মেগা প্রকল্পের মেয়াদ শেষ জলাবদ্ধতার শঙ্কা কাটেনি

এম এ হোসাইন

31

শেষ হয়েছে ‘চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক মেগা প্রকল্পের মেয়াদ। এ বছর থেকে চট্টগ্রামবাসী চিরতরে জলাবদ্ধতার অভিশাপ হতে মুক্ত থাকার কথা। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও বাকি রয়ে গেছে অর্ধেক কাজ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত¡াবধানে খালের রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, খাল পরিষ্কার, ড্রেন পরিষ্কার ও বড় করা, নতুন ড্রেন স্থাপন করাসহ বেশ কিছু কাজ করা হলেও সরু ড্রেন এবং খালের বিভিন্ন পয়েন্টে ময়লার স্তুপ জমে যাওয়া জলাবদ্ধতা থেকে এবারও মুক্তি মিলবে না নগরবাসীর।
জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসীকে মুক্ত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর কাজ শুরু করলেও পরিকল্পনামাফিক কাজে চালাতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। প্রকল্পভুক্ত ৩৬টি খালে কার্যক্রম শুরুর পর পদে পদে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে সংস্থাটিকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাধা ছিলো-সরু খাল ও খালের পাশে রাস্তা না থাকা। খালের ময়লা অপসারণ কাজ চলমান থাকায় অনেক জায়গায় প্রযুক্তিগত সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এতে পরিষ্কার করা অনেক খালের বিভিন্ন পয়েন্টে থেকে গেছে ময়লার স্তুপ। কোনও কোনও জায়গায় ময়লা জমে বাঁধ সৃষ্টি হয়েছে। আবার অনেক খালের মধ্যে ময়লার পরিমাণ এতই বেশি, প্রতিদিন পরিষ্কার করার পরও সেখানে ময়লার স্তুপ জমছে।
এরমধ্যে চাক্তাই খালের অবস্থা শোচনীয়। খালটিতে এতো বেশি ময়লা ফেলা হয়, প্রতিদিনই বিভিন্ন পয়েন্টে ময়লার স্তুপ সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া শাখা খালগুলোতে ময়লা জমে অনেকটা ভরাট হয়ে গেছে। এ অবস্থার মধ্যে চলতি বর্ষায় ভারি বৃষ্টিপাত হলে দেখা দিতে পারে জলাবদ্ধতা। যদিও এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য ম্যানুয়ালি শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ শাহ আলী বলেন, আমরা খালগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করেছি। যান্ত্রিকভাবে অনেক খালের বিভিন্ন অংশে ঢুকে কাজ করা সম্ভব হয়নি। সেখানে ম্যানুয়ালি শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। দ্রæত পানি চলাচলের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতেও জলাবদ্ধতা হয়নি। আমরা যে পরিমাণ কাজ করেছি তাতে জলাবদ্ধতা হওয়ার কথা না। তবে অল্প সময়ে তীব্র বৃষ্টিপাত হলে পানি জমে যেতে পারে। পানি যাতে খালে চলে যেতে পারে সে ব্যবস্থা করেছি। সে ক্ষেত্রে পানি দ্রæত চলে যাবে। জলাবদ্ধতা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সেনাবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্পের ড্রেন সংস্কার, ড্রেন বড় করা, সিলট্যাপ স্থাপন, রেগুলেটর স্থাপন, রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ কাজ চলমান আছে। বৃষ্টি হলে পানি জমে এমন ২২টি স্থান নির্ধারণ করে পানি যাতে দ্রুত খালে চলে যেতে পারে সেজন্য ৫২ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার ড্রেন বড় করা, ড্রেনের প্রশস্ততা ও গভীরতা বাড়ানোর কাজ চলছে। এরমধ্যে ৩৬ কিলোমিটার কাজ শেষ হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের সাথে সমন্বয় করে ২৪০ দশমিক ১১ কিলোমিটার ড্রেন পরিষ্কার করা হচ্ছে। ১০ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার নতুন ড্রেন তৈরি করা হয়েছে। একশ জন শ্রমিকের সমন্বয়ে চারটি টিম করে নিয়মিত খাল পরিষ্কার করা হচ্ছে। ৪টি রেসপন্স টিম তাদের তদারকিতে আছে। ৫টি খালের মুখে রেগুলেটর স্থাপনের কাজ চলমান আছে।
প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ শাহ আলী বলেন, সার্বিকভাবে আমাদের কাজের অগ্রগতি প্রায় ৫২শতাংশ। করোনা, ভূমি অধিগ্রহণ সমস্যাসহ নানা কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। এজন্য দুইবছরের সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের ড্রেনগুলোর একটি বড় সমস্যা হচ্ছে উপরের দিকে বড় এবং নিচের দিকে ছোট। এজন্য পানি জমে যায়। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ না থাকায় আমরা সেখানে কাজ করতে পারছি না। ফলে বৃষ্টিপাত হলে উপরের অংশে পানি না জমলেও নিচের সরু অংশে এসে পানি বাধার মুখে পড়ে। তবে পানি চলাচলের পথটা আমরা পরিষ্কার করে দিয়েছি।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গৃহীত ৫ হাজার ৬শ ১৬ কোটি ৪৯ লক্ষ ৯০ হাজার টাকায় ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক মেগা প্রকল্পটি ২০১৭ সালের ৯ আগস্ট একনেকে অনুমোদন পায়। ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সিডিএর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। একই বছরের ২৮ এপ্রিল নালা পরিষ্কার করার কাজের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ শুরু করে সেনাবাহিনী। প্রকল্পের অধীনে ৩৬টি খাল খনন করা, খালের প্রশস্ততা ও গভীরতা বাড়ানো, মাটি উত্তোলন, প্রতিরোধ দেওয়াল দেয়া, ড্রেন সংস্কার ও নতুন ড্রেন তৈরি করাসহ বিভিন্ন কাজ করা হয়। চলতি বছরের ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের ৬০ শতাংশ কাজ শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও প্রায় ৫২ শতাংশ কাজ করতে সক্ষম হয় বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান।