যেভাবে হুমকির মুখে সামুদ্রিক মৎস্যভা-ার

মহসীন কাজী

84

[ শেষ অংশ ]
সাগর থেকে মাদার স্্িরম্পের সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে হ্যাচারিগুলোর উপর। মাদার সংকটে এখন হাতেগোনা কয়েকটি হ্যাচারি চালু আছে।
জরিপ অনুযায়ি, ফ্রিডজফ নানস্যানের জরিপ অনুযায়ি একেকটি ট্রলারের সর্বোচ্চ ফ্রিজিং ক্যাপাসিটি ২০ মেট্রিক হলেও বর্তমানে ফিশিংয়ে থাকা ট্রলারগুলোর ধারণ ক্ষমতা ২৫০ থেকে ৩৫০ মেট্রিক টন। এই ধারণ ক্ষমতার ৭২ টি ট্রলার প্রতি ভয়েসে গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ মেট্রিক টন মাছ ধরে। দেশীয় আহরণের ক্ষেত্রে এসব অনিয়ম ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের অত্যাধুনিক ফিশিং ট্রলারগুলো বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে অবাধে মাছ শিকার করে যায়। স্যোনার ও ফিশ ফাইন্ডার ব্যবহার করে তারা মাছ নিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে। সামুদ্রিক মৎস্য সেক্টরের এই যখন যখন অবস্থা তখন নতুন নতুন মৎস্য আহরণ এলাকা নির্ধারণ, মৎস্য সম্পদের প্রজাতিভিত্তিক মজুদ নিরূপণ এবং সর্বোচ্চ সহনশীল মাত্রায় মৎস্য আহরণের জন্য
গবেষণা ও জরিপ কাজ পরিচালনার লক্ষ্যে আরভি মীন সন্ধানী নামের একটি জরিপ জাহাজ সংগ্রহ করা হয়। ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে জাহাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হলেও এখনও জরিপ করে কোনো রিপোর্ট দিতে পারেনি। ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও মালয়েশিয়া সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় মালয়েশিয়া থেকে জাহাজটি সংগ্রহ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ইতোমধ্যে আটবার পরীক্ষামূলক অপারেশনের জন্য সাগরে গিয়ে ফিরে আসে। কোনো রিপোর্ট দিতে না পারলেও বিশাল বহরের জনবল নিয়ে এটি এখন কর্ণফুলীতে আছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এ বছরও আরভি মীন সন্ধানী সাগরে যাবে। আগামী বছর একসঙ্গে দুই বছরের রিপোর্ট প্রকাশ করবে।
কথা ছিল মৎস্য অধিদপ্তরাধীন বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রকল্পের জাহাজটি মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় ওপরিতল (পেলাজিক) ও তলদেশীয় (ডেমার্সাইল) মৎস্য সম্পদের জরিপ করবে। পাশাপাশি সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ আহরণ তদারকীর জন্য একই প্রকল্পের মাধ্যমে ১৩৩ টি ফিশিং ট্রলারে ডিজিটাল প্রযুক্তির স্যাটেলাইটনির্ভর আধুনিক ভেসেল মনিটরিং সিস্টেম (ভিএমএস) ডিভাইস স্থাপন করা হয়। কথা ছিল ট্রলারগুলোর কেউ আইন লংঘন করে কম গভীরতায় মাছ শিকার করলে ভিএমএস-এর মাধ্যমে বেইজ স্টেশনের কম্পিউটার মনিটরে পর্যবেক্ষণ করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া যাবে। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ প্রকল্পটিও ভেস্তে গেছে।
প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১১ সালে হাতে নেয়া বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রকল্পের আওতায় দেশের সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের উপর পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দক্ষ জনবল সংকট এবং অনিয়মের কারণে প্রকল্পটির কোনো সুফল পায়নি সামুদ্রিক মৎস্য সেক্টর। এ অবস্থায় আরও দুই বছর প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে।
