মেঘের রাজ্য মেঘালয়ে

সাখাওয়াত হোসেন সবুজ

13

মেঘালয় বলতেই হৃদয়ে মেঘ ছুঁয়ে যায়, চোখের সামনে মেঘের দল খেলা করে। নামের স্বার্থকতা বোঝাতেই যেন মেঘের লোকালয় হিসেবে নিজেকে সাজিয়ে রাখে মেঘ, বৃষ্টি, পাহাড়ে আর ঝর্ণার অলঙ্কারে। গত ফেব্রুয়ারিতে মেঘ বৃষ্টি কম থাকাতে চোখ আর মনের ক্ষুধা মিটাতে দল বেধে আবার ঢুকে পড়ি ডাউকি হয়ে। লম্বা ছুটির চাপে পর্যটক তুলনামূলক বেশি থাকাতে ইমিগ্রেশনে দুপুর পার হয়ে যায়। প্রথমদিন চেরাপুঞ্জি সব জায়গা দেখতে না পারার দুশ্চিন্তায় প্ল্যান পরিবর্তন করে সিদ্বান্ত নিই ক্রাংসুরি জলপ্রপাত দেখে স্নোংপেডেং রাত কাটানোর। ভারতে ইমিগ্রেশন শেষে তিন দিনের জন্য সুমো ভাড়া করে উঠে পড়ি ক্রাংসুরির উদ্দেশ্যে। দু’দিকে পাহাড়ের সবুজ গালিচা আর মাঝে মাঝে পাহাড় বেয়ে সৃষ্ট ঝর্ণাধারা দেখে এগিয়ে চলে আমাদের গাড়ি। মাঝে একটি বড় ঝর্ণায় হালকা বিরতি দিয়ে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছে যায় গন্তব্যেস্থানে। কিছুদূর ডাউন স্ট্রিমে হাটার পর দেখা মিলে নিলাভ স্বচ্ছ জলের ক্রাংসুরি ঝর্ণা। সেখানে ছবিরমত সুন্দর গোছানো চারিদিক। আপার স্ট্রিমে হালকা হেটে আমরা দুপুরের খাবার সেরে নিই। ঝর্ণার নিচে দাঁড়িয়ে উপভোগ করি, জলপ্রপাতের সৌন্দর্য, এ যেন বিধাতার নিজ হাতে বানানো! ঝর্নার নিচে লেকের মত জায়গায় সাতার কাটা যায়। সবাই লাইফ জ্যাকেট গায়ে দিয়ে নেমে পড়ি ঝর্ণা উপভোগ করতে। বিকেল নাগাদ সেখানে কাটিয়ে আমরা উমনগট নদীর পাড়ে স্নোংপেডেং এর উদ্যেশ্যে রওনা দিই। স্নোংপেডেং পৌঁছে গতবারের পরিচিত ফ্রাংককে কল দিয়ে নদীর পাড়ে তাবু আর রাতের খাবারের ব্যাবস্থা করা করি। এর পরেই নদীর পাড়ে গান, আড্ডা আর জলখেলি শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ি। ভোরের স্নোংপেডেং সবচেয়ে উপভোগ্য, তাই দেরি না করে ভোরের আলো ফুটতেই ট্যান্ট ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি। সেখানে ক্যাবল ব্রিজে নীরবতায় দাঁড়িয়ে আছে পাহাড় আর মেঘ। অদ্ভুত সোন্দর্যের ষোলআনা পুষিয়ে নিতে ঘণ্টা খানেক ট্র্যাকিং শেষে পৌঁছে যায় পাহাড়ের চূড়ায়। হরেকরকম পাখির ডাকাডাকি আর ছোট একটা ঝর্ণা দেখে ট্যান্টে এসে দেখি বাকিরা উঠে গেছে। সবাইকে তাড়া দিয়ে পূর্বে ঠিক করা গাড়িতে করে ডাউকি বাজার সকালের নাস্তা করে নেই।


এবার গন্তব্য প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড হিসেবে খ্যাত চেরিপুঞ্জি যা খাসিয়া অধ্যুষিত এবং তাদের কাছে সোহরা নামে পরিচিত। সবুজপাহাড় আর শুভ্র সাদা মেঘের মাখামাখি দেখতে দেখতে সোহরার পথে আমাদের সুমো এগিয়ে চলছে। সুপ্রশস্ত রাস্তা আর বাহারি ডিজাইনের ছোট ছোট ঘর, মাঝে মাঝে পাইন গাছের সাড়ি। মাঝে দুইটা ছোটোখাটো জলপ্রপাত-এ হালকা বিরতি দিয়ে আমরা সোহরার অন্যতম আকর্ষণ সেভেন সিস্টার্স ফলস-এ পৌঁছে যায়। সেখানে একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের ভুরিভোজ সেরে নেই। সেভেন সিস্টার্স ফলস এ ছবি তোলা আর প্রকৃতি উপভোগ শেষে আমরা ইকোপার্ক প্রবেশ করি। ইকো পার্কে বিকেলবেলায় সূর্য রঙের পসরা সাজায় পুরো আকাশজুড়ে।
আকাশে হরেকরকম রঙে রাঙানো যেন কেউ তুলির আচড়ে অদক্ষ হাতে রঙের মাখামাখি করেছে! সেখান থেকে সন্ধ্যায় আমরা সোহরাতে একটা হোম স্টেতে (গেস্টহাউজ এর মত) নিশিযাপনের জন্য উঠি।
সারাদিনের ভ্রমণ এবার একটু একটু ঢের পাওয়া যাচ্ছে রুমে আসার পর। সোহরাতে তাড়াতাড়ি রাত নামে আর সকাল হয় দেরিতে। তাই হালকা ফ্রেশ হয়ে ডিনার সেরে ঘুমিয়ে পড়ি।
বৃষ্টির শব্দে সকালে ঘুম ভাঙ্গে। সবাইকে জাগিয়ে দিয়ে ফ্রেশ হয়ে হাটতে বের হই। রুম থেকে বের হতেই টব লাগানো ফুলগুলো গুডমর্নিং জানাতে কার্পণ্য করেনি। সোহরার মূল লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে সবদিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বাড়িগুলো দ্বিতল এবং প্রত্যেক বাড়িতে ফুলের টব আর গাড়ি থাকবেই। বাড়ির দেওয়ালও নানারকম জীবন্ত ফুলের কারুকার্য। কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে রুমে এসে সবাই একসাথে গাড়িতে উঠে পড়ি। সব দোকান বন্ধ থাকায় আমরা আমাদের গন্তব্যের উদ্যেশ্যে রওনা দেই। আজকে ৫টা ঝর্ণা দেখে বাংলাদেশে ফিরতে হবে। প্রায় ঘন্টা দেড়েক উঁচুনিচু পুরোনো পাথুরে পাহাড় আর সবুজ সাদা মেঘের দৌড়াদৌড়ি দেখতে দেখতে আমাদের গাড়ি চলছে। হঠাৎ জাবেদ ভাই চেচিয়ে বলে গাড়ি থামান! এখানে একটা ঝর্ণা আছে, মাওচায়া ফলস। গাড়ি থামতেই উনি পাহাড়ের পাশে হাটা ধরলেন, আমরা ক’জন উনাকে ফলো করে এগিয়ে চলি। একটু হাটতেই ঝর্ণার আওয়াজ শুনতে পাই, মনে হচ্ছে ঝর্ণা আমাদের আপন সূরে ডাকছে ডাকছে কাছে পেতে। ডাওন স্ট্রিমে নামতেই ঝর্নার নিচে পৌঁছে যায়। উচ্চতা কম হলেও অনেক প্রশস্ত এই মাওচায়া ঝর্ণা। সেখানে স্বচ্ছ পানিতে হালকা ফটোসেশন শেষে গাড়িতে উঠে পড়ি মূল ঝর্ণাগুলোর উদ্দেশ্যে। প্রথমেই পরে ডাইন্থলেন ফলস। আমরা আপার স্ট্রিমে ছিলাম, আমার দেখা শ্রেষ্ঠ ঝর্ণার একটা এটি। পানিগুলো অনেক উঁচু থেকে পড়তেছিল বলে নিচে মেঘের মত কুয়াশার সৃষ্টি হয়েছিল। সবচেয়ে উপভোগ্য ছিল এর চারিদিকে পাহাড়গুলো। বড় বৃক্ষ না থাকলেও সবুজ ঘাসের গালিচা আর বিভিন্ন ধরনের পাহাড়ি ফুলগুলোর প্রেমে পড়ে গেছি। মেঘ আর পাহাড়ের মাখামাখিতে অন্যরকম তৃপ্তি কাজ করে। এর দেড় কিলোমিটার পরেই ওয়েই-স-ডং ফলস। দেড় কিলোমিটার পথ তো নয় যেন ডিপ ফ্রিজ। মেঘের জন্য গাড়ি চালানো যেন দুরূহ ব্যাপার। আমরা চারজন ছাদে থাকায় জমে যাচ্ছিলাম। মেঘের আদ্রতা এত বেশি ছিল যে টি-শার্ট পুরো ভেজা, পায়ের লোমে বিন্দু বিন্দু শিশিরের মত জল জমে আছে। গন্তব্যে পৌঁছে জানতে পারি ৩০ রুপির টিকিট কেটে ৩০ মিনিট মত খাড়া নামতে হবে। আগের টানা ধকল এর কথা চিন্তা করে চারজন আর নামার সাহস করলেন না। আমরা বাকি চারজন টিকিট কেটে নামা শুরু করি। ৩০ মিনিট ডাউন ট্রেকিং শেষে তিন স্তরের কাক্সিক্ষত ওয়েই-স-ডং ঝর্ণার দেখা পেয়ে যায়। ধাপে ধাপে পানির ধারা যেন এই ট্যুরের পূর্ণতা দিতে অপেক্ষায় রেখেছিল। স্বচ্ছ পানির ধারায় সৃষ্ট খুম যেন বড় একটা এ্যাকুরিয়াম যেখানে মাছের বদলে আমরা দাপিয়ে খেলা করছি। এ ট্যুরের সেরা সময় ছিল সেখানে গোসল। অনেক্ষণ গোসল শেষে আমরা গাড়িতে উঠে পড়ি। মাঝে একটা রেস্টুরেন্ট-এ চিকেন ফ্রাইড রাইস উইথ মাশরুম আর চা খেয়ে আবার শুরু হয় যাত্রা। পথে বড়হিল ঝর্ণা (বাংলাদেশ থেকে দেখা যায় যা পান্থুমাই হিসেবে পরিচিত) ও ডাউকি ফলস দেখে বর্ডারে চলে আসি। পরে বাংলাদেশে ঢুকে সিলেটে গরুর কড়াই ভুনা দিয়ে ডিনার শেষে চট্টগ্রামের উদ্যেশ্যে যাত্রা। মেঘালয় যেন মেঘের লোকালয় যেখানে সারাক্ষন মেঘ খেলা করে। চোখে এখনো ভাসছে মেঘ, পাহাড়, সবুজ আর নীল আকাশ। মন পড়ে আছে পাহাড়ের খাজে, মেঘের ভাজে ভাজে। এটি ইকো ট্যুরিজম ন্যাচার স্ট্যাডি এন্ড এ্যাডভেঞ্চার এর ১২৬ তম ইভেন্ট। আমাদের আটজনের টিমে বাকি সাতজন হচ্ছেন দলনেতা জাবেদ ইকবাল, শওকত ওসমান, সুদীপ চৌধুরী, জুয়েল রানা, রিগান সাজ্জাদ, তানজিম ও সাজ্জাদ হোসাইন।