রাঙামাটি পার্বত্য জেলার প্রিয় বড় হুজুর আল্লামা নজরুল ইসলাম নঈমী (র.)’র জন্ম শোকগাথা আবু তালেব বেলাল

8

বেশ দেরিতেই আমি আমার প্রিয় এ মানুষটির জন্য শোক প্রকাশ করছি। ইন্তেকাল করেছেন গত শুক্রবার রাতে। অর্থাৎ একসপ্তাহ গত হয়েছে। জানাজা আর দাফন হয়েছে শনিবার বাদ জোহর। বিশাল খেলার মাঠ শহীদ আবদুস শুক্কুর ময়দানে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দেখলাম মাঠে নয় শুধু, মাঠের বাইরে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জানাজার নামাজের পরিধি ব্যাপ্তি ঘটেছিল। তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও সকলের প্রিয় পাত্র ছিলেন, ছিলেন চট্টগ্রাম পার্বত্য জেলার মুসলিম সর্বজন স্বীকৃত ধর্মগুরু। তাঁর ইন্তেকালের পর পার্বত্যজেলাবাসীর শোক আর দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় দেখে অনুমান করা যায় তিনি কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। রাত আটটায়, পার্বত্যজেলার যারাই চট্টগ্রামে বাস করেন, তাদের অনেকেই ছুটে গিয়েছিলেন এ বড় হুজরকে দেখতে। সেখানে শুধু মুসলিম ছিলেন না, ছিলেন অনেক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীও। পরের দিন তাঁর কফিন যখন রাঙ্গামাটিতে যায় সেই যেন একজন প্রকৃত অভিভাবকের হারানো বেদনায় লাখো নয়নে অশ্রæঝরা মাতম। ছুটে আসা হাজারো মানুষের ভিড়ে সর্বধর্ম ও জাতির মলিন চেহারাগুলো ভেসে উঠেছে। কী হারালো তারা! কোনজন সেই আলোর বিচ্চুরণ থামিয়ে অমাবশ্যার গোর অন্ধকার নামিয়ে গেলেন! তিনি আর কেউ নন, তাঁর নাম আল্লামা হাফেজ ক্বারী নজরুল ইসলাম নঈমী। জন্মস্থান চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়া উপজেলায়। শৈশব কেটেছে নিজগ্রামে। শিক্ষাজীবন শুরু এখানে। সর্বশেষ লেখাপড়া কুরআন হাফেজ, ক্বারী, ইসলামী শিক্ষায় কামিল হাদিস। তাঁর তরিকতের গুরু রাঙ্গুনীয়ার বিখ্যাত আলেম ও সাধক আল্লামা নুরুচ্ছফা নঈমী (র.)। কর্মজীবন শুরু রাঙামাটি সদর সিনিয়র মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক হিসাবে। অভিজ্ঞতা ও সাধনায় পরবর্তীতে অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন। পাশাপাশি রাঙামাটি রিজার্ভ বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব ও ইমাম। সুটাম দেহ উজ্জল চেহারা ও বিনয়ী, নম্র, ভদ্র, মার্জিত ও মিষ্টভাষী এ মানুষটির সাথে কিছুক্ষণ কথা বললেই যেকেউ তাঁর অনুগামী হবেন নিশ্চিত। আমার জীবনে তাঁর সান্নিধ্যের সুযোগ হয়েছিল নব্বই দশকে পারিবারিক ব্যবসার সুবাদে রাঙামাটিতে কিছুদিন অবস্থান করার কারণে। তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স এর ছাত্র। চবিতে প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর সাথে ইসলামী ছাত্র শিবিরের বারবার সংঘাত-সংঘর্ষ ও খুনাখুনিতে অস্থির চবি ক্যাম্পাস। এসময় পরিবার দয়াপরবশ হয়ে আমাকে ব্যবসায়িক হিজরতে পাঠান রাঙামাটিতে। বড় ভাইকে ব্যবসায় সহায়তা করার কথা থাকলেও তেমন তা হয়ে উঠেনি। বরং শান্তিবাহিনীর নানা অত্যাচার ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। গঠন করেছিলাম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের একমাত্র ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা। সভাপতির দায়িত্বও কাঁধে নিয়েছিলাম। এরপর নানা ইস্যুতে আন্দোলন চললেও মূল কর্মসূচি ছিল শান্তিবাহিনীর অশান্ত কর্মকাÐের বিরুদ্ধে। আয়োজন করেছিলাম সর্বদলীয় মুক্ত আলোচনা সভা। এ অনুষ্ঠান করতে গিয়ে নানা বাধাবিপত্তির সন্মুখিন হয়েছিলাম। এসময় আমিসহ নেতৃস্থানীয় কয়েকজন আল্লামা নঈমী হুজুরের কাছে যায়। তিনি তার বাসার ড্রয়িংরুমে বসিয়ে আদর-আপ্যায়ন করে আমাদের সামনে এগুতে বললেন আর দোয়া করলেন। মূলত আহলে সুন্নাতের সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততার সুবাধে আল্লামা নঈমী হুজুরের সাথে আমার পরিচয়, সম্পর্ক ও হৃদ্যতা।
তিনি আহলে সুন্নাত ওযাল জামা’আতে পার্বত্য জেলার দ্বিতীয প্রধান নেতৃত ছিলেন আর প্রধান ব্যক্তি আল্লামা হেজাজী হুজুর। ধর্মীয় ব্যক্তি হিসাবে আল্লামা নজরুল ইসলাম নঈমী সাপ্তাহিক ওয়াজ করতেন মসজিদে মিম্বরে দাঁড়িয়ে। অত্যন্ত সাবলিল ও প্রাঞ্জল ভাষায় তাঁর তকরির তীরের মত বিদ্ধ করত শ্রোতা-দর্শকদের। কিন্তু উচ্চস্বরে চিৎকার করে কোন বক্তব্য রাখতেন না, কারো সমালোচনা করতেন না, আপন ব্যক্তিত্বকে অক্ষুন্ন রেখে ইসলামী মূল বিশ্বাস ও আক্বীদাকে প্রচার করতেন। যেকেউ তার কাছে দোয়া ও আশির্বাদের জন্য যেতেন মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। এমনকি আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি তিনি রাঙামাটি পার্বত্য জেলার অঘোষিত পারিবারিক সালিশ ও বিচারক ছিলেন। পারিবারিক যে কোন দ্ব›দ্ব সংঘাত নিরসনে তাঁর কাছে ছুটে যেতেন, আর যে কোন জটিল সমস্যা তিনি মুহূর্তেই মীমাংসা করে দিতেন। ধর্মীয় নানা বিতর্কিত বিষয়েও তাঁর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও মতাতম রাঙামাটিরবাসীকে অনেক বড় বড় সংঘাত থেকে রক্ষা করেছেন তিনি। একবার রাঙামাটি রিজার্ভবাজার জামে মসজিদে তাবলীগ জামাতের অবস্থান নিয়ে অনিবার্য একটি সংঘাত থেকে কৌশলে রক্ষা করেছিলেন তিনি। ঘটনার সময় আমি ছিলাম বটে আমার স্মৃতি বিভ্রাট ঘটেছে, তবে আমার বড় ভাই, হুজুরের ইন্তেকালের পর ঘটনাটি ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন, বড়ভাই আবু বক্কর সাহেবের ভাষায়, ‘আমি তিন বছরের মত রাঙামাটির জীবনে প্রায়সময় হুজুরের ঈমামতিতে নামাজ পড়তাম। যারা হুজুরের পিছনে নামাজ পড়েছেন তারাই জানেন উনার ক্বিরাত -এর সৌন্দর্য। যেমন সুরালো সুললিত কন্ঠ, তেমন ক্বারীর ছন্দময়তা। মাঝে মাঝে ফজরের নামাজের সময় লম্বা ক্বিরাতের সুরে মনে হত আসমান থেকে এ মূহূর্তে কোরআন নাজিল হচ্ছে মাশাআল্লাহ। একদিন রাঙামাটির ডিসি সাহেব, বাজার কমিটির সভাপতিকে জোরদিয়ে তদবীর করলেন, নির্দেশ দিলেন যে, ঢাকা থেকে ‘তবলীগ জামাতের মুবাল্লিগরা এসেছে, ওদেরকে জামে মসজিদে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। মসজিদ কমিটির সদস্যরা সবাই সুন্নি আক্বীদায় বিশ্বাসী ফলে জেলা প্রশাসকের এ সিদ্ধান্ত বা অনুরোধ মানতে নারাজ। অন্যদিকে ডিসি বাজার কমিটির উপর চাপ সৃস্টি করেই যাচ্ছেন। চারদীকে চরম উত্তেজনা। এমন একটি মূহুর্তে হুজুর আল্লামা নজরুল ইসলাম নঈমী সাহেব দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিলেন। ঘোষণা দিলেন, তবলীগ জামাত মসজিদে আসুক, থাকুক। কমিটির লোকজন, মুসল্লীরা হতবাক! হুজুর কেন এ সিদ্ধান্ত দিলেন? রাতে কমিটির ও মুসল্লীদের কয়েকজনকে হুজুর ডাকলেন, কথা বললেন। নির্দেশ দিলেন সবাই যাতে প্রতি ওয়াক্ত নামাজ জামাতসহকারে পড়ে এবং শেষ মুনাজাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে। নির্দেশ মত সবাই জামাতেই অংশ নিলেন, প্রতিটি ওয়াক্তে লোকে লোকারণ্য। এ সময় হুজুর যখন ফজরের নামাজ থেকে এশার নামাজ পর্যন্ত প্রত্যেক নামাজ শেষে মিলাদ ও কিয়াম করা শুরু করলেন তখন আর তাবলীগ জামাতের লোকজন মসজিদ ছেড়ে চলেযেতে উদ্যোগী হরেন। পরের দিন কোনরকমের উচ্চবাচ্য ছাড়া তারা মসজিদ ছেড়ে চলে গেলেন।
এতে সাপও মরল, লাঠিও ভাঙলনা’। হুজুরের জ্ঞানের গভীরতা ছিল প্রশ্নাতীত। সহজসরল জীবনাচার ছিল তাঁর আদর্শ। তিনি একজন আশেকে রাসূল ও ত্বাকওয়াধারী ইসলামী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আল্লাহ, আমাদের সকলের প্রিয় হুজুর কে জান্নাতের উঁচু মকাম দান করুন।

লেখক: সহকারী সম্পাদক