নব্বই দশকের সর্বশেষ মৎস্য জরিপে একলাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন তলদেশীয় মাছ, ৬০ হাজার একলাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন উপরিস্তরের মাছ ও চার হাজার মেট্রিক টন চিংড়ির মজুদ নির্ণয় করা হয়েছিল। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় জরিপ না হওয়ায় বঙ্গোপসাগরের মৎস্য প্রজাতির প্রাপ্যতা ও মজুদ সম্পর্কে কোন সঠিক ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না।
নতুন মৎস্য আহরণ এলাকা চিহ্নিত না হওয়ায় এবং মাছের প্রজাতিভিত্তিক মজুদের সঠিক ধারণা না থাকায় সাগরে এখন শিকার চলছে অনুমাননির্ভর। এ কারণে এবং প্রজনন মৌসুমে শিকারের কারণে উন্নত প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হতে চলেছে। সাগরের সবচেয়ে মূল্যবান ও সুস্বাদু কোরাল, কামিলা, লাক্ষা, দাতিনা, রাঙ্গাচোক্ষা এখন আর আগের মতো পাওয়া যায় না। কমে গেছে লবস্টার ও টাইগার আহরণের পরিমাণও। তবে ইলিশ ও সার্ডিন মাছের আহরণ বেড়েছে।
সাগর থেকে মোট আহরিত মাছের মধ্যে ৯২ ভাগ শিকার করা হয় অবৈধভাবে। এসব মাছ শিকার করে লাইসেন্সবিহীন ম্যাকানাইজড ও নন ম্যাকানাইজড বোট। একই হিসাবে আরও বলা হয় মাত্র ৮ ভাগ মাছ আসে সরকারিভাবে রেজিস্ট্রেশনকৃত ফিশিং জাহাজ ও বোটের মাধ্যমে।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব মতে, দেশে গত বছর সাগর থেকে ৬ লাখ ২৬ হাজার ৫২৮ মেট্রিক টন মাছ আহরণ করা হয়। যা দেশে উৎপাদিত মাছের ১৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। অভিযোগ রয়েছে, লাইসেন্স করা মৎস্যশিকারি জাহাজগুলো মাছের সঠিক পরিসংখ্যান মৎস্যদপ্তরে দেয় না। সামুদ্রিক মৎস্যদপ্তরে মনগড়া হিসাবই দেয় ট্রলার মালিকরা। এ শ্রেণীর ট্রলারের বিরুদ্ধে রয়েছে অনিয়মের এন্তার অভিযোগ। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো প্রক্রিয়া এ যাবতকালে দেখা যায়নি। তাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর, নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর এবং মেরিন সার্ভে ম্যানেজম্যান্ট ইউনিটও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
অনিয়ন্ত্রিত আহরণ সত্ত্বেও এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রেখে চলেছে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ। দেশের মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৭৪ ভাগ আসে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ থেকে। বৈদেশিক মুদ্রার ৪ দশমিক শূন্য ৪ ভাগের জোগান দেয় এই প্রাকৃতিক খাত। তাছাড়াও এই বৃহত্তর অর্থনৈতিক খাতে নিয়োজিত রয়েছে ১০ লাখ মানুষ। এই খাতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছে মৎস্যশিকার যন্ত্রপাতির বিশাল বাজার।
বাংলাদেশে জরিপবিহীন যত্রতত্র মৎস্যশিকারের কারণে ক্রমেই মৎস্যসম্পদ হ্রাসের আশংকা করছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, এ অবস্থায় মৎস্যশিকার অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের জলসীমাকে থাইল্যান্ডের ভাগ্য বরণ করতে হবে। এভাবে অনিয়ন্ত্রিত মাছশিকারের কারণে থাই উপকূল এখন মৎস্যশূন্য। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে দেশে মৎস্য আহরণের নামে হরিলুট চলছে। বৈধ-অবৈধ কোনো উপায়েই মাছশিকারে কোনো নিয়ম মানা হচ্ছে না।
