যেখানে মেঘের আনাগোনা

জিনিয়া রহমান

16

 

এখানে নিত্য চলে মেঘের আনাগোনা। মেঘবালিকাদের অবিরাম ওড়াউড়ির কারণে এখানকার রিসোর্টটির যথার্থ নাম রাখা হয়েছে দ্য ক্লাউড ইকো রিসোর্ট। বান্দরবান জেলার থানছি এবং রুমার মাঝামাঝি গ্যালেংগা নামক স্থানে তেমাতং পাহাড়ে অবস্থিত এই রিসোর্টটি সাঙ্গু নদীর পাড় ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে। তাই ইঞ্জিন লাগানো ছোট ডিঙিতে করে নদী পথেই যাতায়াত করতে হয়। নদীর দু’পাশের মনোরম দৃশ্যাবলী উপভোগ করতে করতে কখন যে গ্যালেংগা বাজার সংলগ্ন ঘাটে পৌঁছে যাবেন টেরই পাবেন না। বাজারের পাশেই ব্রিজ পার হয়ে গেলেই দেখতে পাবেন রিসোর্টে মেঘেদের মেলা।
নিজস্ব একটি লেক এই রিসোর্টটিকে করে তুলেছে অনন্য। দূরে দেখা যায় পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য নীলগিরি। রিসোর্টের সামনে নদীর পাড় থেকে শুরু হয়েছে সুউচ্চ পাহাড়ের সারি। রিসোর্টের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন না হলেও অতিথিদের থাকার জন্য রয়েছে কাঠ-বাঁশ আর ছনের ঘর যেখানে রাত কাটানো হতে পারে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। ঘরের পাশে টিলার উপরে কিছুটা হেঁটে গেলে পাওয়া যাবে ‘আড্ডা মাচাং’, যেখানে বসে আপনি অনন্ত সময় কাটাতে চাইবেন আড্ডা দিয়ে। রাতে তারা দেখার জন্যও এটি আদর্শ জায়গা। এই মাচাংয়ে বাতাসের নিরবচ্ছিন্ন আনাগোনা নিমিষে ভুলিয়ে দেবে আপনার সকল অবসাদ আর ক্লান্তি।
এই রিসোর্টে আপনি রসনা বিলাসের জন্য পাবেন সাঙ্গু নদীর তাজা মাছ, তাজা মৌসুমী ফল, জুমের চাল, শাক-সবজি যেগুলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে তেমতং পাহাড়েই ফলানো হয় এবং সংগ্রহ করা হয়। রিসোর্টের বাবুর্চি কাম কেয়ারটেকার সবুরের রান্না এবং আতিথেয়তাও অসাধারণ। রিসোর্টের নিজস্ব ৫০০ আমগাছ আছে। আমের মৌসুমে খাওয়া যাবে ফরমালিন ছাড়া সুস্বাদু আম। আরেক পাশে আছে রাবার গাছের বাগান যেখানে রয়েছে এক হাজার রাবার গাছ। আরও রয়েছে পাঁচ হাজার কলা গাছ।
কথা হয় ইকো রিসোর্টটির স্বত্বাধিকারী হানিফ খোকনের সাথে। তিনি জানান, ‘পাহাড় আমার ভালো লাগে, পাহাড় আমাকে টানে চুম্বকের মতো। বেসিক্যালি আমি লিখালিখি করি। একসময় ভেবেছিলাম নির্জন পাহাড়ে নিজের একটা কুটির হবে, সেখানে মনের মতো করে লিখব। সেই মতো পাহাড়ে জায়গা খুঁজতে থাকি এবং অনেক দিন খোঁজার পর পেয়েও যাই কিন্তু ততদিনে আমার ভাবনা আরও বড় হয়। ভাবলাম নিজেই একটা রিসোর্ট করি না কেন! ব্যাস হয়ে গেল।
তবে আমি টিপিক্যাল রিসোর্ট করছি না, এটা পুরোটাই ইকো হবে। আপনি যা খাবেন সব আমার নিজের উৎপাদিত। এমনকি মাছও আমার নিজের লেকের। ফল থেকে শুরু করে শাক-সবজি সবকিছুই নিজেদের চাষের আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি এটাকে একটা কালচারাল ভিলেজ বানাতে চাচ্ছি। সেই লক্ষ্যে কাজও করে যাচ্ছি।’
হানিফ খোকন আরও বলেন, ‘দেখেন, আমি নিজে রিসোর্ট করার আগে যখন ঘুরতে যেতাম ছাত্রজীবনে, আমি নিজেই বুঝেছি যে, বাজেট একটা ব্যাপার। সেই জায়গা থেকে ছাত্র বা যারা কম বাজেটে ঘুরতে চায় তাদের জন্য আমার আলাদা কিন্তু ভালো ব্যবস্থা থাকবে। একজন কবি, একজন গল্পকার, একজন ডাক্তার, একজন ভালো সিনেমা মেকার, একজন ভালো চিত্রশিল্পী এমন করে অনেক মানুষকে আমি এক টুকরো করে জমি দেব। আমার ২৫ একর জমি আছে সেখানে। জমি আমার কিন্তু সবাই নিজ খরচে একটা করে ঘর বানাবে। আমি চাই, একটা ব্যতিক্রম পর্যটন কেন্দ্র।’
উল্লেখ্য যে, এখানে দেশের সর্বপ্রথম বাঞ্জি লাফের আয়োজন করা হচ্ছে। সেই সাথে থাকবে সাঙ্গুতে র‌্যাফটিংয়ের সুযোগ। রিসোর্টের রয়েছে নিজস্ব নৌকা, যা দিয়ে আপনি ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়াতে পারবেন সাঙ্গুর বুকে। রিসোর্টের উত্তরে গ্যালেংগা বাজারে আপনি পাবেন আদিবাসীদের উৎপাদিত দ্রব্য-সামগ্রী। রিসোর্টের পার্শ্ববর্তী পাহাড়েই রয়েছে বিজিবি ক্যাম্প, যা আপনাকে দেবে বাড়তি নিরাপত্তা। বান্দরবানের বেশ গহিনে অবস্থিত হলেও এখানে গ্রামীণ, রবি আর টেলিটকের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। যদিও এখানে বিদ্যুৎ নেই কিন্তু প্রয়োজনীয় কাজ চালানোর জন্য জেনেরেটরের ব্যবস্থা আছে। রিসোর্টের পাশে আছে কিছু গ্রাম, যেখানে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। তাদের পাড়ায় ভ্রমণ করে দেখতে পাবেন তাদের জীবনযাত্রা, আচার-অনুষ্ঠান। তাছাড়া বর্ষার সময় প্রচুর ঝরনা দেখা যায়। রিসোর্টে আসা এবং যাওয়ার পথের মনোরম দৃশ্য ভোলার মতো নয়। ফেরার পথে রুমা হয়ে ফিরলে নদীর পাশে পাবেন ‘রিজুক ঝরনা’। নৌকা থামিয়ে এই সুউচ্চ ঝরনার পানিতে গোসল করে নিতে পারেন। এই রিসোর্টে ভ্রমণ আপনার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় একটি ভ্রমণ হবে বলে আশা করি।
নোট : ভ্রমণের সময় যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলবেন না। পাড়ার লোকজনের অনুমতি ছাড়া তাদের ছবি তুলবেন না। নদীতে বা ঝরনায় সাবধানতা অবলম্বন করবেন।