রবি ঠাকুরের বংশ লতিকা ও ঠাকুর বাড়ির ইতিকথা

মেহেরুন্নেছা মেরী

41

বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি তথা বাঙালি জাতিকে বিশ্বের কাছে উন্নীত করেই ক্ষান্ত হননি তিনি বস্তুত বাঙালি জাতিত্ত্বার প্রাণ পুরুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তার বহুদা বিস্তৃত প্রতিভায়। স্বাভাবিক কবি রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি ব্যক্তি মানুষ রবীন্দ্রনাথ কে সহজ সত্যে ধারণ করতে হয়েছে তার পূর্ব পুরুষের উত্তরাধিকারকে । এই বংশজাত উত্তরাধিকারের ঐতিহাসিক ধারায় অবিচ্ছেদ্যভাবে, ভৌগলিক সীমার আবর্তে তিনি আবর্তিত না হয়েও, ভৌগলিক অবস্থানের ঐতিহাসিক পরিচয়কে অস্বীকার করতে পারেননি। আর তাই খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার ৫নং ঘাটভোগ ইউনিয়নের অধীন পিঠাভোগ গ্রাম রবীন্দ্রনাথের পিতৃক‚লের ইতিহাসের সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িত। রবীন্দ্রনাথের জীবন এবং বংশগত ধারা আলোচনা করতে গেলে এই পিঠাভোগ প্রাম এসে দাড়াই অপরিহার্যভাবে, যাকে অস্বীকার করার কোন যৌক্তিক হেতু নেই । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তথা ঠাকুর বংশের পূর্বপুরুষ পিঠাভোগ গ্রামের কুশারী বংশের বিচ্ছিন্ন একটি লতিকা ঠাকুর বংশের পূর্বপুরুষ—-এ সত্য ঐতিহাসিক ভাবে বিস্তৃত । খুলনা জেলা রূপসা উপজেলার ৫ নং ঘাটভোগ ইউনিয়নের পিঠাভোগ এবং ঘাটভোগ ভৈরব তীরবর্তী একটি প্রাচীন জনপদ। ভৈরব অববাহিকার শ্রোতধারা ধরে যে সব জনপদ গড়ে তার অন্যতম প্রাচীন জনপদ পিঠাভোগ-ঘাটভোগ। ইতিহাস সাক্ষীদেয় হযরত খানজাহান আলীর আগমনের প্রায় দুই শতাব্দী আগেই এখানে জনপদ গড়ে ওঠে। পিঠাভোগের আদি গোত্রীয় ব্রাক্ষণ বাসিন্দা কুশারী গোষ্ঠীপতি বংশ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন কুশারী বংশের ১৩তম প্রজন্ম। পঞ্চানন কুশারী ও শুকদেব কুশারী কলকাতায় এসে গোবিন্দপুর গ্রামে হিন্দু সমাজের হরিজন পল্লীতে (নিম্নবর্গীয় ব্রাত্য পল্লী) বসবাস করতে থাকেন। খুলনার পতিত বা পিরালী ব্রাহ্মণদের পেয়ে গোবিন্দপুরের হরিজন পল্লীতে সকলেই খুশি। কারণ ওই গ্রামে আগে কোনো ব্রাহ্মণ ছিল না। হিন্দুদের কাছে ব্রাহ্মণরা ঠাকুর বা দেবতুল্য। গ্রামে ব্রাহ্মণ এসেছে বা ঠাকুর এসেছে। ঠাকুররা সম্মানীয়, তাদের তো বংশ পবদি ধরে ডাকা যায় না। সে কারণে তাদেরকে ‘ঠাকুর’ মহাশয় বলেই ডাকা শুরু হয় । সেই থেকে পঞ্চানন কুশারী হয়ে গেলেন পঞ্চানন ঠাকুর মহাশয়। তাদের নামের সঙ্গে কুশারী পদবি ঢাকা পড়ে যুক্ত হয় ঠাকুর পদবী। পঞ্চানন ঠাকুর কলকাতায় এসে ইংরেজদের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করেন। ইংরেজরা ‘ঠাকুর’ শব্দটি তাদের মতো উচ্চারণ করেন । পঞ্চানন ঠাকুরকে তারা ডাকতেন পঞ্চানন টেগর বলে।
পঞ্চানন কুশারী সম্পর্কে জানার আগে তার বাবা মহেশ্বর কুশারী ও বাবার বাবা রাম গোপাল কুশারী সম্পর্কে কিছু জানা দরকার ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব-পুরুষদের বংশ পদবি ছিল ‘কুশারী’। তারা ছিলেন ‘পিরালী’ ব্রাহ্মণ (পতিত ব্রাহ্মণ)। পিঠে ভোগ গ্রামের জগন্নাথ কুশারী (দ্বিতীয় ভ্রাতা পুরুষোত্তম কুশারী, বিদ্যাবাগীশ) বিয়ে করেছিলেন খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণ ডিহি গ্রামের (যে গ্রামে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুর বাড়ি) শুকদেব রায় চৌধুরীর এক মেয়েকে। যার মধ্যদিয়ে পিঠে ভোগ গ্রামের সঙ্গে দক্ষিণ ডিহি গ্রামের আত্মীয়তার স¤পর্ক সূচিত হয়। পরে অবশ্যই এই দক্ষিণ ডিহি গ্রামের সঙ্গে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের বহুমুখী আত্মীয়তার সম্পর্ক গাঢ়বদ্ধ হয়। কুলীন ব্রাহ্মণ হওয়া সত্ত্বেও জনগন্নাথ কুশারী দক্ষিণ ডিহি গ্রামের পিরালী ব্রাহ্মণ শুকদেব রায় চৌধুরীর মেয়েকে বিয়ে করার কারণে তিনি সমাজে পিরালী বা পতিত হয়ে পড়েন। ফলে সেই থেকে কুলীন ব্রাহ্মণ কুশারী বংশের সকলেই পিরালী ব্রাহ্মণে পরিগণিত হন সমাজে। এক সময়ে জগন্নাথ কুশারী পিঠে
ভোগ গ্রামের বিপুল ভূসম্পদ ফেলে রেখে তার শ্বশুর বাড়ি দক্ষিণ ডিহি গ্রামে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। জগন্নাথ কুশারী ছিলেন তার পিতা রামগোপাল কুশারীর প্রথম পুত্র। রামগোপালের এক পুত্রের নাম মহেশ্বর কুশারী আর এক পুত্রের নাম শুকদেব কুশারী। জগন্নাথ কুশারী দক্ষিণ ডিহি চলে গেলেও তার ভাই মহেশ্বর ও শুকদেব পিঠে ভোগ গ্রামেই বসবাস করতে থাকেন। একপর্যায়ে মহেশ্বর কুশারীর ছেলে পঞ্চানন কুশারী ও তার কাকা শুকদেব কুশারী পারিবারিক কলহ ও অর্থসঙ্কটের কারণে খুলনার পিঠে ভোগ গ্রাম ছেড়ে জীবন-জীবিকা ও ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য করে অর্থ উপার্জনের আশায় কলকাতায় চলে যান।
পঞ্চানন ঠাকুরের পুত্রের নাম জয়রাম ঠাকুর। তিনি ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমিন। তিনি এ পেশার মধ্যদিয়ে বিপুল অর্থ আয় করেন। জয়রাম ঠাকুরের চার পুত্রের মধ্যে নীলমনি ঠাকুর ও দর্প নারায়ণ ঠাকুর যথাক্রমে জোড়াসাঁকো ও পাথুরিয়া ঘাটা ঠাকুর পরিবারের আদিপুরুষ। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে নীলমনি ঠাকুর ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির উড়িষ্যার রাজস্ব বিভাগে চাকরিতে যোগদান করেন। দু’ভাইয়ের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে কলহের সৃষ্টি হলে নীলমনি ঠাকুর ১ লাখ টাকা নিয়ে বাকি সব কিছু ছোট ভাই দর্পনারায়ণ ছেড়ে দিয়ে জোড়াসাঁকোয় বাড়ি তৈরি করেন। আর দর্পনারায়ণ বাড়ি করেন পাথুরিয়া ঘাটায়। জোড়াসাঁকোর পূর্ব নাম মেছো রাজার নীলমনি ঠাকুরের হাতেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির ইতিহাস শুরু। অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে এ ঠাকুর বাড়ির সুনাম ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং উনিশ শতকের শুরুতে এ ঠাকুর বাড়ি কলকাতা শহরে পরিচিতি
ও প্রতিষ্ঠা লাভ করে। নিজস্ব অবস্থান ও স্বকীয়তা সৃষ্টি করে। নীলমনি ঠাকুরের তিন পুত্র ছিল। এরা হলেনথ রামলোবন ঠাকুর, রামমনি ঠাকুর ও রামবল্লভ ঠাকুর। রামলোবন ঠাকুর ছিলেন নিঃসন্তান।
তিনি এক দত্তক পুত্র (আরেক ভাই এর পুত্র) গ্রহণ করে। তার নাম দ্বারকানাথ। দ্বারকানাথ ঠাকুর (১৭৯৪-১৮৪৬) এর সময়েই ঠাকুর বাড়ির মান-সম্মান, যশ-খ্যাতি, অর্থ ও প্রতিপত্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। তিনি ব্রিটিশ বেনিয়াদের সঙ্গে জাহাজের ব্যবসায় প্রচুর অর্থসম্পদ অর্জন করেন। ব্রিটিশরা তাকে ‘প্রিন্স’ পদবিতে আখ্যায়িত করেন। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর তখন কলকাতার এক উজ্জ্বল বাঙালি ব্যক্তিত্ব। তিনি জোড়াসাঁকোয় জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের কুষ্টিয়া শিলাইদহে, নওগাঁর পতিসরে ও পাবনার শাহাজাদপুরে জমিদারি লাভ করেন। দ্বারকানাথ ঠাকুরের ছিল ৬ সন্তান। জন্মের কিছুকাল পরেই প্রথম কন্যাসন্তানের মৃত্যু হয়। পুত্র সন্তানরা হলেনথ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭- ১৯০৫), নরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভুপেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নগেন্দ্রনাথ ঠাকুর। দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুর (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা) ছিলেন সমাজ সংস্কারক ও জ্ঞানানুরাগী। ১৮৪৩ সালে তিনি রাজা রামমোহন রায়ের প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। ব্রাহ্মধর্মনুসারীরা ছিলেন নিরাকার ও একেশ্বরবাদী। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতায় ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠাসহ ধর্ম ও সত্য রক্ষার্থে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। এ জন্য ঋষিতুল্য এ ব্যক্তিটি ‘মহর্ষি’ উপাধি লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর বন্ধু তথা সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্মের প্রধান সংগঠক ও অনুশাসনকর্তা। রামমোহন রায়ের মৃত্যুর পর দেবেন্দ্রনাথই হয়ে ওঠেন ব্রাহ্মসমাজের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব।
তাঁর অনুগামীরা তাঁকে মহর্ষি অভিধায় ভ‚ষিত করে। আমৃত্যু দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন আদি ব্রাহ্মসমাজের নেতা। অস্পশ্যতা প্রথার কারণে কেবল মাত্র পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) যশোর-খুলনার পিরালী ব্রাহ্মণকন্যারাই ঠাকুর পরিবারের বধূ হয়ে আসতেন।
রবীন্দ্রনাথের ২২ বছর বয়সে বিবাহ হয় দক্ষিনডিহি গ্রামের বেনীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারিনী ওরফে মৃনালীনি দেবীর সাথে। পিতৃকূল-মাতৃকূল এবং শ্বশুরক‚লের সুবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার ৫ নং ঘাটভোগ ইউনিয়নের পিঠাভোগ গ্রামের কুশারী বাড়ী এবং ফুলতলা উপজেলার দক্ষিনডিহি রায় চৌধুরী বাড়ী অঙ্গাঙ্গীন ভাবে জড়িত
এ কথা ভাবতেই ভীষণ ভাল লাগছে যে আমার এ পূর্ব বাংলা (বাংলাদেশ) কবি গুরু রবীন্দ্রনাথকে বুকে ধারন করেনি কেবল… বেধেছে নাড়ীর বাঁধনেও । পশ্চিম বাংলার বাঙালিরা যেমন অহঙ্কারে বুক বাঁধে আমরা ও তেমনি আবেগ আপ্লুত হই এই পিঠে ভোগ গ্রামের কুশারী বাড়ি নিয়ে।