নগরীর চার ফ্লাইওভার

রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনকে দেয়ার সিদ্ধান্ত

ওয়াসিম আহমেদ

21

নগরীতে অবকাঠামোর উন্নয়ন করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। উন্নয়ন শেষে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে (চসিক) রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হস্তান্তর করবে এটাই আইন। তবে সবকিছুর বেলায় আইন মানতে সমস্যা না থাকলেও ফ্লাইওভার নিয়ে হঠাৎ নাটকীয়তা শুরু করেন সিডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। ফ্লাইওভার চট্টগ্রামে ‘নিউ কনসেপ্ট’ দাবি করে কৃতিত্ব নেওয়ার আবেগকে আইনে পরিণত করতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই ফ্লাইওভার রক্ষণাবেক্ষণ করতে কখনও নিচে খালি জায়গায় দোকান, আবার কখনও ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা ) বহির্ভূত টোল আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন। জনরোষের মুখে তিনি সবক’টি সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিলেন। অবশেষে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে সিডিএ কর্তৃক বাস্তবায়িত চারটি ফ্লাইওভার চসিককে হস্তান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের পরেই ফ্লাইওভারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বুঝে নিবে সিটি কর্পোরেশন।
গতকাল বুধবার গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর সভাপতিত্বে এই বিষয়ে পূর্বনির্ধারিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ও সিডিএ’র প্রতিনিধি প্রধান প্রকৌশলী হাসান বিন শামস্ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সিডিএ কর্তৃক বাস্তবায়িত আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার, বহদ্দারহাট জংশনে এমএ মান্নান ফ্লাইওভার, দেওয়ানহাট জংশনে ফ্লাইওভার ও কদমতলী ফ্লাইওভার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চসিককে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয় বলে জানা গেছে। সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফ্লাইওভারগুলো সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করা হবে। এরপর থেকেই রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিবে সিটি কর্পোরেশন।
তবে ফ্লাইওভারে উপরে বৃষ্টির পানি জমা নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সংস্থাটি। পূর্বদেশকে এমনটাই জানিয়েছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়মানুযায়ী ফ্লাইওভারগুলো সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করা হবে। আমরা বুঝে নেওয়ার পর নির্মাণে যেসব ত্রæটি রয়েছে, সেগুলো ঠিক করার চেষ্টা থাকবে। যাতে উপরে পানি জমতে না পারে। ফ্লাইওভারগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা কোনো প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে মেয়র বলেন, এটা পরিস্থিতি ‘ডিমান্ড’ করবে।
অবশ্য, সিডিএ ফ্লাইওভারগুলোর বাস্তবায়নের পর সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করতে নারাজি প্রকাশ করে। নিজস্ব ‘ক্রেডিট’ দাবি করতে মূলত এমন নাটকীয়তার জন্ম দেন তৎকালীন সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মেটাতে না পারে বেকায়দা পড়ে সংস্থাটি। ফলে কখনও ফ্লাইওভারে নিচে দোকান বসানো, আবার কখনও টোল আদায়ের চেষ্টা চালায়। পরে নগরীর অন্যান্য সেবা সংস্থা ও জনরোষের মুখে এসব সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় সিডিএ। সিডিএ চেয়ারম্যানের বিদায়ের পর মন্ত্রণালয় ফ্লাইওভারগুলো কর্পোরেশনকে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেয়। এরই প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ে গতকাল সভা অনুষ্ঠিত হয়।
জানা গেছে, বাস্তবায়নের পর থেকে সিডিএ ফ্লাইওভারগুলো রক্ষণাবেক্ষণসহ সার্বিক দেখভালের দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। এতে করে ফ্লাইওভারগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। ফ্লাইওভারগুলোতে ব্যবহৃত লাইটের অনেকগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। বিল পরিশোধ না করায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় রাতে অন্ধকারচ্ছন্ন হয়ে পড়ে ফ্লাইওভার। ফলে রাতে যানবাহন চলাচল অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এছাড়াও ফ্লাইওভারগুলোর রেলিংয়ের অনেক অংশে স্টিল ও লোহার পাইপসহ লৌহজাত সামগ্রী চুরি হয়েছে।
এছাড়া রাতে ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচলে নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রতিটি ফ্লাইওভারের ওপর বালির স্তর-ময়লা-আবর্জনার স্ত‚প জমে আছে। এর ফলে বৃষ্টিতে ফ্লাইওভারের পানি নির্গমনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বৃষ্টি হলে নিচের সড়কের মতোই ফ্লাইওভারের ওপরও পানি জমে যায়। ফ্লাইওভারসম‚হ নির্মাণের সময় ওপর থেকে নিচে পানি প্রবাহের যে নালা তৈরি করা হয়েছিল রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে ফ্লাইওভারের ওপরে এবং নিচে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার ছাড়া বাকি তিনটি ফ্লাইওভারের নিচের অংশে করা ফুলের বাগান বর্তমানে ময়লা-আবর্জনা এবং বখাটেদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।
নগরীর মূল সড়কের ওপর নির্মাণ করা ফ্লাইওভারগুলো নিয়ে প্রথম থেকেই নগর পরিকল্পনাবিদদের একটি অংশের আপত্তি ছিল। কিন্তু এরপরও বিপুল অর্থ ব্যয়ে সিডিএ ফ্লাইওভারগুলো নির্মাণের পর একাধিকবার ব্যবহার সীমিত পর্যায়ে দেখা যায়। তাছাড়া ফ্লাইওভারগুলো নির্মাণের সময় এবং পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সঠিক পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় এ সব দুর্ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। এছাড়াও ড্রেনেজ সিস্টেমের ত্রæটির কারণে জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।
এদিকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ফ্লাইওভারের নিচে ১৪টি দোকান ও তিনটি সুপারশপ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। এসময় জাস্টিস ফাউন্ডেশন নামের একটি মানবাধিকার সংগঠনের করা রিটে ফ্লাইওভারের নিচে সড়ক বিভাজকের ওপর দোকান নির্মাণের ওপর ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে হাইকোর্ট। পরে গাড়ি থেকে টোল আদায় করে খরচ মেটাতে চায় সিডিএ। তৎকালীন চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হলে মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মতামত চায়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন টোল ছাড়াই ফ্লাইওভারগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণে নিজেদের মতামত প্রদান করে। ঐ মতামত পাওয়ার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গত ১৪ জুলাই গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে ফ্লাইওভারসমূহ সিটি কর্পোরেশনের নিকট হস্তান্তরের অনুরোধ জানায়। এদিকে সিডিএ’র পক্ষ থেকেও ফ্লাইওভারগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিটি কর্পোরেশনের নিকট হস্তান্তরের ব্যাপারে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে পত্র দিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ফ্লাইওভারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়।