মেহেরপুরের আম্রকাননে স্বাধীন বাংলার রক্তিম সূর্যোদয়

ওমর ফারুক চৌধুরী জীবন

53

মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে উদিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তিম লাল সূর্য। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল ছিল বাঙালি জাতির রাজনৈতিক জীবনে এক ঘটনাবহুল আলোকোজ্জ্বল দিন। প্রথমবারের মতো বাঙালি জাতি নিজেদের রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়ে তার সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ পরিচালনা করে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে ও বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের সঙ্গে তার সরকারও এদিন আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। ভারতের সিমান্তবর্তী মেহেরপুর নামক এই এলাকাটিকে ভৌগলিক অবস্থানের কারনে মুক্তিবাহিনী সব চেয়ে নিরাপদ মনে করতেন বলেই বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননকে অস্থায়ী সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের জন্যে উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারন করা হয়। অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলায় অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। অনেকের মনে ধারণা ছিল, এখানে হয়তো আওয়ামী লীগের কোন সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
ঘটনার পেছনে যাওয়া যাক। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা মিশন ‘অপারেশন সার্চলাইট’ সংঘটিত হবার সময় যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রেফতার করে তার আগ মুহূর্তে ২৫ মার্চ দিবাগত রাত অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু ইপিআর এর একটি ছোট ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। মূলত সেই দিন হতেই বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ২৫ মার্চের ভয়াবহ গণহত্যার সময় আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান নেতা তাজউদ্দীন আহমদ নিজ বাসভবন ছেড়ে আত্মগোপন করেন। প্রথমে আত্মরক্ষা তারপর প্রস্তুতি এবং সর্বশেষে পালটা আক্রমণ এই নীতিকে সাংগঠনিক পথে পরিচালনার জন্য তিনি সরকার গঠনের দীপ্ত পরিকল্পনা শুরু করেন।
৩০ মার্চ সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীন আহমেদ ফরিদপুর-কুষ্টিয়া হয়ে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে পৌঁছান। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পদার্পণ করেন। সীমান্ত অতিক্রম করার বিষয়ে মেহেরপুরের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী তাদের সার্বিক সহায়তা করেন। সীমান্ত অতিক্রম করার পর ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর তৎকালীন মহাপরিদর্শক গোলক মজুমদার তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। গোলক মজুমদারের কাছে সংবাদ পেয়ে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক কে এফ রুস্তামজী তাদের আশ্রয়স্থলে এবং তাজউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন এবং পূর্ববাংলা সার্বিক পরিস্থিতি এবং বাঙালির স্বাধীনতা লাভের অদম্য ¯পৃহা সম্পর্কে সম্যক অবগত হন। সীমান্তে পৌছে তাজউদ্দীন আহমেদ দেখেন, বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সেনাদের সমর্থনে ভারত সরকার থেকে নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ভারতীয় সামরিক বাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আসলে কিছুই করার নেই। তিনি মুক্তিফৌজ গঠনের ব্যপারে বিএসএফ এর সাহায্য চাইলে তৎকালীন বিএসএফ প্রধান তাজউদ্দীন আহমেদকে বলেন, মুক্তিসেনাদের ট্রেনিং এবং অস্ত্র প্রদান সময় সাপেক্ষ কাজ। তিনি আরো বলেন, ট্রেনিংয়ের বিষয়ে তখন পর্যন্ত ভারত সরকারের কোন নির্দেশ না থাকায় তিনি মুক্তিবাহিনীকে ট্রেনিং ও অস্ত্র দিতে পারবেন না। এ ব্যাপারে কে এফ রুস্তামজী দিল্লির ঊর্ধ্বতন কর্তাদের সাথে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয় তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে নিয়ে দিল্লি যাওয়ার জন্য। উদ্দেশ্য হল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং তাজউদ্দীন আহমদের বৈঠক। দিল্লিতে পেঁৗঁছানোর পর ভারত সরকার বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হন যে, তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠতম সহকর্মী। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠকের আগের দিন ভারতীয় এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাজউদ্দীনের কাছে জানতে চান যে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে কোনো সরকার গঠিত হয়েছে কিনা। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের আগে ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ আরো কিছু কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাজউদ্দিন আহমদের কয়েক দফা বৈঠক হয় এবং তিনি তাদের বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনার জন্য যেসব সাহায্য ও সহযোগিতার প্রয়োজন তা বুঝাতে সক্ষম হলেও এসময় তিনি উপলব্ধি করেন, কেবল একজন আওয়ামী লীগের একজন নেতা হিসেবে সাক্ষাৎ আলাপ, আলোচনায় সামান্য সহানুভ‚তি ও সমবেদনা ছাড়া তেমন কিছু পাওয়া সম্ভব না। সরকার গঠন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে সেই সরকারের দৃঢ় সমর্থন ছাড়া বিশ্বের কোন দেশই বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে না। তাজউদ্দীন আহমদে সিদ্ধান্ত নেন যে বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি রূপে নিজেকে তুলে ধরবেন। কারণ ৩১ মার্চ ভারতীয় পার্লামেন্টে, পূর্ব বাংলার জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্য করার জন্য এক প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং তা কার্যকর রূপ লাভ করতে পারে বলে তাজউদ্দীন আহমদের ধারণা হয়।
ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠকের সূচনাতে তাজউদ্দীন আহমদ জানান, পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ২৬ মার্চেই বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করে সরকার গঠন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রেসিডেন্ট এবং মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকে যোগদানকারী সকল প্রবীণ সহকর্মীই মন্ত্রীসভার সদস্য। শেখ মুজিবের গ্রেফতার ছাড়া তখন পর্যন্ত দলের অন্যান্য প্রবীণ নেতাকর্মীর খবর অজানা থাকায় সমাবেত দলীয় প্রতিনিধিদের সাথে পরামর্শক্রমে দিল্লীর উক্ত সভায় তাজউদ্দীন আহমদ নিজেকে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী রূপে তুলে ধরেন এবং ইন্দিরা গান্ধীর কাছে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য অনুরোধ করেন। ইন্দিরা গান্ধী তাকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, উপযুক্ত সময়ে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া হবে।
এভাবেই অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ধারনার সূচনা হয়। ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠক শেষে তিনি বাংলাদেশকে সর্বপ্রকার সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলে তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের এমএনএ এবং এমপিএ-দের কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তে অধিবেশন আহব্বান করেন। ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ (এমএনএ, এমপিএ) এক সভায় মিলিত হয়ে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ গঠন করেন। গণপরিষদ বঙ্গবন্ধুর ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করেন। এই ‘গণপরিষদ’ একটি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করে। তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য নিয়োগ করা হয়। ১০ এপ্রিল রাতটি ছিল স¤পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। কলকাতার আকাশবানী বেতার কেন্দ্র থেকে বারবারই প্রচার করা হচ্ছিল যে রাত দশটার পর একটি বিশেষ সংবাদ প্রচারিত হবে। রাত দশটায় দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সতেজ ও মসৃণ কণ্ঠে উচ্চারিত হল শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবাদটি। তিনি বললেন, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়েছে। গনপ্রজাতন্ত্রী ‘বাংলাদেশ’ নামের নতুন এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সরকারের
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। এখন বাংলাদেশের বিপ্লবী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ প্রচারিত হবে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ বাংলাদেশ বেতারে মন্ত্রিপরিষদ গঠনের ঘোষণা দিয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। ভাষণের শুরুতে তিনি বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের বীর ভাই বোনেরা, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মুক্তি পাগল গন মানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে আমি আপনাদের আমার সংগ্রামী অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি তাঁদের, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে গিয়ে তাঁদের মূল্যবান জীবন উৎসর্গ করেছেন। যতদিন বাংলার আকাশে চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা রইবে, যতদিন বাংলার মাটিতে মানুষ থাকবে ততদিন মাতৃভ‚মির স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামের বীর শহীদদের অমর সৃতি বাঙালির মানসপটে চির অম্লান থাকবে’। লম্বা এ ভাষণের শেষের দিকে এসে বলেন, ‘পুরাতন পূর্ব পাকিস্থানের ধ্বংসাবশেষের ওপর
নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলবার সংকল্পে আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। আমাদের এই পবিত্র দায়িত্ব পালনে এক মুহূর্তের জন্যেও ভুলে গেলে চলবেনা যে এ যুদ্ধ গনযুদ্ধ এবং সত্যিকার অর্থে এ কথাই বলতে হয় যে এ যুদ্ধ বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের যুদ্ধ ‘ পরিশেষে জয়বাংলা, জয় স্বাধীন বাংলাদেশ বলে ভাষণ শেষ করেন। ১১ এপ্রিল কর্নেল ওসমানীকে সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করা হয়।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল ছিল শনিবার। সীমান্তবর্তী বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আমবাগানের চারদিকে রাইফেল হাতে কড়া পাহরায় বীর মুক্তিযোদ্ধারা। হাজার হাজার মুক্তিকামী বাঙালির উপচেপড়া ভিড় চারদিকে। মাত্র ছয়খানা চেয়ার দিয়ে শপথ মঞ্চ তৈরি করা হয় মুক্ত আকাশের নিচে। অনুষ্ঠানের প্রবেশদ্বারে লেখা হয় ‘স্বাগতম’। নব গঠিত সরকারের সদস্য, নেতারা আসতে থাকেন একে একে।
সময় এগারটা পঞ্চাশ মিনিটে আসে সেই ঐতিহাসিক স্বাধীনতার মুহূর্তটি। সদ্যসৃষ্ট রাষ্ট্রের সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা লাভের অদম্য স্পহায় মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত সর্বস্তরের বিপুল সংখ্যক জনগণ ও দেশি-বিদেশি সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। শপথ মঞ্চে উঠে এলেন বঙ্গবন্ধুর আজীবনের ঘনিষ্ঠ সহচরবৃন্দ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাঁর পেছনে তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এ এইচ এম কামরুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও জেনারেল এম এ জি ওসমানী। ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে থাকে গোটা এলাকা। পাকিস্থানি সেনাদের বিমান হামলার আশঙ্কা ছিল যে কোন মুহূর্তে। সে কারনে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হয় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে। মাত্র ৪৫ মিনিটের এই শপথ অনুষ্ঠানের শুরুতেই পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত এবং গীতা, বাইবেল থেকে পাঠ করা হয়। সেদিন স্থানীয় শিল্পী এবং হাজারো মানুষের কণ্ঠে গাওয়া হয় বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা,আমি তোমায় ভালবাসি’। তারপর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এরপর আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের চীফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী ঐতিহাসিক দলিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এরপর তিনি নবগঠিত সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রিবর্গ ও সেনাবাহিনী প্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করান তিনি। শপথ গ্রহণের পর সশস্ত্র তেজোদীপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা এবং আনসার বাহিনীর সদস্যরা মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবর্গকে রাষ্ট্রীয় কায়দায় ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করেন। পাক শাসকগোষ্ঠীকে বৃদ্ধাক্সগুলি প্রদর্শন করে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম ইংরেজিতে প্রদত্ত ভাষণের শুরুতে বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমি তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করেছি এবং তাঁর পরামর্শক্রমে আরও তিনজনকে মন্ত্রীরূপে নিয়োগ করেছি।’ তারপর তিনি প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দকে পরিচয় করিয়ে দেন। ঘোষণা করেন প্রধান সেনাপতি পদে কর্নেল ওসমানী এবং সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফ পদে কর্নেল আবদুর রবের নাম। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাঁর আবেগময় ভাষণের শেষে দৃপ্তকণ্ঠে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রপতি জনগণনন্দিত ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ নির্যাতিত মানুষের মূর্তপ্রতীক শেখ মুজিব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম করে আজ বন্দী। তাঁর নেতৃত্বে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম জয়ী হবেই’। মুজিবনগর সরকার রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার হলেও কার্যত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ছিলেন মূল চালিকাশক্তি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর সেই ঐতিহাসিক দিনে এক অভ‚তপূর্ব ও অবিস্মরণীয় লম্বা ভাষণ দিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। দেশি বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বর্ণনা করেছিলেন কেন, কোন প্রেক্ষাপটে আমাদের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের সাংবাদিকবন্ধুদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি এই জন্য যে, তারা আমাদের আমন্ত্রণে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি দেখে যাবার জন্য বহু কষ্ট করে, বহু দূর-দূরান্ত থেকে এখানে উপস্থিত হয়েছেন’।
সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন, বাংলাদেশ এখন যুদ্ধে লিপ্ত। পাকিস্তানের উপনিবেশবাদী নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো বিকল্প নেই। পাকিস্তান আজ মৃত এবং অসংখ্য আদম সন্তানের লাশের তলায় তার কবর রচিত হয়েছে’। মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বক্তৃতার শেষে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে আমরা কামনা করি বিশ্বের প্রতিটি ছোট, বড়ো জাতির বন্ধুত্ব। বিশ্ববাসীর কাছে আমরা আমাদের বক্তব্য পেশ করলাম। বিশ্বের আর কোন জাতি আমাদের চেয়ে স্বীকৃতির বেশি দাবিদার হতে পারে না। কেননা, আর কোন জাতি আমাদের চেয়ে কঠোরতর সংগ্রাম করেনি, অধিকতর সংগ্রাম করেনি। জয়বাংলা’। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সেদিন মুজিবনগরের বৈদ্যনাথতলায় ৮ পৃষ্ঠার এক বিবৃতি পাঠ করেন। তিনি ঘোষণা করেন বৈদ্যনাথ তলার নাম রাখা হলো ‘মুজিবনগর’। সম্ভবত পাকিস্তানিদের শাসকদের মনে ধারণা ছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে যদি বন্দি করে ফেলা যায় অথবা হত্যা করা যায় তাহলে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে এদেশের গোটা স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যর্থ হয়ে যাবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের তৎকালীন হাইকমান্ড এবং বিশেষ করে দলের সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত তাজউদ্দীন আহমদ প্রজ্ঞা, সহিষ্ণুতা, কৌশল ও প্রচন্ড দৃঢ়তায় হাল ধরেন।
তিনি দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সমন্বয়ে বঙ্গবন্ধুর নামে ও তাকেই শীর্ষে রেখেই রচনা করেন সমগ্র স্বাধীনতা সংগ্রাম। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের এক স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাজউদ্দিন আহমদ তাকে বলেছিলেন, প্রত্যেকদিনই ইতিহাস সৃষ্টি হচ্ছে। তার সঙ্গে আমরা সম্পক্ত। আসুন আমরা এমনভাবে কাজ করি যেন ঐতিহাসিকদেরও ভবিষ্যতে খুঁজে পেতে কষ্ট হয় যে, আমরা পেছনে কিভাবে কাজ করছিলাম। তাজউদ্দিন আহমদের এ বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট তিনি নিজে কতোটা প্রচারবিমুখ ছিলেন। এখানে অপ্রাসঙ্গিক হলেও সত্য যে, সেদিন তাজউদ্দিন আহমেদের প্রধানমন্ত্রীত্ব হয়ত মেনে নিতে পারেনি খন্দকার মোশতাক আহমদ। জ্যেষ্ঠতার দাবিতে তিনিই এ পদের জন্যে নিজেকে যোগ্য মনে করতেন। যা স্পষ্টভাবে জাতির সামনে প্রতীয়মান হয় পরবর্তীতে খন্দকার মোশতাকের বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে।
মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সহযোগিতা কামনা করেন এবং তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে বলেই বাংলার জনগণসহ বিশ্ববাসী মনে করে। মুজিব নগর সরকারের মাধ্যমে ভারতীয় সৈন্যদের সকল ধরনের সমর্থন আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অভিষ্ঠ লক্ষে পৌঁছাতে সহযোগিতা করেছে। ভারতীয় সৈন্যরা শুধুমাত্র আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংই দেননি, যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সরঞ্জমাদিও প্রেরণ করেছেন। যার ফলে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পেরেছেন এবং পাক হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করতে পেরেছেন। মুজিব নগর সরকার হচ্ছে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম কার্যকরী সরকার। যে সরকারের নেতৃত্বে মাত্র নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম, ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ নারীর কঠিন আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা আর্জন করে। মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভিকা হিসেবে এবং জাতির চেতনাবোধ জাগ্রতের দিন হিসেবে ১৭ এপ্রিল মুজিব নগর দিবসটি বাঙালি জাতির জীবনে এক অবিস্মরণীয় গৌরবগাঁথা দিন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সংগঠক