যোগাযোগ, যানজট, গণপরিবহন ও সবুজাভ চট্টগ্রাম

চৌধুরী মো. মাহবুবুল আলম

94

চট্টগ্রাম ক্রমেই বসবাস অযোগ্য নগরীতে পরিণত হচ্ছে। এ নিয়ে লেখালেখি, আলোচনা কম হয়নি। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম এখন রুগ্ন শহরে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রামের উন্নয়ন রাজনৈতিক নেতাদের কোন্দল, ইগো প্রবলেমে আটকে পড়েছে। নগরীর অভিভাবক চসিক, সিডিএ এর সমন্নয়হীনতা। ওয়াসার খুঁড়াখুঁড়ির কারণে রাস্তাগুলোর বেহাল অবস্থা। বৃষ্টিতে কাদায় মাখামাখি ও রোদেলা সময়ে ধুলোবালির কারণে নগরবাসীর ভোগান্তির শেষ নেই। রাস্তায় বের হবার কথা মনে হলে ভয়াবহ  যানজটের কবলে পড়ে সিদ্ধ কষ্টে হবার মুহূতের্র কথা ভেবে ভয়ে ধুক করে উঠে। সেই ভয়ের সাথে যোগ হয়েছে ভাঙ্গাচোরা রাস্তা, গণপরিবহন সংকট ও যাত্রী হয়রানী সমস্যা। এসব সমস্যার ভেতর নিত্যদিন জীবন-যাপন করছে চট্টগ্রামবাসী। রাস্তার পিচঢালাই উঠে গিয়ে ধানি ক্ষেতের রূপ নিয়েছে। সড়কের সবর্ত্র ভাঙ্গনের রুগ্ন চিত্র। বিভিন্ন স্থানে ছোট বড় গর্তে ভরা। গাড়িতে চড়ে চলাতো দূরের কথা হেঁটেও চলাদায়। গাড়ি চলছে হেলেদুলে। ঝাঁকুনি যেন মরণ ঝাঁকুনি। শরীরের সর্বত্র ব্যথায় ভরে যায়। যারা এসব ভাঙ্গাচোরা রাস্তায় প্রতিদিন আসা-যাওয়া করেন তাদের শারীরিক, মানসিক অবস্থা বর্ণনাতীত। গত ১৩/৮/২০১৭ ইং নগরীর নিমতলা রোডে ট্রেইলার উল্টে তিনজন নিহত হয়। রাস্তা এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এ বছরের অতিবর্ষণে নগরীর ১ হাজার ৬৬ কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ৩০০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়ক সংস্কারে যদি স্বচ্ছতা, ঠিকাদারদের জবাবদিহিতা  নিশ্চিত করা হয় তাহলে কাজের মান ঠিক থাকবে। কমবে দেশের অর্থ অপচয় ও জনদুর্ভোগ। ওয়াসার খুঁড়াখুঁড়ির কারণে নগরীর রাস্তাগুলোর বেহালদশা ও যানজট সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। একদিকে ভাঙ্গাচোরা রাস্তা অন্যদিকে যানজট দুটোর কবলে পড়ে মানুষের অসহনীয় কষ্টের যেন শেষ নেই। উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা, বধিরতা, মানসিক অস্থিরতা, শারীরিক বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে গাড়ির যন্ত্রাংশ, ঘটছে আহত মানুষ। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে যানজটের ভয়াবহতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কর্মঘণ্টা।

