২২ অক্টোবর ২০২০ কবি ময়ুখ চৌধুরীর ৭০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ প্রবন্ধ

ময়ূখ আলোয় ময়ুখকাব্য

মুহাম্মদ রেজাউল করিম

8

ময়ুখ চৌধুরী নদীর মতো বুক ঘষে ঘষে পাড়ি দিয়েছেন কবিতার এতদূর পথ। কাব্যচর্চায় তিনি ইতোমধ্যে অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় অতিক্রম করে এসেছেন। দশকভিত্তিক পর্যালোচনার সুবিধার জন্য ময়ুখ চৌধুরীকে সত্তর দশকের কবি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর সৃজনশীলতার প্রধান মাধ্যম কবিতা। সম্পাদনা করেছেন প্রতীতি এবং কবিতা নামে দুটি সাহিত্য পত্রিকা। ‘খসড়া সম্পর্ক’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। কবি পরিচয়টি ময়ুখ চৌধুরীর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকলেও পেশাজীবনে তিনি ছিলেন বিশ^বিদ্যালয়ে সাহিত্যের অধ্যাপক। কলকাতা বিশ^বিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছিলেন ‘রবীন্দ্রনাথের পোয়েটিক ওরিয়েন্টেশন’ বিষয়ের ওপর। এছাড়া শামসুর রাহমানের কবিতার ওপরও করেছেন উচ্চতর গবেষণা। শ্রেণিকক্ষে তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা মোহের ইন্দ্রজাল তৈরি করে রাখতেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ কালো বরফের প্রতিবেশী প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। ২০২০ সালে প্রকাশিত হয়েছে দশম কাব্যগ্রন্থ চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুন্ডহীন। এক থেকে দশে আসতে সময় নিয়েছেন পুরো একত্রিশ বছর।
এই যাত্রাপথ প্রলম্বিত হওয়ার কারণ কবি নিজেই জানিয়েছেন কবিতার পঙক্তিতে। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেছেন : ‘নদীর মতো বুক ঘষে-ঘষে প্রতিটি পাথরের সংগীত আমি বয়ে আনছি।’ এভাবেইআমার আসতে একটু দেরি হতে পারে কাব্যেরহে কবিতা অপেক্ষা করো কবিতায়ময়ুখ চৌধুরী এই বিলম্বেরকৈফিয়ত দিয়েছেন। তারপর আমরা দেখলাম ‘আমার আসতে একটু দেরি হতে পারে’ (২০০২) প্রকাশিত হওয়ার তের বছর পর প্রকাশিত হয়েছে পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ ‘পলাতক পেন্ডূলাম’ (২০১৫)। কবিতার শিল্পচ‚ড়ায় পৌঁছতে কোথাও যেন এতটুকু ফাঁক আর ফাঁকি না থাকে, একারণেই এই প্রলম্বিত যাত্রাকাল। তাঁর কবিতায় থাকবে বুক ঘষে ঘষে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে আসা পাথরের অন্তর্নিহিত সুরের মূর্ছনা।
যেকোনো সৃজনশিল্পীকে দশকের ছকে আটক করে মূল্যায়ন করার কিছু অসুবিধা আছে। ঘুড়ির নাটাই যে ছাদ থেকে উড়ছে সেই ছাদ গুরুত্বপূর্ণ না-কি যে হাত ধরে উড়ছেসেই হাত গুরুত্বপূর্ণ? কবিকে দশকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা অনেকটা হাতকে নয়, ছাদকে মূল্যায়ন করার মতোই ঝুঁকিপূর্ণ। রবীন্দ্রবলয় থেকে বেরিয়ে আধুনিক বাংলা কবিতার নতুন বাঁকবদলের সময়কে চিহ্নিত করতে গিয়ে তিরিশের দশককে বিশেষভাবে বিশেষায়িত করা হয়েছিল। সাহিত্যের গবেষকগণ সেই জ্যামিতির কারাগারে বন্দী হয়ে পরবর্তী সময়ে চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট- এভাবে দশকের ছাদে হাতকে বেঁধে কবিগণকে বহুলাংশে অবমূল্যায়ন করেছেন। পঞ্চাশের শাদাকালো দশকের ছাদ থেকে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ কবিতার ঘুড়ি উড়ালেও একুশ শতকের আলো ঝলমল সূচনালগ্ন পর্যন্ত তাদের হাত সক্রিয় ছিল। তাছাড়া দশকের বিশেষ প্রবণতার চৌহদ্দির বাইরে যাবেন না, এমন শপথবাক্য পাঠ করেও কোনো কবি কবিতা লেখা শুরু করেন না। ময়ুখ চৌধুরীও পাঠ করেননি এমন কোনো শপথ বাক্য। ময়ুখের কবিতা থেকেই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাক:
কেউ কি বলেছে নাকি একটি বিন্দুর রশ্মি মাত্র দশ দিগন্ত অবধি
হোমার কি দিব্যি দিয়ে বলেছেন সর্গ নেই নয়ের অধিক?
তবে কেন নদীকে ছুরির মাপে কেটে কেটে রেলগাড়ি খেলা
ভ‚মি-জরিপের মতো মুন্সিদের খতিয়ান লেখা!
দশকওয়ারি সাম্প্রদায়িকতার পরিপ্রেক্ষিতে/চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুÐহীন
ময়ুখ চৌধুরীর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল উনিশশো পঁয়ষট্টি সালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ কালো বরফের প্রতিবেশী প্রকাশিত হয়েছে উনিশশো উনানব্বই সালে। পঁয়ষট্টি থেকে উনানব্বই, মাঝখানের এই চব্বিশ বছর তাঁর কবিতা বিপুল পরিমাণে প্রকাশিত হয়েছে দুই বাংলার প্রায় সব সাহিত্যমাধ্যমে। উল্লেখিত কবিতাতেই তিনি বলেছেন:
ষাটের মাঝরাতে যার স্বপ্নদোষ হয়েছে প্রথম
সে যদি বিবাহ করে আশির দশকে, তবে
তার কলমের কালি আঁকা হলো কোন বিছানায়?
কবিতা পড়তে পড়তে বোঝার আগেই ভালো লেগে যেতে হবে। এটাই সার্থক কবিতার প্রথম, হয়ত প্রধানতম ভ‚ষণ। কবি সাংবাদিক নন, তাই কেউ শব্দের অবিভাজ্য অর্থ কবিতার মধ্যে খুঁজতে যান না। কবিতার শব্দগুলো বহুমুখী অর্থ, ইঙ্গিত, দর্শন এবং হাজার বছরের প্রতœকথার সম্ভাবনা ধারন করে পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয়। এবং এই উন্মোচন হবে অবশ্যই অনির্বচনীয় ভালোলাগার অন্তরাল ভেদ করে। দার্শনিক ভাবনা, বৈজ্ঞানিক থিম, বিবর্তনবাদ, পৌরাণিক অনুষঙ্গ, রাজনৈতিক চিন্তন, মৃত্যুভাবনা, সামাজিক গতিধারা, মুক্তিযুদ্ধ এবং সর্বসাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকেও তিনি অঞ্জলিভরে তুলে এনেছেন কবিতার শিল্পচ‚ড়ায়। সুতরাং ময়ুখকাব্যের পাঠকের যদি বর্ণিত এই বিষয়গুলোর ওপর স্বচ্ছ জ্ঞান না থাকে তাহলে কবিতার ভালোলাগা সহজে উপভোগ করতে পারলেও কবিতার নির্যাস উপলব্ধি করতে কিছুটা বেগ পেতে হবে। কাব্যালঙ্কারের ব্যবহারেও অনন্য দৃষ্টান্তের সাক্ষর রেখেছেন কবি। শব্দালঙ্কার এবং অনন্য অর্থলঙ্কারের উপস্থিতি উপস্থাপন করা যায় ময়ুখকাব্য থেকে পঙক্তি ধরে ধরে।
প্রত্যেক কবিরই জীবনকে দেখার নিজস্ব একটি ভঙ্গি থাকে। এই নিজস্ব জীবনবোধ কবির স্বতন্ত্র পরিচয়কে পৌঁছে দেয় সকলের কাছে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনবোধ আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনবোধ এক নয়। অনুরূপ নজরুল আর জীবনানন্দের জীবনবোধও এক নয়। প্রত্যেক সফল এবং প্রকৃত কবিই কোনো না কোনোভাবে অন্যদের তুলনায় কবিস্বাতন্ত্র্যের দিক থেকে স্বতন্ত্র সত্ত্বার অধিকারী। এই স্বতন্ত্র সত্ত¡া নির্মিত হয় কবির বেঁচে থাকার সময়, ভৌগোলিক পরিসীমা, মেধার চৌহদ্দি এবং এসবের সমন্বয়ে অর্জিত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। কবি ময়ুখ চৌধুরীও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নন। তিনি শারীরিকভাবে চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং কলকাতা- এই তিন শহরে বেড়ে উঠলেও তাঁর মেধার প্রসার এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। পাশ্চাত্য এবং প্রাচ্যের দর্শন, পুঁজিবাদী এবং সাম্যবাদী অর্থনীতি, সেরাসিন এবং ভারতীয় ধর্মবিধি ইত্যাদির মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়েছে কবি ময়ুখ চৌধুরীর নিজস্ব কবিস্বাতন্ত্র্য। এপ্রসঙ্গে প্যারিসের নীলরুটি কাব্যের র্যাঁবো, রিলকে আর সার্ত্রে কবিতার কিছু পঙক্তি উদ্ধৃত করা যায়:
স্বপ্নে আমার কালকে রাত্রে
এসেছিলো জাঁ পল সার্ত্রে,
বললো-“খোকা, খেলছো শব্দ নিয়ে?
শব্দের সাথে শব্দের দাও বিয়ে!
দর্শন ছাড়া আছে আর কিছু বিত্ত?
সুখী হবে না তো দু’জনার অস্তিত্ব।”
ময়ুখের কবিতায় বৈজ্ঞানিক প্রকৌশলের ব্যবহারের কথা ইতিমধ্যেই জানিয়েছি। বৈজ্ঞানিক এবং গাণিতিক উপমার ব্যতিক্রম ব্যবহার পাওয়া যাবে ময়ুখের অজস্র কবিতায়। বিশেষত ক্যাঙ্গারুর বুকপকেট এবংপিরামিড সংসারকাব্যে বিজ্ঞানের নানামুখী প্রকৌশলকে তিনি কাব্যিক ব্যঞ্জনায় উপমায়িত করে ব্যবহার করেছেন। জীবনের অনেকগুলো বসন্ত বহন করে নিয়ে আসা শরীরকে তিনি কবিতায় প্রকাশ করেছেন জীববিজ্ঞানের উপমা দিয়ে :
আমার বসন্তগুলো প্রাণপণে জড়িয়ে ধরেছে
জীববিজ্ঞানের এক পুরাতন বইয়ের মলাট।
পুরাতন বইয়ের মলাট/পিরামিড সংসার
বিবর্তনবাদের অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন কবিতার দীর্ঘ বিরতিকে যুক্তিগ্রাহ্য করার জন্য। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, কবিতার করণকৌশলের বিবর্তনকেও কবি নিজ কবিতায় বিভিন্নভাবে আশ্রয় দিয়েছেন। নিচের পঙক্তি থেকে পাঠক মাত্রেরই কৌত‚হল জাগবে – নিয়ানডার্থালপূর্ব প্রজাতির দুই হাত কেমন ছিল:
নিয়ানডার্থালপূর্ব প্রজাতির মতো হাত দুটোকেও কাজে লাগাতে পারতাম,
আঁদ্রে ব্রেতো খুশি হয়ে দেখতো; একটা চৌকি হেঁটে যাচ্ছে।
হে কবিতা, অপেক্ষা করো/আমার আসতে একটু দেরি হতে পারে
বিবর্তনের পথে বিলুপ্ত বাইসন আর ম্যামথকে কবি ব্যবহার করেছেন রাজনৈতিক দর্শনের ছকে এঁকে। যেখানে পুঁজিবাদী দৈত্যগুলো আফিমপরীদের পৃষ্ঠপোষকতায় আজো টিকে আছে:
লবণাক্ত ইতিহাস পথ চলে নুড়ি ও পাথরে;
কথা ছিলো: বাইসন ম্যামথ হবে প্রাক্তন জগৎ।
ইঁদুর/কালো বরফের প্রতিবেশী
কবির রাজনৈতিক অবলোকন কালো বরফের প্রতিবেশী কাব্যের ‘স্মৃতি ও স্বপ্নের বাংলাদেশ’ কবিতায় ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে। সতেরোশ সাতান্ন সাল থেকে উনিশশো পঁচাশি সাল পর্যন্ত এই ভূখন্ডের রাজনৈাতিক পালাবদল, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, বিদ্রোহ-সংগ্রাম ধারাবাহিকভাবে বিন্যস্ত হয়েছেএই কবিতায়। ১৭৫৭ সালের ওপর কবি বলেছেন,
লোহার বাসরঘরে ঢুকেছে মনসা বৃটেনের,
এবার নীলের চাষ, বাজে গান শুধু মরণের।
আঠারোশ সাতান্ন’র সিপাহী বিদ্রোহ, উনিশশো পাঁচের বঙ্গভঙ্গ, সাতচল্লিশের প্রশ্নবিদ্ধ স্বাধীনতা, বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয়দফা, উনসত্তুরের গণ অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, পঁচাত্তরের পৈশাচিক হত্যাকান্ড, আটাত্তরের সামরিক শাসন, তিরাশির মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের রেমিটেন্সের জোয়ার এবং পঁচাশির স্বৈরচার বিরোধী আন্দোলন উঠে এসেছে এই কবিতায়। ১৯৭১ শীর্ষক পঙক্তি দুটো হলো, ‘সবুজের মাঝখানে লাল হৃৎপিÐ জ¦লে ওঠে/এবার ফুটবে হাসি মাটিমাখা মানুষের ঠোঁটে।’ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা নিয়ে লিখেছেন ১৯৭৫ শীর্ষক পঙক্তিমালা। তিনি লিখেছেন:
কেনো আগাছার ভীড়ে বিষধর সাপের ভেতর
বেড়ে উঠেছিলে তুমি,গড়েছিলে স্বপ্নের কবর!
১৯৮৩ সালে অ্যাপেক তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি রাতারাতি পাল্টে যায়। এর প্রভাব পড়ে প্রবাসী বাঙালিদের ওপর। তাদের উপার্জনও বেড়ে যায় কয়েকগুন। ফলে হু হু করে দেশে রেমিটেন্স আসতে শুরু করে। প্রবাসী পরিবারগুলো সেই টাকা খরচ করতে শুরু করে দেদারসে। ভোগ বিলাস ছাড়াও তারা ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত মানুষের জায়গা জমি কিনতে শুরু করে। তাদের এই টাকার স্রোতের প্রভাব পড়ে এদেশের নিম্নমধ্যবিত্ত এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পেশাজীবী শ্রেণির ওপর। বিপন্ন হয় তাদের নৈমিত্তিক জীবন, মানসচিত্ত। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ময়ুখ চৌধুরী ১৯৮৩ শীর্ষক পঙক্তিমালায় বলেছেন: ‘বঙ্গোপসাগরতীরে লবণাক্ত মানুষ আমরা/ পেট্রোলিয়ামের গন্ধে পাদুকার বিকল্প চামড়া।’
আমার আসতে একটু দেরি হতে পারে কাব্যের ‘নূর হোসেন, সংসদে যাবে না?’ কবিতাটি কবি লিখেছিলেন স্বৈরচার পতনের অব্যবহিত পরে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৭ ফেব্রæয়ারি, ১৯৯১ আর এই কবিতাটি ময়ুখ চৌধুরী লিখেছেন ১৯ ফেব্রূয়ারি ১৯৯১। এই কবিতায় কবি বলেছেন ‘আকাশ মানেই হলো গণতন্ত্র, মাঝে মধ্যে মেঘ।’ মেঘে মেঘে আমাদের গণতন্ত্রের কেটেছে অনেক বেলা। এমন কবিতা না থাকলে একসময় বাংলাদেশ হয়ত ভুলেই যাবে কত কত ত্যাগের বিনিময়ে এদেশে গণতন্ত্র এসেছিল। নূর হোসেন কীভাবে তাঁর কৃত্রিম পোশাক ফেলে দিয়ে নিজের শরীরটাকেই গণতন্ত্রের তীব্র আকাক্সক্ষার আকাশ করে তুলেছিল সেইদিন!
কাদের আঙুলগুলি ব্যস্ত আজ লুব্ধ ভূমিকাতে!
মধ্যমা কনিষ্ঠা আর অনামিকা-তর্জনীর অনাত্মীভবন.
বুড়ো আঙুলের টিপে দেখো আজ ব্যতিব্যস্ত সংসদভবন,
.. .. .. .. .. .. .. ..
প্রতীকে প্রতীকে আজ চলে মানুষের বেচাকেনা।
নূর হোসেন, সংসদে যাবে না?
নূর হোসেন, সংসদে যাবে না?/আমার আসতে একটু দেরি হতে পারে
স্বরবৃত্ত তাল লয়ের সর্বাঙ্গিন সুন্দর আরেকটি রাজনৈতিক কবিতা মিছিল, তুমি বামদিকে যাও। জারুলতলার কাব্যএর অন্তর্ভূক্ত এই কবিতাটি সাম্যবাদী রাজনৈতিক মঞ্চে মুহুর্মুহু উচ্চারিত হওয়ার মতো একটি কবিতা।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

সূচনা থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত কবিতাটি ৪+৪+৪+২ পর্ব বিভাজনে নির্মিত। কয়েকটি পঙক্তি লক্ষ্য করুন:
ডান দিকে নয়, ডান দিকে নয়, বাম দিকেতে যাও;
বাম দিকে যাও কাস্তে কোদাল লোহিত পালের নাও।
ডান দিকে সব রক্তচোষা বাদুড় ঝুলে আছে,
বাম দিকে ঐ মুক্তি নাচে শিমুলপলাশ গাছে।
কালো বরফের প্রতিবেশী কাব্যের ‘ইঁদুর’, ‘স্মৃতি ও স্বপ্নের বাংলাদেশ’; আমার আসতে একটু দেরি হতে পারে কাব্যের ‘চলো যাই, মুক্তিযুদ্ধ’,‘নূর হোসেন, সংসদে যাবে না?’ জারুলতলার কাব্যের ‘মিছিল তুমি বাম দিকে যাও’ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক কবিতা। এছাড়া ময়ুখ চৌধুরীর প্রতিটি কাব্যগ্রন্থে মৃত্যুচিন্তার কবিতা যেমন অবশ্যম্ভাবিভাবে ঠাঁই পেয়েছে তেমনি তাঁর রাজনৈতিক কবিতাগুলোও আশ্রয় পেয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।
২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর বিশ্বজিৎ দাস নামক এক দর্জিকে প্রকাশ্যে দিবালোকে হত্যা করা হয়েছিল। পুরান ঢাকায় পুলিশের উপস্থিতিতে এবং সাংবাদিকদের ক্যামরার সামনে নৃশংসভাবে সংঘটিত হত্যাকান্ডটি সারাদেশের বিবেকবান সর্বস্তরের মানুষকে পীড়িত করেছিল। বিশ্বজিতের সেই হত্যাকান্ডের ওপর ময়ুখ চৌধুরীর দুটি কবিতা আছে চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুন্ডহীন কাব্যে। কবিতা দুটো হলো ‘দর্জির ছেলের মৃত্যু’ এবং ‘বাড়িফেরা’।
তুমি রাত্রি জেগে কাপড় কেটেছ,
আমরাও কেটেছি-দিনের আলোতে প্রাকৃতিক আবরণ।
তুমি সেলাই করেছিলে আমাদের জামা,
আমরাও সেলাইয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছি ময়নাতদন্তে।
দর্জির ছেলের মৃত্যু/ চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুন্ডহীন
দেশ-কাল-পাত্রহীন বিশ^ব্যাপী মানুষের ওপর মানুষের অমানবিক আর হিংসাত্মক আচরণ উঠে এসেছে পানের চেয়েও লাল রক্তের উপমার মধ্য দিয়ে। মানুষ কি পৃথিবীতে একমাত্র জাতি যারা স্বগোত্রীয়ের রক্ত ঝরিয়ে উল্লাস করে? মানুষের খাদ্য তালিকা দেখুন একবার:
বাচ্চারা অনায়সে টুথপেস্ট খেয়ে ফেলতে পারে
বড়োরা পারে না।
তাদের খাদ্যের তালিকায়
পানের চেয়েও লাল মানুষের রক্ত উঠে আসে
টুথপেস্ট/পিরামিড সংসার
শ্রমজীবী মানুষের আর্তনাদ উঠে এসেছে পিরামিড সংসার কাব্যের ‘বেহুলার বোন’ কবিতায়। অনির্বচনীয়ভাবে ভালোলাগার মতো একটি দীর্ঘকবিতা এই ‘বেহুলার বোন’ কবিতাটি। এখানে উদ্ধৃত করছি কয়েকটি পঙক্তি:
শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত ঘরে
শ্রমজীবী প্রতীকেরা এখানে কী করে!
বেহুলার বোনের প্রেমিক
ষোলো কোটি পাকস্থলী রাজপথে ঘামে-
প্রেম নিয়ে কবি সাহিত্যিকদের কলমের কালি আর মস্তিষ্কের নিউরন, দুটোই ক্ষয়ে এবং বয়ে চলছে আবহমান কাল ধরে। জারুলতলার কাব্য’র অধিকাংশ কবিতাই প্রেমময় পঙক্তিতে বিন্যস্ত। কবি ময়ুখ চৌধুরী প্রেমের যাত্রাপথ নির্দেশ করেছেন এভাবে:
প্রেমতো চোর নয়, ডাকাতের মতো চিঠি দিয়ে আসে,
হত্যাকারীর মতো রক্ত নিয়ে যায়।
ভালোবাসার প্রথম অধিবেশন/কালো বরফের প্রতিবেশী
অলঙ্কারহীন, শুধুমাত্র দার্শনিক চমকপূর্ণ কবিতা কালের দৈর্ঘ্যে টিকে থাকবে কি-না এই বিষয়ে বোদ্ধামহলে বিতর্ক রয়েছে। কবিতার মাথামুন্ড কিছু না বুঝে শুধুমাত্র আলঙ্কারিক চমকের মোহে অনেক পাঠক ঘন্টার পর ঘন্টা কবিতা পাঠ করেন। জীবনানন্দ দাশের কবিতা এক্ষেত্রে প্রোজ্জ্বল প্রমাণ। বলাবাহুল্য একেকটি কবিতা তার আলঙ্কারিক সাফল্যের কারণেই মানুষের হৃদয়ে দৃঢ় আসন গড়ে নেয়। শব্দালঙ্কার এবং অর্থালঙ্কারের বিচারেও ময়ুখ চৌধুরীর কবিতা যেকোনো শ্রেণির পাঠকের হৃদয় জয় করতে সক্ষম। কবিতার অর্থবাচকতার ওপরেও কথা বলা যায় এখানে। গদ্যসাহিত্যে যেমন শব্দের গায়ে চিরন্তন হয়ে লেগে থাকা অর্থটাই একমাত্র লক্ষ্য, কবিতায় তেমনটা নয়। কবিতার একেকটি শব্দের মধ্যে নিদ্রাহীন জেগে থাকে বহুমুখী অর্থের নিনাদ। নিচের পঙক্তিগুলোর বাচ্যার্থ এবং কাব্যিক ব্যঞ্জনা লক্ষ্য করুন:
রূপার নোলকে সাজায় কৃষ্ণপক্ষ
অন্ধকারের পরতে পরতে দ্যুতি।
জোয়ারের নামে কামার্ত নদীবক্ষ
অর্জন করে মোহনার বিচ্যুতি।
ঝাউতলার চাঁদ/কালো বরফের প্রতিবেশী
ক্রমহ্রাসমান কৃষ্ণপক্ষের চাঁদকে রূপার নোলকের সাথে উপমা একমাত্র কবিতাতেই সম্ভব। অর্থলঙ্কার দেখুন অন্ধকার এবং দ্যুতির বিরোধাভাস। বাচ্যার্থ বিচার করলে কি অন্ধকারের পরতে পরতে দ্যুতির অস্তিত্ব সম্ভব? কিন্তু কবি জানেন অন্ধকার এবং দ্যুতি হলো একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কৃষ্ণপক্ষের আকর্ষণে সৃষ্ট জোয়ারের ভিতর কামের গন্ধ নির্ণয় করতে দুটি দিকের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রথমত কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার এবং দ্বিতীয়তএকই সময় সৃষ্ট পৃথিবী এবং চাঁদের বিগলিত আকর্ষণ। শ্রবণ এবং পাঠসুখকর এমন এন্তার কবিতার উদ্ধৃতি দেওয়া যায় ময়ুখকাব্য থেকে।
অর্ধেক রয়েছি জলে, আর্ধেক জালে কাব্যের এ শহর আমার শহর কবিতাটিও ছন্দবৈচিত্র্যের কারণে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। পাঠসুখকরতো বটেই। তাল লয়ের দিক থেকে এই কবিতাটি কিছুটা দ্রæত আবৃত্তি করলে সাত মাত্রার স্বরবৃত্ত হিসেবে ঠিকঠিক মিলে যায়। ৩+৪/৩+৪ এভাবে প্রতি পর্বে সাতমাত্রা এবং পঙক্তিতে ১৪ মাত্রা। স্বরবৃত্ত হিসেবে অবশ্যই অনন্য উদাহরণ। কেননা স্বরবৃত্তে আমরা পর্বে চার মাত্রা দেখতেই অভ্যস্ত। আবার তাল লয় কিছুটা ধীর করে আবৃত্তি করলে মাত্রাবৃত্ত হিসেবেও কবিতাটি সুন্দর আবৃত্তি করা যায়। কবিতাটির কয়েকটি পঙক্তি দেখুন:
এ শহর আমার শহর
এখানে বৃষ্টি-মেঘে কেটেছে হাজার বছর
তিমিরে তিমির পেটে উর্মিলা স্বপ্ন ঘেঁটে
সহসা সাঁতার কেটে জেগেছে আদিম লহর;
ময়ুখকাব্যজুড়ে দীর্ঘ কবিতা লেখার একটি প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। শিল্পসুন্দর এই দীর্ঘকবিতাগুলো ময়ুখ চৌধুরীর কবিস্বাতন্ত্র্যের সাক্ষর বহন করে। উপমা এবং রূপক হিসেবে মোমবাতির উল্লেখ রয়েছে ময়ুখের বেশকয়েকটি কবিতায়। কবিতাভেদে মোমবাতির অর্থও সবসময় একরকম থাকে না। মোমবাতি মানুষের জীবনের মতো আলো ছড়াতে ছড়াতে একসময় নিঃশেষ হয়ে যায়। আলোকরশ্মিসম কয়েকটি পঙক্তি দেখা যাক এখানে —-
আমি নিজেই মোমবাতির শিখার মতো জ¦লতে থাকবো;
দেখি, শেষ পর্যন্ত কোনো প্যাঁচা এসে বলে কিনা-
‘বাতিটা নেভাও, আমি কষ্ট পাচ্ছি।’
জন্মরাতে/কালো বরফের প্রতিবেশী
মোমবাতির নিঃশব্দ কান্নাও কাব্যমোদীর হৃদয়ে কৃষ্ণপক্ষের তীব্র উত্তাল ঢেউ সৃষ্টি করতে পারে:
ঘুমের ভেতরে তুমি একদিন
একটু ঘুমিয়ে নিও, আমি খুশি হবো।
শব্দহীন কেঁদে যাবে একা মোমবাতি
সারারাত ধ’রে
জমাট কান্নার মতো তুমিও পাথর হয়ে যেও
ঘুমের ভেতরে।
ঘুমের ভেতরে/প্যারিসের নীলরুটি
এই ঘুমের ভেতরে কবিতাটি অনন্য সুন্দর একটি দীর্ঘকবিতা। একজন নারীর শৈশব, কৈশোর, যৌবন আর পরিণতজীবনের আনন্দ-উচ্ছলতা আর জীবনযন্ত্রণা কাব্যিক নির্মাণের মধ্য দিয়ে এই কবিতায় বিকশিত হয়েছে।
সম্বন্ধপদ হিসেবে পিপাসাকে ঘুমের প্রতি কীভাবে সম্পর্কিত করা যায় তারও দৃষ্টান্ত দেখা যায় ময়ুখ চৌধুরীর কবিতায়। কুসুমের কীট, রঙিন গ্লাসের বিষ, স্বর্ণের খাদ এবং নারীর ছিনাল কবিতার যেকোনো আনাড়ি পাঠককেও স্তব্ধ করে দিবে। লক্ষ্য করুন এই তিনটি পঙক্তির শব্দ এবং অর্থব্যঞ্জনা-
কুসুমেতে কীট থাকে, বিষ থাকে রঙিন গেলাশে,
মর্মান্তিক খাদ থাকে স্বর্ণ আর নারীর ভেতর।
কেবল মাটির পাত্রে পিপাসার ঘুম নেমে আসে।
একজন ফিরে আসে/কালো বরফের প্রতিবেশী
বয়স বাড়তে বাড়তে মানুষের মাথার ওপর একসময় কলপের মতো কালো রাত নেমে আসে। কবিতায়ও নেমে আসে সেই উপমা:
অপেক্ষায় থেকে থেকে মানুষেরা বৃদ্ধি পায়, বৃদ্ধ হয়ে যায়,
কলপের মতো কালো রাত নামে মাথার ওপর
যুগান্তরের গল্প/ তোমার জানলায় আমি জেগে আছি চন্দ্রমল্লিকা
অনুপ্রাস এবং যমকের সম্মিলন হয়েছে এমন একটি পঙক্তি উদ্ধৃত করছি এখানে। ব- এর অনুপ্রাস এবং বেলা এর যমক এসে মিলেছে এই পঙক্তিতে —-
বেলায় কাটাচ্ছো বেলা পিপাসার্ত বালির বালিকা
সমুদ্র দর্শন/অর্ধেক রয়েছি জলে, অর্ধেক জালে
উক্ত পঙক্তিতে ব এবং ল এর অনুপ্রাস সৃষ্টির পাশাপাশি ‘বেলা’র যমক দেখিয়েছেন কবি। যেমন: বেলায় কাটাচ্ছো বেলা। এখানে ‘বেলায়’ হলো সমুদ্রের বেলাভূমি, অন্য ‘বেলা’র অর্থ হলো সময়।
পরাবাস্তব জগতে কবির বিচরণ আছে অনেকগুলো কবিতায়। পুরো আঁদ্রে ব্রেতোকেই একাধিক কবিতায় তিনি তুলে নিয়ে এসেছেন। ‘ময়ুখ চৌধুরীর কবিতায় সুরিয়াল তন্দ্রা’ শিরোনামে পরাবাস্তবতার ওপর হাজার হাজার শব্দ ব্যয়ে প্রবন্ধ লেখা সম্ভব। চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুন্ডহীন কাব্যের ‘চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুন্ডহীন’ শীর্ষক ১নং কবিতায় কবির সাথে ছায়ার অভিমান দেখে আমাদেরও কষ্ট হয় বুকের ভিতর:
আমার খারাপ লাগে-আমি রোদ পোহাই, অথচ আমার ছায়া তা পারে না। .. .. ..
আজ, জানলা দিয়ে স্পষ্ট দেখলাম: আমার নিঃসঙ্গ ছায়াটা একা একা রোদ পোহাচ্ছে। এবং আমি নেই।
ঘুড়িহীন লাটাই ঘুরে ময়ুখের কবিতায়। কিন্তু কেন ঘোরে এ লাটাই? এ প্রশ্ন আপাতত ঘুমিয়ে থাকুক পরাবাস্তবতার ইন্দ্রজালে।
তোমার বাড়ির ছাদে এখনও তো কারো ভাই বিকেল বেলায়
ঘুড়িহীন লাটাই ঘোরায়।
পাথরঘাটার পদ্য/পিরামিড সংসার
পরাবাস্তবের বিপ্রতীপে আছে অস্তিত্ববাদ। আঁদ্রে ব্রেতোর বিপরীতে জাঁ পল সার্ত্রের মতো। ময়ুখের কবিতাতেও আস্তিত্ববাদী দর্শনজাত বিশ্বাস লক্ষ্যণীয়। তিনি শ্রমজীবী মানুষকে ব্যঞ্জনায়িত করার জন্য কাব্যগ্রন্থের নামই রেখেছেন কালো বরফের প্রতিবেশী। এই কালো বরফ আর কিছু নয়, শ্রমজীবী মানুষেরই প্রতীক। প্রাগৌতিহাসিক কাল থেকে আমাদের গ্রহে দুই শ্রেণির মানুষ বিচরণ করছে। তাদের হাতে চলছে এই জগতের ভাঙা গড়ার খেলা। নিপীড়ক আর নিপীড়িত, শ্রমবাদী আর ভোগবাদী – এই দুই শ্রেণির কোনো না কোনো শ্রেণিতেই আছি আমরা সকলে। পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত, সর্বত্র। শ্রমবাদীর ঘামে ভোগবাদীর প্রাসাদ গড়ে ওঠে, নিপীড়িতের কান্নায় নিপীড়কের ভোগ-দখল আর ক্ষমতা পোক্ত হয়। বরফ গলে জল ঝরে পড়ে, শরীর গলে ঘাম নেমে আসে মাটির মমতায় আর চোখ বেয়ে নেমে আসে অব্যক্ত যন্ত্রণার লবণ। এই অস্তিত্ববাদ ছাড়া কবিতাকে শিরদাঁড়া দাঁড়াতে পারে না। ময়ুখ চৌধুরী নিজেই বলেছেন, তাঁর নব্বই ভাগ কবিতা অভিজ্ঞতাজাত সূত্রের ওপর তৈরী।
বিন্দু থেকে বিশালতার মধ্যে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাওয়ার মতো অনন্য দক্ষতা আছে শিক্ষক ময়ুখ চৌধুরীর। তিনি সাহিত্য পাঠের গূঢ়ার্থ বোঝাতে গিয়ে বলেন, সাহিত্যশিক্ষার্থীদের পাঠ্য হলো মানুষ এবং সমাজ। এক্সরে মেশিন শুধুমাত্র জীবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অন্তর্গত রহস্য অবলোকন করতে পারে। কিন্তু সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের অবলোকন করতে হবে মানুষ আর সমাজের আদ্যন্ত অর্ন্তগত নিনাদ। রাজনীতি বলে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। কিন্তু সাহিত্য তা অনুমোদন করে না। সাহিত্য মানুষকেই বড় করে দেখে। এখানে ব্যক্তির চেয়ে সমাজ বড় নয় বরং সমাজের চেয়ে ব্যক্তিই বড়। রবীন্দ্রনাথ পড়াতে গিয়ে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশ এবং বিশ্বব্রহ্মান্ডকে তুলনামূলকভাবে নিয়ে এসেছেন শিক্ষার্থীদের চোখের সামনে। স্থান, কাল এবং ব্যক্তিকে জ্যামিতিক রেখায় এঁকে কীভাবে সাহিত্যের বিশ্লেষণ করতে হয় তিনি তা শিখিয়েছেন দিনের পর দিন। কবিতার পাঠ পঙক্তি ধরে ধরে বিশ্লেষণ করার মতো প্রাচীনপন্থী শিক্ষক নন তিনি। পাঠ করবে শিক্ষার্থী আর কীভাবে পাঠ করবে তার পথ-পদ্ধতি শেখানোতেই শ্রেণিকক্ষে অনন্য হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ওমর খৈয়াম পড়াতে গিয়ে তিনি আরব আর পারস্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সাংস্কৃতিক দন্দ্বকেও নিয়ে এসেছিলেন পাঠের ভিতর।
মাথা বিক্রি করা মুকুটে নয়, ময়ুখ চৌধুরী বরণীয় এবং স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তাঁর সৃজনকলায়, যুগ-যুগান্ত ধরে। হঠাৎ চমক জাগানো অনেক কবি ও কথাশিল্পী অনতিবিলম্বেই হারিয়ে গিয়েছেন কালের ধূলোর নিচে। এমনকি বড় বড় পুরস্কারও টিকিয়ে রাখতে পারেনি অনেকের অনুল্লেখযোগ্য কীর্তিকে। অন্যদিকে স্বর্ণশীর্ষবিন্দুতে আলো এসে পড়ুক আর না-ই পড়ুক, ধূলোর আস্তরণ তাকে কখনোই ঢেকে দিতে পারবে না। ময়ুখ চৌধুরীর কবিতার অনির্বচনীয় ভালোলাগা এবং হিরণব্বয় নির্যাস তাঁকে নিয়ে যাবে কাব্যমোদীদের হৃদয়ে, হৃদয়মল্লিকায়।

সূত্র:
১. ময়ুখ চৌধুরীর সাক্ষাৎকার : মাছরাঙা টেলিভিশন এবং বার্তাটুয়ান্টিফোর ডট কম।
২. ময়ুখ চৌধুরীর সব কাব্যগ্রন্থ
৩. আমার সাথে ময়ুখ চৌধুরীর নিয়মিত ফোনালাপ
৪. শ্রেণিকক্ষে ময়ুখ চৌধুরীর আলাপন।