মৎস্য আহরণে শৃঙ্খলা আনতে ১৯৮৩ সালে প্রণীত হয় সামুদ্রিক মৎস্য অধ্যাদেশ। ১৯৯৩ সালে এটি সংশোধন করা হয়। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী সমুদ্রে মৎস্যশিকারি সকল নৌযানের জন্য ফিশিং লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই অধ্যাদেশের কোনো কার্যকারিতাই নেই। অধ্যাদেশ অনুযায়ী মৎস্যশিকার হলে দেশের অর্থনীতিতে আরও জোরালো ভূমিকা রাখা সম্ভব হতো বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশে সাগরের এই বিশাল সীমানা মৎস্য সম্পদের অপার সূতিকাগার ও প্রচুর সম্ভাবনাময় । এ সম্পদ অফুরন্ত নয় বরং নবায়নযোগ্য। সম্পদটির সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সহনশীল আহরণ নিশ্চিত না করা হয় তাহলে এক সময় আমাদের পার্শ্ববর্তী থাই উপসাগরের মত বঙ্গোপসাগরও মৎস্যশূন্য হয়ে যাবে। যদি সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে পরিকল্পিত উপায়ে মৎস্যআহরণ করা যায় তবে তা আমাদের অর্থনীতিতে নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা রাখতে পারবে।
ইলিশের সাফল্য কথা
ইলিশ হচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। ইলিশের রয়েছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক মূল্য। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির আবেগ। উৎসব আয়োজনে ইলিশের সঙ্গে অন্য কোনো পদের তুলনা হয় না। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের সাথে মিশে আছে ইলিশের নাম। প্রাচীন বাংলা, সংস্কৃত সাহিত্য ও লোকজ সংস্কৃতিতে রয়েছে ইলিশের স্বাদ, খাওয়ার পদ্ধতি এবং সংরক্ষণের দিক-নির্দেশনা। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘ইলশে গুঁড়ি’ কবিতা এখনও আমাদের আলোড়িত করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসেও প্রমত্ত পদ্মায় ইলিশ মাছে ভরপুর থাকার কথা রয়েছে। প্রাচীনকালে লোকজনের বিশ্বাস ছিল, আশ্বিন-কার্তিক মাসের দুর্গাপূজার দশম দিন থেকে মাঘ-ফালগুনের সরস্বতী পূজার দিন পর্যন্ত ইলিশ ধরা ও খাওয়া বন্ধ রাখা হলে এ মাছ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের আবেদনে মৎস্য অধিদপ্তর উল্লেখ করেছে, ১৮২২ সাল থেকে ইলিশ বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও কৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও আমিষ জাতীয় খাদ্যে এ মাছের ভূমিকা রয়েছে।
ইলিশ নিয়ে বাঙালির উচ্ছ্বাস বরাবরই আবেগপ্রবণ। ইলিশ শুধু জাতীয় মাছই নয়। প্রাকৃতিক এ সম্পদ বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতির ইতিহাসকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে। এক সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ১৬০টি নদীতে ইলিশের দেখা মিলত। পদ্মার ইলিশ পৌঁছে গিয়েছিল খ্যাতির শীর্ষে। কিন্তু অতি আহরণ, পরিবেশ দূষণ ও আবাসস্থলের ক্ষতির মতো প্রধানত কয়েকটি কারণে গত শতকের আশির দশকে ইলিশের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়। পরবর্তীতে দুই-তিন দশকে বিশেষ করে গত এক দশকে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ এবং সে সবের সফল বাস্তবায়নে ফিরে আসে ইলিশের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য। ইলিশের উৎপাদন গত কয়েক বছরে রেকর্ড সৃষ্টি করে। এক হিসাবে দেখা গেছে, নয়বছরের ব্যবধানে দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে চারগুণেরও বেশি।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব মতে, ২০০২-০৩ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত ইলিশের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। ২০০৮-০৯ অর্থবছর দেশে ইলিশ উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার মেট্রিক টনে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছর তা ৪ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরও দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৪ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন। যা সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যায় ২০১৭ সালে।
ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান দেশ। বাংলাদেশে বিশ্বের মোট ৭৫ শতাংশ ইলিশ আহরিত হয়। এছাড়া ১৫ শতাংশ মিয়ানমার, ৫ শতাংশ ভারত ও ৫ শতাংশ অন্যান্য দেশের।
ইলিশের ক্রমাগত উৎপাদন বৃদ্ধির নেপথ্যে সরকারের যে কয়েকটি উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে, তার অন্যতম হচ্ছে মা-ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচি। ২০০৮ সাল থেকে এ কর্মসূচি শুরু হয়। শুরুতে এর মেয়াদ ছিল ১১ দিন। যা পরবর্তীতে ২২ দিন করা হয়। বাংলাদেশের জলজ ইকোসিস্টেমে সব সময় কমপক্ষে শতকরা ত্রিশ ভাগ ইলিশ ডিম বহন করে। প্রজননের ভার মৌসুমে ডিম বহনকারী ইলিশের সংখ্যা শতকরা ৬০-৭০ ভাগ বেড়ে যায়। চন্দ্রমাস পরিবর্তন যোগ্য হলেও মৎস্য বিজ্ঞানীরা প্রধানত বাংলা আশ্বিন-কার্তিক বা ইংরেজি অক্টোবর মাসের পূর্ণিমা ঘিরে ইলিশের প্রধান বা ভর প্রজনন মৌসুম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ সময়ের প্রজননকে নিরাপদ ও নির্বিঘœ করার উদ্দেশ্যে পূর্ণিমার আগের ৪ দিন, পূর্ণিমার দিন ও পূর্ণিমার পরের ১৭ দিন অর্থাৎ মোট ২২ দিন ইলিশ আহরণের পাশাপাশি এর মজুদ, পরিবহন এবং বেচাকেনাও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং এ নিষেধাজ্ঞা সফলভাবে কার্যকর করা হয়। উপকূলসহ দেশের সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকে। মা-ইলিশ সংরক্ষণের এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে ইলিশের উৎপাদন আশাতীত সফলতা লাভ করেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে ১১ দিন বন্ধ থাকায় ১ দশমিক ৬৩ কোটি ইলিশ আহরণ হতে রক্ষা পেয়েছে। এতে ৪ লাখ ১৭ হাজার ৭৬৫ কেজি ডিম প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হয়েছে। উৎপাদিত ডিমের শতকরা ৫০ ভাগ পরিস্ফুটনের হার ধরা হলেও ২ লাখ ৬১ হাজার ১০৩ কোট রেণু উৎপাদন হয়েছে এবং এরমধ্যে শতকরা মাত্র দশ ভাগ বেঁচে থাকার হার ধরা হলেও ওই বছরে ২৬ হাজার ১০০ কোটি পোনা ইলিশে রূপ নিয়েছে। এভাবে প্রতিবছর ইলিশের উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মা-ইলিশ সংরক্ষণে সরকার দরিদ্র জেলেদের প্রতিও বিশেষভাবে সুনজর দিয়েছে। ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ রাখায় গত বছর সরকার ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৭২৩ পরিবারকে ২০ কেজি হারে চাল বিতরণ করেছে। এ খাদ্য সহায়তায় দরিদ্র জেলেরা ব্যাপক উপকৃত হয়েছে।
ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে জাটকা সংরক্ষণ কর্মসুচি সরকারের আরেকটি সাফল্যের উদাহরণ। প্রকৃতির নিয়মে ইলিশ স্বাদুপানি থেকে সমুদ্রের লোনাপানি আবার লোনাপানি থেকে স্বাদুপানিতে অভিপ্রয়াণ করে। ইলিশের লার্ভা নার্সারি ক্ষেত্রগুলোতে ৬-১০ সপ্তাহ বিচরণের পরে জাটকা হিসেবে গভীর সমুদ্রে যাত্রা করে। আর এ সময়টাতে বিশেষ করে শতকরা ৬০-৭০ ভাগ জাটকা জেলেদের শিকারে পরিণত হয়। তাই সরকার ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা নিধন বন্ধ ঘোষণা করেছে। জাটকা নিধনে জেলেদের নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকার প্রতিটি জেলে পরিবারকে খাদ্য সহায়তা হিসেবে প্রতি মাসে ৪০ কেজি হারে চাল প্রদান করছে। এর ফলে ইলিশের উৎপাদন ব্যাপক বেড়েছে।
ইলিশ শিকারি জেলেদের জীবনমান উন্নয়নেও নেয়া হয়েছে নানামুখী উদ্যোগ। প্রকৃত জেলেদের একটি ডাটাবেজের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ এরইমধ্যে অনেকখানি বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়েছে। প্রত্যেক জেলেকে দেয়া হয়েছে পরিচয়পত্র। মাছ ধরার বিরতিকালীন সময়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। মাছ ধরারত অবস্থায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য কোন কারণে মৃত্যু হলে ওই জেলের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা হারে আর্থিক সহায়তা দেয়ার কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
