মুজতাহিদ অনুসরণ কেন জরুরি

মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

93

‘তাক্লিদ’ শব্দটি আরবি। ‘কিলদাতুন’ ধাতু হতে এসেছে। ‘কিলাদাহ’ শব্দ দিয়ে মানুষের গলায় পরিধান বুঝলে তার অর্থ হবে গলার হার বা মালা। যখন পশুর গলায় কোন কিছু পরানো বুঝায় তখন তার অর্থ হবে দড়ি বা রশি।
মুসলিম দার্শনিক ঈমাম গায্যালী (রহ.) লিখেছেন, ‘কারো কথা বা মত প্রমাণ ছাড়াই মেনে নেওয়ার তাক্লিদ। ঈমানের এরূপ আস্থা যিনি পোষণ করেন, আমার ঈমামের মতামতের পক্ষে দলিল প্রমাণ আছে এবং তা সত্যও বটে, তিনি ‘মুকাল্লিদ’। মুকাল্লিদের বিশ্বাস এ ধরনের নয় যে, দলিল প্রমাণ থাকলে অনুসরণ করবো অন্যথায় নয়। ঈমামের তাক্লিদের বিষয় জানতে চাওয়া তাক্লিদের বিরোধী কাজ নয়। উসুলে ফেকাহ শাস্ত্রের মতে, যে মুসলমান কোরআন, হাদিস ও ইজমার আলোকে ধর্মীয় সমস্যাসমূহ সমাধান করতে অক্ষম এবং সকল বিষয়ে কোরআন ও সুন্নার নির্দেশনা আবিষ্কার যিনি করতে পারে না, এমন মুসলিম কোরআন-সুন্নাহ ও ইজমার আলোকে জীবন সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম যে কোন ঈমামের অনুসরণ করাকে তাক্লিদ বলে। অনুসরণকারী যেহেতু সরাসরি কোরআন-হাদিস ও ইজমার আলোকে জীবন চলতে পারে না তাই শরীয়তের দলিল প্রমাণ অন্বেষণ করার তার দরকার হয় না। তাক্লিদকারী যে ঈমামকে অনুসরণ করেন তাঁর কথাকে শরীয়তের দলিল মনে করে না, মনে করেন বিধি বিধানের নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যাদানকারী। সহজ ও সরল অর্থে তাক্লিদ হলো মাজহাব বিশ্বাস করা।
মহান আল্লাহ পাকের আনুগত্য করতে ইসলামের প্রধান নির্দেশ রয়েছে। মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের বিধি-বিধান মানুষের কাছে প্রচার করেছেন বলেই তাঁর অনুসরণ করা আল্লাহর নির্দেশ। নবীজির আনুগত্য মানে মহান আল্লাহ পাকের আনুগত্য করা। হালাল-হারাম, বৈধ-অবৈধ যেহেতু নির্ধারিত হয় আল্লাহ ও রাসূল (দ.)’র কথার ভিত্তিতে তাই অন্য কারো আনুগত্য করা ইসলাম অনুমোদন করে না। কিন্তু কোরআন ও সুন্নাহর এমন অনেক বিধি-বিধান আছে যেগুলোর ব্যাখ্যা স্পষ্ট নয়। এসকল কোরআন-হাদিসের সহজ উপলব্ধি করা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ এসব আয়াত ও হাদিসে রয়েছে সংক্ষিপ্ততা, অস্পষ্টতা ও বাহ্যিক বৈপরীত্য। যেমন মহান আল্লাহর বাণী পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তালাকপ্রাপ্ত নারীগণ তিন ‘কুরু’ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে’। (সূরা বাকারা, আয়াত : ২২৮)
আরবি ভাষায় ‘কুরু’ শব্দটি দু’টি অর্থে ব্যবহৃত হয়। এখানে কুরুর অর্থ তালাকপ্রাপ্তা নারী তিন মাসিককাল অপেক্ষা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না তিন তুহ্র পর্যন্ত অপেক্ষা করবে তা স্পষ্ট নয়। অনুরূপভাবে আল্লাহর রাসূল (দ.)’র এক হাদিসে বর্ণনা আছে ‘যার ঈমাম আছে, (নামাজে) ঈমামের কিরাতই তার কিরাত বলে গণ্য হবে’।
অন্য একটি হাদিসে ইরশাদ আছে, যে ব্যক্তি (নামাজে) সূরা ফাতিহা পড়ল না তার নামাজই হলো না’। বাইরের দৃষ্টিতে হাদিস দু’টি বিপরীত মনে হচ্ছে। প্রথম হাদিসের অর্থ দাঁড়ায়, নামাজে ঈমামের পেছনে মুক্তাদিকে কেরাত পড়তে হবে না। দ্বিতীয় হাদিসের অর্থ হলো, প্রতিটি নামাজে মুক্তাদি সূরা ফাতিহা পাঠ করতে হবে। হাদিস দু’টির বাহ্যিক দ্ব›দ্ব নিরসন করত ঃ আমল করা সাধারণ মুসলমানের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ঈমাম ও মুজতাহিদকে (যিনি কোরআন সুন্নাহ সম্পর্কে অভিক্ত) অনুসরণ করতে হয়। এখানে ঈমাম ও মুজতাহিদ অনুসরণীয় কিন্তু তাঁরা শরীয়তের নির্মাতা নন।