যানজট নিয়ে কম হয়নি আলোচনা, লেখালেখি। তারপরেও যানজট কমেনি বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত রমজানে ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতায় কিছুটা দুর্ভোগ কমেছিল। কিন্তু সেটা স্থায়ী হয়নি। আবারো পুরনো ভয়াবহতার চিত্র। ট্রাফিক বিভাগের কর্মপরিকল্পনার শেষ নেই। কিন্তু কোনভাবে যানজট কমেনা। কিছু অসাধু ট্রাফিক পুলিশ প্রকাশ্যে চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত। এখন আর ঘুষগ্রহণের মত হীনকাজে অত লাজ শরমের বালাই নেই। পুরাতন লক্করঝক্কর গাড়ি, চালক, জনগণের আইন না মানার প্রবণতা। চালকদের আইন না মানার প্রবণতাটাই বেশি। অভিজাতদের অনেকে আইন মানতে চায় না। নিজে চলে উল্টো পথে চলে আর বকাবকি করে রিক্শাওয়ালাকে। তাই অসম প্রতিযোগিতা একদিকে যেমন মৃত্যু দুর্ঘটনা বাড়ায়, তেমনি যানজটেরও কারণ। ফুটপাত, রাস্তা দখলের যে প্রতিযোগিতা। যেভাবে পারে রাস্তা, ফুটপাত দখল করছে। দেখার কেউ নেই। ফুটপাত, রাস্তা দখলে চলে গেছে হকার আর দোকানদারের দখলে। আর মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাঁটছে রাস্তার মাঝখানে। মুমূর্ষু রোগী বহনকারী এম্বুলেন্স জরুরি হরণ বাজিয়ে চলছে। কারো কোন অনুশোচনা, ভ্রুক্ষেপ নেই যে যার মত করে যানজট লাগিয়ে বসে আছে। ব্যস্ত মোড় গুলোর দিকে থাকালে দেখা যায় বিভিন্ন বাস, হিউমেন হলার, টেম্পু, সি এন জি, রিক্শা, ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে, রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে অবলীলায় যাত্রী উঠানামা করছে। আছে বিভিন্ন হকারের উৎপাত। সম্প্রতি হকার উচ্ছেদ সাধুবাদযোগ্য পদক্ষেপ হলেও চাঁদাবাজী, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে কতদিন স্থায়ী হয় তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। উচ্ছেদকৃত স্থানে গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে জনগণ সুফল ভোগ করতে পারছে না। রাস্তার সাথে লাগোয়া বিভিন্ন গ্যারেজ, দোকান গড়ে উঠায় রাস্তার উপরেই সব কাজ চলে। এসব দখলের  কারণে গাড়ি চলাচলের পথ সরু হয়ে যায়। মোড়ে গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী উঠানামা করছে আর পেছনে লম্বা গাড়ির লাইন পড়ে গেছে সেদিকে চালকের ভ্রুক্ষেপ নেই। যদি মোড়গুলো ফ্রি রাখা যায় তাহলে যানজট অনেকাংশে কমে যাবে। কিস্তু আমাদের সব ব্যবসা মোড়কে কেন্দ্র করে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল, সি এন জি ফিলিং স্টেশন, শপিংমলে নেই র্পযাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা। অনেকে পার্কিংকে দোকান বানিয়ে ব্যবসা করছে। নগরীতে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা  নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ব্যয়বহুল হলেও মাল্টিলেভেল পার্কিং ব্যবস্থা করে যানজট অনেকটা নিরসন সম্ভব। ইতোমধ্যে গণপূর্তমন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রামের বিপণি বিতান মাল্টিলেভেল পার্কিং ব্যবস্থা করেছে। পরিকল্পিত পার্কিং ব্যবস্থা ছাড়া যানজট নিরসন অসম্ভব। চট্টগ্রাামের গণপরিবহন সমস্যা আরেকটি বড় সমস্যা। হযবরল এই সেক্টরে শৃংখলার কোন বালাই নেই। পুরাতন লক্করঝক্কর গাড়ি দিয়ে  জোড়াতালিতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। অধিকাংশ গাড়ির নেই ফিটনেস, চালকের নেই লাইসেন্স। টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে রাস্তায় এসব যান চলাচল করে। শ্রমিক নেতাদের চাঁদাবাজী ও দৌরাত্ম্য কঠোর হাতে দমন করে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা অত্যন্ত জরুরি। বেশির ভাগ যানবাহন ছোট আকৃতির (রিক্শা, অটোরিক্শা, ব্যক্তিগত গাড়ি)। ছোট যানগুলো যাত্রী পরিবহন করে মাত্র ৩০%। বাকী ৭০% যাত্রী পরিবহন করে গণপরিবহন। অথচ মোট গাড়ির মাত্র ৮% হল গণপরিবহন। অবাক করা বিষয় হল এই ৮% দিয়ে চলছে চট্টগ্রামের গণপরিবহন।

চট্টগ্রামের গণপরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন জরুরি। গণপরিবহন নিয়ে মহাপরিকল্পনা ও আধুনিক, যাত্রীবান্ধব, দ্রুতগতির গণপরিবহন নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিটি রোডে চলাচলরত গণপরিবহনের যথাযথ তদাররকি যাত্রী হয়রানী ও অনিয়ম বন্ধ করতে পারে। ট্রাফিক বিভাগ যখন ফিটনেসবিহীন গাড়ি,নকল লাইসেন্সের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে অমনি রাস্তা থেকে সব গাড়ি গায়েব। যাত্রীরা পতিত হয় অবর্ণনীয় দুর্ভোগে। শ্রমিক সংগঠনগুলো ধুয়ো তুলে হয়রানীর। নগরীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে গত ৫ আগস্ট থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত নগরীর ১৪ টি রোডে চলাচলরত গণপরিবহনের উপর জরিপ শুরু হয়। বি আর টি এ’র মতে নগরীতে চলাচল করে ১ হাজার ৮৪ টি বাস। অথচ জরিপে অংশ নিয়েছে ৫৯৯ টি বাস। তম্মধ্যে ১১৪ টি বাসের কাগজপত্রে সমস্যা আছে। তাহলে বাকী বাসগুলো গেল কই? জরিপ শেষ হলে লুকিয়ে থাকা বাসগুলো আবারো রাস্তায় নামবে, কেড়ে নেবে মানুষের প্রাণ। দেশের সিংহভাগ আয়ের যোগানদাতা এই নগরীর গণপরিবহনে আমূল পরিবর্তন জরুরি। সবুজাভ চট্টগ্রামের রূপ ফিরিয়ে আনতে চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, যানজট নিরসন ও আধুনিক আরামদায়ক একটি সুশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত জরুরি। এক্ষেত্রে চট্টগ্রামের চসিক, সিডিএ, ওয়াসার সমন্বয় যেমন প্রয়োজন তেমনি চট্টগ্রামের সরকারদলীয় সব মন্ত্রী, এমপি, সংস্থা একযোগে চট্টগ্রামের জন্য কাজ করলে চট্টগ্রাম হবে একটি অনন্য সুন্দরনগরী।

লেখক : প্রাবন্ধিক