রঙের পুতুল

নীতুল ইয়াছমিন

8

চৈত্রের শেষ বিকালে বসন্ত বিদায় নিয়েছে। বৈশাখী আমেজ ঘরে ঘরে শুভ নববর্ষ জানাতে ব্যস্ত সবাই। ভোর হতেই নববর্ষের আগমন। নববর্ষের সাজে সেজেছে সবাই। শিশুরা সাজে তাদের নিজের মত করে। ঋতু সেজেছে আজ মেলায় যাবে।
-বাবা, বাবা -আমি মেলায় যাবো।
-হ্যা যাবে মা, আমি তোমাকে নিয়ে যাবো।
একথা শুনে ঋতু খুশিতে দৌড়ে গিয়ে তার মাটির ব্যাংক নিয়ে আসে।
-বাবা এটা ভেঙে দাও।
-কেনো মা এটা ভাঙবে?
-এটার ভিতর অনেক পয়সা আছে।
-পয়সা দিয়ে করবে মা?
-আমি মেলায় গিয়ে, অনেক কিছু কিনে আনবো।
-মেলায় গিয়ে আমিতো কিনে দেবো, এটা রেখে আসো মা।
-তাহলে কিন্তু আমি কিছুই নেবো নাএটা ভেঙে না দিলে!
বাবাকে বেশ কয়েকবার বলল ঋতু। বাবা ছিলো একটু অন্যমনস্ক। তাই ঋতুর আর দেরি সহ্য হচ্ছিলো না। হাত থেকে মাটির ব্যাংকটা ফ্লোরের উপর ধপাস করে ছেড়ে দিলো। ব্যাংক ভেঙে চৌচির। পয়সাগুলো সারা ফ্লোর ছড়িয়ে গেলো। তখন বাবা তাকালো ঋতুর দিকে।
-তোমায় না বললাম আমি কিনে দেবো!
-তুমি কেনো কিনে দেবে বাবা? আমার তো পয়সা আছে।
এবার বাবা হাসতে থাকে। আর ঋতু পয়সা কুড়িয়ে নিজের গায়ের জামাটাকে ব্যাগ বানিয়ে সেখানে রাখতে থাকে। কুড়ানো শেষ হলে আবার বাবার কাছে গিয়ে বলে,
– বাবা পয়সাগুলো গুনে দাও!
-তুমিই তো গুনতে পারো মা! তুমিতো এখন স্কুলে পড়। তুমি গুনতে শুরু করো। ভুল হলে আমি বলে দিবো।
এবার পয়সাগুলো গুনতে থাকে ঋতু। এক সময় গুনে শেষ করে। সর্বমোট ১৪৩ টাকা হয়। খুব খুশি ঋতু -অনেক টাকা তার।
-বাবা চলো মেলায় যাবো।
-হ্যা মা যাবো আমি রেডি হয়ে নিই।
-আচ্ছা বাবা, তবে একটু তাড়াতাড়ি করবে। কারণ দেরি হয়ে গেলে কিছুই পাবোনা।
এবার বাবা আবারো হাসে।
তারা বিকেল বেলায় মেলায় চলে গেলো। মেলায় ঢুকেই ঋতু অনেক খুশি।
-বাবা, বাবা সব কিছুই রঙিন দেখছি। আমি নাগরদোলায় চড়বো।
-ঠিক আছে মা!
ঋতু নাগরদোলায় উঠলো,পুতুল নাচ দেখলো, মেলায় বানানো গরম জিলাপিও খেলো। এখন সে খেলনা কিনবে। বাবা সাথে করে খেলনার দোকানে নিয়ে গেলো। অনেক রকমের খেলনা কিনলো এবং খুশিও হলো।
-মা এবার আমরা বাসায় ফিরে যাবো।
-জ্বি বাবা চলো।
মেলা থেকে বের হতে যাবে, ঠিক তখনি চোখ পড়ে ঋতুর নানা রঙে সাজানো মাটির পুতুলের দিকে।
-বাবা আমি পুতুল নেবো।
-ওটা তো মাটির, ভেঙে যাবে। তোমাকে তো অনেক খেলনা কিনে দিয়েছি।
-না বাবা আমি নেবোই। দেখ েেদখ বর পুতুলটা আমার দিকে কিভাবে চেয়ে আছে!
এই বলে ঋতু কিছু পয়সা বের করে দিলো বাবার হাতে।
-আমার পয়সা দিয়ে কিনে দাও বাবা!
এখন বাবা দেখছে মেয়ে নাছোড়বান্দা। তাই অবশেষে একটা বর পুতুল কিনে দিলো বাবা। পুতুলটা পেয়ে ঋতু অনেক খুশি। কিন্তু হঠাৎ তার মনে হলো, কনে না হলে পুতুল বিয়ে কেমনে হবে! এবার বাবার কাছে আবার বায়না- আমাকে আরেকটা কনে পুতুল কিনে দাও। আমি পুতুল বিয়ে দিবো। বাবা হাসে মেয়ে বলে কি!
মেয়ের সমস্ত বায়না মিটিয়ে বাসার উদ্দেশ্য রওনা হলো রিক্সায় করে। বাসার সামনে এসে গেছে। রিক্সা থেকে নামবে। হঠাৎ হাত ফসকে পড়ে গেলো। বর পুতুলটি পাকা রাস্তায়, আর সাথে সাথেই ভেঙে গেলো রঙের পুতুলের হাত পা। চিৎকার দিয়ে উঠলো ঋতু।
-বাবা আমার আমার বর মরে গেছে, বলেই কাঁদতে থাকলো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।
বাবা সান্তনা দিতে থাকে ঋতুকে,
-মা! তোমাকে আরেকটা রঙের পুতুল কিনে দিবো।
কিন্তু ঋতুর কান্না কোনভাবেই থামছে না। মনে হয় সে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছে। কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ঘুমিয়ে গেলো আর স্বপ্ন দেখতে লাগলো রঙের পুতুল বিয়ে।