সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮

যথাযথ প্রয়োগের বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ

37

সরকারের খাতায় জমাথাকা দীর্ঘদিনের সড়ক পরিবহন আইনটি অবশেষে আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে। গত প্রায় একসপ্তাহজুড়ে নিরাপদ সড়কের দাবি নিয়ে শিশু ও কিশোর শিক্ষার্থীরা ৯দফা দাবি নিয়ে যুক্তিসংগত আন্দোলন শুরু করলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের সবকটি দাবি পূরণে আশ্বাস দেন। ফলে শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছেড়ে ক্লসে ফিরে যায়। এরপর গত ৬ আগস্ট মন্ত্রী পরিষদের সভায় বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮- এর খসড়া উপস্থাপন করা হয়। সভায় আইনটি অনুমোদনও করা হয়। তবে এ আইন নিয়ে দীর্ঘদিন যে আলোচনা ও পর্যালোচনা চলছিল তাতে যে সমস্ত প্রস্তাব এসেছিল কার্যত তার পুরোটাই আইনে আসেনি। এমনকি প্রত্যাশা ছিল, বিদ্যমান আইনের চেয়ে প্রস্তাবিত আইনটি অনেক বেশি কঠোর হবে। কিন্তু দৃশ্যত তা খুব বেশি কঠোর হয়নি। ফলে আইনের মারপ্যাঁচে অপরাধী পার পেয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ ও সুধিমহলের ধারণা। আইনের খসড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছরের কারাদন্ড ও অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড এবং সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ আইনে আগে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত বা প্রাণহানির জন্য সর্বোচ্চ সাজা ছিল তিন বছরের কারাদন্ড। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের জনদাবি ছিল সর্বোচ্চ সাজা ১০ বা এর বেশি বছর করার। এমনকি হাইকোর্টেরও নির্দেশনা ছিল সাত বছর করার। খসড়া আইনে সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছরের কারাদন্ড করায় যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষা হয়নি, বরং বাস মালিক ও শ্রমিকদের স্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে বলে মনে করছেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।
তবে খসড়া আইনে বলা হয়েছে, তদন্তে কারও নিহত হওয়ার ঘটনা উদ্দেশ্যমূলক হত্যা বলে প্রমাণিত হলে সেক্ষেত্রে ফৌজদারি আইনে মৃত্যুদন্ডের বিধান প্রয়োগ হবে । বস্তুত এটিও নির্ভর করবে পুলিশের তদন্তের ওপর। তদন্ত যদি স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হয় এবং এর প্রতিবেদন ও চার্জশিট যথাযথ হয়, তবেই অপরাধীর উপযুক্ত সাজা হতে পারে। এজন্য তদন্তকারী পুলিশের আন্তরিকতা দরকার। এছাড়া এ বিষয়ে পুলিশের প্রতি বিশেষ নির্দেশনাসহ প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
এ আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এতে দুর্ঘটনায় কেবল চালকের সাজার কথা বলা হয়েছে। এটা ঠিক, আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে চালকের অদক্ষতা, বেপরোয়া গাড়ি চালনা, যাত্রীর উঠানামা ও ওভারটেকের মাধ্যমে অসুস্থ প্রতিযোগিতা ইত্যাদির কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে বেশি। তবে দুর্ঘটনার জন্য চালক ছাড়াও ফিটনেস বিহীন গাড়ি, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক বা অন্য কোনো অবকাঠামো, এমনকি দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিও দায়ী হতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের সাজার বিষয়টি জড়িত থাকার কথা। কিন্তু খসড়া আইনে তা নেই।
খসড়া আইনে আরো বলা হয়েছে, গাড়ি চালানোর অপেশাদার লাইসেন্স পেতে হলে চালকের শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস এবং বয়স ১৮ বছর হতে হবে। আর পেশাদার লাইসেন্সের জন্য বয়স হতে হবে ২১ বছর। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা আরও কিছুটা বেশি করে এসএসসি পর্যন্ত করা উচিত বলে আমরা মনে করি। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানোর জন্য জরিমানা আগে ছিল দুই হাজার টাকা এবং তিন মাসের জেল। এ ক্ষেত্রে নতুন খসড়া আইনে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং ছয় মাসের জেল বা উভয় দন্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চালানোর জন্য বিদ্যমান আইনে সর্বোচ্চ চার মাসের জেল বা ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নতুন আইনে ছয় মাসের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো আইনটির ইতিবাচক দিক সন্দেহ নেই। তবে এসব বিধানের ফলেই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে যাবে এমনটি ভাবার কারণ নেই। মনে রাখতে হবে, আইন প্রণয়নের চেয়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগের বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এদিকটিতে জোরালো দৃষ্টি দিতে হবে। তাছাড়া আইনটি চূড়ান্ত করার আগে এর ত্রুটি-বিচ্যুতি বা ফাঁক-ফোকরগুলো দূর করা প্রয়োজন। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামত ধারণ করে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে তবেই যেন আইনটি চূড়ান্ত করা হয়।