মৃদূলা ও নতুন বন্ধুরা

রুমানা নাওয়ার

12

মৃদুলার মা’র চাকরির সুবাদে নতুন স্কুলে ভর্তি হতে হলো মৃদুলাকে। পাঁড়াগাঁয়ের সাধারণ এক স্কুল। রাজধানীর আধুনিক স্কুল ছেড়ে মৃদুলার এখানে আগমন। নতুন পরিবেশ নতুন বন্ধু বেশ লাগছে তার। প্রথম দিন থেকে চতুর্থ শ্রেণীতে দাপটের সাথে নিজের অবস্থান তৈরী করে নিলো সে। ক্লাসের ফার্ষ্ট গার্ল জান্নাতুল আদন মুশফি।একটু ভয় কাতুরে এবং অন্তর্মুখী স্বভাবের। আগে যা ও একটু নেতৃত্ব দিতো ক্লাসে। মৃদুলা আসার পর তাও শেষ হয়ে গেলো। দৌর্দন্ড প্রতাপ মেয়েদের উপর যেমন ছেলেদের উপরও প্রয়োগ করতে লাগলো।
মুখের সাথে সাথে হাতটাও চালাতে ভুল করেনা মৃদুলা মাহজাবীন।পাড়া গাঁয়ের দুষ্ট ছেলেগুলোও ওর সাথে পারেনা বল আর বুদ্ধিতে। ক্লাস টিচার মেমোরি চৌং র কাছে নালিশ আসতে লাগলো হরদম। কখনো ফাহিম, কখনো রহিম, কখনো আবদুল্লাহ। এভাবে পালা করে মারা এবং অবশেষে নালিশ। কেঁদে কেটে অস্থির মেয়ের হাতে মার খাওয়ার অপমান। ছেলে হয়েও পরাস্ত হওয়ার অপমান। ক্লাস টিচার যতোই মৃদুলাকে সাবধান করে ও ততই ধারালো যুক্তি খাড়া করে।
প্রায় প্রতিদিনই ক্লাসে বা হেড মিস্ট্রেস এর রুমে ডাক পড়ে মৃদুলার। ও একটুও ভয় ডর পায়না। স্কুলের অন্য স্টুডেন্টরা যেখানে হেড মিস্ট্রেস এর রুমে যেতে সাহস করেনা। সেখানে মৃদুলা হনহন করে ঢুকে ঘটনার আদিঅন্ত বর্ণনা করা শুরু করে। এই তো সেদিন রিনা মণি নামের ওরই ক্লাসের একটা মেয়েকে প্লাষ্টিকের স্কেল দিয়ে মারার বিচার আসলো। স্কুলের পাশেই রিনা মণির বাবার মাছের আড়ত। সাথে সাথে মেয়েটা বাবাকে ডেকে আনলো মৃদুলার বিচার করতে। টিচার্স রুমে সব টিচার টিফিন খাওয়ায় ব্যস্ত। রিনা মনির বাবা লুঙ্গি খিচে হাত উঁচিয়ে মৃদুলার বিরুদ্ধে নালিশ দিতে আসলো শিক্ষককে।
নুন্যতম ভদ্রতাটুকুন এ জানেনা এসব পাড়াগাঁয়ের লোকেরা। সব শিক্ষক তার কথা শুনলো। মৃদুলার সাথে বাকবিতন্ডা জুড়ে দিলো সে ও তার মেয়ে। একই ক্লাসে পড়লে ফিজিক্যালি রিনা মণি মেয়েটা মৃদুলার চেয়ে বয়সে এবং লম্বায় বড়। রিনা মণির বাপ সেটাই দেখালো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। মৃদুলাকে হঠাৎ প্রশ্ন ছুঁড়ে—
তুমি বড় নাকি রিনা মণি বড়। ওর গায়ে হাত তোলো তুমি?
মৃদুলাও কম যায় না। হাজার হলে ও ঢাকা শহরে বড় হওয়া মেয়ে। পটপট করে উত্তর করলো—-
ওর বয়স কত আমি তো জানিনা। তাহলে বলতে পারতাম কে বড়।
টিচারদের দু’একজন হো হো করে হেসে উঠলো। মৃদুলার বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরে।
হেড মিস্ট্রেস সব কথা শুনলো। তারপর রিনা মণির বাপ জামাল মিয়াকে বললো, -আপনি এক্ষুণি বের হয়ে যান স্কুলের ত্রিসীমানা থেকে। বাচ্চা পড়ানোর দায়িত্ব যেমন আমাদের, তাদের দেখভালের দায়িত্বটা ও আমাদের উপর। আমরাই ওদের বাবা মা, মূল অভিভাবক। যতক্ষণ স্কুলে আছি। আপনাকে আগেও বলা হয়েছে এরকম লুঙ্গি খিচে স্কুলে না আসার জন্য। এরপর ও যদি আসেন। তাহলে আমি অন্য ব্যবস্থা নিবো আপনার বিরুদ্ধে।
আর কথা না বাড়িয়ে অভদ্র জামাল মিয়া হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো অফিস রুম থেকে। তারপর রিনা মণিকে ডেকে সাবধান করে দিলো—
যেকোন সমস্যায় টিচাররা আছে। ওদের জানাতে। বিশেষ করে ক্লাস টিচারকে। আর কখনো যেন মা বাবাকে ডেকে না আনে স্কুলে।
মৃদুলাকেও বারণ করা হলো হাত না উঠাতে। সে যেই হোক। মারামারি কখনো শুভ কিছু বয়ে আনেনা। সবার সাথে মিলেমিশে বন্ধু সুলভ আচরণ করতে বললো হেড মিস্ট্রেস শেলী খাস্তগির।
পড়াশুনোয় যথেষ্ট মেধাবী মৃদুলা মাহজাবীন। তার দেখাদেখি তার অন্যান্য বন্ধুরা নিয়মিত পড়া শিখতে লাগলো। হাজার হলেও ঢাকা শহরের মেয়ে সে। যা বলে যা করে তাই ভালো লাগে তাদের। তার পিছু নেয় সবাই।
সমাবেশে শুদ্ধ উচ্চারণে শপথ বাক্য পাঠ করতে গেলে শিক্ষকরা বাহবা দেয় তাকে। চটপটে এবং বুদ্ধিমান মৃদুলা অল্পদিনে সবার মন জয় করে নিলো। হাতমুখ সমানে চালালেও পড়াশুনায় কো-কারিকুলাম এক্টিভিটিস এ সমানভাবে দক্ষতার ছাপ রাখতে লাগলো সে। তাকে দেখে দেখে ক্লাসের অন্য সবাই আগ্রহী হয়ে উঠলো চিত্রাংকন ডিবেটস আবৃত্তি গান গল্পবলায়। কিন্তু ঐ একটা জিনিষ ও সে না করে থাকতে পারেনা। শিক্ষকরা নিষেধ করার পরও। সামান্য ছুঁতো পেলেই গায়ে হাত তোলা। অবশ্য সবার ক্ষেত্রে না। অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের পড়ায় সাহায্য করতে গেলে, ওরা অনীহা প্রকাশ করতে গেলেই মৃদুলা চড় থাপ্পড় কানমলার মতো শাস্তি দেয়। তার এ বিশেষ গুণটার পরিচয় পেয়ে বড় আপাসহ স্কুলের সব শিক্ষকরা খুশীতে উদ্বেলিত হলো। মূদুলার প্রতি ভালোবাসা আরো বেড়ে গেলো।