যানজট মুক্তির প্রধান উপায় সড়ক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনয়ন ও দুর্নীতিমুক্তকরণ

34

আমাদের দেশে পরিবহন খাতের সমস্যা দীর্ঘদিনের। আজ থেকে ৭-৮ দশক পূর্বে রাস্তার সংখ্যা কম ছিল। কম ছিল যানবাহনের সংখ্যাও। আবার রাস্তার সংখ্যা যাই থাকুক তারমধ্যে পাকা রাস্তার সংখ্যা ছিল অপ্রতুল। তবু মানুষ অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, পড়া-লেখা এক কথায় জীবন সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকাÐ অনায়াসে চালিয়ে নিতে কোন সমস্যা মনে করতেন না। আজকের মত আধুনিক সড়ক এবং ঝড়ঢ়যরংঃরপধঃবফ ঠবযরপষব না থাকলেও মানুষ অনায়াসে চালিয়ে যেতেন প্রত্যহ জীবন। আধরষধনরষরঃু ড়ভ ঞৎধংঢ়ড়ৎঃধঃরড়হ বা আরামদায়ক (ঈড়ুু) রাস্তার অভাবে ক্লান্ত, শ্রান্ত ইড়ঃযবৎবফ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথে বসে বা ওহপঁনধঃব অবস্থায় কাটাতে হয়নি। বর্তমানে জনসংখ্যার পরিমাণ তখনকার চেয়ে তিনগুণের বেশি এ কথা সত্য। কিন্তু সাথে সাথে রাস্তা-ঘাট ও যানবাহন কতগুণ বেড়েছে তাওতো দেখতে হবে। তারপরও কেন মানুষের মূল্যবান সময় পথে-ঘাটে, রাস্তায় ক্ষয় করতে হবে। ‘যানজট’ শব্দটির সাথে আগেকার মানুষের পরিচয় ছিল না। ছিল না কল্পনাতেও। ‘যানজট’ যে জীবনের আশা-ভরসা ধ্বংস করে দিচ্ছে, তা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীরা পারছে না বিদ্যালয়ে পৌঁছতে, বণিকরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে, শ্রমিকরা কর্মস্থলে, মোট কথা প্রত্যেক শ্রেণি পেশার মানুষের ভোগান্তির উৎস হিসেবে চিহ্নিত পরিবহন খাত নামক বৃত্তকলাকার বস্তু।
যোগাযোগ ব্যবস্থা হচ্ছে একটি দেশের শিরদাঁড়া। সুতরাং এ ক্ষেত্রে উন্নতি করতে না পারলে দেশের উন্নয়নও সম্ভব নয়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামে যে ধরনের মহাযানজট দেখা যাচ্ছে তা নিরসন করা দেশের স্বার্থেই জরুরি। যানজটের কারণে একটা দেশের অর্থনীতি, অগ্রযাত্রা, অদম্য সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যাবে এটাতো মেনে নেয়া যায় না। ঘণ্টায় গাড়ির গতি নেমে এসেছে ১৫ কিলোমিটারে। আর্থিক ক্ষতির পরিমান ২৭ হাজার কোটি টাকা প্রতি বছরে। এসবের কোন সুরাহা করতে না পারলে সরকারি চৎড়ঢ়ধমধহফধ একটি ঞৎরপশু বিষয়ে পরিণত হবে। বাস্তবতার নিরিখে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের যানজট যেন বড় ধরনের অভিশাপ। যে সকল কারণে এ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে যেমন ট্রাফিক আইন সম্পর্কে চালকদের উপযুক্ত জ্ঞান না থাকা, ট্রাফিক সিগন্যাল (ঝরমহ) বিকল হওয়া, ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব এড়িয়ে চলা, চাঁদাবাজি, সড়কে জেব্রাক্রসিং না থাকা, পথচারীদের জন্যে ঋড়ড়ঃঢ়ধঃয না থাকা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলের সুযোগ থাকায় মাঝপথে হঠাৎ গাড়ি বন্ধ হওয়া, দায়িত্বহীনভাবে সড়কজুড়ে নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা সর্বোপরি অপরিকল্পিত উন্নয়ন কাজের নামে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িকেই দায়ী করছেন ভোক্তভোগীরা। ভোগান্তির এ দৃশ্যের আওতায় ঢাকাসহ সমগ্র দেশ। প্রশাসনিক ও বানিজ্যিক দিক বিবেচনায় দেশের দু’টি মহনগর ঢাকার সাথে চট্টগ্রামের সহজতর যাতায়াত ব্যবস্থা থাকাটা অপরিহার্য বিষয়। স্থলপথে যাতায়াতের জন্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছাড়া যাত্রীদের বিকল্প নেই। কিন্তু মহাসড়কটির প্রবেশ প্রস্তানের মূল স্থানগুলোতে দুঃসহ যানজট হরহামেশাই লেগে আছে। চট্টগ্রাম নগরীর এ.কে খান মোড় দিয়ে প্রবেশমুখে বাম পার্শ্বস্থ টেম্পোস্ট্যান্ড বিড়ম্বনা বাড়িয়ে দিয়েছে। একিই স্থানের পশ্চিমে চবঃৎড়ষ চঁসঢ় সংলগ্ন রাস্তায় ওহঃবৎপরঃু ইঁং-ঈড়ধপয দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠা-নামা করে বিধায় সীমাহীন দুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে। যাত্রী উঠা-নামার নির্ধারিত স্থান নেই বলে দু’টি তিনটি গাড়ি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে। তখন যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অলংকার মোড়, সিটি গেট, কর্নেল হাট এলাকায় একিই পরিস্থিতি দৃশ্যমান। সিটি গেটের অদূরে অঘোষিত বাস টার্মিনাল মানুষের যন্ত্রণা অনেকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। উড়াল সেতু (ঋষুড়াবৎ) নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। প্রস্তাবিত ঊষবাধঃবফ ঊীঢ়ৎবংংধিু ও কর্ণফুলী টানেল তৈরি চট্টগ্রাম নগরীর প্রয়োজনভিত্তিক উন্নয়ন নয় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞজনেরা। পৌর এলাকার বিশেষ বিশেষ জংশনে গতিবিধি লক্ষ্য করে দেখা গেছে যে, সেখানে যানবাহন চলাচলের পরিমাণ ঘণ্টায় তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজারের কাছাকাছি। যদিও বলা হয় ১০,০০০ এর চেয়ে কম পরিমাণে যানবাহন চলাচলের স্থানে উড়াল সেতুর প্রয়োজনীয়তা খুব বেশি নেই। একিই সাথে ঋষুড়াবৎ এবং ঞঁহহবষ নির্মাণের ব্যয় দিয়ে সমগ্র চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন সম্ভব বলে জানিয়েছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নরমফ. সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে নগর শাসন পরিস্থিতি সম্পর্কিত বাৎসরিক প্রকাশনায় এ তথ্য দেয়া হয়। সুতরাং এত বিশাল অংকের টাকা খরচ করেও যে জনদুর্ভোগ লাঘব করা যাচ্ছে না তা খুবই স্পষ্ট। না পারার কারণও আমরা প্রতিনিয়ত সংবাদ মাধ্যমে পাচ্ছি।
২৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ৪ লেনের হলেও মেঘনা-গোমতি সেতু দু’টি ২ লেনের বিধায় সেতুর উভয় পার্শ্বে যানজটের সৃষ্টি হয়। এ সড়কটির মহিপাল উড়াল সেতুর কাজ সমাপ্ত হওয়ার পূর্বের অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। বর্তমানে ফেনীর ফতেপুরস্থ রেলক্রসিং এ উড়াল সেতুর কাজ চলছে। এতে ঐ স্থানে যানজট বিদ্যমান। মাঝে মধ্যে গাড়ির বহর দীর্ঘায়িত হতে হতে একদিকে ফেনীর মহিপাল অপরদিকে কুমিল্লার পদুয়া পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। ৩ মার্চ দৈনিক প্রথম আলো শিরোনাম করেছে ‘মহাসড়ক মানেই মহাদুর্ভোগ’। ৮ বছরে সড়ক ও সেতু উন্নয়নে ৩১ হাজার এবং মেরামত বাবদ খরচ হয়েছে ৯ হাজার, সর্বমোট চল্লিশ হাজার কোটি টাকা। এষড়নধষ ঈড়সঢ়বঃরঃরাবহবংং জবঢ়ড়ৎঃ নামে একটি তালিকা প্রকাশ করেছে জেনেভায় অবস্থিত ডড়ৎষফ ঊপড়হড়সরপ ঋড়ৎঁস. ২০১৬-১৭ সালের প্রতিবেদনটিতে ১৩৮ দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ১১৩ তম। এশিয়ার নিকৃষ্ট সড়কের তালিকায় বাংলাদেশ দ্বিতীয়। একমাত্র নেপালের তুলনায় বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থাপনা ভালো। মজার ব্যপার হচ্ছে- মহাসড়ক নির্মানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত যেখানে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় করছে ১০ কোটি, সেখানে বাংলাদেশে ব্যয় ৫৯ কোটি টাকা। যা চীনে ১৩ কোটি এবং ইউরোপে ২৮ কোটি টাকার মত। বিশ্বে উন্নত সড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রথম দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত, দ্বিতীয় সিঙ্গাপুর, তৃতীয় হংকং। এশিয়ার তিনটি দেশের অবস্থান যেখানে এত সম্মানজনক অবস্থানে সেখানে বাংলাদেশ কতটুকু এগুতে পেরেছে তা বলাই বাহুল্য। প্রথম আলোর ৩ মার্চের রিপোর্টে আরো লিখেছে- ১,০৬০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ৪টি মহাসড়ক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে সমস্যায় জর্জরিত। বহু স্থানে বেহাল অবস্থা। ক’দিন পরপর ক্ষত স্থানে মেরামতের যে দৃশ্য দেখা যায় তাকে উন্নয়নের ইষধপশ ঐড়ষব বা কৃষ্ণ গহবর বললে অত্যোক্তি হবে না। সরকার কিছুতেই এর দায় এড়াতে পারে না। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ২৪৪ কিলোমিটারের মধ্যে ৯০ কিলোমিটার বেহাল। বিভিন্ন স্থানে গর্ত। প্রথম আলোর ধারাবাহিক রিপোর্টের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ৪ মার্চের প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘যাত্রার শুরু থেকেই যানজট’। ৩০৭ কিলোমিটার দূরত্বের ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক। যার ১৩৫ কিলোমিটারের অবস্থা বেহাল। ২৮ কিলোমিটার খানাখন্দে ভরা। জোড়াতালির মেরামত করে গভীর গর্ত যে লুকানো যায় না তার প্রমাণ এখানে স্পষ্ট। ৫ মার্চ সর্বশেষ পর্বে প্রথম আলোর ঐবধফষরহব ‘ভোগান্তির শেষ নেই’। ঢাকা থেকে খুলনা সড়ক পথে যাওয়া মানে জীবনের ঝুঁকি। যশোর-খুলনা মহাসড়কে খানাখন্দের কারণে মানুষের প্রাণ যাওয়ার উপক্রম। যশোর, মাদারিপুর, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জের সবখানেই সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা উড়ফফবৎরহম. যার কারণে মাঝ পথেই বিকল হয়ে পড়ছে অনেক যানবাহন। অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে। অকালেই ঝরে যাচ্ছে বহু প্রাণ। দৈনিক পূর্বকোনের ৩ মার্চ ২০১৮ সংখ্যায় সড়ক দুর্ঘটনা ও বেপরোয়া গাড়িচালনা নিয়ে সম্পাদকীয় লিখা হয়েছে। তার কিয়দাংশ ডড়ৎফ ঋড়ৎ ডড়ৎফ ‘দেশে দুর্ঘটনার হার এবং দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। শুধু গত মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রæয়ারি) দুর্ঘটনায় মারা গেছে ২১ জন, আহত ২ শতাধিক’। দৈনিক পূর্বদেশ এ ৫ মার্চ প্রতিবেদন ছাপিয়েছে- চকরিয়ার ৪ পয়েন্টে ‘মৃত্যুফাঁদ’ আড়াই মাসে নিহত ১৭। উল্লেখিত স্থানটি চট্টগ্রাম- কক্সবাজার মহাসড়কের অন্তর্ভুক্ত। এ মহাসড়কটি নিয়ে ১৭ মার্চ আরো একটি সচিত্র প্রতিবেদন একিই পত্রিকায় দেখা গেছে। চট্টগ্রামস্থ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সম্বন্ধে পূর্বদেশের ১০-১৪ মার্চ পর্যন্ত বিস্ময়কর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনিয়ম অব্যবস্থাপনায় নিমজ্জিত বিআরটিএ প্রতিনিয়ত আমাদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দিচ্ছে। পত্রিকাটির ৩ মার্চ খবধফ ঘবংি এ ছিল- ফিট্নেসবিহীন গাড়ি ও মেয়াদ উত্তীর্ণ সিলিন্ডার নিয়ে সড়ক-মহাসড়কে গাড়ির দৌড়াত্ম্যের ফিরিস্তি। ঢাকার দৈনিক নয়াদিগন্তসহ বহু পত্রিকা সড়ক, যানবাহন ও নাগরিক ভোগান্তির উপর গরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে- ২০১৬ সালের চেয়ে ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে প্রাণহানী হয়েছে বিশ শতাংশের উপরে। গাড়ি চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, নিয়ন্ত্রণহীন গতি, সঠিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই লাইসেন্সপ্রাপ্তির ফলে সড়ক দুর্ঘটনার হার এত বেশি। এ সব তদারকির দায়িত্ব যাদের তারা কোথায়?
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ইলিয়াছ কাঞ্চন সড়ক দুর্ঘটনায় সহধর্মিণীকে হারিয়েছে, আর কেউ যাতে ঐ রকম নির্মমতার শিকার না হয় তার জন্যে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামের আন্দোলন গড়ে তোলেন। কিন্তু ম্যানেজ করে লাইসেন্স, ম্যানেজ করে ফিটনেস, ম্যানেজ করে পাস হস্তগত হয়ে যাচ্ছে বলে এই আন্দোলন সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছুতে পারছে না। অথচ দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠী জনাব ইলিয়াছ কাঞ্চনের সাথে একমত পোষণ করার পরও কেন সফলতা আসছে না। দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, দুষ্টচক্র কোথায় কিভাবে তা দেশের মানুষ জানেন। এর সত্যতা গত ১ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশন সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপর যে প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পেশ করেছে তাতে ফুটে উঠেছে। স্পষ্ট হয়েছে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দুর্নীতি করে দেশ-জনগণের সর্বনাশের চিত্রটি।

লেখক : রাজনীতিক ও প্রাবন্ধিক