বিখ্যাত গবেষক ও মুহাদ্দিস শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবী (রহ.) লিখেছেন, আল কোরআনের আলোচনার বিষয় পাঁচটি- ১। ওয়াজিব, সুন্নাহ, বৈধ-নিষেধ ইত্যাদি বিষয়ের হুকুম আহকাম আলোচনা। ইবাদত, লেনদেন, সংসার, সমাজ, নাগরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ সকল ধরনের বিধি-বিধান এর অন্তর্ভুক্ত। ‘ফকীহ’গণ এসব বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করে থাকেন। ২। ইহুদি, খ্রিস্টান, পৌত্তলিক ও মুনাফিকদের সাথে বির্তক আলোচনা বিষয়ক জ্ঞান। যে জ্ঞানকে বলা হয় ‘ইলমুন মুখাসামা’ বা তর্কশাস্ত্র বিষয়ক জ্ঞান। এই জ্ঞান অর্জন করার দায়িত্ব মুতাকাল্লিমীন বা তর্কশাস্ত্র বিশারদের। ৩। মহান আল্লাহ পাকের নির্দেশনাসমূহ ও নিয়ামতের আলোচনা। নবমÐল ভ‚মÐলের সৃষ্টি, বান্দাদেরকে তাদের প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ সম্পর্কে অলৌকিকভাবে অবগত করা এবং আল্লাহ পাকের পরিপূর্ণ সু²তম গুণাবলী বর্ণনা করার জ্ঞান। ৪। মহান আল্লাহ পাকের বিশেষ বিশেষ ঘটনার আলোকে মানুষকে সতর্ক করা। যেমন আল্লাহ পাক তাঁর অনুগত বান্দাদের প্রতি যে পুরস্কার প্রদান করেছেন তা অস্বীকারকারীদের তিনি কী শাস্তি প্রদান করেছেন তা মানুষের কাছে তুলে ধরা। ৫। মৃত্যুর পর কবরের আযাব, কিয়ামত, বেহেস্ত-দোযখ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা। (সূত্র : আল- ফাওযুল কাবীর ফী উসূলিত তাফসির, পৃষ্ঠা: ১৬-১৭)
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.) এর হাদিস হলো পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যা। কোরআন পাক সঠিকভাবে বুঝতে হাদিস পাকের ধারস্থ হতে হয়। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘আপনার প্রতি আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি যাতে মানুষের কাছে তা আপনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেন’। (সূরা নাহল, ১৬:৪৪)
পবিত্র কোরআনে যেসব বিষয় শিল্পময়ভাবে বিধৃত হয়েছে তা আরো পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যাসহ বর্ণনা করা হয়েছে হাদিসে। আমরা একথা স্পষ্টভাবে বলতে পারি যে, হাদিসে পাকের আলোচনার বিষয়সমূহ ও উল্লেখিত পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবাদ।
এই পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে ‘ইলমুল আহকাম’ ছাড়া বাকি চারটি বিষয় অনেকটা সহজ। আরবি ভাষা সাহিত্য সম্পর্কে যার জ্ঞান আছে তিনি এই চার বিষয়ক কোরআনের আয়াত ও হাদিসের মর্মবাণী আত্মস্থ করতে পারবেন। কিন্তু ‘ইলমুল আহকাম’ অর্থাৎ শরীয়তে বিধি-বিধান সম্পর্কিত কোরআনের আয়াত ও হাদিসসমূহ গভীর, সু² এবং আত্মস্থ করা সহজ নয়। এসব আয়াত ও হাদিসের মর্ম উপলব্ধি করতে দরকার হয় উচ্চ মেধা, প্রখর দৃষ্টিশক্তি, উন্নত চিন্তা ও দর্শন। বুঝতে হয় কোরআনের নাসেখ-মানসুখ, মুহকাম-মুতাশাবিহা ইত্যাদি বিষয়ক। তাক্ওয়া বা আল্লাহ ভীতির মাধ্যমে যার এসব বিষয় বুঝার ক্ষমতা আছে তাকে বলা হয় ‘মুজতাহিদ’।
ইসলামের সঠিক পথে সাধারণ মুসলমান চলতে চাইলে তাকে কোন না কোন ‘মুজতাহিদ’কে অনুসরণ করতে হবে। সাধারণ রোগী চিকিৎসা শাস্ত্রে অজ্ঞ বলে স্বাস্থ্য রক্ষায় চিকিৎসকের কাছে যায়। কিন্তু চিকিৎসক তাঁর নিজের চিকিৎসা করতে অন্য কারো কাছে যেতে হয় না, কারণ তিনি নিজেই নিজের চিকিৎসা করতে পারেন। তদ্রæপভাবে ‘মুজতাহিদ’ নিজে গবেষণা করে ইসলামের ওপর চলতে পারেন, সাধারণ মুসলমান পারে না বলে কোন না কোন ‘মুজতাহিদ’কে অনুসরণ করে চলতে হয়। যেভাবে সাধারণ রোগী চিকিৎসা শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে আরোগ্য লাভের জন্য অনুসরণ বা ব্যবস্থাপত্র নিতে হয়।