যুগের হাওয়া যুগের তাল যুগের চালে বেসামাল

মছিউদ্দৌলা জাহাঙ্গীর

13

যুগের হাওয়া যুগের তাল, একেক যুগের একেক হাল। ফ্যাশন যে কি জিনিস বুঝা বড়ই মুশকিল। কি সুন্দর একটি প্যান্ট খাবলা মেরে মেরে সেটির দেহকে টুকরা টুকরা ছিঁড়ে ফেলার নাম ফ্যাশন। আহা একসময় একটু দাগ পড়লেও সে জামা আর পরা হতনা অসুন্দর দেখাত বলে, পরে দেখলাম তাতে তালি এলো। মাশাল্লাহ্ ভেরাইটিস তালি, একটা-দু’টা না অনেক তালি লাগানো হত সারা প্যান্ট জুড়ে নানা রকমের তালি। শেষ পর্যন্ত এমন হয়েছিল ভাল প্যান্টাকে ছিঁড়ে ফেলে তালি লাগানো শুরু হয়ে গেল। বিভিন্ন কোম্পানীর তালি নানান ডিজাইন, হাওয়ার তালে লাগল কিছু নিজের জালে, ফলে ভাল একটি কামাই হয়ে গেল ব্যবসায়ীদের। তারপর তালি খেল গালি এলো এখন জালি, গোটা প্যান্ট ছেঁড়া, পায়ে ছেঁড়া, হাঁটুতে ছেঁড়া, ঊরুতে ছেঁড়া আরো উপরেও তাই এবং জামাও ছেঁড়া। ভুলে গেছি ফেড করা তথা রং জ্বালিয়ে ফেলা। একসময় ছিল যত উজ্জ্বল পরা যায় আর এখন রং যত জ্বালানো যায়। হায়রে ফ্যাশন, মতিগতি তার কিছু বুঝি না। ঠিক আছে যত ঝড়-ঝক্কি সব কাপড়ের উপর দিয়ে যাচ্ছে তা না হয় সওয়া গেল, কিন্তু বিয়ের উপর দিয়েও যে দেখি ফ্যাশনের ডামাডোল শুরু হয়েছে। তা কি করে সই?
ক’দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম ভারতীয় নায়িকা সুস্মিতা সেন নিজ বয়সের ১৫ বছরের কম বয়সের প্রেমিককে বিয়ে করছেন। নো চিন্তা তবে এক সময় দেখতাম নায়িকারা বিবাহিত, সন্তানের বাপদের বিয়ে করতেন, যেমন হেমা মালিনী করেছেন, শ্রীদেবী করেছেন। আমাদের সুবর্ণা মোস্তফাও করে ছিলেন বিবাহিত একসন্তানের জনক হুমায়ূন ফরিদীকে আবার শাওন করেছেন চার সন্তানের জনক হুমায়ূন আহমেদকে। আবার দেখেছি নিজ বয়সের দ্বিগুণ বয়সের পুরুষকেও বিয়ে করতে, যেমন ২০বছর বয়সের সায়রা বানু বিয়ে করলেন ৪০ বছরের দিলীপ কুমারকে। না ঠিক আছে উনারা অনেক শ্রদ্ধেয় জুটি তেমন সম্পর্ক আরেকটি হয়েছিল, ক্রিকেটার-বর্তমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও জেমিমা গোল্ড স্মিথ। ৪২ বছর আর ২১ বছরের বর-কনে। অবশ্য ইমরানের রাজনীতির কারণে বিবাহ টিকেনি তবে সম্পর্ক নাকি আছে। ইমরান খান সাহেব কিন্তু অনেক চালাক, প্রচুর অভিজ্ঞতা আর সফলতা রয়েছে জীবনে, শেষে এসে রাজনীতিতেও সফল। শুধু ভূগোলে নাকি খানিকটা দুর্বল, জাপান আর জার্মানীর সীমান্ত এক করে ফেলেছেন। সমস্যা নাই দেশ চালাচ্ছেন বিমান তো আর না, ভূগোল জানতে হবে কেন? ভাগ্যভালো বিমান চালান না, তাহলে জার্মানের যাত্রীদের জাপান নামিয়ে দিয়ে চলে আসতেন। তবে