যুদ্ধদিনের বালাটে ফিরে স্মৃতিকাতর রাষ্ট্রপতি

32

একাত্তরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজ করেছিলেন সেই বালাট অঞ্চলে গিয়ে যুদ্ধদিনের নানা ঘটনা স্মরণ করলেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। মুক্তিযুদ্ধে এ অঞ্চলের মানুষ অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে আসা তার দায়িত্ব ছিল। এতদিন পর এসে মনে হচ্ছে সেই দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন তিনি।
বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের (মুজিব বাহিনী) সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন আবদুল হামিদ। মেঘালয়ের গুমাঘাট, মৈলাম ও বালাট অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের সময় আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশি তরুণদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করতেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে ইচ্ছুকদের জন্য এই বালাটেই ‘ইয়ুথ রিসেপশন ক্যাম্প’ গড়ে তার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন আবদুল হামিদ। বিডিনিউজ
স্বাধীনতার সাড়ে চার দশকের বেশি সময় পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে বালাটে গিয়ে দুঃসময়ের সব বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ না হলেও দু-একজনের দেখা পেয়েছেন তিনি। উত্তাল সেই দিনগুলোয় সময় পার করা সাধারণ চায়ের দোকানও তার কাছে হয়ে ওঠে বিশেষ কিছু। সেই সময়ের স্মৃতিও অপকটে বলে গেছেন তিনি।
গতকাল শুক্রবার আসামের গুয়াহাটি থেকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে বালাট যান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। সেখানে পৌঁছানোর পর স্থানীয় প্রশাসনসহ এলাকার লোকজন তাকে স্বাগত জানান।
বালাটে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের দুইজন মানুষকে পেয়ে সেই সময়ের স্মৃতির ঝাঁপি খোলেন আবদুল হামিদ। মারাক ও রজত নামের দুই আদিবাসীর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ চলে তার স্মৃতিচারণা।
একাত্তরে বালাটের যে বাড়িতে ছিলেন সেই বাড়ি, বালাট বাজারও ঘুরে দেখেন আবদুল হামিদ। বালাটে প্রথমে এসে যে চায়ের দোকানে রাত কাটাতেন, সেই দোকানে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
এ সময় সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের আবদুল হামিদ বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা (বালাট অঞ্চলের মানুষ) অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। প্রায় ১০ লাখ মানুষকে তারা আশ্রয় দিয়েছে। নিজেরা কষ্ট স্বীকার করেছে।”
তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের ১০ বছরের মধ্যে আসতে পারলে ওই সময়ের অনেকের সাথে দেখা হতে পারত। সমাজে ওই সময় প্রতিষ্ঠিত যারা ছিল, তারা এখন বেঁচে নেই। যেখান থেকে সাহায্য পেয়েছি, সেখানে এত বছর পরেও আসতে পারাটা আমার জন্য মানসিক শান্তির। অনেক স্মৃতি এখানে।”
আবদুল হামিদ বলেন, “দেশ স্বাধীনের পর নানা ব্যস্ততায় আসতে পারিনি। ’৭৫ এর পর প্রেক্ষাপট পাল্টে গেল। ’৯৬ এর পর আসতে পারতাম। আমার ফ্যামিলিসহ এখানে ছিলাম। না আসাটা মাঝে মাঝে মনে পীড়া দিত। মনে হত বেঈমানি করছি। আসাটা আমার দায়িত্ব ছিল। আজ মনে হচ্ছে, দায়িত্ব পালন করলাম।”
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া, শরণার্থীদের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করাসহ নানা বিষয় তুলে ধরেন তিনি। “যে দুঃসহ সময় কাটিয়েছি সেটা চিন্তা করা যায় না। প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। এই জায়গটা দেখা আমার জন্য খুবই টাচি। এত স্মৃতির জায়গা…।”
সৌর বিদ্যুৎ নিয়ে বিশ্বের ১২১টি দেশের জোট ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্সের (আইএসএ) সম্মেলনে যোগ দিতে আবদুল হামিদের এই ভারত সফর। আগামীকাল ১১ মার্চ নয়া দিল্লিতে আইএসএর এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
নয়া দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবন কালচারাল সেন্টারে (আরবিসিসি) ওই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে মেঘালয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের স্মৃতিবিজড়িত নানা জায়গা পরিদর্শন করলেন তিনি। আজ শনিবার গুয়াহাটি হয়ে নয়া দিল্লি যাবেন আবদুল হামিদ। বালাট থেকে শিলং পৌঁছালে নতুন মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানান।