মুর্শীদে বরহক আল্লামা হাফেজ দৌলত খান (রহ:)

কাজী আহসান উল মোরশেদ কাদেরী

72

সাঈয়েদুস সাদাত হুজুরে করীম রউফুর রহীম হযরত মুহাম্মদ (দ:) কর্তৃক প্রবর্তিত ইসলাম ধর্মকে জাহানব্যাপী সজীব ও তাবলীগ এশায়াতের নিমিত্তে মাওলায়ে আ’লা মুশকীল কোশা মাওলা আলী কররমাল্লাহুর মাধ্যমে অলীয়ে রাব্বানী পৃথিবীতে আগমনের মূল কারণ। মদীনাতুল আউলিয়া খ্যাত চাটঁগাম শরীফ গাউছ কুতুব অলী আবদাল গণের ঊর্বর ভূমি ও তীর্থক্ষেত্র। গাউছুল আজম মাইজভাÐারী কেবলার বেলাদত ভূমি ফটিকছড়ির পাইন্দং এ অসংখ্য বুযুর্গসূফী আলেমের আবির্ভাব হয়েছে। বিশেষ করে বাহারুল উলুম আল্লামা তোরাব উদ্দিন (রহ:), গাউছুল আজম মাইজভাÐারীর নানাজান আল্লামা রহমতুল্লাহ্ শাহ্ (রহ:), খলীফায়ে গাউছুল আজম মাওলানা মোহাব্বত আলী শাহ্ (রহ:), কাজীউল কুজ্জাত কাজী ফালাহ্ গাজী শাহ্ (রহ:)প্রমুখ। তন্মধ্যে মুর্শিদে কামেল আল্লামা হাফেজ দৌলত খান (রহ:) অন্যতম। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আল আরবে কুখ্যাত নজদী দস্যুগণ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বব্যাপী তাদের মতবাদ প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে এই দেশে ইমামে আহলে সুন্নত আল্লামা গাজী শেরে বাংলা (রহ:) এর নেতৃত্বে যে ক’জন মর্দে মুজাহিদ সুন্নিয়ত প্রতিষ্ঠায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তন্মধ্যে ফিরিঙ্গি বাজারের শাহ্ ছাহেব কেবলা নামে পরিচিত হযরত শাহ্ হাফেজ দৌলত খান (রহ:) অন্যতম।
সত্যানুসন্ধানীদের প্রিয় পুরুষ এই মহান সূফী ব্যক্তিত্ব ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে ফটিকছড়ির পাইন্দং এর পশ্চিম হাইদচকিয়া জ্ঞানীগুণী উচ্চস্তরের অভিজাত বনেদী মোহাব্বত আলী মুন্সী বাড়ীর সুফী ব্যক্তিত্ব আমিনুর রহমান মাতব্বর (গাউছুল আজম মাইজভান্ডারীর ১০ই মাঘ ওরছ শরীফের শুরুর দিকের অন্যতম ইন্তেজামকারী) এর ঔরষে ও মুহতারিমা গুল বাহার বেগমের গর্ভে এক শুভ মুহূর্তে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতৃতুল্য এক মাত্র বড় ভাই মরহুম তৌহিদুল আলম চৌধুরীও চট্টগ্রামের তৎকালীন শিল্পপতি দানবীর ও সমাজ সংস্কারক দানবীর ব্যাক্তিত্ব ছিলেন। তিনি আপন ছোট ভাইকে স্বীয় পুত্রের ন্যায় লালন ও দ্বীনি কাজে খেদমত করার উৎসাহ যোগাতেন।
হাফেজ দৌলত খান (রহ:) এর জন্মের আগে অনেক সন্তানাদীর মৃত্যুর কারণে তাঁর পূন্যবতী মাতা নিয়ত করেন যদি তাকে আর একটা পুত্র সন্তান আল্লাহ্ পাক এনায়েত করেন তাহলে তাঁকে দ্বীনি খেদমতে সঁপে দিবেন। কোন এক শুভ মুহূর্তে বাড়ীর ‘‘হুসাইন মোমিন শাহ (রহ:) মসজিদে’’ বিছমিল্লাখানীর পর তৎকালীন প্রসিদ্ধ আলেম ও সূফী যুগিনিঘাটা নিবাসী আল্লামা শাহ্ হাফেজুর রহমান প্রকাশ হাফেজ মাস্টার সাহেবের নিকট সোপর্দ করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনান্তে তাঁকে প্রেরণ করা হয় মিরশ্বরাই মিঠানালাস্থ প্রখ্যাত চিশতিয়া নেজামিয়া ছিলছিলার দিকপাল বড় হাফেজ সাহেব কেবলা নামে মশহুর হযরত শাহ্ সূফী সৈয়দ গোলাম রহমান এসমতী কেবলা (রহ:) এর কাছে। শাহ্ এসমতীর তত্বাবধানে তিনি কোরআন শরীফ হিফজ করেন এবং চিশতীয়া নিজামীয়া ছিলছিলার লতীফা শিক্ষাগ্রহণ করেন। মিঠানালার বড় হাফেজ সাহেব কেবলার ঐকান্তিক ইচ্ছায় তাঁর আপন বন্ধু কোম্পানীগঞ্জের চর পার্বতী নিবাসী মোজাদ্দেদীয়া ছিলছিলার হাদী,শাহ্সূফী পীর হাফেজ শাহ্ ছফিউল্লাহ্(রহ:)’র কাছে প্রেরণ করেন। চর পার্বতীর হাফেজ সাহেব কেবলার তত্ত¡াবধানে থেকে তিনি শরীয়ত তরীকত্বের যাবতীয় এলেম অর্জন করেন এবং দীর্ঘকাল মহান শায়খের খেদমতে থেকে তিনি বায়াত গ্রহণ করেন এবং আরো কিছুদিন সেখানে থেকে তিনি বিভিন্ন উচ্চ মার্গের ছুলুকিয়াত অর্জন করেন। অবশেষে স্বীয় পীরের কাছ থেকে খেলাফত অর্জনের পর মাতৃভূমি চট্টগ্রাম শহরে আগমন করেন। ফিরিঙ্গি বাজারের কাজী নজরুল ইসলাম সড়কের প্রখ্যাত বুযুর্গ শাহ্সুফী সৈয়্যদ নেজাম শাহ্ প্রকাশ চাঁন শাহ্ মাজার প্রাঙ্গণে খানকাহ্ শরীফ স্থাপন করেন।
তরীকতের শায়খ হিসাবে তিনি পথ হারাদের মওলায়ী রঙ্গে রঙ্গিন করাতে থাকেন। ফিরিঙ্গি বাজারের শাহ সাহেব হিসাবে বিশেষ বুৎপত্তি লাভ করেন এবং হাজার হাজার তরীকত পন্থিদের কাছে মহান মুর্শিদে বরহকে পরিগণিত হন। তাঁর ‘‘খানকা-এ দৌলতিয়া’’ আস্তে আস্তে হয়ে উঠে অভিজাত পরিবার হতে কুলি-মেথরের আপনালয়।
দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত আলেম-উলামা পীর-মাশায়েখগণ তাঁর খানকা শরীফে তশরীফ আনয়ন করতেন প্রতিনিয়ত। তন্মধ্যে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানসহ হাকীমুল উম্মত আহমদ ইয়ার খান নঈমী (রহ:), খতীবে আজম আল্লামা শফি উকাড়বী (রহ:), আমিরুল হুজ্জাজ হযরত আমির ইয়াহিয়া (রহ:), আজমীর শরীফের পীর হাজী সৈয়্যদ আলাউদ্দিন চিশতী (রহ:), আরবের আল্লামা আহমদ রামদ্বানী (রহ:), শাহান শাহ্ সৈয়্যদ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (রহ:), আল্লামা আতিকুল্লাহ্ খান (রহ:), ইমাম আল্লামা গাজী শেরে বাংলা (রহ:), আল্লামা কাজী নুরুল ইসলাম হাশেমী (ম.জি.আ), চুনতীর শাহ্ সাহেব কেবলা (রহ:), কুতুবদিয়া শাহ্ আবদুল মালেক কুতুবী (রহ:), আল্লামা সৈয়্যদ শামছুল হুদা (রহ:), অধ্যক্ষ মোজাফফর আহমদ (রহ:), অধ্যক্ষ মোসলেহ উদ্দিন (রহ:), অধ্যক্ষ আবদুল হালিম (রহ:), খতিব আল্লামা সালাউদ্দিন, শায়খুল হাদীস আল্লামা ফোরকান (রহ:) উল্লেখযোগ্য।
ইমাম শেরে বাংলা তাঁকে ‘‘শাহ্ ছাহেব’’ নামে সম্বোধন করেন এবং শাহেন শাহ হক ভান্ডারী (রহ:) তাঁকে মামু সাহেব নামে ডাকতেন, সুযোগ পেলেই হঠাৎ করে খানকাহ্ শরীফে তশরীফ আনতেন এবং তরীকতের আলোচনায় মশগুল হয়ে যেতেন। আন্দরকিল্লাহ্ শাহী জুমা মসজিদের খতীব মহোদয় জুমার পর শাহ্ ছাহেবকে দিয়েই মিলাদ কিয়াম পরিচালনা করাতেন। তাঁর সুললিত তাওয়াল্লুদ শরীফের জন্য আগত মুসল্লীগণ আগ্রহভরে অপেক্ষা করতেন।গাউছুল আজম মাইজভান্ডারীর পৌত্র খাদেমুল ফোকরা খ্যাত সৈয়্যদ শাহ্ দেলোয়ার হোসাইন মাইজভান্ডারীর সাথে ছিল তাঁর হৃদ্যতাপূর্ণ বেলায়তী সম্পর্ক। পবিত্র হজ্ব পালনের সময় তিনি জাহাজের আমিরে হুজ্জাজের দায়িত্ব পালন করেন। খুলনা, রংপুর, বাগেরহাট, মংলা বন্দরে তিনি তরীকতের ছফর করতেন এবং সেখানে খানকাহ্ স্থাপন করেন। সেই অঞ্চলগুলোতে তাঁর অসংখ্য ভক্ত ও মুরীদান আছে। অত্যন্ত দানশীল মনোভাবাপন্ন শাহ্ ছাহেব কেবলা দেশের প্রখ্যাত ছুন্নী মারকাজ হেফজখানা ও এতিমখানায় অকাতরে দান করতেন। খানকাহ্ শরীফ ও বাড়ীর আস্তানায় মাসিক মাহফিল ও লংগর খানা ব্যবস্থা চালু করেন।বাংলার অনন্য সূফী সাধক মুর্শিদে হক্কানী আল্লামা হাফেজ দৌলত খান (রহ:) ১৯৮০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে মওলা-এ হাকিকীর দরবারে সার্থক প্রেমিক রাজ রূপে নিজেকে সমর্পণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। পরদিন দরবার পাক প্রাঙ্গনে আন্দরকিল্লাহ্ শাহী মসজিদের তৎকালীন খতিব সৈয়্যদ আবদুল আহাদ আল মাদানী (রহ:)’র ইমামতিতে জানায়ার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ওফাত পরবর্তী ৪০ বৎসর যাবত তার একমাত্র পুত্র যোগ্য ওয়ারিশ রূপে শাহজাদা আলহাজ্ব জাফর উল্লাহ্ খান এম.এ সাহেব মাজার শরীফ ও দরবারকে এক ইসলামিক কমপ্লেক্স রূপদান করেন। দীর্ঘ ২৪ বছর যাবত একটানা সুচারুরূপে হেফজখানা ও এতিমখানা কোনরকম সরকারি সাহায্য ছাড়া ভক্ত অনুরক্ত মুরীদানদের ঐকান্তিক সহায়তায় চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্পূর্ণ ‘‘দাঈ’’ মনোভাব নিয়ে তাওয়াক্কুলিয়া নিয়তে অত্র প্রতিষ্ঠান চালু আছে। প্রতি বছর ৫ ফেব্রুয়ারী ওরছে পাকে শত শত আলেম উলামা পীর মাশায়েখদের উপস্থিতিতে ভরপুর মজলিশ উদযাপিত হয়ে থাকে। মজলিসে প্রত্যেক বছর হেফজ সম্পাদনকারী ছাত্রদের দস্তারে ফজিলত প্রদান করা হয়। ফিরিঙ্গি বাজারের শাহ্ ছাহেব কেবলা নামে খ্যাত আল্লামা দৌলত খান (রহ:) এখনো উত্তর চট্টলার অন্যতম মুর্শিদে কামেল রূপে তাছাররূপাত এনায়েত করছেন। এই মহান অলীয়ে রাব্বানীর রুহানী শামীয়ানা তলে মহান আল্লাহ্ আমাদের দায়েম কায়েম রাখুন। আমীন

লেখক : আহ্বায়ক- বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন চট্টগ্রাম মহানগর