কাশ্মীর ইস্যুতে তাঁর সাম্প্রতিক হুঙ্কার মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে। বলছিলাম সন্তানের বাপকে বিয়ে করেছে ঠিক আছে, অধিক বয়সের পুরুষকে বিয়ে করেছে সেটিও ঠিক আছে, পুরুষের দু-চার বিয়ে করা জায়েজ। কিন্তু নারীর নিজ হতে কম বয়সের পুরুষকে বিবাহ করা মনে হয় ঠিক না, কারণ শেকসপিয়র বলেছেন নিজের চাইতে বয়সে বড় মেয়েকে বিয়ে না করতে। তাঁর স্ত্রীর বয়স নাকি তাঁর চাইতে দু’বছর বেশী তাতেই তিনি ঝামেলা বুঝে গেলেন, তাহলে সুস্মিতার প্রেমিকের অবস্থা কি হবে? সে বিশ্লেষণে পরে যাই, ইতোমধ্যে যারা কর্ম সেরে ফেলেছেন তাদের নিয়ে কিছু কথা বলি।
কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছি নায়িকারা কেবল নিজ বয়সের কম বয়সের পুরুষকে বিয়ে করছেন, হঠাৎ কি হয়ে গেল বুঝছিনা। সম্প্রতি দেখেছি প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, ভারতীয় অভিনেত্রী, নিজ হতে দশ বছরের ছোট এক পুরুষকে বিয়ে করলেন। শুনতে পাচ্ছি তাতে নাকি এখন পেঁক ধরেছে, ভঙ্গুর অবস্থা, দেখুন কান্ড আমাদের রাষ্ট্রপতি মহোদয় কত আশা করেছেন। ঢাকা ভার্সিটির কনভোকেশনে এসে রাষ্ট্রপতি নিজমুখে বলেছিলেন মনেরকথা, প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে কি ছিল মনে। প্রিয়াঙ্কা তখন কক্সবাজার রোহিঙ্গাক্যাম্প পরিদর্শনে এসেছিলেন জাতিসংঘের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে, নিয়ম হল ফিরে যাওয়ার সময় রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎ করা। সে খুশীতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি গোঁফে তেল দিয়ে বসলেন, দর্শন হবেই নিয়মের খেলাপ হবেনা। কিন্তু বেড়ায় ক্ষেত খেয়েছে, আমাদের ফার্স্টলেডি নাকি প্রধানমন্ত্রীর সাথে কারসাজি করে ষড়যন্ত্রটা করেছেন, বঙ্গভবনে প্রিয়াঙ্কার আসা ভঙ্গ করলেন। এখানেও বঙ্গ ভঙ্গ, রাষ্ট্রপতির আশায় দাগ পড়েছে, সে দর্শনে তিনি কিছু একটা ঘটার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছিলেন। দশবছরের ছোটতে হলে ত্রিশবছরের বড়তে সমস্যা কি? আছে, সে প্রমাণ বাংলার জমিনেই আছে। উত্তরবঙ্গে কোন্ একটি জেলাতে বছর কয়েক আগে শত বছরের এক বরের সাথে ষোল বছরের কনের বিয়ে হয় আর সে কনে সন্তানের মা’ও হয়। সংবাদপত্রে সে খবর তখন ফলাও করে বের হয়। সুতরাং রাষ্ট্রপতির ভাবনা দোষের কিছুনা, তারচে বড় কথা হল আমাদের প্রেসিডেন্ট মহোদয় অতি রসিক মানুষ। আল্লাহ উনার আশা পূরণ করুন, হতেও পারে, কারণ টানেলের শেষেই আলোর একটি রেখা দেখা যাচ্ছে, প্রিয়াঙ্কা-নিক টানাপড়েন। এখন আবার শুনছি প্রিয়াঙ্কা মা হতে চলছেন, কাজেই ছাড়াছাড়ি হতে পারে অতি তাড়াতাড়ি, কারণ মায়ের তো আর গø্যামার থাকে না।
কিছুদিন আগে তেমন একটি ঘর ভেঙ্গেছে, আমাদের সুবর্ণা মুস্তফার। তিনি ফরিদীকে ত্যাগ করে ১৬ বছরের ছোট বদরুলকে বিয়ে করেন, বদরুল অন্য নারীর ফাঁদে পড়ে সুবর্ণাকে ত্যাগ করল। একটা বদের হাড্ডি বদরুল। অমৃতা সিং সাত বছরের ছোট সাইফ আলী খানকে বিয়ে করল, এখন সাইফ তাকে ফেলে কারিনাকে নিয়ে সংসার করছে। এমন প্রচুর উদাহরণ আছে নিজের চেয়ে কম বয়সের ছেলেকে বিয়ে করা নারীর শাদী টিকেনা। সুতরাং সুস্মিতার কি হয় দেখা যাক। এখন কি বলব সত্যি কথা, যুগের হাওয়া পাল্টে গেছে নারী-পুরুষ সমান অধিকার। খালি মুখে বললে তো হবেনা প্রকৃতি সয় কিনা তা’ও তো দেখতে হবে। সেটি কেউ দেখছেনা, বিধির বিধান মানছেনা কেবল নিজের বিধান চালাতে চাইছে। আমার কিছুতেই মাথায় আসছেনা নারী পুরুষ সমান হয় কি করে? উদাহরণ দেব না, তা নিজেরা ভেবে নিন। বিয়ের জন্য ছেলে আর মেয়েতে বয়সের ব্যবধান দশ বছর হওয়াটা একান্ত বাঞ্ছনীয়, ছেলের বয়স বেশী। ব্যবধানটা ১৫ বছরের হলে ভাল আরো বেশী হয় কারণ সংসারটা টেকার সম্ভাবনা অনেক বেশী থাকে, তবে ব্যবধান দশের কম হলে সমস্যার আশঙ্কা বেশী। বুঝিয়ে বলার দরকার নেই বিবাহিতরা অবশ্যই বুঝতে পারছেন, তাহলে বরের চাইতে কনের বয়স বেশীÑ বিধি তা মানবে কেন? বিধি তো একটি নিয়ম মেনে চলে, আমি সমাজে বা পরিবারে অনেক দাপটে চলতে পারি কিন্তু বিধির বিধান ভাংব কেমন করে? আজ শাহরুখ খান, সালমান খানরা এখনো নায়ক হচ্ছেন, মাধুরী-জুহিরা কি নায়িকা হতে পারেন? পারেন না, এটিই বিধির বিধান, ভাংলে খবর আছে।
ইদানিং আরেকটি সমস্যা হল সন্তান না নেওয়া বা নিতে না চাওয়া। বিবাহকে নিরুৎসাহিত করা কিংবা নির্ধারিত বয়স পার হয়ে যায় তবুও বিয়ে না করা। ফলে অনেক নায়ক-নায়িকাকে দেখা যায় পরিবার হীন, নিঃসন্তান, জানি না তাদের কেমন লাগে, কিন্তু আমার ভাবতেও অস্বস্তি লাগছে তেমন একটি অবস্থা। জীবনের একেক সময়ের একেক অনুভূতি, একেক অপরিহার্যতা যা এড়ানো কোনক্রমেই সম্ভব না, সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনী তেমনই অবিচ্ছেদ্য এক অংশ জীবনের। আহা পারভীন ববি, ভারতীয় নায়িকা, কি অসহায়, যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হয়েছে তার, না ছিল কোন সন্তান, না পরিজন। তেমন পরিণতি হয়তো বরণ করবেন রেখাও, যদিও তিনি কিছু বুঝতে দেননা তথাপি তিনি জানেন আর তার খোদা জানেন তার ভিতর কি চলছে। সেদিক থেকে মাশাল্লাহ্ অমিতাভ বচ্চন প্রচন্ড ভাগ্যবান, আমাদের রাজ্জাক-শাবানাও পরম সুখী ছিলেন ও আছেন পরিবার নিয়ে। পৃথিবীতে পরিবার হচ্ছে স্বর্গ, পারিবারিক বন্ধন মহামূল্যবান এক বন্ধন আর এ বন্ধনের উপরই আমাদের চট্টগ্রামের মেয়র সাহেব গুরুত্ব দিয়েছেন। গত ১লা মে’র পূর্বদেশের শেষ পৃষ্ঠায় দেখলাম মেয়র সাহেব পূর্ব মাদারবাড়ির এক সমাবেশে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন ফিরিয়ে আনার উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। মেয়রকে ধন্যবাদ তাঁর এই উপলব্ধির জন্য, পরিবারের গ্রহণযোগ্যতাকে তিনি স্বীকার করেছেন। কিন্তু কথা হলো কিভাবে ফিরে আসবে সে বন্ধন? বর্তমানে সমাজের যে অবক্ষয় শুরু হয়েছে সে সাথে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সমাজ ও পরিবারকে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলেছে। সুতরাং সে বন্ধন ফিরিয়ে আনতে ও সুদৃঢ় করতে প্রত্যেককে যার যা অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। চট্টগ্রামে একটি প্রবাদ আছে, ছোটকালে মজা নানারবাড়ী, যৌবনে মজা শ্বশুর বাড়ী আর বৃদ্ধকালে মজা বিয়াইর বাড়ী। সামাজিক বন্ধনের জন্য রীতিটি বড়ই গুরুত্বপূর্ণ।
নায়ক-নায়িকারা হচ্ছেন সেলিব্রিটি, তাদের দেখে মানুষ শেখে কারণ তাদেরই অধিকাংশ মানুষ অনুসরণ করে, এখন তারা যদি নিয়ম না মানেন ৪০ বছরের নারী ২৫ বছরের ছেলেকে বিয়ে করেন, সমাজে বিশৃঙ্খলা তো হবেই। নায়িকারা বিয়ে করেননা, অধিক বয়সে বিয়ে করেন, সন্তান ধারণ করেন না অথচ এলিজাবেথ টেলরকে দেখেন, কি ভীষণ মাতৃত্বের সাধ তাঁর, সন্তানের পিপাসা। বিশ্ববিখ্যাত নায়িকা লিজ টেলর, অনেক সন্তানের জননী তিনি সন্তান যখন আর ধারণ করতে পারছিলেন না দত্তক নেয়া পর্যন্ত শুরু করেছিলেন। আহা কি সুতীব্র আকাক্সক্ষা সন্তানের! তিনিও তো নারী সাথে বিখ্যাত অভিনেত্রীও অথচ কি চমৎকারভাবে মাতৃত্বের সকল গুণাবলী নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন। বিধির বিধানকে তিনি তো উপেক্ষা করেননি। অবশ্য তাই বলে আমি গন্ডায় গন্ডায় সন্তান ধারণের কথা বলছি না, বলছি বিধির বিধানটি ঠিক থাকুক। নারী-পুরুষের বিধি প্রদত্ত বৈষম্যটি সকলে উদার চিত্তে মেনে নিক। আসুন আমরা পরিবারকে ভালোবাসি, সমাজকে ভালবাসি। দাদা-দাদী, নানা-নানী, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনী এদের চাইতে সুমধুর কি আছে পৃথিবীতে? কিছুই নাই, এ যে স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ দান, এ দানকে হেলায় হারিয়ে কেউ যেন যুগের হাওয়ায় বেসামাল হয়ে না যাই।
লেখক : কলামিস্ট