মুসলিম রেঁনেসার জাগ্রত কবি ফররুখ

মুহাম্মদ তাফহীমুল ইসলাম

6

প্রখ্যাত বাঙালি কবি ফররুখ আহমদ। জন্মেছেন ১৯১৮ সালের ১০ই জুন মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার মাঝাইল গ্রামে। পিতা-সৈয়দ হাতেম আলী, মাতা- রওশন আকতার। পিতা ছিলেন পুলিশ ইন্সপেক্টর। ফররুখ ১৯৩৭ সালে খুলনা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর স্কটিশ কলেজে দর্শন এবং ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি বামপন্থী রাজনীতির প্রতি ঝুঁকে পড়েন। তবে চল্লিশ-এর দশকে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসে পরিবর্তন আসে। ফররুখ আহমদ ১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে আপন খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন এর সাথে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। ফররুখ তাঁর নিজের বিয়ে উপলক্ষে ‘উপহার’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন যা ‘সওগাত’ পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১৩৪৯ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ফররুখ আহমদ এগারো জন সন্তান-সন্তুতির জনক ছিলেন।
তিনি ১৯৪৩ সালে কলকাতার আই. জি. প্রিজন অফিসে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবনে পদার্পন করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি সিভিল সাপ্লাইতে এবং ১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মেও চাকরি করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি ‘মাসিক মোহাম্মদী’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে ফররুখ আহমদ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বেতারে যোগ দেন। সেখানে প্রথমে অনিয়মিত হিসেবে এবং পরে নিয়মিত স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন সাহিত্যের প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী। তিনি বিচরণ করেছেন সাহিত্যের নানা শাখায়। তবে তাঁর প্রধানতম পরিচয় ‘কবি’। তিনি রচনা করেছেন সনেটও। তাঁর রচনায় প্রভাব বিস্তার করে ধর্মীয় ভাবধারা। আরবি ও ফারসি শব্দের ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায় তাঁর রচনায়। কবি ফররুখ আহমদ বাংলা ভাষার প্রতি ছিলেন নিবেদিত। তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে সমর্থন করতেন। ফররুখ অসংখ্যা কাব্যগ্রন্থ, শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ ও গল্পগ্রন্থ রচনা করে গেছেন। ছোটদের জন্য তাঁর বহু রচনা রয়েছে। যেগুলোতে রয়েছে মানবতার শিক্ষা। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্য- সাত সাগরের মাঝি (১৯৪৪), সিরাজাম মুনিরা (১৯৫২), নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১), মুহূর্তের কবিতা (১৯৬৩), হাতেমতায়ী (১৯৬৬), হাবেদা মরুর কাহিনী (১৯৮১) ইত্যাদি। পাখির বাসা (১৯৬৫), হরফের ছড়া (১৯৭০), ছড়ার আসর (১৯৭০) ইত্যাদি তাঁর শিশুতোষ রচনা। তাঁর রচনায় একটি আলোড়ন, জাগ্রত চেতনার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কবি ফররুখ আহমদ সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৬০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৬৫ সনে প্রেসিডেন্ট পদক ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স” এবং ১৯৬৬ সালে আদমজী পুরস্কার ও ইউনেস্কো পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালে তাঁকে যথাক্রমে মরণোত্তর একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়। মুসলিম রেঁনেসার জাগ্রত কবি ফররুখ আহমদ ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর সন্ধ্যাবেলা ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকার শাহজানপুরে দাফন করা হয়।