি কেবল নির্বোধরাই মনে করতে পারেন। সেই সময় সংবাদপত্রের অনুসন্ধানেও বেরিয়ে আসে যে এর পেছনে কোনো দলের ইন্ধন নেই। এখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা না করে পারা যায় না। তরুণ ছাত্রদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাথে যখন ছাত্ররা রাস্তায় নেমে পরে নিজ হাতে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন শুরু করে তখন সাথে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছাত্রদের এটি যৌক্তিক আন্দোলন। প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তি আন্দোলনকে ডিফিউজ করে কিছুটা বাধাহীনভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পরে।
ছাত্রদের কোটা আন্দোলনকেউ প্রধানমন্ত্রী একই ভাবে হ্যান্ডেল করে পার্লামেন্টে ‘সমস্ত কোটাই বাতিল করার ঘোষণা দিয়ে দেশটাকে আপাতত শান্ত রাখার পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন যদিও কোটা আন্দোলনকারীরা চাকুরিতে কোটার সংস্কার চেয়েছিলেন। পুলিশের সূত্র উদ্বৃত করে ৭ জুলাই প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল। ‘এখন পর্যন্ত জোরালো কোনো রাজনৈতিক যোগসাজশের তথ্য তাদের হাতে আসেনি।’
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। তাদের দুই সহযোগী বাস দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর। ফলে প্রথম দিন দুই হয়তো এমন কথা বলার সুযোগ ছিল না। কিন্তু আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যুক্ত হওয়ামাত্রই কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এল। যেহেতু এই আন্দোলনের যৌক্তিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা গেলো না। সেহেতু আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে এক নতুন ব্যাখ্যা উপস্থিত করা হলো। ‘উসকারিন’ অভিযোগে আটক করা হলো অনেককে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জোর দিয়ে বললেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অবশ্যই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল ( যুগান্তর ১০ আগস্ট ২০১৮) কিন্তু সাংবাদিকেরা অনুসন্ধান করে জানালেন যে, ‘শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি’ (প্রথম আলো ১৮ আগস্ট ২০১৮) আমাদের বক্তব্য হলো এই আন্দোলনগুলোর কোনটাই সরকার বিরোধী আন্দোলন ছিল না। এগুলো ছিল, তাদের নায্য দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলন, যেগুলো স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী আমলে নিয়েছিলেন এবং সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এখানে সরকারকে সাধুবাদ জানাতে হয়। গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থায় সভা, সমিতি, মিছিল নায্য দাবি দাওয়ার আন্দোলন, চিন্তার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্র ও টিভি বা অন্যান্য মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা আমাদের সাংবিধানিক কর্তৃক অনুমতিপ্রাপ্ত অধিকার। তবে সেটি করতে গিয়ে সহিংসতা, রক্তাক্ত সংঘর্ষ, বাস, ট্রাক জ্বালাও পোড়াও ইত্যাদি অবশ্যই করা যাবে না। আন্দোলনের নামে মানুষ হত্যার তো প্রশ্নই আসে না।
সম্প্রতি দুই আন্দোলনের ক্ষেত্রেই আত্মীয় স্বজনকে সাংবাদিকদের এই ধরনের প্রশ্ন করা এবং সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানের চেষ্টা করার কারণ বোধগম্য। তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থীরা যদি কোনো সংগঠনের সদস্য হতেন তা যদি নিষিদ্ধ সংগঠন না হয়, তবে কি তা দোষের বিষয় হতো ? অনেক ছাত্র সংগঠন তাদের নিজস্ব দলীয় পরিচয়েই কোটা সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। আমাদের জানা মতে এর কোনটাই সহিংস ছিল না। ইংরেজিতে যাকে ‘ভায়োলেন্স’ বলে তাও ছিল না। তবে তারা কি এ ধরনের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে যুক্ত হতে পারবেন না? শিক্ষার্থীদের দাবি যদি যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত বলে বিবেচিত হয় তবে কেন একজন শিক্ষার্থীকে এর সঙ্গে যুক্ত হতে তার রাজনৈতিক পরিচয়কে নিসর্জন দিতে হবে ? কোটা সংস্কার আন্দোলনের যারা বিরোধিতা করেছেন তারা যদি তাদের রাজনৈতিক ্এবং সাংগঠনিক পরিচয় অক্ষুন্ন রেখেই এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন, তবে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়দের ক্ষেত্রে ভিন্ন বিবেচনা থাকার উদ্দেশ্য কী। তা বোঝা গেল না। এটি বোঝা প্রয়োজন।
যদি কোনো ছাত্রসংগঠন মনে করে যে দলীয়ভাবে কোনো দাবি বা আন্দোলন সমর্থন করবে না, তার অর্থ কি এই যে কোনো সদস্যই এই আন্দোলনকে যৌক্তিক মনে করতে পারবেন না? সংসদ সদস্যদের যেমন সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বাধা আছে, সৌভাগ্যবশত ছাত্ররাজনীতিতে তেমন বিধান নেই। ফলে তরুণ এবং শিক্ষার্থীরা তাদের ইচ্ছেমত বিষয়ে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নেবেন ? সেটাই স্বাভাবিক এর বিকল্প হচ্ছে দলের দাসত্ব করা, যারা ছাত্রদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে উদ্বিগ্ন, তাদের হাবভাবে মনে হয়েছে যে তরুণেরা দলের দাসত্ব করুক। সেটাই তাদের বেশি প্রত্যাশিত। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দাবি কেবল শিক্ষার্থীদের বিষয় ছিল না, বরং ছিল সমাজের সর্বস্তরের মানুষের দাবি, নাগরিক হিসেবে একজন তরুণ যদি এই আন্দোলনে অংশ নেন, তবে তার রাজনৈতিক বা দলীয় সংশ্লিষ্টতাকে আক্রমণ করা আসলে নাগরিকের অধিকার খর্ব করার শামিল। এটি কি বলা সমীচীন যে একটি দলের সঙ্গে যুক্ত থেকে রাজনৈতিক সক্রিয়তা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু তা না হলেই তা অপরাধমূলক।
সাম্প্রতিক দুই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এমন প্রচারণার উদ্দেশ্য বিরাজনীতিকরণ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন ধারণা দেয়া যে রাজনীতি একধরনের খুবই খারাপ বিষয়। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলে তাদের হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হতে হবে। এমন ধরনের ভীতি তৈরিও একটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে। রাজনীতি বাদ দিয়ে দেশ শাসনের চেষ্টা কিংবা কেবল এক দলেরই রাজনীতিই সহনীয়। ভিন্নমতদের বা অন্যদের নয় এই ধারণাকে গণতন্ত্র বলে দাবি করার কোন কারণ নেই। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংসদের নির্বাচন না হওয়া। ছাত্ররাজনীতির নামে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাজ, তরুণদের একাংশের মধ্যে একসময় “আই হেইট পলিটিক্স” বলার যে ফ্যাশন চালু হয়েছিল, তার বিপরীতে দাঁড়িয়েই তরুণেরা এইসব আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। একটি ধারণা তাদের মধ্যে হয়তো জন্ম হয়েছে যে বিরাজমান অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে, তা নিরাপদ সড়ক কিংবা চাকুরিক্ষেত্রে বৈষম্য- যাই হোক না কেন পরিবর্তনের পক্ষে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের বিকল্প নেই। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচ কোটি ছয় লাখ। এরা কেবল দেশের প্রধান কর্মশক্তিই নয়, এরাই বাংলাদেশ, এদের কাছে রাজনীতিকে অস্পৃশ্য করে তোলার চেষ্টা শুভ হওয়ার কোনও কারণ নেই। রাজনীতি-সচেতনতা এবং রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা ছাড়া দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ইতিহাস বাংলা ভাষা আন্দোলন, ছাত্রদের ১১ দফা ও মহান নেতা, জাতির স্থপতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফার আন্দোলনে তরুণ ছাত্র সমাজের সংশ্লিষ্টতা তাই সাক্ষ্য দেয়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট