রাঙ্গুনিয়ায় করোনা পরিস্থিতিতে সহস্রাধিক শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন

41

রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি
…………………

নভেল করোনাভাইরাসে যখন গোটা বিশ্ব আতঙ্কিত, তখন এই ভাইরাসের চেয়েও রিকশাযাত্রী কম হওয়া নিয়ে চিন্তিত রিক্সাচালক মো. জসিম (৩২)। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লিচুবাগান এলাকায় কয়েক দেড় যুগ ধরে রিকশা চালান তিনি। শনিবার সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২ পর্যন্ত মাত্র ২০ টাকা উপার্জন করেছেন তিনি। অন্যদিন এই সময়ে তিনি দুই থেকে তিনশ টাকা উপার্জন করতে পারতো বলে জানান। চন্দ্রঘোনা ছুফি পাড়া গ্রামের ব্যাটারি চালিত রিক্সা চালক মো. রবি ( ৩১) তার তিন কন্যা সন্তান নিয়ে এক বেলা খেয়ে অপর বেলা নাখেয়ে চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। অপর রিক্সা চালক মো. সেলিম বলেন ‘একদিন রিকশা চালিয়ে যে টাকা পাই তা দিয়ে সংসার চালাই। এখন যাত্রী নাই চলি ক্যামনে। টাকা কামাই না করলে পেটে ভাত যাবে না। চায়ের দোকানের শ্রমিক মো দিদার তার ৫ জনের সংসার এখন আলু আর ডাল দিয়ে চলছে। সিএনজি চালক মো. জাহাঙ্গির বলছেন, আমরা এখন সম্পূর্ণভাবে বেকার। কোন টাকা নাই হাতে। অথচ এদিন গাড়ি চালালে সব খরচ মিটিয়ে হাতে ৭/৮শ থাকত। আর সেদিন এখন নেই। আমরা এখন সমাজে ও সংসারে বোঝা। আর বাস চালক মো. শামসুল হক (৫১) বলেন, আমরা উত্তর চট্টগ্রামের চট্টগ্রামÑকাপ্তাই সড়কের কমপক্ষে সহ¯্রাধীক শ্রমিক কর্মচারী এখন ঘরে বেকার বসে থাকা ছাড়া কোন উপায় দেখছিনা। কারো চুলোয় আগুন জলছে কারো চুলোয় জলছেনা। এরকম চলতে থাকলে আমরা পথে বসা ছাড়া আর কিছু দেখছিনা। মাইক্রো চালক আবদুস শুক্কুর (৫১) জানান, আমরা প্রায় মাইক্রো হাইস মিলে ২শতাধিক কর্মচারী চালক গত সপ্তাহ থেকে আজ পর্যন্ত কোন রকমে চলছি। এটাকে বেচে থাকা বলা যায়না। আর সামনের দিন গুলো কিভাবে চলবে সৃষ্টি কর্তাই ভাল জানে। আমাদের সব শেষ। সব মিলিয়ে রাঙ্গুনিয়ায় নিম্ন্ আয়ের কমপক্ষে বিভিন্ন পেশার ৩ সহস্ধীরক শ্রমজীবি মানুষ এখন কর্মহীন। করোনার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া উপজেলার বিভিন্ন শ্রমজীবি মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। জানা যায়, রাঙ্গুনিয়ায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে কয়েকদিন ধরেই উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান ও নিত্যপণ্যের দোকান খোলা থাকলেও সন্ধ্যা ৭টার পর ফাঁকা হয়ে যায় তা। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বাসস্ট্যান্ড সহ ফাঁকা হয়ে পড়েছে রাস্তাঘাট। দু’একটি করে রিকশা, অটোরিকশা দেখা গেলেও যাত্রী সংকটে ভাড়া পাচ্ছে না তাঁরা। এ অবস্থায় বিপাকে পড়েছেন উপজেলার অনেক শ্রমজীবী মানুষ। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও মাইকিং করে দোকানপাট, যান চলাচল বন্ধ রাখাসহ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা অব্যাহত রেখেছে উপজেলা প্রশাসন। আর এ নির্দেশনা কার্যকর করতে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি কাজ করছে পুলিশ প্রশাসন। এরফলে গত কয়েকদিন ধরে রাঙ্গুনিয়া জুড়ে অঘোষিত লকডাউন অবস্থা বিরাজ করেছে। উপজেলার এই পরিস্থিতিতে চরম বিপাকে পড়েছেন শ্রমজীবি মানুষ। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু কিছু ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
রোয়াজারহাট এলাকার ভ্যানচালক মো. রহিম বলেন, “করোনার ভয়ে সবাই যখন ঘরে, তখন পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে বের হতে হয়। গাড়ি থাকলেও দোকান বন্ধ থাকায় ভাড়া পাইনা।” মো. আবদুল করিম নামে এক সিএনজি অটোরিকশা চালক বলেন, “আগে ধামাইরহাট থেকে চন্দ্রঘোনা ঘুরে আসলে ৩-৪শত টাকা পেতাম। কিন্তু আজ পেয়েছি মাত্র ৪৫ টাকা। ইনকাম তো দূরে থাক, গ্যাস খরচটাও এখন উঠছে না।” সাধারণ মানুষের চরম এই দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে মো. আলমগীর নামে একজন বলেন, ভোটের সময় যদি ভোট চাইতে মানুষের দোয়ারে দোয়ারে যেতে পারে, তবে মানুষের এই বিপদে কেন জনপ্রতিনিধিরা ব্যক্তি উদ্যোগে ত্রাণ নিয়ে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে না? এদিকে করোনা সতর্কতায় যানবাহনসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় উপজেলায় কর্মহীন হয়ে পড়া রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও অন্যান্য ড্রাইভারসহ বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের সহায়তায় বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এর আওতায় উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে কর্মহীন মানুষের কাছে চাল-ডাল পৌছে দেওয়ার কার্যক্রম শনিবার থেকে শুরু করা হয়েছে। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান জানান, “রাঙ্গুনিয়ার করোনার প্রভাবে কর্মহীন হয়ে পড়া দুই হাজার দুস্থ পরিবারকে চাল ও ডাল দেয়া হচ্ছে। এই কার্যক্রম উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়নে শনিবার থেকে শুরু করা হয়েছে।”