যৌতুকপ্রথা : সামাজিক ক্যান্সার

ডা. অঞ্জনা দত্ত

22


দিন কয়েক আগে মুখো বইতে একজন একটি চিঠি পোস্ট করেছিলেন। চিঠিটি লিখেছিলেন ‘চট্টগ্রামের এক বাবা’। চট্টগ্রামের লোকদের নিজস্ব কিছু আচার-সংস্কৃতি রয়েছে। ঐ বিষয়ে পরে আলোচনা করার ইচ্ছা রইলো। যৌতুকপ্রথা হলো বিয়ের সময় কন্যার পিতা পাত্রকে অথবা পাত্রের বাবাকে টাকা, সোনার গয়না, কখনো কখনো জমি (এটা প্রাচীনকালে ছিল) এবং পাত্রপক্ষের আরও অন্য কোন চাহিদা থাকলে সেগুলি মেটানো। যৌতুক নেয়ার ক্ষেত্রে অনেকসময় কেউ না কেউ মধ্যস্থতা করে থাকত। এছাড়া ‘কনের মূল্য’ (ইৎরফব চৎরপব) নামক আর একটি প্রথা প্রচলিত ছিল। এটি পরিশোধ করতে হতো পাত্র পক্ষকে। এটা অনেকটা কনে বিয়ের পূর্বে পিতৃগৃহে যে কাজ করতো এখন বিয়ের পরে সেটি শ্বশুর বাড়িতে করবে তার একটা মূল্য দেয়া।
যৌতুক প্রথা ঠিক কবে থেকে প্রচলিত হয়েছে সে ব্যাপারে সঠিক ধারণা পাওয়া যায় না। মূলত এই বিষয়টি সনাতন ধর্মে প্রচলিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি বিগত বহু বছর যাবত প্রিন্ট মিডিয়ায় আমরা প্রায়শ দেখতে পাই আমাদের দেশে যৌতুকের বলি ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মাঝে আশংকাজনকভাবে বাড়ছে। অথচ ইসলাম ধর্মে যৌতুক দেয়া নিষিদ্ধ কি না জানি না সঠিক, তবে প্রচলন নেই। বরং ইসলাম ধর্মে যৌতুক নেয়ার পরিবর্তে পাত্রের আয় অনুযায়ী কনের জন্য দেন মোহরের ব্যবস্থা রয়েছে ।
এটি বিয়ের দিনেই লিখিতভাবে পাত্র অঙ্গীকার এবং একটা অংশ পরিশোধ করে থাকে। ইসলাম ধর্ম অনুসারীদের মাঝে যৌতুক দেয়া নেয়া নিয়ে পরে আলোচনা করবো। তার আগে দেখে নেই সনাতন ধর্মে এতদসংক্রান্ত কি প্রচলন আছে। হিন্দুধর্মকে সনাতন ধর্ম নামে অভিহিত করা হয়। পৃথিবীতে এটি অন্যতম প্রাচীন ধর্ম। এই ধর্মের উৎপত্তি ঠিক কখন হয়েছিল সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নেই। মানব সভ্যতার ইতিহাস সৃষ্টির কাল হতে সনাতন ধর্মে বিশ্বাসীদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। সিন্ধু সভ্যতাকে অন্যতম আদি সভ্যতা হিসাবে গণ্য করা হলে সনাতন ধর্মকে পৃথিবীর আদি ধর্ম হিসাবে মেনে না নেয়ার অবকাশ নেই।
ঠিক কখন থেকে যৌতুকপ্রথা চালু করা হয় সে সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা না গেলেও হিন্দু প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে এর উল্লেখ রয়েছে। প্রথম যৌতুক প্রথার কথা জানা যায় দক্ষিণ এশিয়ায়। মনুসংহিতার ২০০০ বছর আগেও ‘স্ত্রীধন’ নামে কন্যাদের বিয়ের সময় উপহার দেওয়া হত। এমনকি কন্যার পিতা তার মেয়েকে বিয়ের দিন তার সম্পত্তির একটা অংশ উইল করে দিত। পরবর্তীতে স্ত্রীধন ‘কন্যাদান’ নামে অভিহিত হয়। কন্যাদান শব্দটি ‘দান’ শব্দ হতে আসে। কন্যার পিতা তার মেয়েকে উপহার হিসাবে দান করতেন পাত্রকে। এছাড়াও মেয়ের বাড়ি থেকে অন্য উপহারও দেয়া হতো মেয়েকে। এতে মেয়ের বাবার সম্মান বৃদ্ধি পেত।
যৌতুক প্রথার প্রথম দিকে মনে করা হতো কন্যারা পিতার যে উত্তরাধিকার প্রাপ্ত হচ্ছে এটা শ্বশুর বাড়িতে মেয়েটির নিরাপত্তা অথবা রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করবে। তবে অনেক সময় দেখা যেত যে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি হতে তার পিতার বাড়ির সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করা হতো। এই জন্য কালের আবর্তনে উচ্চ বর্ণীয় সমাজপতিরা তাদের সুবিধার্থে সামাজিক অনেক নিয়ম-কানুন বদলালেন। যেমন যৌতুক দাবি করতে পারতেন শুধু ব্রাহ্মণশ্রেণীভুক্তরা। পিতার উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত হলো কন্যারা।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে যৌতুক প্রথা এমন আকার ধারণ করলো যে অনেক ক্ষেত্রে মেয়ের বাবার পক্ষে পাত্র পক্ষের দাবি-দাওয়া পূরণ করা সম্ভব হতো না। পিতা-মাতারা কন্যাশিশুকে বোঝা ভাবতে শুরু করলো। ইদানিং বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সুযোগে নারীরা যখন জানতে পারতো যে তার কন্যা সন্তান জন্মাবে তখন তারা এবরশন করিয়ে ফেলতো। অনেক সময় যৌতুক ঠিকমত পরিশোধ করতে না পারলে শ্বশুর বাড়িতে বৌ এর উপর অত্যাচার হতো অথবা বৌটি বাধ্য হতো আত্মহননের পথ বেছে নিতে। এটি এখন আমাদের সমাজে ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতে ১৯৬১ সালে যৌতুক বিরোধী আইন পাশ করা হয়। এর আগে পিতার সম্পত্তিতে কন্যাদের সমধিকার রেখে ১৯৫৬ সালে একটি আইন পাশ করা হয়। তবে মুসলিমদের জন্য শরীয়া আইন বলবৎ থাকবে মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় ।
যৌতুক বিরোধী আইন পাশ হলেও এটি সাধারণত মানা হতো না। ভারতীয় পেনাল কোড সেকশন ৪৯৮ এ অনুযায়ী কোন স্ত্রী যদি তার উপর যৌতুকের জন্য নির্যাতন করে মর্মে স্বামী অথবা শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে নালিশ করে তাহলে ঐ উল্লেখিত ধারা বলে তাদের গ্রেফতার করা যাবে। তবে অনেক সময় এই আইনটির অপব্যবহার হওয়ায় ভারতীয় সুপ্রীম কোর্ট ২০১৪ সালে এক রুল জারি করেন যে কোন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আসামিদের গ্রেফতার করতে হবে।
বাংলাদেশে যৌতুক বিরোধী এ্যাক্ট ১৯৮০ সালে পাশ করা হয়। কিন্তু এই এ্যাক্টে শুধু যৌতুক চাওয়া এবং দেয়া নিষিদ্ধ করা হয়। যৌতুকের জন্য কোন শারীরিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। এই এ্যাক্টটি তিনবার পরিবর্তন করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার ২০১৭ সালে যৌতুক বিরোধী এ্যাক্ট ২০১৭ ক্যাবিনেটে পাশ করে। এই এ্যাক্ট অনুযায়ী কোন স্ত্রী যদি শ্বশুরবাড়িতে যৌতুকের কারণে সুইসাইড করতে বাধ্য হয় তাহলে আসামির জরিমানাসহ ১৪ বছর সশ্রম কারাদÐ হবে। এছাড়া কোন স্ত্রী যৌতুকের জন্য যদি নির্যাতিত হয় তাহলে ১২ বছরের সশ্রম কারাদÐ হবে ।
যদিও ইসলাম ধর্মে যৌতুক প্রথা প্রচলিত নয়, তারপরেও সা¤প্রতিককালে বহু মুসলিম নারী যৌতুকের বলী হচ্ছেন। যদি যৌতুক বিরোধী এ্যাক্ট ২০১৭ কার্যকর হয় তাহলে আশা করা যায় আমাদের দেশের নারীরা এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।
এখন আমরা আমাদের দেশে অঞ্চলভেদে বিবাহ সংক্রান্ত কিছু রীতি নিয়ে আলোচনা করতে চাই। এই প্রবন্ধের প্রথমেই সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা ‘চট্টগ্রামের এক বাবার চিঠি’র কথা বলা হয়েছে। আমাদের দেশে অঞ্চলভেদে বিয়ের রীতি-নীতি বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। যেহেতু এখানে সুনির্দিষ্টভাবে একটি অঞ্চলের কথা বলা হয়েছে আমরা সেটি নিয়েই আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো। চট্টগ্রামে হিন্দু-মুসলিম উভয় স¤প্রদায়ের মাঝে কিছু প্রথার প্রচলন রয়েছে। যে প্রথাগুলি মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবার পক্ষে মেটানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
যেমন- উভয় স¤প্রদায়ে প্রায়শ দেখা যায় বরযাত্রীর সংখ্যা দুই পক্ষের মাঝে আলোচনার নির্ধারিত সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। অনেক সময় সহস্রাধিকও হয়। এত বরযাত্রী আপ্যায়নে যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে কনেকে শ্বশুরবাড়িতে অনেক গঞ্জনা সইতে হয়। বিয়ে হলো দুটো পরিবারের মাঝে একটি মিষ্টি সম্পর্কের বন্ধনে তৈরি হওয়া। নতুন সম্পর্কের যাত্রা শুরু হওয়া। অথচ অনেক সময় এটি শুরু হয় তিক্ততার মাধ্যমে। যৌতুক বিরোধী এ্যাক্ট থাকা সত্তে¡ও এই নিয়েও কথা কাটাকাটি থেকে শুরু করে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির শুরু হয়। যার মাশুল গুনতে হয় পরবর্তীতে বিয়ের কনেকে।
সহস্রাধিক বরযাত্রীসহ বিয়ে করতে আসার পরেও বিয়ের পরপরই জামাইভাতি করতে হয় হিন্দু স¤প্রদায়ে। ঐদিন জামাই তার বন্ধুদের নিয়ে আসে কনের বাড়িতে। অনেক সময় এই সংখ্যাও কয়েকশত ছড়িয়ে যায়। এই উপলক্ষে মেয়ের বাবাকে বিয়ের অনুষ্ঠানের চাইতেও উন্নত মানের খাবার আয়োজন করতে হয়। এরপরে থাকে বেয়াইভাতি। অনেকক্ষেত্রে পাত্রের পিতা এবং তদস্থানীয়রা বেয়াইভাতি ছাড়া কখনো কনের বাবার বাড়িতে ভাত খাবে না। কাজেই এই অনুষ্ঠানটি করাও অনেকটা বাধ্যতামূলক। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই আচারগুলি পালন করা এক ধরনের অত্যাচার বিশেষ। আর যে পিতার একাধিক কন্যাসন্তান রয়েছে তার অবস্থা সহজেই অনুমেয়। এছাড়া রয়েছে অন্তত বিয়ের প্রথম বছর পাত্রের বাড়িতে পূজার কাপড়-চোপড় পাঠানো।
সচরাচর যে আচারগুলি ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পরিবারে প্রচলিত তাহলো রমজান মাসে মেয়ের বাড়ি হতে পাত্রের বাড়িতে ইফতারি পাঠানো। পরিমাণ বলতে হলে বলতে হয় যে কখনো ইফতারির খাবার পাঠাতে ভ্যানগাড়ি ভাড়া করতে হয়। কাপড়-চোপড় তো দিতেই হয়। কোরবানি ঈদের সময় গরু পাঠানো, শবে বরাতের সময় হালুয়া রুটি, মহররমের সময় চালের রুটি, মুরগির মাংস ইত্যাদি মেয়ের বাড়ি থেকে বরের বাড়িতে পাঠাতে হয়। পরিমাণ তাদের পছন্দমত না হলে মেয়েটির কি অবস্থা হয় সেটি বোঝা কঠিন কিছু নয়। উচ্চবিত্তদের জন্য এইগুলি পালন করায় অর্থনৈতিকভাবে কোন সমস্যার সৃষ্টি করে না। সমস্যা হয় মধ্যবিত্ত পরিবারে যারা না পারেন অর্থনৈতিকভাবে সংস্থান করতে, না পারেন নিজেদের মেয়েটির গঞ্জনা সইতে হবে ভেবে মুখ ফুটে বলতে যে তারা তাদের সামর্থ্যরে বাইরে কিছু করতে পারবেন না। ধার-দেনা করে তারা দীর্ঘকাল যাবত চলে আসা এইসব রীতি পালন করেন।
আর নিম্নবিত্ত পরিবারে তো সংসার ভাঙ্গনের মুখে এসে দাঁড়ায়। এটি এখন সময়ের দাবি অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইনসহ যৌতুক বিরোধী এ্যাক্ট ২০১৭’তে সংশোধনী এনে এই অর্থহীন লোকাচারগুলি বেআইনি ঘোষণা করা এবং কঠোরভাবে প্রয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এই যৌতুক বিরোধী এ্যাক্ট ২০১৭ সংশোধনীসহ সংসদে আইন হিসাবে পাশ করা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি আইন হিসাবে পাশ হলে প্রয়োগের রাস্তা সুগম হবে। বেঁচে যাবে অনেক পরিবার সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়া থেকে।
বেঁচে যাবে যৌতুকের বলী হওয়া থেকে বহু অসহায় নারী। এই সামাজিক ক্যান্সার থেকে মুক্ত হতে পারলে আমরা ইতোমধ্যে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য যা কিছু অর্জন করেছি তার সাথে যোগ হবে আর একটি পালক, যেটি পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বর্তমান সরকারের গতিশীল নেতৃত্বে সে দিনটি করায়ত্ত করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এ ব্যাপারে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক : সাবেক প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম বন্দর হাসপাতাল