মে দিবসের পটভূমি ও এ সময়ের করণীয়

এম.এ. সাত্তার

38

শোষণ, বঞ্চনা ও নির্যাতন, নিবর্তনের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সৃষ্টি হয় ঐতিহাসিক মহান মে দিবসের। সংঘবদ্ধ শ্রমিক সমাজের দাবি আদায়ের আন্দোলনের বিষয় জানতে সর্বাগ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলনের ব্যাপারে জানতে হবে।
বিশ্বের নূতন ভূখন্ড আমেরিকা আবিষ্কারের পর থেকে ইউরোপে তাদের সহায় সম্পদ লুণ্ঠনের বিভিন্ন উপনিবেশ ও আধা উপ-নিবেশ ব্যবস্থাত চালু করে। দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার স্পেন এবং উত্তর আমেরিকায় গড়ে উঠে বৃটেন ও ফ্রান্স উপনিবেশ। বৃটেন তাদের প্রভাব বিস্তারের জন্য তাদের প্রাধান্য বিস্তার করে এবং অন্যদের হটিয়ে তারা অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি আমেরিকায় ১৫টি উপনিবেশ স্থাপনে সক্ষম হয়। এদের মধ্যে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানরা পরাভূত হয়। আমরা পশ্চিমাদের অধীনে পড়ি। এতে গোটা আমেরিকায় পরিণত হয় উদ্বাস্তু ও বহিরাগতদের অভয়ারণ্য। আমেরিকার জনগোষ্ঠি শ্বেতাঙ্গ এবং কালো মানুষকে নিয়ে এক বিচিত্র জাতি গড়ে উঠে। পরবর্তীতে অধিকাংশ অধিবাসী আমেরিকানকে তাদের মাতৃভূমি বিবেচনা করে বৃটিশদের লুণ্ঠন ও শোষণের বিরুদ্ধে পরিত্রাণ পাওযার জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করে। এতে মার্কিন শ্রমিকদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ১৭৭৪ সন থেকে ১৭৮৩ সন পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলে। ১৭৮৩ খ্রি: ১৫টি বৃটিশ উপনিবেশ নিয়ে গড়ে উঠে মার্কিন ও যুক্তরাষ্ট্র। স্বাভাবিকভাবে সেখানে শিল্প কারখানার বিকাশ ঘটে। কাজের সন্ধানে শ্রমিকেরা আমেরিকায় ফাঁড়ি জমায়। ফলে শিল্প শ্রমিক এবং মালিকদের মধ্যে পরস্পর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বার বার সংঘাত বাড়তে থাকে।


প্রথমত সূত্রপাত হয় ১৮২৮ সালে বস্ত্রকলে, ১৫টি ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন নিয়ে ফিলাডেলফিয়ার নামে প্রথম জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গড়ে উঠে। ৩ বছর স্থায়ী হওয়ার পর এ সংগঠনের বিলুপ্তি ঘটে। ১৮৩৩-৩৭ সাল পর্যন্ত মজুরী বৃদ্ধির দাবিতে এবং প্রাথমিকভাবে ১০ ঘণ্টা শ্রম ঘণ্টা করার দাবিতে ১৬৮টি ধর্মঘট পালিত হয়। এতে আংশিক দাবি প্রতিষ্ঠা হয়। সারাদেশে ১৫০টির মত ইউনিয়ন সংগঠন গড়ে উঠে। দাবি আদায়ের জন্য শ্রমিকেরা স্থানীয় এবং রাষ্ট্রীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ১৮২৯ সনে ২৮ ভাগ ভোট পেয়ে বেশ কয়েকজন শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়। শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে তৎকালীন ডেমোক্রেটিভ পার্টি সরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহে মজুরী না কমিয়ে ১০ ঘণ্টা শ্রম ঘণ্টা মেনে নেন। ইতিমধ্যে আমেরিকার আয়তন বৃদ্ধি পেয়ে ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে ৩৮টি অঙ্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে। শিল্পের দ্রæততম বিকাশ ঘটে। আমেরিকার উত্তরাঞ্চল শিল্প প্রধান হলে দক্ষিণ আমেরিকা কৃষিনির্ভর ও দাস প্রথানির্ভর অঞ্চল। দুই ধরণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দের ফলে ১৮৬১ সাল থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী গৃহ যুদ্ধের সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত শিল্প সমৃদ্ধে দক্ষিণ অঞ্চল এগিয়ে যায়।
১৮৬৬ সনে ২০ মে-আগস্ট ৬০টি ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন সমন্বয়ে বাল্টিমোর শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় “ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন”। ঢালাই শ্রমিকদের নেতা উইলিয়াম এইচ সিলভিস সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হয়। তাঁর নেতৃত্বে ৮ ঘণ্টা শ্রম ঘণ্টার দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে উঠে। এতে তাঁর নেতৃত্বে ৮ ঘণ্টা শ্রম ঘণ্টার দাবি মেনে নেয়া হয়। ১৮৮৬ সালে মার্কিন আইন সভায় তা পেশ করা হয়। আইনটি বাস্তবায়নের পূর্বে সিলভিস মৃত্যুবরণ করে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে “ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়নের” বিলুপ্তি ঘটে। ১৮৭৪ সনে নিউইয়র্কে টমকিন শ্রমিকদের সভায় শ্রমিকদের উপর গুলি বর্ষণ করা হয়। ১০ জন খনি শ্রমিকদের ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। এই সকল নির্যাতনের পটভূমিতে ১৮৭৫ সনে রেল-ইস্পাত শিল্পে লক্ষাধিক শ্রমিক ধর্মঘট করে। শ্রমিকদের ঝুলুম নির্যাতনের ফলে ৮ ঘণ্টার শ্রম ঘণ্টার আন্দোলন আরও জোরদার হয়। এই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংঘটিত ট্রেড ইউনিয়ন ও লেবার ফেডারেশন এ প্রস্তাব গ্রহণ করে যে, ১৮৮৬ সনের ১লা মে থেকে দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রম ঘণ্টা দিবস হিসেবে আইনত: গণ্য করা হবে। এই সঙ্গে সকল শ্রমিক সংগঠনের কাছে সুপারিশ করা হয় যে, তারা যেন উপরোক্ত তারিখের মধ্যে যার যার এলাকায় উক্ত সিদ্ধান্তকে আইন কানুন হিসেবে পরিচালনা করে।
এ প্রস্তাবের মধ্যে দিয়ে মে দিবসের ঐতিহাসিক পটভূমি সৃষ্টি লাভ করে। এই প্রস্তাবের ফলে সকল সরকারি আইন-কানুন অগ্রাহ্য করে শ্রমিক শ্রেণি নিজেরাই যথাযথ আইন ব্যবস্থা চালু করে তা মেনে চলার অঙ্গীকারে সকলই ঐক্যবদ্ধ হয়। এই বিরাট চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নের তারিখ ঐতিহাসিক ১লা মে ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবস হিসেবে গন্য করে নূতন ইতিহাস স্থাপন করা হয়।
আমেরিকান ফেডারেশন তাদের প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। তৎকালীন সর্ববৃহৎ শ্রমিক সংগঠন “নাইটস অব লেবার” সংগঠনকে পদের সমর্থন দিলরে ও পরে বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। অচিরেই তাদের সংগঠনের অবলুপ্তি ঘটে। শ্রমিকদের বিপক্ষে অবস্থানের কারণে তাদেরও নির্মম পরিণতি ঘটে। সারা দেশে শ্রমিকদের মধ্যে ৮ ঘণ্টা শ্রম ঘণ্টা খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ১৮৮৫ সালেই ২৪৬৭টি শ্রমিক সংগঠন ধর্মঘট সহ তুমুল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। ১৮৮৬ সালের প্রথম দিকে শ্রমিক আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। শিকাগোর শ্রমিক এলাকায় শিকাগো শহর আন্দোলনের দূর্গে পরিণত হয়। ৮ ঘণ্টা শ্রম ঘণ্টা শ্রমিকদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠে। জুতার কারখানায় প্রথম দাবিটি মেনে নেয়ার কারণে জুতার নাম দেয়া হয় “৮ ঘণ্টা জুতা”। সিগারেট কারখানায় মেনে নেয়ার ফলে সেখানকার শ্রমিকেরা “৮ ঘণ্টা চুরুট” নাম দেয়। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা লাভ করে ঐতিহাসিক ১ মে ১৯৮৬ সাল। এতে প্রায় ৩ লক্ষাধিক শ্রমিক অংশগ্রহণ করে। অপরদিকে মালিক গোষ্ঠী পূর্ব ঘোষিত সভা সমাবেশ বানচাল করার জন্য সশস্ত্র পুলিশ ও গুন্ডাবাহিনী লেলিয়ে দেয়। সকল ষড়যন্ত্র এবং বাধা উপেক্ষা করে শ্রমিকদের বিশাল মিছিল শিকাগোর মিচিগান এভিন্যু থেকে লেক-পয়েন্ট গিয়ে এক বিরাট শ্রমিক সমাবেশে সমুদ্রে পরিণত হয়। শ্রমিক নেতা পারসন স্পাইজ প্রমুখ তারা ইংরেজি বোজয়ামীয় ও মার্জন পোলিশ ভাষায় বক্তৃতা করেন। ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের দাবিতে এবং আন্দোলন অব্যাহত ঘোষণা দেন। ১ মের ধর্মঘটে ২ লক্ষ রাজ মিস্ত্রী ৮ ঘণ্টার দাবি আদায়ে সক্ষম হয়। এতে আন্দোলনের নতুন মাত্রা যোগ হয়। ৩ মে শিকাগোর ম্যাক্কমীক ফসল কাটার কারখানায় সভা চলাকালে অতর্কিতে পুলিশ হামলা চালালে ঘটনাস্থলে ৪ জন শ্রমিক নিহত হয়। এ সংবাদ চারিদেকে ছড়িয়ে পড়ে। কাঠ চিরাই কারখানার এক শ্রমিক নেতা আর্গানাইজ স্পাইজ নিহতের খবর শুনে সাথীদের সাথে আলোচনা করে ঘোষণা করে দিলেন ৪ মে শিকাগোর হে-মার্কেটে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হবে। ৪ মে রাত ৮ টায় শিকাগোর মেয়র কার্টার হ্যারিসনের অনুমতিক্রমে এবং উপস্থিতিতে প্রতিবাদ সভায় বিপুল শ্রমিক সমাবেশ ঘটে। পারসন আন্দোলনের পক্ষে জ্বালাময়ী বক্তৃতা করেন। শেষ বক্তা সামায়েল ফিলভনের বক্তৃতার সময় শিকাগো পুলিশের কুখ্যান ক্যাপটেইন বন ফিল্ডের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র পুলিশ আক্রমণ চালায়। শ্রমিকেরা তাদের অনুমতির কথা জানালেন তাতেও মঞ্চে বোমা হামলা করে। তাৎক্ষণিক ৪ জন শ্রমিক ও ৭ জন পুলিশ ঘটনাস্থলে নিহত হন। লাঠি সোটা, টিয়ার গ্যাসে হে-মার্কেট রক্তের বন্যায় প্লাবিত হল। গ্রেপ্তার করা হলো মাইকেল, স্কোয়ার, জর্জ এঞ্জেল, এডলফ ফিসার, লুই লিঙ্গে ও আস্কারনীকে। পুলিশ আলবার্ট ও পার্সনকে গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়। গোটা শিকাগো শহর পরিণত হয় মধ্যযুগীয় বর্বরতার রাজ্যে। প্রহসনের বিচার শুরু হয় ১৮৮৬ সনে ২১ জুন। সম্পূর্ণ একতরফাভাবে মিথ্যা অভিযোগে শ্রমিক নেতাদের মধ্যে পারসন, স্পাইজ, ফিলড্রেন ফিসার, লুই লিংগে, এঞ্জেল ও স্কোয়ারকে ফাঁসি দেয়া হয়। শ্রমিক নেতা নীবকে ১৫ বছর সশ্রম কারদÐ দেয়া হয়। আমেরিকার শ্রমিক সমাজের সাথে বিশেষ বিশেষ শ্রমিক সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলনে অবস্থান নেন। একই দিন ২২ বছর বয়সী তরুণ শ্রমিক নেতা লুইসের প্রাণহীন দেহ পাওয়া যায়। তাকে আত্মহত্যার অপবাদ দেয়া হয়। ১১ নভেম্বর ১৮৮৭ শিকাগোর বুক কাউন্টি জেলখানায় পারসন স্পাইজ, এঞ্জেল ও ফিসারের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। শ্রমিক সমাজের আন্দোলন ও আত্মহুতির বিনিময়ে অর্জিত হয় মহান মে দিবস। কলকাতায় বাংলা শিল্প কেন্দ্রে প্রথম মে দিবস পালিত হয়। ১৯৭২ সনে বাংলাদেশে মে দিবসে ছুটি ঘোষিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন বেতারে ভাষণ দেন। অনেক আন্দোলন সংগ্রামের বিনিময়ে মে দিবস অর্জিত হলেও শ্রমিক সমাজের আকুতি এবং চাকুরির নিরাপত্তাসহ সার্বিক ক্ষেত্রে চাকুরির নিশ্চয়তার কোন গ্যারান্টি পাওয়া যায়নি। পরিবহন শ্রমিক, কৃষি শ্রমিকসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শ্রমিক, হোটেল-রেস্টুরেন্ট শ্রমিক, গার্মেন্টস শ্রমিক, দর্জি শ্রমিক, ফরমাল এবং ইনফরমাল সেক্টরের কলকারখানা, আধুনিকায়ন না করে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকদের ছাঁটাই, গোল্ডেন হ্যান্ডসেকের নামে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে। এতে মেধাবী এবং হাজার হাজার দক্ষ শ্রমিক মানবেতর জীবন অতিবাহিত করছেন। পুরাতন কলকারখানা আধুনিকায়ন/বিএমআরই করে দক্ষ শ্রমিকদের মেধা কাজে লাগানো সম্ভব। সোনালী আঁশ পাট শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ঠিকাদার প্রথার নামে শ্রমিকের সারা জীবনের চাকুরির অভিজ্ঞতা ধ্বংস করে তাদেরকে অধিকার বঞ্চিত করা হয়েছে। বর্তমান সরকার বিএমআরই করে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিলেও তা থমকে গিয়েছে। শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের ৮ দফা জাতীয় দাবি এবং পাটকল শ্রমিক ঐক্য পরিষদের ৯ দফা দাবির সমর্থনে আন্দোলন চলছে। দীর্ঘদিন বেতন ভাতা নেই। শ্রমিকদের ভূখা নাঙ্গাঁ রেখে ভাল উৎপাদনের আশা করা যায়না। শ্রম শিল্পে নির্গত ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারের নিশ্চয়তা, কর্ম-পরিবেশ, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং সরকার ঘোষিত মজুরি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শ্রম শিল্পে স্থিতিশীলতা, উৎপাদন এবং সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে অবদান রাখা সম্ভব। এটাই বাস্তবতা এবং আশু করণীয়।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, শ্রমিকনেতা