যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৭৯-১৯১৫)

3

যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ১৯১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর উড়িষ্যার বালাসোর হাসপাতালে মারা যান। তিনি বাঘা যতীন নামেই বেশি পরিচিত। তিনি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর দলের প্রধান নেতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালের বিখ্যাত জার্মান প্লট তার মাথা থেকে আসে। বাঘা যতীন ১৮৭৯ সালের ৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ার কয়া গ্রামে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও মা শরৎশশী। ঝিনাইদহ জেলায় পৈতৃক বাড়িতে তার ছেলেবেলা কাটে। ৫ বছর বয়সে বাবা মারা গেলে মা ও বড় বোন বিনোদবালার সঙ্গে নানাবাড়ি চলে যান। তিনি শৈশব থেকেই শারীরিক শক্তির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ছুরি দিয়ে বাঘকে হত্যা করায় নাম রটে যায় বাঘা যতীন। যতীন পড়াশোনা ও খেলাধুলার পাশাপাশি পৌরাণিক নাটকের হনুমান, রাজা হরিশচন্দ্র, ধ্রæব, প্রহ্লাদ প্রভৃতি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৮৯৫ সালে এন্ট্রান্স পাস করে তিনি কলকাতা সেন্ট্রাল কলেজে (বর্তমানের ক্ষুদিরাম বোস সেন্ট্রাল কলেজ) ভর্তি হন। কলেজের পাশেই স্বামী বিবেকানন্দ বাস করতেন। তার সংস্পর্শে এসে তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য আধ্যাত্মিক বিকাশের কথা ভাবতে শুরু করেন। এ সময়ে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। বিবেকানন্দের আহŸানে বন্ধুদের নিয়ে যতীন রোগীদের সেবায় নিয়োজিত হন। বিবেকানন্দের পরামর্শে শরীরচর্চার জন্য অম্বু গুহের কুস্তির আখড?ায় যোগ দেন।
কলেজে পড়াকালে যতীন অ্যাটকিনসন সাহেবের স্টেনো টাইপিংয়ের ক্লাসে ভর্তি হন। কারণ নতুন এ মেশিন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেশি বেতনের চাকরি পাওয়া সম্ভব ছিল। ১৮৯৯ সালে ঔপনিবেশিক মনোবৃত্তির বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে দিয়ে মজঃফরপুর চলে যান। সেখানে ব্যারিস্টার কেনেডির সেক্রেটারি হিসেবে কাজে যোগ দেন। কেনেডি কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে বক্তৃতা এবং নিজের সম্পাদিত ত্রিহুত কুরিয়ার পত্রিকার মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবিরোধী প্রচারণা চালাতেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি পাওয়া কেনেডি মোগল সাম্রাজ্যের উপরে মৌলিক গবেষণার জন্য বিখ্যাত। কেনেডির স্ত্রী ও মেয়ে মারা যায় ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল� চাকীর বোমায়। কেনেডির উৎসাহে মজঃফরপুরের তরুণদের জন্য যতীন ফুটবল ও অ্যাথলেটিক ক্লাব গড?ে তোলেন। কিছুদিন পর কলেরা রোগীদের সেবা করতে গিয়ে মা মারা গেলে যতীন কয়া গ্রামে ফিরে যান। প্রয়াত মায়ের পছন্দ করা পাত্রী কুমারখালীর উমাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়ে ইন্দুবালাকে ১৯০০ সালে বিয়ে করেন। তাদের ৪টি সন্তান হয়। তারা হলেন- অতীন্দ্র, আশালতা, তেজেন্দ্র ও বীরেন্দ্র। কেনেডির সুপারিশে বাংলা সরকারের অর্থসচিব হেনরি হুইলার তাকে নিজের স্ট্যানোগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ দেন। ১৯০০ সাল থেকে মূল ‘অনুশীলন সমিতি’র প্রতিষ্ঠাতাদের সঙ্গে জেলায় জেলায় পত্তন করেন এই গুপ্ত সমিতির শাখা। ১৯০৩ সালে যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণের বাড়িতে অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে যতীন বিপ্লবী কর্মকাÐে জড়িত হন। সরকারি নথিপত্রে যতীন পরিচিত হন অরবিন্দের ডানহাত হিসেবে। তার সংস্পর্শে এসে শরীর গঠন আখড়ায় গাছে চড়া, সাঁতার কাটা ও বন্দুক ছোড়ার প্রশিক্ষণ নেন। যুগান্তর দলে কাজ করার সময় নরেনের (এম এন রায়) সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং অচিরেই একে অপরের আস্থাভাজন হন। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ যুবরাজের ভারত সফরকালে কলকাতায় বিরাট শোভাযাত্রা উপলক্ষে যতীন স্থির করেন এ দেশে ইংরেজদের আচরণ প্রত্যক্ষ করাবেন যুবরাজকে। একটি ঘোড়ার গাড়ির ছাদে একদল সৈনিক বসে মজা করছিল। তাদের বুটপরা পা দুলছিল গাড়ীর যাত্রী ও নারীদের নাকের সামনে। যুবরাজ কাছে আসতে যতীন তাদের নেমে যেতে অনুরোধ করেন। যতীন গাড়ির ছাদে ওঠামাত্রা তারা আক্রমণ করে। কিন্তু থাপ্পড় মারতে মারতে যতীন তাদের ধরাশায়ী করেন। তা দেখে যুবরাজ তার গাড়ি থামাতে বলেন। পরে দেশে ফিরে ভারত সচিব মর্লি’র সঙ্গে ১৯০৬ সালের ১০ মে এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। কিন্তু যতীন জানান, ‘আর পালানো নয়। যুদ্ধ করে আমরা মরব। তাতেই দেশ জাগবে।’ ৪ জন অনুচরসহ মুখোমুখি হলেন বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র পুলিশের। আহতাবস্থায় হাসপাতালে মারা যান ১৯১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। সূত্র : উইকিপিডিয়া