‘মৌলিক পৃষ্ঠায় হেঁয়ালি’ পাঠের পর

ইলিয়াস বাবর

35

‘কবিতা তো আর গল্প প্রবন্ধ কিংবা উপন্যাস নয় যে একেবারে পাঠকের মুখে তুলে দিতে হবে। কবিতার পাঠক কিন্তু গড়পড়তা পাঠক নন! যিনি কবিতার পাঠক, যতিচিহ্ন না থাকলেও তিনি কবিতাটা ধরতে পারেন।’ এমন দৃঢ়ভাবেই যার কবিতাযাপন, ইস্পাত-কঠিন সংকল্প আর অভিজ্ঞানের মধ্য দিয়ে ঢুকতে চায় কবিতার জগতে তারই অধিকার আছে কবিতা চর্চার, কবিতা নির্মাণের। তাহলে, প্রতিনিয়ত যোগ হওয়া কবিতা-নামীয় পংক্তিগুচ্ছ কি কবিতা নয়? ফেসবুকের বাগাডম্বর, স্বঘোষিত কবি তকোমাধারীদের দিয়ে কি কবিতাচাষ হতে পারে? এসব ধর্তব্যে থাকলে সেই কবে জঞ্জালে ভরে যেত আমাদের ঐতিহ্যিক-বৌদ্ধিক সম্মিলনের কবিতা নদী! সময় বড় বিচারক হেতু তার তুলাদন্ডে আশ্রয় পায় কেবল কবিতা-ই। কবিতা বিনে চেহারা আর বকোয়াবাজীর শব্দসমষ্টি সময়ের অপচয় বৈ কিছুই নয়। এজন্যই কবিতা-কিতাব হাতে নেয়ার আগে রুচি ও কমিটমেন্টের দিকে নজর দিতে নয়। প্রবাহমানতার ভেতরেও চেকে দেখতে হয় রুচিবোধ ও সৌন্দর্যপ্রীতির আশ্চর্য রূপময়তার বৈভব। মূলত সংক্রমণের গভীর এক ব্যাধিতে পাঠক বোধের অতি উচ্চ স্তরে শোকর পেশ করার সুযোগ পায় কবিরই সু গভীর অভিনিবেশের কল্যাণে। কবি ওবায়েদ আকাশ তার কাব্যচিন্তার প্রয়াসে পাঠককে সারথী করেছেন সেই নব্বইয়ের দশক থেকে। দীর্ঘ কবিতাযাত্রায় তার কাব্যভাষা যেমন বদলেছে, গ্রন্থের পর গ্রন্থেও দৃশ্যমান হয় বিপুল পরিবর্তন। নিজেকে ক্রমাগত ছাড়িয়ে যাবার মাঙ্গলিক শুদ্ধতায় তিনি নির্মাণ করতে থাকেন নিজেরই আলাদা একটি স্বরÑ তা পরিবর্তনমানতা আর সময়ের দাবির কথা মাথায় রেখেই। প্রচলিত শব্দবন্দনা, কবিতার শরীর নির্মাণ ও দর্শনচিন্তা এবং স্বচ্ছ ধারণার কল্যাণে কবিতা সত্যিকার অর্থেই শিল্পের উচ্চমার্গীয় শাখা হিসেবে বিবেচিত করার দাবি করে যান নিরন্তর। সৃজনের স্বরাজে তিনি পাঠককে সঙ্গি করেন দূরতম যাত্রায়। সময়ের অভিঘাতে পরিবর্তনের হাওয়া কবি বলার কৌশলে পাঠকই যেন চমকে চমকে উঠে। ‘অভিনেতা তীর্থঙ্কর’ কবিতায় দেখা যায় পরিবর্তনের বিরাট লহরÑ ‘তীর্থঙ্কর, অভিনয়ের প্রাক ভ‚মিকায়/ তার গোফের উপর বসিয়ে দিল নার্সারী। তাতে যা লাভ হলো:/ ফুটে থাক দুচারটি ফুল আবশ্যক পারফিউমের কাজটি অক্ষত হয়ে গেল… আর এখন তাতে ফল ধরবেÑ যা পেকে খেতে/ তীর্থঙ্করের স¯েœহ আর্শীবাদ প্রয়োজন পড়বে তোমাদের…’ প্রচ্ছন্নভাবে পুঁজির প্রভাব প্রতিপত্তিকেই যেন কবি এঁকে দেন কবিতার পংক্তিজুড়ে। সময়ের দর্শনগতভাব আর স্বকালের চরিত্রে কখনোই বিস্মৃত হন না প্রকৃত কবিরা। আর থাকে বেড়ে উঠার উর্বর সময় শৈশব। শৈশবের পেছন থেকে হাত নেড়ে ডেকে যায় নস্টালজিক মুহূর্তে মনে হয় কবিতা থেকে বেরিয়ে পড়িÑ প্রকারান্তে এই মিথ্যাবাদী নগর, স্বার্থেমোড়া সংঘ সব কিছু থেকেই বেরিয়ে পড়ি, কেবল সবুজ আর সরলতার মায়া। আরেক পৃথক সাক্ষাতকারে কবি ওবায়েদ আকাশ শৈশব সর্ম্পকেই বলেনÑ‘প্রথম জীবনই মৌলিক জীবন। আমি আমার প্রথম জীবনের কথা ভাবতে ভালবাসি। জীবনে চারটি দাশকেরও বেশি সময় অতিক্রম করেছি। কিন্তু আমি শুধু আমার প্রথম দুই দশকের হারানো শৈশবকে ফিরে পেতে চাই। হারিয়ে ফেলা অন্য সময়গুলে কলুষমুক্ত নয়। কিন্তু আমার প্রথম জীবন ছিল নির্মল, প্রকৃতির সঙ্গে খেলাধুলায় মগ্ন একটা নিভৃততম কাল। সে জীবন আমি হারিয়ে ফেলেছি। তাকে ফিরে পেতে চাই। তাই সে আমার কবিতায় ভর করে।’ ‘কাগজ থেকে বেরিয়ে’ কবিতায় এমনতর জীবনজিজ্ঞাসার প্রগাঢ় চুম্বনে সিক্ত হয় পাঠকক‚ল। কবিতায় দেখা যাকÑ ‘ ভাবতে ভাবতে পাড়াগাঁয়ের সমস্ত মাঠ এসে/ চড়ে বসল আমার কাগজের পাতায়Ñ/ গরু চড়াল, মলন ছড়াল/ রাত ভরে শুরু হলো বীর গাজির গান… আর ভোরবেলা যখন লাঙল চড়াতে যাবে/ তখন তার পিছু পিছু এই কাগজ থেকে বেরিয়ে পড়ব ঠিক’।
জীবনের জন্য এত হাহাকার, এত জয়গান আর এত জোচ্চুরির ভেতরেও জেগে উঠে মৃত্যুভাবনা। পৃথিবীব্যাপি দুর্বলের প্রতি শোষণ, জাতিগত বিভেদ, ক্রমাগত সভ্য সমাজের ভেতরেও গজে উঠা প্রবল বর্ণবাদ, ধর্মান্ধতা, অপব্যাখ্যার ঘেরাটোপ, উপরে উঠার প্রলোভন আর নানাবিধ সুবিধেপনার মধ্যেই মানুষ বাঁচে থাকে। বেঁচে থাকাটা নিঝর্ঞ্জাট নয়, বিচিত্র এবং বেদনাবহুল। ফলে ভাবনার উল্টোপ্রান্তে সে ধরে রাখে কল্পনারও অতীত কিছু। শব্দের ভেলায় ছড়িয়ে কবি বিবৃত করেনÑ ‘… ট্রেনটি উল্টে গেলে দেখি, মানুষগুলো পাখি আর আসবাবগুলো কী করে মাছ হয়ে/ নতুন এক পৃথিবী নির্মাণ করে বসে। আমি বললাম, আপনারা যারা যারা এই নতুন/ পৃথিবীর পক্ষ নিয়েছেন, সাহস করে হাত তুলে ছিনিয়ে নিন অবিশ^াস্য পুরস্কার সবÑ/ যা আমি আপনাদের জন্য প্রবর্তন করেছি। আর তখন অন্যসব ট্রেনযাত্রীরা বলে,/ এইভাবে ট্রেনের কামরা উল্টে দিয়ে পৃথিবীকে বদলানোর পদ্ধতি বুঝি প্রবর্তন হয়ে/ গেল’ (পাতাল ট্রেন)। কিন্তু কবিকে পুড়েও হতে হয় সর্বসাম্প্রতিক স্বর। বর্তমানে দাঁড়িয়ে তাকে ভাবতে হয় দূর অতীত আর অদূর ভবিষ্যতের কাল্পনিক নিকট অভিজ্ঞতা। দূরকে পরিপক্কভাবে দেখা আর দেখানোর গুরুদায়িত্ব কবিরা তুলে নেয় কাঁধে। ফলত, তাদের জেনে রাখতে হয় ইতিহাসজ্ঞান, সমসাময়িক রাজনীতি আর ভূগোলের কঙ্কাল। ‘পৃথিবী বদলানোর পদ্ধতি’ জেনেও মানুষ যে উল্টো ভাবে তার সম্যক ধারণা কবির চেয়ে আর কে বেশি জানে তবে! এবং জানে বলেই আমাদের বর্তমানতার সাথে মিলিয়ে উঠতে পারি কবির অতীত রচনা কিংবা কিছুকাল আগের রচনা। অবাক হবার যথেষ্ট কারণ থাকলেও কবি যে অলৌকিক ক্ষমতা আর আত্মিক যোগ রাখতে সক্ষম হন তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ হয়তো আমরা ‘বিকলাঙ্গ ভাবনাসূত্র’ কবিতার একেবারে শেষ স্তবকে এসেই পেতে পারিÑ ‘… আমি ব্যাবিলনীয়-ক্যালডীয় সভ্যতাকালেও/ পুরোদস্তুর অবৈজ্ঞানিক বিবেচিত হলাম/ আজ আবার সাম্প্রতিক গবেষণাগারে নিক্ষিপ্ত হয়ে দেখি/ জ¦লেপুড়ে অঙ্গারÑ তবু বেঁচে উঠছি/ পৃথিবীর প্রাচীন দীর্ঘশ^াস।’ সরাসরি কোন কথাই কবিতার যোগ্যতা নিয়ে দাঁড়াতে পারে না পাঠকের দরবারেÑ সেদিক থেকেই আমরা জানি, কাব্যলক্ষণ সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলতে লাগে ঐশ^রিক বোধÑ উপরের স্তবকটি পড়লে আমাদের বারবারই চোখে পস্ট হতে থাকে মানবতার বিপর্যয়, তবুও জেগে উঠার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা আর দ্রোহের করুণ ইতিহাস। তবুও থেমে থাকে না দখল, রহিত হয় না মিথ্যে আর অহমের ক্ষমতাবান গতায়ত। নিজেকে খুঁড়ে খুঁড়ে বয়ে আনতে হয় শিল্পের রসদ। প্রত্যক্ষ জানার ভেতরে থাকে না আড়ালের ছায়াÑ জীবনের সাথে যা জড়িত তাই শিল্পের বিচারে দামি রত্ম হিসেবে আখ্যা পায় শুধু সৃজন গুণেই নয় ভাড়ামো থাকে বলেও। ‘ওই মায়ের ছবি আঁকতে আঁকতে তারও অনেক পরে একদিন কবিত লিখতে শুরু করলাম। কবিতায় মাকে খুঁজতে খুঁজতে উঠে এলো আমার মাতৃভ‚মির মুখ। আমার দেশের প্রকৃতি আমার মায়ের মুখের মতোই সুন্দর। আমার মায়ের মতোই ¯েœহময়ী’Ñ এমন প্রত্যয়ে কবি ওবায়েদ আকাশের কাব্যপথে যাত্রা। এ কারণেই কি অটোবায়েগ্রাফিক্যাল সেন্স খুঁজে পাই ‘বাড়িতে আছেটা কী’ কবিতায়? এটা অস্বীকারের জো নেয়Ñ প্রত্যেক শিল্পীরই সৃজনপথে এগিয়ে আসার পেছনে একটা নিগূঢ় কারণ থাকে, থাকে নেপথ্যের বিবিধ রতন। কবিতায় এমন না-হয় কীভাবে বলেন কবিÑ ‘… আছেটা কী, বাড়িতে এপিটাফ ভেঙে/ গর্ত খুঁড়তে খুঁড়তে জল উঠে আসছেÑ/ ১৯৭৭ সালে মায়ের মৃত্যু সংবাদ, ’৯০ সালে/ স্বৈরাচারের হাড়ের ভেতর দিয়ে সুঁই ঢুকিয়ে/ মালা গেঁথে গবাদিকণ্ঠে ঝুলে যাবার মতো কিছুই তো/ বিছিয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে না শিশুরা’ নিজের ছায়া ঘুরেফিরে আসে কবিতা কি গল্পের শরীরে। তাছাড়া সাহিত্যবিশ্লেষণে ¯্রষ্টার জীবদ্দশা কি আয়ুষ্কাল তো তার সময়কে ধরার মানসেই আলোচিত হয়! যে সাধক তার স্বকাল আর সময়কে ধরতে না পারার ব্যর্থতায় খাবি খান তাকে জীবন নিয়েও মৃত বলা যায়, নাকি! কবি ওবায়েদ আকাশ তার সচেতন মানসে শব্দবন্ধে তুলে আনেন তার বেড়ে উঠাÑ এমনকি তার সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনাসমূহ, তা ব্যক্তিগত, দৈশিক কিংবা বৈশি^ক হলেও। এখানেই মূলত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে সময়ের অভিঘাত, পরিপাশের্^র পাশর্^প্রতিক্রিয়া। আর থাকে প্রকৃতির আস্কারাÑ মূখ্যত যেকোন মানুষই প্রকৃতি দ্বারা প্রভাবিতÑ তা মননে কি শরীরে। কবি মাত্রই প্রকৃতিঘনিষ্ট, প্রকৃতির অলিখিত তাড়নায় তিনি উদ্বেলিত হয়ে উঠেন, বিকশিত ও বিস্তৃত হয়েও উঠেন। কবিতা-গান কি চিত্রকলায় তার সুনিপুন প্রভাব আমরা দেখে উঠি সুদারুণভাবে। আজকের অতিমাত্রায় প্রযুক্তিগত সুবিধায় আমরা হয়তো পরিবেশ দূষণ করছি খুব, পলে পলে আত্মবিধ্বংসী ক্রিয়ায় নিজেদের সক্রিয় রাখছিÑ এও তো কবুল করতে হয়, হয়তো এরই প্রতিক্রিয়ায় পরিবেশবাদী আন্দোলন কিংবা সংগঠনের অস্বিস্ত প্রবল হয়ে উঠছে দিনকে দিন। নাগরিক কোলাহল, যানযট, দ্রæত হওয়ার প্রতিযোগিতা, অর্থের তাড়নার ভেতরেও কবি বিস্মৃত হন না প্রকৃতিবন্দনা আর সময়ের বারোমাসি তৎপরতা। ‘বদলি’ কবিতায় কবি কি সময়ের কঠিন মেশিনে থেকেও এক ধরণের আকুলতার বলে যান না আমাদের এভাবেÑ ‘… অসহ্য গরমের ভেতর লেবুর শরবত হাতে/ ধানের গন্ধ, পুবালি বাতাসের গন্ধ এঁকে এঁকে/ পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরিয়ে তুলছ খাতায়… কেউ কেউ জানেÑ কিছু উড়ন্ত পাখির পালক/ খসে-পড়া দেখে এরকম বদলির সিদ্ধান্ত নিয়েছি’। হায় সময়! আমরা কার অর্ন্তলীন হয়ে কার বন্দনা করি তবে! পুঁজির বেসামাল ক্ষমতা পারে না উল্টে দিতে সবুজ আর মায়ার দীর্ঘ ইতিাহাস! এখানে বৃক্ষের বদলে শিখিয়ে দেয়া কথায় মন ভরে আমাদের, মিথ্যার ফানুসকেই পূজো দেই দিনে বহুবার। বেউপায় হয়ে সংক্ষুব্ধ হতে হয় কেবল কবিকেই! তার উপর কে তবে বিলিয়েছে অপরিসীম দায়, সম্মানি আর সামাজিক মর্যাদা দিয়ে? কিন্তু শুধু কবিই বলতে যায় এমনভাবে, শত্রæ হয়ে উঠে প্রাতিষ্ঠানিক ভ‚তের, গণমানুষের হৃদয়ের আর্তি তাকে বলতেই হয়, বলেই যান তিনি। ‘এমন নাব্য তুমি এমন সবুজ’ কবিতা হয়তো তারই সত্যতা বলে যায় দিনমানÑ‘… তোমার লালায় গজানো ঘাস, আলোকস্তম্ভের ছায়ায়/ প্রাইভেট কোম্পানির সংকলিত বৃক্ষ পরিচিতি/ বুঝে উঠবার আগেই তোমার এই অগ্রগমন/ চর্তুদিকে সম্ভাব্য পরিবেশ-কল্পনায় ভাবিয়ে তুলেছে’।
সমুখে জেগে থাকেন রবীবাবু। তার অসীম জমিদারিতে বাঁধা কবিদের সময়, স¤্রাজ্য। কবিতা কি শব্দের ঋণেÑ কখনোবা নুয়ে যেতে হয় তার দরবারে, যদিও ঋণ নিয়ে তাকে পুঁজিতে পরিণত করতে পারা মানুষই তো নগন্য! স্বীকার না-করা যুগের অনেকেই ঋণগ্রস্থ হয়ে দেউলিয়া আজকালÑ তা ইতিহাসপরম্পরা দেখে উঠি আমরা। রবীন্দ্রনাথ বটবৃক্ষ হয়েও সমসাময়িক, অগ্রজমান চন্দ্র হয়েও চ্যালেঞ্জ জানায় অনুজদের। ফলে তার সাথেই চলে বেশুমার লেনাদেনা, বোঝাপড়ার নানান খতিয়ান। ‘কবিতার সন্ধানে’ কবিতার একেবারে শেষে কবি ওবায়েদ আকাশ তারই নমুন বিধৃত করেন কি এভাবে! ‘… সবাই মাতালের মতো খেলছি আর/ ভোর হতে না হতেই প্রত্যেকের ব্যাগভর্তি টাকা শূন্য হয়ে গেল… ভাবছি, ফিরতি ট্রেনে জমিদার রবীন্দ্রনাথ/ প্রত্যেকের খোয়া-যাওয়া টাকা/ ফিরিয়ে না দিয়ে যেতেই পারেন না’। অবশ্য কবিতা নিয়েই কবি ওবায়েদ আকাশের ভাবনারাজি একটু ভিন্নতরÑ তা তার চিন্তায় কি শব্দনির্বাচন আর ব্যতিক্রমে। মাথা থাকলেই কবি হয় না, শুধু কবিতা থাকলেও দাবি করতে পারে না কবিত্বের গৌরবতিলকÑ বড়জোর স্বভাবকবির তকোমা নিয়ে কবিরাজি আর সরকারগিরি করতে গিয়ে বাড়াতে পারে জঞ্জাল। ওবায়েদ আকাশের ভাবনা এক্ষণে শেয়ার করা যায় পাঠকের কাছেÑ‘… তাই আমি কবিতার সঙ্গে সংসার করে প্রতিদিন স্বেচ্ছামৃত্যুকে গিলে এক একটি পবিত্র আত্মার জন্ম দেই। কবিতার সঙ্গে তালাক, শালিস, সেপারেশন আমার নিত্যমুহূর্তের ব্যাপার। তা না হলে আমার আগামিকালের কবিতাটি যে মৃত সন্তান প্রসাব করবেÑ সেই লাশ এ পৃথিবী গ্রহণে বাধ্য নয়।’ কবিতাচর্চা নিয়ে যার ধারনা এমন স্বচ্ছ আর সৎ তিনি সচেষ্ট থাকেন কি লিখছেন, কেন লিখছেন এসবে। এবং এম্বিধ কারণেই তার কাছে পরিষ্কার হতে থাকে অকবিদের আস্ফালন। ‘কবি’ কবিতায় তারই ইঙ্গিত দেখা যায় পস্টভাবেÑ ‘কথন-ভঙ্গিমার কাছে তোমাকে পরাজিত হতে হবে/ বাক্যান্ধ মানুষেরা তালপাতার ওড়াউড়ি দেখে/ ভুলে থাকে নিজের নড়াজচড়া… তোমাকে বোধের কাছে শুতে দিয়ে দেখি/ তুমি কথা বলছ প্রতিজন্মনিয়ন্ত্রণে’। প্রতিজন্মনিয়ন্ত্রণের কথা আমাদের ক’জনেরই বা মনে থাকে! বেভুল-বেপথু মানুষেরা গোল্লায় যাক, তুলতে থাকুক দশক আর গোষ্ঠিবাজির ফতোয় তবুও কবিরা নির্লিপ্ত এবং সতত সক্রিয় থাকেন নিজের পথ পরিক্রমায়। তবুও চলতে থাকে স্তাবকতা, তবুও থাকে লেজুড়বৃত্তি। কবি সচেতনভাবেই এড়িয়ে গিয়ে এসবের ধরাবর্ণনা করেন যেন ‘স্তাবকতা’ কবিতায়। কবিতায় দেখিÑ ‘… বয়সের খাকি অন্ধকার দেখে সরে যাই/ যাচ্ছেতাই উড়ে এসে ক্রন্দসী পারাবতগুলো/ যর্থাথ স্তবঢলে ভেসে যায়… সুসাধ্য মনে হয় বটে/ ঘাটে ঘাটে কলসীগুলো ভরে ওঠে স্তোত্রপাঠ’।
কবি ওবায়েদ আকাশের ‘মৌলিক পৃষ্ঠায় হেঁয়ালি’ কাব্যগ্রন্থ পাঠে অগ্রসর হতে হতে কেবলই মনে পড়ে বিখ্যাত লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে’র দারুণ একটি উক্তিÑ ‘ভালো লেখক তার বিষয় নির্বাচনে অত্যন্ত সুবিবেচক, তিনি তার লেখার উপাদানসমূহ পরিপূর্ণভাবে সংগ্রথিত করেন। তার নিজের উপরে ও তার ধারনাসমূহের উপরে অনড় বিশ^াস থাকতে হবে।’ কবিতার বিষয়াশয়, নানা ঢঙয়ের কবিতা নির্বাচন, শব্দকুশলতা, সত্যের নির্যাস, ব্যক্তিগত জীবনকে ক্রমাগত সামষ্টিক ও দেশজ করে তোলার মহৎ প্রয়াস, সেইসাথে বিজ্ঞানমনস্কতা, প্রগতিমুখিনতাÑ সর্বোপরি রুচির যূথবদ্ধতার অপূর্ব নির্দশন বলা যায় কবিতাসমূহ। নিজেকে আড়াল না রেখে দেখানোর সাহস কজন রাখতে পারে, ক্রমপরিবর্তনমান এ সময়ে? প্রকৃত কবি লুকান না শিল্পভোগ্য কোন উপকরণই! ‘প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায়’Ñ এমন করে কে আগে ভেবেছে তবেÑ অগ্রজদের নিয়ে? কেউ না ভাবলেও, কেউ টানাগদ্যে অমন জোছনামাখা শব্দ ব্যয় করার দার্ঢ্যতা দেখাতে না পারলেও আরো অন্যান্য বিষয় নিয়ে ব্যতিক্রম ও আধুনিক চিন্তাপুঞ্জের সমবায় আছে বলেই কবি ওবায়েদ আকাশ আলাদা, ‘মৌলিক পৃষ্ঠায় হেঁয়ালি’ কবিতাকিতাবটিও ব্যতিক্রম। এমনতর আত্মবিশ^াস আর কাব্য-অহংবোধ নিয়েই জেগে থাকুক ওবায়েদ আকাশের কাব্যসংসার।