মা ইলিশ সুরক্ষা ও ডিম ছাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করায় এ সফলতা এসেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ইলিশ উৎপাদনের সফলতা ধরে রাখার জন্য ইলিশ অধ্যুষিত দেশের ১৫টি জেলায় ২ লাখ ২৪ হাজার ১০২টি জেলে পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দিচ্ছে সরকার।
জাটকা সংরক্ষণের সুযোগ দিয়ে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই দুই মাসও নদীতে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। এ সময়ে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত জেলেদের খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়। একজন জেলেকে মাসে দেয়া হয় ৪০ কেজি চাল। দেশের ১৬টি জেলার প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার ১০২টি জেলে পরিবার এ খাদ্য সহায়তা পায়। এছাড়া এই দুই মাস জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করা হয়।
সরকারের জাটকা নিধন কার্যক্রম, মা-ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম, ইলিশের অভয়াশ্রম চিহ্নিতকরণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানসহ সময়োপযোগী কর্মসূচি ইলিশের সংখ্যা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। মা ইলিশ রক্ষায় ২০১১ সালে যেখানে এক হাজার ৪৪০টি অভিযান চালানো হয়েছিল , যেখানে ২০১৫ সালে চালানো হয় ৫ হাজার ২০৯টি অভিযান। জাটকা রক্ষায় ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত পাঁচ মাসে ৩৪৩ টি মোবাইল কোর্ট ও ৯৬২ টি অভিযান পরিচালনা করে ৮৯ দশমিক ৪২ টন জাটকা এবং প্রায় ৬৬ লাখ মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে। এ সময় ১০ লাখ ২৬ হাজার টাকা জরিমানা এবং ১৬৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- প্রদান করা হয়।
দেশের পদ্মা-মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ-নদী ও উপকূলীয় এলাকায় পাওয়া যায় ইলিশ। এটি লম্বায় সর্বোচ্চ ৬৩ সেন্টিমিটার ও ওজনে তিন কেজি ৩০০ গ্রাম হতে পারে। তবে সচরাচর ২ কেজি ওজনে পৌঁছানোর আগে জেলেদের জালে ধরা পড়ে ইলিশ।
একসময় দেশে প্রচুর পাওয়া গেলেও বর্তমানে দেশের প্রায় ১০০ নদ-নদীতে পাওয়া যাচ্ছে ইলিশ। এর প্রধান আহরণ এলাকা হচ্ছে- মেঘনা নদীর নিম্নাঞ্চল, তেঁতুলিয়া, কালাবদর বা আড়িয়াল খাঁ, ধর্মগঞ্জ, নয়াভাঙগানি, বিষখালি, পায়রা, রূপসা, শিবসা, পশুর, কচা, লতা, লোহাদিয়া, আন্ধারমানিকসহ অনেক মোহনা ও উপকূলীয় অঞ্চল।
কর্মসংস্থানেও ইলিশের ভূমিকা রয়েছে ব্যাপক। দেশের ৪০ জেলার প্রায় ১৪৫ উপজেলার ১৫০০টি ইউনিয়নের সাড়ে ৪ লাখ জেলে ইলিশ মাছ ধরে। এরমধ্যে গড়ে ৩২ শতাংশ সার্বক্ষণিক ও বাকি ৬৮ শতাংশ খ-কালীন জড়িত। এছাড়া বিপণন, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি ও জাল-নৌকা তৈরিতে সার্বিকভাবে ২০-২৫ লাখ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে জড়িত।
বাংলাদেশের ইলিশ সুস্বাদু। এটির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বিদেশে রপ্তানিতে এতদিন বাংলাদেশি ইলিশের কোনো ব্রান্ডিং ছিল না, নাম ছিল। যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে শনাক্তকরণের কোনো পদ্ধতিও ছিল না। ‘ভৌগোলিক নির্দেশক’ (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন) পণ্য হিসেবেই ইলিশ যাচ্ছে বিশ্বের নানা দেশে। ইলিশ এখন শুধুই বাংলাদেশের পণ্য।

লেখক : সাংবাদিক