মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ দানেশ আহমদ চৌধুরী

55

১৯৪২ সালে ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী থানার অন্তর্গত বৈলছড়ি ইউনিয়নের চেচুরিয়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম একরাম আলী চৌধুরী ও মাতার নাম ছফুরা খাতুন। দানেশ আহমদ চৌধুরী বৈলছড়ী নজুমুনন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শুরু করেন। স্কুল জীবন শেষ করে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবন থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ৬৬ এর ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় একজন লড়াকু ছাত্রনেতা হিসেবে সর্বসাধারণের নিকট পরিচিতি পান। একদিকে চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন, অন্যদিকে ’৬৮, ’৬৯ সনের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঁশখালীতে তাঁর ভূমিকা অতুলনীয়। তাঁর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের বিশাল কর্মী বাহিনী নৌকা মার্কা প্রতীককে জয়যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ছাত্রনেতা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জাতীয় শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন আপসহীন। একজন ধার্মিক মানুষ হয়েও তিনি আপাদমস্তক ছিলেন অসা¤প্রদায়িক। মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ধারার রাজনীতি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। দানেশ আহমদ চৌধুরীর মত সৎ, দক্ষ, নিষ্ঠাবান, সাদামাটা, পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ পাওয়া আজ খুবই দুষ্কর। তিনি চট্টগ্রামের প্রখ্যাত আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন এবং অন্যদিকে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণির অত্যন্ত প্রিয় মানুষ হিসেবে বাংলাদেশে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি চট্টগ্রাম জেলা শ্রমিকলীগের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় শ্রমিকলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। তারই সুবাদে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৭২ সালে পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দেশে শ্রমিকলীগের দলনেতা হিসেবে যুগোসøভাকিয়া, বুলগেরিয়া, বার্লিনসহ পৃথিবীর বহুদেশে সফর করেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘লালবাহিনী’ সৃষ্টি করলে দানেশ আহমদ চৌধুরীকে ৭৩ সালে চট্টগ্রাম বিভাগের লালবাহিনীর চিফ কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বভার অর্পণ করেন। এরপর তিনি ১৯৭৪ সালে ২৬ মে ভারতীয় অবিভক্ত বাংলার আইনসভার সদস্য (এমএলএ) খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরীর সুযোগ্য কন্যা উন্মুল খাইর বেগম এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
বাঁশখালীর মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা চিন্তা-ভাবনা করে জননেতা দানেশ আহমদ চৌধুরী বাঁশখালীর মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য যানবাহন সার্ভিস চালু করার জন্য কয়েকজন বাঁশখালীর স্বনামধন্য ব্যক্তির সাথে আলাপ করে প্রয়াত বাবু সুধীর রঞ্জন চৌধুরী, ইলসা গ্রামের কাঠ ব্যবসায়ী আবদুর রসিদ চৌধুরী, হাজী রফিক সওদাগর, গুণাগরীর ছালেহ আহম্মদ সওদাগর এবং চাম্বলের নুর আহম্মদ, জলদীর বাদশার বাবাকে বলেন, বাঁশখালী থেকে চট্টগ্রাম শহরে জিপ গাড়ি চালানোর জন্য অনুরোধ করলে তাঁরা উৎসাহিত হয়ে ৭/৮টি জিপ ক্রয় করে বাঁশখালীর জিপ সার্ভিস চালু করেন। তখন আবদুর রসিদকে সভাপতি, বাবু সুধীর রঞ্জন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে ৭ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। নানা সমস্যার কারণে জিপ সার্ভিস প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এ সংকটময় অবস্থায় দানেশ আহমদ চৌধুরী সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বাবু সুধীর রঞ্জন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক ও আবদুর রসিদকে সহ-সভাপতি করে ৭ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে বাঁশখালী জিপ মালিক সমিতি নামকরণ করা হয়। তিনি সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর বাঁশখালীর জিপ সার্ভিস পুনরায় চালু করা হয়। তাই বাঁশখালী জিপ সার্ভিস চালুর রাখার ব্যাপারে তাঁর অবদান খাটো করে দেখার কোন অবকাশ নেই। তাছাড়াও চট্টগ্রাম থেকে আনোয়ারা যানবাহন সার্ভিস চালু করার ব্যাপারে দানেশ আহমদ চৌধুরীর অবদান অপরিসীম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর ৫ ডিসেম্বর ১৯৭৬ সালে তাকে কারাবরণ করতে হয়। তিনি ১৯৭৭ সালে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদন নির্বাচিত হন। সেই সময়ে সভাপতি ছিলেন সংগ্রামী জননেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জননেতা এম আবু ছালেহ। তাছাড়াও তিনি ১৯৭৯ সালে তৎকালীন চট্টগ্রাম-১৫ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। দেশ ও জাতির সংকটময় অবস্থায় সৎ, ত্যাগী, নিষ্ঠাবান, সততা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতা বর্তমানে খুবই প্রয়োজন। দানেশ আহমদ চৌধুরী ছিলেন ত্যাগী ও একজন নিষ্ঠাবান নেতা। ২০০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি সৎ, নিষ্ঠাবান বহু গুণের অধিকারী এই রাজনীতিবিদ পরপারে চলে যান। তিনি মৃত্যুকালে চার কন্যা, দুই পুত্র সন্তান রেখে যান। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।
তথ্যসূত্র : আধ্যাত্মিক পরিক্রমা-২