মুসলিম বিশ্বের ঐক্যই পারে সংকট থেকে উত্তরণের উপায়

কাজি রশিদ উদ্দিন

13

পৃথিবীর বুকে বসবাসকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো মানবজাতি। পৃথিবীর প্রকৃত বয়স ও তার সৃষ্টি রহস্য আমাদের কোনও সঠিক নাই। তবে বিজ্ঞান এমন বহু আবিস্কার করে যাচ্ছে, যা মানবজাতির বসবাসকে যেমন করেছে আনন্দময় তেমনি করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। এক স্রষ্টায় বিশ্বাসী প্রতিটি ধর্মই পৃথিবীতে এসেছে বিশৃঙ্খল সময়ে মানবসমাজে শৃঙ্খলা আনতে। নুহ আ: ইব্রাহিম আ: মুসা আ: ঈসা আ: থেকে সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সা: পর্যন্ত প্রত্যেকেই এসেছেন মানবজীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্যে। মুসা আ: ও ঈসা আ: এবং অন্যরা নির্দিষ্ট সময় ও এলাকার জন্য এলেও একমাত্র নবী মুহাম্মদ সা: এসেছেন সর্বজনীনভাবে সর্বযুগ এবং সমগ্র মহাবিশ্বের জন্য।সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ সা: ৫৭০ সালে পৃথিবীতে আগমন করেন। ৬১০ সালে তিনি আল্লাহর দ্বীন ইসলাম ধর্ম প্রচার আরম্ভ করেন এবং ৬৩৩ সালে ইহজগৎ থেকে বিদায় নেন। বিদায়ের কিছু আগে মানবজাতির উদ্দেশ্যে একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। যাকে আমরা ‘বিদায় হজের ভাষণ’ বলি এটি যে মানবকল্যাণের সর্বশ্রেষ্ঠ দিকনির্দেশনা। তা স্বীকার করেন প্রত্যেক বিবেকবান মানুষ। বিদায় হজের নবী মুহাম্মদ সা. স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আল্লাহতায়ালা আজ মানবজাতির জন্য দ্বীন ইসলামকে ধর্ম হিসাবে পূর্ণতা দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, ‘তোমাদের মাঝে যারা কুরআন ও হাদিসকে আকড়ে থাকবে, তারাই সফল হবে।’বাপ-দাদার রেখে যাওয়া অন্তঃসারশূন্য পৌত্তলিকা আকড়ে থাকতে চেয়েছিল বলেই মক্কার লোকেরা নবীজীর ধর্ম প্রচারকে বাধাগ্রস্ত করতে চেয়েছিল। তবুও তারা কখনও নবীজীকে সৎ মানুষ হিসেবে অবিশ্বাস করেনি। মক্কার কাফেররা নবীজীকে সব সময় আল আমিন বা বিশ্বাসী বলে অভিহিত করত। নবী করিম সা. এর জাগতিক জীবন সমগ্র বিশ্বের কাছে মানবজীবনের এক অতুলনীয় মডেল। সমগ্র মানবজাতির জন্য এর চেয়ে বড় আর কোনো অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বের ও আদর্শের দৃষ্টান্ত নেই।
পৃথিবীতে আজ মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ১৮০ কোটি। প্রত্যেক মুসলমানই পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে জীবন পরিচালিত করার কথা। এখানে বলে রাখা ভাল যে, ইসলাম প্রচলিত অর্থে শুধুমাত্র একটি ধর্মের নাম নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা (Compit code of life)। একই পথে হাঁটা। একই সুরে কথা বলা উচিত- সবাইর আজ আমরা কী দেখছি? অনেক দেশে মুসলমানেরা আজ শিয়া-সুন্নি-কুর্দিতে বিভক্ত।
সুন্নিরা আবার চার মজহাবে বিভক্ত। একই মজহাবের লোকেরা আবার নানান পীর-মুরশিদের মাজারকে কেন্দ্র করে বিভক্ত। পৃথিবীর মুসলমানের এই বিভাজিত জীবনের দৃশ্য বাংলাদেশেও দৃশ্যমান। অসংখ্য পথে বিভক্ত হয়ে একজন আরেকজনকে কাফের পর্যন্ত বলতে দ্বিধা করে না। অথচ ইসলামে স্পষ্ট নির্দেশ আছে, কোনো মুসলমান অন্য মুসলমানকে ‘কাফের’ বলতে পারবে না।
ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্রু সেডসহ (১০৯৬ থেকে ১২৯২ খ্রি:) অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে ন্যায় ও সত্যের দিশারী ইসলাম। সাড়ে ১২শ’ বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস বিজয়ের সুস্তম্ভ করেছে উঁচু থেকে আরো উঁচু। সব ধর্মের অনুসারীদের নিরাপত্তার চাদরে জীবনযাপনের দিয়েছে অবারিত সুযোগ।
সবশেষে এই মুসলিম জাতি হারিয়েছে তার গতিশীল জীবনের পথ। ক্ষমতার শীর্ষে ফিরে এলো খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী। মূলত এই সময়ে ঐতিহ্য হারানো মুসলমানেরা প্রতিপক্ষের কৌশলের ফাঁদে পা দিয়ে অস্তিত্ব হারানোর পথে। ফলে একবিংশ শতকের আজকের দিনে একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছে ইসলামের অনুসারীরা।খ্রিস্টবাদী ও ইহুদিবাদী সমাজব্যবস্থার অসংখ্যা কৌশলের দুটি কৌশলকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যাক। তাদের এ দু’টি অপকৌশল হলো মুসলিম জাহানকে বিভক্ত করা এবং মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি করা। তাদের চূড়ান্ত ভিশন ও মিশন হলো-মুসলিম সমাজকে দিধাবিভক্ত করা। অতীতে শিয়া সুন্নি নিয়ে কিংবা মাজহাব নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে তেমন কোনো বিরোধ ছিল না। দুর্ভাগ্য আজ মহান ঐতিহ্যের অধিকারী জাতি মুসলমানদের তারা বিভক্ত নানা নামে। এই বিভক্তির কারণে অনেক সময় দেখা যায়। একই মসজিদে নামাজ পড়া নিয়ে মারামারির ঘটনা পর্যন্ত ঘটে। অনেক সময়ে তুচ্ছ ঘটনা যেমন নামাজে দাঁড়িয়ে হাত বাধার পদ্ধতি নিয়ে অথবা দাঁড়িয়ে মিলাদ পড়া নিয়ে তুমুল ঝগড়া ঝাটি বাধে। ফেরকার দ্ব›েদ্ব জড়িয়ে মসজিদে আসতে নিরুৎসাহিত করা, নাকি যিনি নামাজ পড়েন না তাকে মসজিদে আসতে উদ্বুদ্ধ করা প্রকৃত মুসলমানের কাজ?২০০১ সালে আফগানিস্তানে আক্রমণের মাধ্যমে তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ যে নয়া ত্রæুসেডের সূচনা করেছেন তা প্রমাণিত; কিন্তু সেই সময় আমাদের অনেক নেতা এটা বুঝতে পারেন নি। এ কারণে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ও মিসরের পর সিরিয়ায় মুসলিমদের রক্ত ঝড়ছে। মুসলমানদের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পবিত্র আল-আকসাকে কেড়ে নেয়ার সর্বশেষ ধাপে ইহুদিরা। অন্যদিকে, আরাকান ও কাশ্মিরে চলছে অব্যাহত মুসলিম হত্যা, আকাশে-বাতাসে ধ্বনিতে হচ্ছে মুসলমানদের হাহাকার। আজো যদি মুসলিম বিশ্বের সরকারগুলো ও নেতাদের ঘুম না ভাঙে, তা হলে হয়তো দীর্ঘ সময় মুসলমানদের থাকতে হবে অন্য কারো গোলাম হয়ে।মুসলিম বিশ্বের এক হওয়ার সময় এসেছে। আর কোনোভাবেই বিভক্ত হওয়ার সময় নেই। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান ডাক দিয়েছেন মুসলিম বিশ্বকে এক হতে। তিনি বলেছেন, ৫৭টি দেশ নিয়ে ওআইসির অধীনে একটি সেনাবাহিনী গঠনের কথা। যাদের কাজ হবে এই বিশ্বকে নিরাপদ করা।
গত ২৬ এপ্রিল ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনি মুসলিম বিশ্বকে যুক্তরাষ্ট্র তথা সব অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়েছেন। এদিকে ২৪ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এক সপ্তাহও টিকবে না।এর জবাবে খামেনি বলেছেন, এ ধরনের মন্তব্য মুসলিমদের জন্য অবমাননাকর। আমাদের সকল মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধ চলছে, এটি দুঃখজনক। কিছু অনগ্রসর মুসলিশ দেশের সরকার অন্যান্য দেশের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। আমাদের উচিত যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য শত্রæদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেসব সমস্যা মোকাবেলা করছে তা বিভ্রান্তির কারণে তৈরি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে হোয়াইট হাউজ অবশ্যই মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। তাই আরব বিশ্বের সম্পদ লুটে নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
নিপীড়নকারী ও দখলদার এবং তাদের দোসরদের উদ্ধত অপশক্তির বিরুদ্ধে বিশ্বের সব মুসলিম দেশ এক জোট হলে আমাদের বিজয় ইনশাল্লাহ হবেই।সত্যিকার অর্থে আমরা মুসলিম হলে আমাদের মধ্যে জাতপাতের কোনো বিভেদ-বিদ্বেষ থাকতে পারে না।
মহান স্রষ্টাকে সামনে রেখেই বলা যায়, যদি সৌদি আরব ইরান-তুরস্ক, ইরাক, মিশর ও পাকিস্তান মিলে মুসলিম বিশ্বকে বিভেদমুক্ত করতে পারে এবং ওআইসির অধীনে শক্তিশালী সেনা ইউনিট গঠন করতে পারে, তা হলে আগামী দিন হতে পারে মুসলমানদের। মুসলিম সমাজের নেতাদের এমন কোনো ভুল করা উচিত হবে না, যে ভুলে মুসলমানেরা কার্যত হারিয়ে যাবে। সব ত্রæসেডের ন্যায্য ও সমুচিত জবাব দিতে তাদের একটি ছাতার নিচে মিলিত হয়ে নেতৃত্বের গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট..